দস্তোয়েভস্কির সাহিত্যে নারী
সায়ন্তন সেন
শেষ পর্যন্ত নেল্লির প্রতিরোধ ভাঙে, ভেঙে কান্নায় ফেটে পড়ে। বছর তেরো বয়সের পুঁচকে মেয়েটা মানুষের মনের একটা গোপন সুড়ঙ্গ আমাদের চিনিয়ে দেয়: মানুষ যখন নিজের বুকের ক্ষতগুলো কাউকে দেখাতে পারে না, তখন অন্যকে কষ্ট দিয়ে, অপমান করে, সকলের সাথে অসহযোগ করে সেই যন্ত্রণার উপশম খোঁজে। হয়তো হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়, যতক্ষণ অবরোধ- ততক্ষণ যুদ্ধ করে। ঐ একই কারণে ‘নোটস্ ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর নায়ক অমন খিটখিটে, মনে-মনে সবাইকে অপমান করে, তারপর ক্ষমা করে সুখ পায়। অপমান করে যে-মেয়েটিকে সে ভালোবেসে ফেলেছে তাকেও, তারপর দুঃখে হাহাকার করে। দস্তোয়েভস্কির উপন্যাসে প্রায়শই খুব গরিব মেয়েদের দেখা পাওয়া যায়; কেউ ভিখিরি, কেউ বেশ্যা, কেউ আবার কোনো ধনী ব্যবসায়ী বা জমিদারের ‘আশ্রিতা’। একবার তারা গরিব বলে শোষিত হয়, আরেকবার মেয়ে বলে।
প্রথম উপন্যাস ‘অভাজন’-এর কথাই ধরা যাক। এর নায়িকা ভারভারা আলেক্সেয়েভনা ভীষণ গরিব। এমব্রয়ডারি করে কোনোরকমে দু-বেলার খাবারটুকু জোটে, অথবা তাও জোটে না সবসময়। ভারভারা লেখাপড়া জানে। ‘বেলকিনের গল্প’ তার প্রিয় বই। তার একটা শিল্পী-মন আছে, অতি-অল্প প্রশ্রয়ে যা বিষাদগ্রস্ত হয়। লেখার হাতটাও চমৎকার মেয়ের। দেভুশকিন-এর মতে, ‘ঠিক যেন কবিতা’। ভারভারা জানে, দেভুশকিন তাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে, ফুল দেয়, আরও এটা-ওটা উপহার দেয়। তাকে উপহার দেবে বলে নিয়মিত ধার করে দেভুশকিন। ভারভারার কিন্তু সেটা পছন্দ নয়। ‘আবার তুমি ধার করেছো?’ লিখে মৃদু ভর্ৎসনা করে সে। তাকে খুশি করার জন্য একটা গরিব লোক নিজেকে দিনের-পর-দিন আরও নিঃস্ব আরও ছিবড়ে করে দেবে- সেটা কেনই বা পছন্দ হবে তার? আর সত্যিকারের কোনো উপকার কি হয় তাতে? একটা একটা বালসামের শাখা, এক পাউন্ড মিষ্টি, দুটো ফুলের টব, এই সব নিষ্ফল আদর দিয়ে কীটের জীবন আর কতটুকু সহনীয় হয়? ভারভারা জানে, এসব প্রলেপ কিছু নয়। ভালোবাসা, কবিত্ব, প্রেম, ‘গোলাপী কল্পনা’ কিছু নয়। দারিদ্র্যের জয় হবে, একটা নিষ্ঠুর ব্যবস্থা তাকে তিলে-তিলে ঠিকই ধ্বংস করে দেবে। তাকে, আর তার গোবেচারা গরিব প্রেমিকটিকেও। তাই শেষমেশ দেভুশকিনকে সে মুক্ত করে দেয়। দেভুশকিন-এর অল্প পুঁজির চ্যারিটি, তার প্রগলভ অভিভাবকত্ব প্রত্যাখ্যান করে ভারভারা একজন অবস্থাপন্ন জমিদারকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। সহজ, এবং সহজ-লভ্য কম্প্রোমাইজ। টিকে থাকার একটা ‘স্বাভাবিক’ আকাঙ্ক্ষা তাকে ভালোবাসাহীন দাম্পত্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। প্রেমহীন দাম্পত্য, তাও শুধু টিকে থাকার জন্য- তাকে বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া আর কি বলা যায়?
দেভুশকিন এ-গল্পের নায়ক। হয়তো তার লেখার স্টাইল একদিন সত্যি-সত্যি গড়ে উঠবে, সেইদিন এই দরিদ্রের অহমিকা সত্য হবে; প্রৌঢ়, তবু তাকে ঘিরে নানান প্রত্যাশা আছে আমাদের। ভারভারার এসব বালাই নেই, ভারভারা তো মেয়ে, একটা প্র্যাগম্যাটিক সিদ্ধান্তের ভারে ক্রমশ নিষ্প্রভ হতে-হতে সে পাঠকের মন থেকে মুছে যায় (নিষ্ঠুর, তবুও কি স্বাভাবিক; বড়ো-বেশি স্বাভাবিক, স্বাভাবিকতম পরিণতি)। তার হেমন্তের দিন, অকারণ বিষণ্নতা, পুশকিনপ্রীতি, সব পুরুষ-সাহিত্যিকদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে থমথমে মুখে চলে যায় বীকভের উত্তরাধিকারীর জননী হতে। যে তার সর্বনাশ করেছে একদিন, তারই ঘর করতে চলে যায় ভারভারা। শেষ বিদায়ের আগে দেভুশকিনকে বলে, ‘হতভাগিনী ভারভারাকে তোমার মনে রেখো’... ‘বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত’ উপন্যাসের নেল্লিকে তো অনেকেই চেনেন। ‘বেচারী, অনাথিনী নেল্লি’, একরত্তি মেয়ে, মায়ের হাত ধরে ভিক্ষার থালা নিয়ে যে নেমে এসেছিল পথে। নেল্লির দুর্ভোগের মূলে ছিল তার মায়ের অ্যাডভেঞ্চারবিলাসী দুঃসাহসী প্রেমিক হৃদয়, ঠকে গিয়ে, দাগা খেয়ে, জীবনের সব বাজি হেরেও যা মচকায়নি (ভারভারার উলটো?)। মরার আগে সেই হতভাগিনী নেল্লিকে বলেছিল, ‘নেল্লী, গরিব হওয়া কিছু পাপ নয়, বড়োলোক হয়ে লোকের মনে আঘাত দেওয়াই হল পাপ’...। ...গরিব হয়ে থাকিস নেল্লী, আমি মরে গেলে কারও কথা শুনিস না, কিছু শুনিস না। একা থাকবি, গরিব হয়ে খেটে খাস, কাজ না পেলে ভিক্ষে করিস তবু ওদের কাছে যাস না।’ ‘ওদের’ মানে, যে তাকে ঠকিয়েছে, তাদের কাছে। ভানিয়ার অনুরোধে প্রিন্স সের্গেইচকে নিজের দুঃখের গল্প বলতে-বলতে মায়ের এই কথাগুলোও নেল্লি বলেছিল। ভানিয়া (এই উপন্যাসের নায়ক) নিজেও গরিব, কিন্তু নেল্লি যতটা, ততটা নয়। নেল্লি তার আশ্রিতা। এবং নীতিবোধ টনটনে যেহেতু, ঘরের কাজ করে সেই অনুগ্রহের দাম চুকিয়ে দিতে চায়।
সেই নেল্লি কিনা শেষমেশ ভানিয়াকেই মন দিয়ে ফেলল। ভানিয়া বুঝেও বোঝে না, শুধু দ্যাখে ‘কী এক রহস্যময় দৃষ্টিতে’ মেয়েটা প্রায়ই চেয়ে থাকে তার দিকে। এই উপন্যাসের একটি দৃশ্যে ডাক্তার নেল্লিকে ওষুধ খাওয়াতে গেলে সে বারবার তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। যতবার নেল্লি ওষুধ ফেলে দেয়, ডাক্তার ততবারই ফের তার মুখের সামনে তুলে ধরেন চামচখানা। শেষ পর্যন্ত নেল্লির প্রতিরোধ ভাঙে, ভেঙে কান্নায় ফেটে পড়ে। বছর তেরো বয়সের পুঁচকে মেয়েটা মানুষের মনের একটা গোপন সুড়ঙ্গ আমাদের চিনিয়ে দেয়; মানুষ যখন নিজের বুকের ক্ষতগুলো কাউকে দেখাতে পারে না, তখন অন্যকে কষ্ট দিয়ে, অপমান করে, সকলের সাথে অসহযোগ করে সেই যন্ত্রণার উপশম খোঁজে। হয়তো হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়, যতক্ষণ অবরোধ- ততক্ষণ যুদ্ধ করে। ঐ একই কারণে ‘নোটস্ ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর নায়ক অমন খিটখিটে, মনে-মনে সবাইকে অপমান করে, তারপর ক্ষমা করে সুখ পায়। অপমান করে যে-মেয়েটিকে সে ভালোবেসে ফেলেছে তাকেও, তারপর দুঃখে হাহাকার করে। এমনকি রাসকোলনিকভ যে সত্যি-সত্যি খুন করে বসে, সেটাও ঐ কারণে। সে ‘উবেরমেনশ্’ নয়, নেপোলিয়নও নয়; পরিত্যক্ত, মা-ই-ন-রি-টি- যে কাউকে ভালোবাসতে পারছে না, কারও ভালোবাসা টের পাচ্ছে না। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমার নিষ্ঠুরতায় দুঃখ পাই’- এই কথাটুকু মুখ-ফুটে বলতে পারলে, কত মানুষের কত গোপন অসুখ সেরে যেত! নেল্লির ছিল হার্টের অসুখ। এমন একটা জটিল অসুখ, যার চিকিৎসা সম্ভব নয়। উপন্যাসের শেষে ঐ অসুখেই সে মারা যায়। যে-ব্যবস্থা নেল্লির মতো ফুটফুটে মেয়েদের বাঁচতে দেয় না, তার সঙ্গে বুঝে ওঠার মতো অস্ত্র কই আমাদের হাতে? আর সোনিয়া, তারই কি দুঃখ কিছু কম? মাতাল বাপ আর নিষ্ঠুর সৎ মায়ের মূমুর্ষু সংসার ঠেলতে তাকে অন্ধকার কুঠুরিতে চলে যেতে হল। গরিব, হদ্দ গরিব, তারচেয়েও গরিব এবং দুর্দশাগ্রস্ত মেয়েদের ভিড়ে সোনিয়ার মুখ বোধহয় সবচেয়ে উজ্জ্বল। যিশু খ্রিস্ট যদি মেয়ে হতেন- তিনি হতেন ঠিক সোনিয়ার মতো (তাই না?)। খুন-টুন করে রাসকোলনিকভ তখন প্রায় উন্মাদ হয়ে যেতে বসেছে, এমন সময় সে সোনিয়াকে খুঁজে পায়। সোনিয়া, তার দুঃখসহোদরা! যে-ছেলেটা আরেকটু হলে স্যাঁতসেঁতে বিছানায় ছারপোকার মতো মিশে যাচ্ছিল, মানুষের হিংসার, ক্ষমতার ইতিহাস ভাবতে-ভাবতে শান দিচ্ছিল আত্মার কুঠারে, সেই রাসকোলনিকভ- ‘অপরাধ ও শাস্তি’-র নায়ক, স্মার্ট, সপ্রতিভ, শিক্ষিত ও সুদর্শন অথচ ইনার্শিয়াগ্রস্ত রাসকোলনিকভ- তাকে সোনিয়ার দুঃখের কাছে অবশেষে নত হতে হল।
আর কাকে সে বলতে পারত ঐ কুঠারের কথা? ‘আমি এখন জানি, সোনিয়া, যে মানুষ মনের দিক থেকে এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে শক্ত ও সমর্থ সেই সকলের ওপর প্রভুত্ব করতে পারে! যে বেশি সাহস দেখাতে পারবে ওদের কাছে সে-ই সঠিক। লোকের মুখের ওপর যে বেশি করে থুতু ছেটাতে পারবে সেই তাদের আইনপ্রণেতা আর যে সবার চেয়ে বেশি সাহস ধরে সে-ই সবার চেয়ে ঠিক! এ-পর্যন্ত তাই চলে আসছে এবং চিরকাল তা চলবেও! একমাত্র অন্ধদেরই সেটা চোখে পড়ে না!’
রাসকোলনিকভ খুন করেছে জেনেও সোনিয়া ভয় পায় না, তাকে ঘৃণা করে না। দুঃখে তার বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে: ‘ইশ্, কী কষ্ট!’ আধোঅন্ধকারে রাসকোলনিকভ শুধায়, ‘তাহলে এখন আমার কী করা উচিত, বলো!’ সোনিয়ার ছলোছলো চোখে বিদ্যুৎ ঝলকায়। দু-হাতে কাঁধ শক্ত করে ধরে রাসকোলনিকভকে সে দাঁড় করিয়ে দেয়; বলে, “এখনই, এই মুহূর্তে রাস্তার চৌমাথায় গিয়ে দাঁড়াও। মাথা নোয়াও, যে মাটিকে তুমি অপবিত্র করেছ প্রথমে তাকে চুমু খাও, তারপর চারদিকে ঘুরে-ঘুরে দুনিয়াসুদ্ধ সবাইকে মাথা নুইয়ে প্রণাম জানাও, সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বল : ‘আমি খুন করেছি।’ তবেই ভগবান আবার তোমাকে জীবন ফিরিয়ে দেবেন। যাবে? যাবে তো?”
অবশ্য সেই পুনরুজ্জীবনের গল্প দস্তোইয়েভস্কি ধরেননি, একটা ইঙ্গিতমাত্র দিয়ে আখ্যান শেষ করেছেন। রাসকোলনিকভ তখন বন্দী সাইবেরিয়ার কারাগারে। তার দুঃখের ভাগ নিতে সোনিয়াও গেছে তার পিছু-পিছু। বাঁচাতে হবে ছেলেটাকে, বুকের জমাট পাথর ভেঙে খুলে দিতে হবে অবরুদ্ধ অশ্রুর উৎসমুখ, সেই কাজেই সোনিয়াকে আমরা নিষ্ঠাবান দেখি উপন্যাসের শেষে। অমোঘ বাণী নয়, সুপরামর্শ নয়; ভালোবাসা দিয়ে, দরদ দিয়ে, দুঃখের ভাগ নিয়ে মানুষ মানুষকে পালটে দিতে পারে। রাসকোলনিকভও পালটেছে। তারপর একদিন কাঁদতে-কাঁদতে সে সোনিয়ার হাঁটু জড়িয়ে ধরেছে। দস্তোইয়েভস্কি লেখেননি, ‘কিন্তু এটা ঠিক যে তার পুনরুজ্জীবন ঘটছে, সে নিজেও তা জানে, সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারছে তার নবলব্ধ সত্তা দিয়ে’। জগতের সকল দুঃখের ভার গলার ক্রুশ করে নিয়েছে যে মেয়ে, আজ থেকে রাসকোলনিকভ তার সমস্ত দুঃখ-কষ্টের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করবে। প্রায়শ্চিত্তের আগুনে শুদ্ধ হবে সোনিয়ার প্রতি তার ভালোবাসাও। এই নিষ্ঠুর, প্রেমহীন, ষড়যন্ত্রসঙ্কুল পৃথিবীতে সোনিয়া ছাড়া আর কে তাকে বাঁচাতে পারত?
‘ব্রাদার্স কারামাজভ’-এ লিজাভিয়েতাকে প্রথম দেখা যায় সন্তান প্রসবের সময় (প্রসঙ্গত, ‘নোটস্ ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর প্রসটিটিউট, এবং ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর অন্যতম ভিক্টিমের নামও কিন্তু লিজাভিয়েতা। এই ‘পুওর লিজা’ আর্কেটাইপ দস্তোইয়েভস্কি নিয়েছিলেন কারামজিনের গল্প থেকে)। ফিওদর পাভলোভিচের বাগান সংলগ্ন স্নানঘরের দরজা ঠেলে গ্রিগোরি দেখে, ‘শহরের একটা জড়বুদ্ধি মেয়ে, লিজাভিয়েতা, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং গায়ের বোটকা গন্ধের দরুন সারা তল্লাটে- ‘স্মের্দিয়াশশায়া’- ‘দুর্গন্ধ’ ‘পূতিগন্ধী’ লিজাভিয়েতা নামে যার পরিচয়, কী করে যেন ওদের স্নানঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, ওখানে সদ্য একটি সন্তান প্রসব করেছে। সদ্যোজাত শিশুটির পাশে শুয়ে সে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।’
লিজাভিয়েতা ছিল উঞ্ছবৃত্তিধারী, কিন্তু রুটি আর জল ছাড়া কিছুই সে খেত না। শহরের লোক টাকা দিলে ‘গির্জার ভাণ্ডে হোক বা জেল কয়েদিদের বাক্সেই হোক- কোথাও না কোথাও ফেলে দিয়ে আসত’। কেউ খাবার দিলে ‘প্রথম যে বাচ্চাটাকে সামনাসামনি পেত তাকে সেটা দিয়ে দিত, তা না হলে এমনও হয়েছে যে আমাদের শহরের অত্যন্ত ধনী কোনো মহিলাকে থামিয়ে তার হাতে তুলে দিয়েছে, মহিলাও খুশি হয়ে তা গ্রহণ করেছে।’ তার শণ কাপড়ের একটিমাত্র কামিজে শহরের শালীনতা ক্ষুণ্ন হত। তবু শহরের সমব্যথী লোকেরা যতবার তাকে একটু ভদ্রগোছের জামাকাপড় পরানোর চেষ্টা করেছে, সব সে ফেলে দিয়ে এসেছে গির্জার উঠোনে। সমাজের শালীনতা নিয়ে, শহরের লোকেদের সম্ভ্রাম রক্ষা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ঘুমোত সে সবজি খেতে, খড়ের গাদায়, গোয়াল ঘরে, গির্জার বারান্দায়। তার চুলে, কাদামাটির জটে জড়িয়ে যেত ঘাস-পাতা-কুটো, গায়ের ময়লা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াত, তাই নিয়েই সে থাকত। কথা বলতে পারত না, মাঝে-মাঝে জিভ নেড়ে কেবল ঘোঁত-ঘোঁত আওয়াজ করত। কাজেই তার মনের খবর কিছু জানা যায়নি।
‘এমন একটা জন্তুকে মেয়েমানুষ বলা যায় কি?’ ‘যায়, এমনকি খুবই বলা যায়’, পানোন্মত্ত কয়েকজন ভদ্রসন্তানের প্রশ্নের উত্তরে সামনে এগিয়ে এসে বুক ঠুকে ঘোষণা করল ফিওদোর পাভলোভিচ। তারপর ফিওদোর পাভলোভিচ কারামাজভ- যার লাম্পট্যের সীমাপরিসীমা নেই, প্রিয়তম শব্দ যার নারী, মেয়েদের ‘ন্যূনতম প্রশ্রয়ের ইঙ্গিতে’ যে সম্ভোগে প্রবৃত্ত হত- লিজাভিয়েতার গর্ভে নিজের হত্যাকারীর বীজ ঢেলে দিল। সেই রাত্রে ফিওদোর পাভলোভিচ লিজাভিয়েতাকে ধর্ষণ করেছিল কি না উপন্যাসে স্পষ্ট করে বলা নেই। যা আছে তা কতকটা এরকম : প্রসবের কিছুক্ষণ আগে ঐ ভারী পেট নিয়ে লিজাভিয়েতা ফিওদোর পাভলোভিচের বাগানের উঁচু ও মজবুত বেড়া টপকে লাফিয়ে ভিতরে গিয়ে পড়ে। তারপর শরীরটাকে টেনে নিয়ে যায় স্নানঘর পর্যন্ত। আসতে তো হবেই তাকে। তার পেটের ভিতরেই যে আছে ফিওদোরের খুনি। পাঠক, এই সেই ‘শোচনীয় ও রহস্যজনক মৃত্যু’, যাকে ঘিরে আবর্তিত হবে কারামাজভ ভাইয়েদের অদৃষ্ট। খুন- যা মিতিয়া করতে প্রস্তুত ছিল, ইভান প্রত্যাশা করেছিল, আলিওশা প্রতিরোধ করতে পারেনি, দস্তোইয়েভস্কি দেখতে পেয়েছিলেন : তার বীজ লুকোনো আছে লিজাভিয়েতার গর্ভে।
সূত্র : ১. অভাজন- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : ননী ভৌমিক) ২. বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : অরুণ সোম) ৩. আত্মগোপনে লেখা- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : অরুণ সোম) ৪. অপরাধ ও শাস্তি- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : অরুণ সোম) ৫. ইডিয়ট- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : অরুণ সোম) ৬. কারামাজভ ভাইয়েরা- ফিওদোর দস্তোয়েভস্কি (অনুবাদ : অরুণ সোম)
শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি
সমাজতন্ত্র নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথও
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন