
বৃটিশকে তাড়িয়ে সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পর সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়। কমিউনিস্টরা সেদিন শ্লোগান তুলেছিল “ইয়া আজাদী ঝুটা হায়, লাখো ইনছান ভুখা হায়”। কমিউনিস্টদের ওপর নেমে আসে চরম দমন-পীড়ন, কয়েক হাজার পার্টির নেতা কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়, দেশত্যাগে বাধ্য হয় হাজার হাজার পার্টি সদস্য নেতা কর্মী। ঠিক এমনই সময়ে ১৯৪৯ সালের ১৮ মার্চ খুলনার দৌলতপুরের এক বৃটিশ বিরোধী ও বামপন্থী পরিবারে জন্ম হয় শেখ মনিরুজ্জামানের।
ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রগতিশীল পরিমন্ডলে বড় হতে থাকেন এবং বড় ভাইদের সাথে থেকে বামপন্থী হয়ে ওঠেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলা, শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকেন। পিতা শেখ শফিউদ্দিন দৌলতপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান ছিলেন। কমরেড রতন সেনের বড় ভাই বিপ্লবী মোহিত সেনগুপ্ত ছিলেন শেখ শফিউদ্দিনের সহপাঠী,তাদের পরিবারে যাতায়াত ছিল অবাধে। দৌলতপুরের শেখ পরিবারের সদস্য কমরেড শেখ নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে এসে শেখ মনিরুজ্জামানের রাজনীতির হাতে খড়ি হয়।
দৌলতপুরের শেখ পরিবারের আরেক বিপ্লবী প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এর সাথে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। অসাধারণ মেধা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং তার সাথে ছাত্র রাজনীতি ও পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলন কমরেড শেখ মনিরুজ্জামানকে পরিণত করে খুলনা অঞ্চলের ত্যাগী সাহসী গণমানুষের প্রিয় নেতা হিসেবে।
শেখ মনিরুজ্জামান বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলেন। তিনি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে প্রথম গ্রেডে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে দৌলতপুর হাজী মোহাম্মদ মুহাসিন স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এস এস সি পাশ করে ভর্তি হন সরকারি ব্রজলাল কলেজে। সঙ্গে এক ঝাক বন্ধু প্রায় সকলে সমাজতন্ত্রের ভাবাপন্ন যারা ৬২ শিক্ষা আন্দোলনের সময় স্কুল পালিয়ে মিছিলে আসতেন, ফলে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হতে সময় লাগেনি। কলেজে তখন ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠন বিশাল, ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রায় সকল আসনে জয় লাভ করে। ছাত্রনেতা জামিরুল ইসলাম তখন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি। ১৯৭০ সালে ব্রজলাল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএসসি পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফলিত রসায়নে এম এ ক্লাসে ভর্তি হন।
১৯৬৫ সালে চীন রাশিয়া দ্বন্দ্বে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়। সেই সময় কয়েক জন ছাত্র কর্মী ছাড়া মস্কো পন্থিদের পক্ষ কেউ ছিল না। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পরে ফেব্রুয়ারী মাসে কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি ও কমরেড রতন সেন রাজশাহী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ট্রেনে করে খুলনায় পৌঁছান। রেল স্টেশনে উভয় পক্ষ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও এই দুই বিপ্লবী মস্কোপন্থি ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে আসেন। এটিএম খালিদ, সরদার মোতাহার উদ্দিন, শেখ মনিরুজ্জামান, রওনকুল ইসলাম বাবর, কাজী জাহাঙ্গীর আহম্মেদ, সৈয়দ মজনুর রহমান, বাবর আলী সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। যাদের নিয়ে পরবর্তীতে বিষ্ণু চ্যাটার্জির খানকার গ্রামের বাড়িতে নতুন পার্টি গ্রুপ গঠন করা হয়। যাদের প্রায়ই সকলেই পরবর্তীতে খুলনা পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে শুরুতেই দৌলতপুর, গোয়লখালী ও বয়রা- বৈকালি প্রতিরোধ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। শ্রমিক নেতা সরকার মোতাহার উদ্দিনসহ নেতৃবৃন্দকে আর্মিরা আটক করে প্লাটিনাম জুট মিলে রাখে, সেখান থেকে কৌশলে উদ্ধার করা হলে দৌলতপুর নিজ বাড়িতে কয়েকদিন রাখে,পরে এলাকায় জানাজানি হলে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে রণাঙ্গনে খবরাখবর আনা নেওয়া মুক্তিযুদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ করেন। ২৯ জুলাই রণাঙ্গন থেকে মা গুরুতর অসুস্থ এই খবর মিথ্যা খবর দিয়ে রওনকুল ইসলাম বাবরকে বাড়িতে আনে স্থানীয় রাজাকারেরা। পরে পাক আর্মি তাকে এবং তার ছোট ভাই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী জাকির ও তপন দাসকে গ্রেফতার করে। সেদিন রাতে মহেশ্বর পাশা বিলে তাদেরকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। রওনকুল ইসলাম বাবর ছাত্র ইউনিয়ন খুলনা জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর ভাই। এই হত্যাকান্ডের পর মনিরুজ্জামানের পরিবার তাকে নিরাপদ স্থানে আটকে রাখে এবং কয়েকদিন পর সেখান থেকে ভারতে চলে যান।
১৬ ডিসেম্বরের পর মুক্তিযোদ্ধারা মুহাসিন স্কুলে ক্যাম্পে স্থাপন করে। এই সময় নঙ্গরখানা খুলে নিরন্ন মানুষকে খাদ্য দিয়ে সহায়তায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।
১৯৭২ শেখ মনিরুজ্জামান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস চালু হলে তিনি নিয়মিত ক্লাস শুরু করেন। এই সময় শেখ মনিরুজ্জামান ও সেলিনা হোসেন (লেখিকা) কে যুগ্ম আহ্বায়ক করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন খুলনা জেলা সম্মেলনের আগে পার্টি থেকে শেখ মনিরুজ্জামানকে খুলনায় ডেকে আনা হয় এবং ছাত্র ইউনিয়ন জেলা সংসদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। খুলনায় চলে আসার জন্য তিনি আর এমএ পরীক্ষা দিতে পারেননি। জাতীয় সম্মেলনে তিনি কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি দেশের অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন।
ছাত্র রাজনীতি শেষে তিনি শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত আনসার ফ্লাওয়ার মিলে কাজ শুরু করেন এবং নির্বাচনে সিবিএ এর সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন থেকে জুট প্রেস শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দুই বার জুট প্রেস এন্ড বেলিং মজদুর ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন।
তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান( দুইবারের শ্রম প্রতিমন্ত্রী) কে হারিয়ে দেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ১৯৮১ সালে তিনি উচ্চতর রাজনৈতিক প্রশিক্ষণে গ্রহণ করেন। শেখ মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
১৯৮০ সালে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসের পর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি তখন খুলনা জেলা কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক। ১৯৮৭ সালে চতুর্থ কংগ্রেস ও ১৯৯১ সালে পঞ্চম কংগ্রেসে একই পদে বহাল থাকেন।
বিলোপবাদীরা পার্টি ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি ১৩ জনের সাথে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ষষ্ঠ কংগ্রেস থেকে আমৃত্যু তিনি প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ২০০২ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই পদে ছিলেন।
৮০ দশকে আমরা যারা সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র রাজনীতি করতে এসেছিলাম এক ঝাক তরুণ, তাদের মধ্যে ব্রজলাল কলেজের প্রায়ই সকলকে পার্টির যুক্ত করার প্রধান ভুমিকায় ছিলেন কমরেড শেখ মনিরুজ্জামানের। দৌলতপুর থানার বয়রা আমার বাড়ির এলাকায় প্রথম পাটি গ্রুপ গড়ে ওঠেছিল তাঁরই উদ্যোগে। প্রথম দিনের আলোচনায় তৎকালীন জেলা সম্পাদক কমরেড রতন সেন উপস্থিত ছিলেন। চরম দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল এলাকায় শক্তিশালী ছাত্র ইউনিয়ন আমরা গড়ে তুলেছিলাম। বোধহয় সেই কারণে বিশেষ বিবেচনায় পার্টি গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শেখ মনিরুজ্জামান পরম যত্নে আমাদেরকে গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৯২ সালে বিলোপবাদীরা পার্টি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি দিনরাত এক করে সমগ্র খুলনা জেলায় নেতা কর্মীদের বাড়ি বাড়ি ছুটে বেড়িয়েছেন। তখন আমাকেও জেলার নানা কাজে যুক্ত করেন এবং পরবর্তী জেলা সম্মেলন জেলা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। আমি যখন ছাত্র ইউনিয়ন দৌলতপুর থানার সভাপতি। কলেজ শেষে তাঁর বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতে যেতাম। তখনই তিনি জুট প্রেস শ্রমিকদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন।
কমরেড শেখ মনিরুজ্জামান রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, রেলশ্রমিক, বেকারি শ্রমিক, হ্যান্ড লিংক শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতেন। ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন তিনি কারাগারে অন্তরালে ছিলেন।
জেল থেকে বেরিয়ে ১৯৭৯ সালে খুলনা-৩ আসনে সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন। তাঁর নির্বাচনী জনসভায় তৎকালীন পার্টি সভাপতি কমরেড মণি সিংহ যোগদান করেন।
কমরেড শেখ মনিরুজ্জামানের সাথে আমার জেলা কমিটিতে সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রায় ২৪ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা হলো, তিনি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকে অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন আর সম্মান করতেন। শ্রমিকদের বিপদে নিজের জীবন বাজী রেখে ঝাপিয়ে পড়তেন, শ্রমিকদের জন্য নানাভাবে অর্থ ব্যয় করতেন।
তাঁর এই সাহসী ভুমিকার জন্য খুলনার সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাকে সমীহ করে চলতেন। তিনি ইচ্ছা করলে ভোগ বিলাসের জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে নিজের অনেক সম্পত্তি বিক্রি করে রাজনীতির জন্য খরচ করেছেন, রাজনীতিতে আজীবন সার্বক্ষনিক থেকেছেন। কমরেড শেখ মনিরুজ্জামান বিভিন্ন সময় আমাদেরকে অনেক উপদেশমূলক কথা বলতেন, তাঁর সব কথা তখন আমরা আমলে নিতে পারিনি, কিন্তু আজ বুঝতে পারি তাঁর কথাগুলো কতটা বাস্তব। তিনি ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মারা যান।
কমরেড শেখ মনিরুজ্জামানের মতো নেতার সততা-সাহস- ত্যাগ-কর্মপন্থা আমাদের আগামী দিনের রাজনীতিতে পথ দেখাবে। চিরঞ্জীব কমরেড শেখ মনিরুজ্জামান।
লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি