জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে
একতা ডেস্ক:
(সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের উদ্যোগে গত ১০ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। গোলটেবিল আলোচনায় পঠিত বক্তব্য পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো)
সংগ্রামী সভাপতি, শ্রদ্ধেয় আলোচকবৃন্দ, সাংবাদিক বন্ধুগণ, সুধীমণ্ডলী, ভাই ও বোনেরা, আমাদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনারা জানেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির পোশাকি নাম ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)।’ অসম এ চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার অজুহাতে এই চুক্তিতে একতরফা সুবিধা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশের উপর শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত নানান অসম শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ চুক্তিতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ তৎপরতা দেশবাসীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা আরও মনে করি, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের এখতিয়ার অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছিল না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে ‘নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তার চুক্তি মেনে। ফলে, চুক্তি সম্পাদনের আগে-পরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকার আজও চুক্তি প্রকাশ করেনি। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২৮ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট থেকে চুক্তি সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে তার ফলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে তাই শুধু আমরা তুলে ধরছি। কিন্তু ইউক্রেন, শ্রীলংকা ও ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, মূল চুক্তিটি বাস্তবে ১৭৭ পৃষ্ঠার। তাহলে অবশিষ্ট ১৪৯ পৃষ্ঠায় কী ভয়ংকর শর্ত লেখা আছে তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশ
যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে
১. বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছর আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার অর্থাৎ ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এলএনজি আমদানি করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
২. টনপ্রতি ৭৫-৮০ ডলার বেশি দামে আগামী পাঁচ বছর প্রতিবছর ৭ লাখ টন করে গম ক্রয় করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য কিনতে হবে, যার মূল্য দাঁড়াবে ১২৫ কোটি ডলার।
৪. তুলা, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনার জন্য বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ৩৫০ কোটি ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকা।
৫. মার্কিন বেসামরিক কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিনা দরপত্রে ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে হবে। সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে।
৬. বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক-ছাড় সুবিধা পাবে, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। এর মধ্যে অধিকাংশ পণ্য রফতানির সুযোগ ও সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই।
৭. চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এরূপ কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশ কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজনে, নিজের ইচ্ছায় চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। এই শর্ত দ্বারা সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যেমন, ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাইতে হচ্ছে।
৮. এই চুক্তিতে মাছ, মাংসসহ সব পণ্যের অবাধ আমদানির বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ করে পোলট্রি, মৎস্য, দুগ্ধসহ বিভিন্ন খাতে আমাদের দেশে বর্তমানে যেটুকু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ধস নামবে। অপ্রয়োজনে কৃষিপণ্য কিনতে আমরা বাধ্য হবো। রাসায়নিক পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ঢোকার সুযোগ অবারিত হবে। এমনকি মার্কিন পণ্যমান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পণ্যের যে মান ঘোষণা করবে, ঐ সব পণ্যের মান নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং বাংলাদেশে ঐসব পণ্যের মানও পরীক্ষা করা যাবে না।
৯. এই চুক্তির ফলে আমরা বেশি দামে মার্কিন তুলা কিনতে বাধ্য হবো। পরিবহনের খরচ ও ট্রান্সশিপমেন্টের সময় বেশি লাগবে। তৈরি পোশাকের খরচ বেড়ে যাবে। রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে বিপর্যয় আসবে, অনেক শ্রমিক চাকুরিচ্যুত হবে।
১০. এই চুক্তি কার্যকর হলে আগামী ১০ বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এদেশে আমদানিকৃত ৬,৪১০টি পণ্যের মধ্যে ৬,০৩৮টি পণ্যের শুল্ক মওকুফ হয়ে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশ ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক হারাবে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এখন গড়ে ১৫% হারে যে শুল্ক নেয়, এ চুক্তির পর তার সাথে আরও ১৯% যোগ করে মোট ৩৪% হারে শুল্ক নেবে।
১১. বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬ বিলিয়ন ডলার। জাপানের সাথে ঘাটতি ০.৪৫ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ১৯ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সুবিধা পাওয়া ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হলে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যরাও অনুরূপভাবে শুদ্ধসুবিধা দাবি করলে আমাদের অর্থনীতি এক মহাসংকটে পতিত হবে। ইতিমধ্যে জাপান এ আলোচনা তুলেছে।
১২. এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রন্ত হবে। ওষুধের দাম বেড়ে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে, জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।
১৩. এসবের বাইরে স্বতন্ত্র ও সমান্তরাল আরও চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির বিভিন্ন ধারায় কী লেখা আছে, তার বিস্তারিত বিবরণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
উপরের আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি অসম, অন্যায্য ও অধীনতামূলক। এই চুক্তি বাংলাদেশকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একইদিন কেরাণীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এস-এর সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অস্বাভাবিক দ্রুততায় এবং গোপন প্রক্রিয়ায় এসব চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরকার দেশের বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বৃহত্তম ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মরিয়া হয়ে ওঠেছিল।
বন্দর নিয়ে চক্রান্ত বর্তমান সরকারের আমলেও চলছে। ইতোমধ্যে এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়াল্ডকে দিতে গত ৪ জুন নৌ মন্ত্রণালয় থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দুইটি চিঠি দেওয়া হয়েছে দ্রুত চুক্তি সম্পাদন করার জন্য। গত ৮ এপ্রিল দুবাইতে ডিপি ওয়াল্ডের সাথে বৈঠক হয়েছে। সেখানে আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে কয়েকজন অংশ নিয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পিপিপি অথরিটি ও ডিপি ওয়াল্ডের প্রতিনিধি সমন্বয়ে ১৩ সদস্যের কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। অথচ বন্দর ব্যবহারকারী, শ্রমিক কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদেও আলোচনা করা হচ্ছে না।
বাংলাদেশে তুরস্কের সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপনের আলোচনা এখনো চলমান কৌশলগত সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এঝঙগওঅ, অঈঝঅ নামে দুটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের আলোচনাও টেবিলে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলার চক্রান্ত অব্যাহত আছে। জানা যায়, গত ৫ থেকে ৭ই মে ব্রেন্ডানলিঞ্চ এর নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য। ঐ সময়ই চুক্তি দুটি স্বাক্ষরের ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে বলে শুনা যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন তৎপরতায় যাঁদের নাম সবচেয়ে আলোচিত ছিল, তাঁদের একজন তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং অন্যজন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি খলিলুর রহমানকে প্রমোশন দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে এবং আশিক চৌধুরীকে স্বপদে বহাল রেখেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিবিসি’র সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ কয়েকজন উপদেষ্টা ‘চুক্তির বিষয়ে জানেন না’ বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। মৎস্য উপদেষ্টা বলেছেন ঠেকাতে পারিনি। জামায়াত ও এনসিপি চুক্তিতে সম্মতি প্রদানের কথা মিন মিন করে অস্বীকার করলেও, চুক্তির বিরুদ্ধে তারা সংসদে এবং বাইরে কোনো কথা বলছে না। এতে বোঝা যায়, তাদের অবস্থান দেশবিরোধী চুক্তির পক্ষে।
বন্ধুগণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্যচুক্তিসহ সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি জাতীয় সংসদে উত্থাপন, সকল অসম চুক্তি বাতিল এবং ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাসহ দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী অগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের দাবিতে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের পক্ষ থেকে গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল। জোটের পক্ষ থেকে ওইদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে জাতীয় সংসদ ভবন পর্যন্ত গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ কর্মসূচির সমর্থনে সারাদেশে জোটের উদ্যোগে সমাবেশ-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু, সরকারি ও বিরোধী দলের কোনো সদস্য চুক্তিটি সংসদে উত্থাপন করেননি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য চুক্তির প্রসঙ্গটি সংসদে উত্থাপন করলেও স্পিকার আলোচ্যবিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেননি। এতে বোঝা যায়, বর্তমান বিএনপি সরকার সংসদকে পাশ কাটিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায়। সরকার ইতোমধ্যে সে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে কেনা ৫৭ হাজার টন গম বাংলাদেশে এসেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য সরকার গত ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ওয়াশিংটনে গিয়ে গত ১৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জ্বালানি সহযোগিতার নামে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর সুযোগ সৃষ্টি হলো।
মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক বৈষম্যমূলক বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে, ভারত স্থগিত করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, তারা চুক্তি বাতিল করবে না, পর্যালোচনা ও সংশোধন করবে। কিন্তু, পর্যালোচনা ও সংশোধন না করেই একের পর এক চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান-দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলুন।
বন্ধুগণ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধের ফলে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। টানা পাঁচ সপ্তাহ যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও, এখনও যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি হয়নি। যুদ্ধের আতঙ্ক কাটেনি। এখনও হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা অব্যাহত আছে। দস্যুর মতো হানা দিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী। তাঁদের বিরুদ্ধে সাজানো হয়েছে মিথ্যে মামলা। মার্কিনী অবরোধ-নিষেধাজ্ঞায় কিউবার জনগণের দুর্ভোগের শেষ নেই। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট, তাঁর পরিবারের সদস্য ও কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের ‘রাজা’ মনে করছেন। বিশ্বের সমস্ত সম্পদের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টি। এ কারণেই তারা দেশে দেশে আগ্রাসন চালাচ্ছে। একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে অসম চুক্তি–এই দুই কৌশলে তারা বিভিন্ন দেশকে নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের শৃঙ্খলে আটকাতে চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই সাম্রাজ্যবাদীদের বহুলচর্চিত কৌশল।
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় উঠেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতিও আমাদের আহ্বান–সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন, ব্যাপক জনগণের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলুন!
আমাদের দাবি
(১) সংবিধানের ১৪৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করে চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সাথে দেশ বিক্রির গোলামি চুক্তির সাথে জড়িত ইউনূস, খলিলুর রহমানসহ সকলকে বিচারের আওতায় আনা হোক।
(২) অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কার্যক্রমের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক।
(৩) বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করতে হবে।
(৪) নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ড বা কোনো বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার পায়তারা বন্ধ কর। লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিল কর।
(৫) দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি এঝঙগওঅ, অঈঝঅ এর নামে বাংলাদেশের বন্দর, বিমান ঘাঁটি মার্কিনীদের ব্যবহার করতে দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধ কর। বাংলাদেশেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটি করতে দেওয়া হবে না।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন