ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর সম্পর্ক যান্ত্রিকতা বনাম মার্কসবাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ডা. মনোজ দাশ প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থারই একটি ভিত্তিকাঠামো ও একটি উপরিকাঠামো থাকে। ‘ভিত্তি হলো সমাজ বিকাশের নির্দিষ্ট স্তরে তার অর্থনৈতিক কাঠামো। উপরিকাঠামো হলো সমাজের রাজনৈতিক, আইনগত, ধর্মীয়, শিল্পকলামূলক ও দার্শনিক মত এবং তাদের সাথে সংগতিপূর্ণ রাজনৈতিক, আইনগত ও অন্যান্য রকমের প্রতিষ্ঠান।’ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অনুযায়ী ভিত্তি ও উপরিকাঠামো দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। মার্কসবাদ অনুযায়ী উপরিকাঠামো অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত, ভিত্তিকাঠামো উপরিকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার বিপরীত দিকে উপরিকাঠামোও ভিত্তিকাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে এবং তাকে পরিবর্তন করতে পারে। এভাবে উপরিকাঠামো ও ভিত্তিকাঠামো দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর এই সম্পর্কের বিশ্লেষণ ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এঙ্গেলস ঐতিহাসিক বস্তুবাদের যান্ত্রিক ও নিয়তিবাদী ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করে ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর সম্পর্কের সুস্পষ্ট দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা করে গেছেন। মার্কস অর্থনীতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মার্কস অর্থনীতি-নিরপেক্ষ ইচ্ছা কিংবা চিন্তার স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছেন। এঙ্গেলস বলেছেন-‘এটা একটি আজগুবি ধারণা যে, ইতিহাসে যাদের ভূমিকা রয়েছে সেইসব বিভিন্ন মতাদর্শক্ষেত্রের স্বাধীন বিকাশকে আমরা অস্বীকার করি বলে ইতিহাসের ওপর তাদের কোনরূপ প্রতিক্রিয়াকেও আমরা বুঝি অস্বীকার করি। ... এই ভদ্রলোকেরা প্রায়ই ইচ্ছা করেই ভুলে যান যে, একবার যখন কোন ঐতিহাসিক বস্তু অপরাপর এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক কারণের ফলস্বরূপ সৃষ্ট হয়ে যায়, তখন সেই বস্তুটি তার নিজের পরিবেশের ওপর এবং এমনকি যেসব কারণ থেকে তার জন্ম সেগুলিরও ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।’ (এঙ্গেলস: এফ. মেহনিং এর কাছে লিখিত পত্র, ১৪ জুলাই ১৮৯৩) ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অর্থনৈতিক নিয়তিবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। উপরিকাঠামো সৃষ্টির পেছনে অর্থনৈতিক ভিত্তির সামগ্রিক প্রভাবের কথাটি চিন্তা করলে এ কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভিত্তি উপরিকাঠামোকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ উপরিকাঠামোর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পূর্ণভাবে সমাজের অর্থনেতিক ভিত্তির ওপরে নির্ভরশীল। উপরিকাঠামোর কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই ও ভিত্তি এবং উপরিকাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ক যান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সমাজের পরিবর্তনশীল উৎপাদন সম্পর্ক যে অর্থনৈতিক ভিত্তির জন্ম দেয় তার ফলে সমাজের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে প্রাতিষঙ্গিক (correspoding) উপরিকাঠামো উৎসারিত হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও তা থেকে এই জাতীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, উপরিকাঠামোর বিভিন্ন উপাদান আবশ্যিকভাবে অর্থনৈতিক ভিত্তির যান্ত্রিক প্রতিফলন মাত্র। লেনিন ও প্লেখানভ ঐতিহাসিক বস্তুবাদের এই সরলীকৃত ব্যাখ্যার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। মার্কসের ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে না পারার কারণেই মার্কসবাদ সম্পর্কে এক ধরনের বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। মার্কসবাদের বেশ কিছু বিকৃতিকারী, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের মাকর্সবাদী বলে, অন্যান্যরা মার্কসবাদকে অস্বীকার করার জন্যই তার অবান্তর হাস্যকর অনুসরণ করে মার্কসবাদকে এই বলে প্রচার করতে চেয়েছে যে, সমাজের প্রতিটি ধ্যান-ধারণা ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কোন-না-কোনও তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রত্যক্ষ ফল এবং তার সেবক। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত The Justification of Capitalism in West European Philosophy গ্রন্থে রুশ তাত্ত্বিক ঠ. ঝযঁষুধঃরশড়া এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন যে, ‘আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন যেহেতু পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু এই দর্শনও বস্তুতপক্ষে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পুঁজিবাদের মতো এই দর্শনও সামগ্রিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল।’ লেনিন ও প্লেখানভ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছিলেন যে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ কখনই উপরিকাঠামোকে একপেশেভাবে অর্থনৈতিক ভিত্তি দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে মনে করে না। ‘শুলিয়াতিকভের বক্তব্য দাঁড়িয়েছিল ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপরে। তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না যে, কোনো তত্ত্ব বা ধারণা চিন্তার ইতিহাসে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে সৃষ্টি হলেও তার চরিত্রগত এবং পদ্ধতিগত স্বরূপ অনেকাংশেই নির্ণীত হয় তার পূর্ববর্তী চিন্তাধারার সঙ্গে যৌক্তিক (logical) প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।’ উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, গ্যালিলেওর বৈজ্ঞানিক চিন্তা একাধারে যেমন ছিল সামন্ততন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের বিষয়গত প্রতিফলন, অপরদিকে তাঁর চিন্তা ছিল বিজ্ঞানজগতের একান্ত নিজস্ব বিকাশধারার যৌক্তিক পরিণতি। সমাজচিন্তার ইতিহাসে মার্কসবাদের জন্মকেই এভাবে দেখা যেতে পারে। মার্কসবাদ শুধুমাত্র শ্রমিকশ্রেণির ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়নি। মার্কসীয় তত্ত্বের বিকাশের পেছনে বিশেষ অবদান ছিল জার্মান ভাববাদী দর্শনের। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ যে অর্থনীতিকে একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখেনি, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এঙ্গেলসের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে-‘ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা অনুসারে জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনই হচ্ছে ইতিহাসের শেষ পর্যন্ত নির্ধারক বস্তু। এর বেশি কিছু মার্কস বা আমি কখনো বলিনি। অতএব, কেউ যদি তাকে বিকৃত করে দাঁড় করায় যে, অর্থনৈতিক ব্যাপারই হচ্ছে একমাত্র নির্ধারক বস্তু, তাহলে সে প্রতিপাদ্যটিকে একটি অর্থহীন, বিমূর্ত, নির্বোধ উক্তিতে পরিণত করে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হলো ভিত্তি, কিন্তু উপরিকাঠামোর বিভিন্ন বস্তুও ঐতিহাসিক সংগ্রামগুলির গতিকে প্রভাবিত করে এবং বহুক্ষেত্রে তাদের রূপ নির্ধারণে প্রধান হয়ে ওঠে।’ (এঙ্গেলস: জে ব্লখের কাছে লিখিত পত্র, ২১ সেপ্টেম্বর ১৮৯০) কিন্তু অর্থনৈতিক ভিত্তিতে বাদ দিয়ে কোনভাবেই উপরিকাঠামোর (রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো) উৎপত্তি ও বিকাশের প্রক্রিয়া বোঝা সম্ভব নয়। আবার ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে, কিন্তু তাই বলে অন্যান্য উপাদানের গুরুত্বকে অস্বীকার করে না। একথাও খেয়াল রাখে যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ যে সব উপরিকাঠামোর সৃষ্টি, ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর গতিপ্রকৃতিতে এবং অর্থনৈতিক জীবনসহ সমগ্র জাতীয় জীবনে এদের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। মার্কস-এঙ্গেলস যান্ত্রিক কার্যকরণ সম্পর্কের বিপরীতে ভিত্তিকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে দ্বান্দ্বিক কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। মার্কসের কাছে অর্থনৈতিক কাঠামো হচ্ছে কারণ এবং উপরিকাঠামো এর কার্য হিসেবে ভূমিকা পালন করে। উপরিকাঠামো আবার গৌণ কারণ হিসেবে কার্য সৃষ্টি করতে পারে এবং ভিত্তিকাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু ‘অর্থনৈতিক অবস্থাই শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। .... রাজনৈতিক, আইনগত, দার্শনিক, ধর্মীয়, সাহিত্যিক, শিল্পগত ইত্যাদি বিকাশ ঘটে অর্থনৈতিক বিকাশকেই ভিত্তি করে। কিন্তু এদের সবগুলিই পরস্পরের ওপর এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরেও ক্রিয়া করে। অর্থনৈতিক ভিত্তিই সক্রিয় কারণ, অন্য সবকিছু নিষ্ক্রিয় ফলাফল মাত্র, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। বরং পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে যা সর্বদাই শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রতিষ্ঠা করে।’ (এঙ্গেলস : এইচ স্টার্কেনৃবুর্গের কাছে লিখিত পত্র, ২৫ জানুয়ারি ১৮৯৪) তাই উপরিকাঠামো ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সামাজিক ভিত্তির দ্বারা প্রভাবিত হলেও, উপরিকাঠামো তার আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। এই প্রসঙ্গে কনরাড্ স্মিটকে (Conard Schmidt) লিখা ১৮৯০ সালের অক্টোবর মাসের একটি পত্রে এঙ্গেলস্ রাষ্ট্রশক্তির আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নটির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, রাষ্ট্র প্রাতিষঙ্গিক উৎপাদন সম্পর্কের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েও অচিরেই আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, উপরিকাঠামো একাধিক ক্ষেত্রে ইতিহাসের যে স্তরের ফলশ্রুতি, তাকে অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে যে ভিত্তি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে উপরিকাঠামোর স্থান নির্ণীত হয়, তা নয়। সমাজের যে অর্থনৈতিক ভিত্তিকাঠামো একটি বিশেষ উপরিকাঠামোর জন্ম দেয়, সেই ভিত্তিকাঠামোর অবলুপ্তি হলেও উপরিকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে এই ভিত্তিকে অতিক্রম করে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। যেমন, অ্যারিস্টটলের চিন্তা সমকালীন গ্রীক সমাজব্যবস্থা থেকে উৎসারিত হলেও গ্রিক ব্যবস্থার পতনের পর বহু শতাব্দী জুড়ে তার প্রভাব ইউরোপের দার্শনিক চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী, সাহিত্যিকের রচনা ও শিল্পকর্মের প্রভাব উপরিকাঠামোর এই আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্যের ফলেই আজও অম্লান হয়ে আছে। আবার এ কথাও অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মও তার যুগ তথা সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি নিরপেক্ষ নয়, কারণ এই সৃষ্টির প্রয়োজন হয় যুগের প্রয়োজনে, ইতিহাসের দাবিতে। তাই উপরিকাঠামো যেমন ভিত্তিকাঠামো দ্বারা প্রভাবিত হয়, আবার উপরিকাঠামোও একদিক থেকে আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন। শোষণহীন সমাজব্যবস্থায় উপরিকাঠামোর আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য আরও গভীরভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত হওয়ার সুযোগ থাকে। মানুষের চেতনা সক্রিয় ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করার শর্ত তৈরি হয় তখনই যখন তা হয় শোষণের শৃঙ্খলমুক্ত। এই প্রেক্ষিতেই স্বাধীন মানবমনের চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাজজীবনের বিকাশের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার প্রশ্ন চলে আসে। মানুষের চিন্তার ইতিহাসে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, যে তত্ত্ব বা ধারণা সমাজের প্রগতিশীল বিকাশের সহায়ক, উপরিকাঠামোর সেই সব উপাদানকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ গুরুত্ব সহকারে স্বীকৃতি দেয়। যে-কোনও তত্ত্বের বিকাশকে শুধুমাত্র একটি শ্রেণির মতাদর্শগত দিক হিসেবে বিবেচনা করা মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। চিন্তা ও দর্শনের জগতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ একটি তত্ত্বের মতাদর্শগত চরিত্র ও তার জ্ঞান সম্বন্ধীয় ধর্মের (পড়হমহরঃরাব ভঁহপঃরড়হ) মধ্যে পার্থক্য করে। ‘প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখ দার্শনিকের চিন্তা বিষয়গতভাবে দাস সমাজব্যবস্থা থেকে উৎসারিত হলেও, তাঁদের দার্শনিক চিন্তাকে সম্পূর্ণরূপে দাস ব্যবস্থার মতাদর্শগত সমর্থন মনে করাটা হবে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক চিন্তা। কারণ চিন্তার জগতে যুক্তির বিকাশ তার নিজস্ব নিয়মে ঘটে, যার ওপরে সামাজিক ভিত্তির প্রভাব একান্তই পরোক্ষ অর্থাৎ যে-কোন তত্ত্বের বিকাশকে শুধুমাত্র একটি শ্রেণির মতাদর্শগত রক্ষাকবচরূপে চিহ্নিত করাটা হবে নিকৃষ্টমানের বস্তুবাদের নামান্তর মাত্র।’ (Theodor Oiæerman: Problems of the history of Philosophy, চ: ৪০১-৪০৫) মার্কস ও এঙ্গেলসের সময়কালে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অর্থনীতি এতো বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে যে, তাঁরা এ বিষয়ে একটু বেশি জোর দিতে বাধ্য হন। যার ফলে অন্যান্য উপাদানগুলো কীভাবে অর্থনীতি থেকে উদ্ভূত এবং সেগুলো কীভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে তাঁরা পর্যাপ্ত ও যথাযথ ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেননি। এঙ্গেলসের কথায়- ‘প্রথমে আমরা প্রধানত এই জোর দিয়েছিলাম এবং বাধ্য হয়েই দিয়েছিলাম যে, রাজনৈতিক, আইনগত ও অন্যান্য মতাদর্শগত ধারণা এবং এইসব ধারণার মাধ্যমে সংঘটিত কার্যাবলীর উদ্ভব হয়েছে মূল অর্থনৈতিক ঘটনাবলী থেকে। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে বিষয়বস্তুর স্বার্থে আমরা রূপের দিকটা, অর্থাৎ যেভাবে ও যে কায়দায় এইসব ধারণা আর্বিভূত হয় সেই দিকটা অবহেলা করেছিলাম। এতে আমাদের শত্রুদের পক্ষে ভুল বোঝানোর ও বিকৃতি সাধনের একটা বড় সুযোগ জুটে যায়।’ সামগ্রিকভাবে মার্কস ও এঙ্গেলসকে অধ্যয়ন না করলে মার্কসবাদ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে। এঙ্গেলস এ বিষয়ে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন: ‘তরুণরা যে অনেক সময় অর্থনৈতিক দিকের ওপর যতোখানি উচিত তার চেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকেন, সে জন্য মার্কস ও আমি, আমরা নিজেরাই কিছুটা দায়ী। আমাদের প্রতিপক্ষীয়েরা অস্বীকার করতেন বলেই তাদের বিপরীতে অর্থনৈতিক দিকটির ওপর আমাদের জোর দিতে হয়েছিল এবং পারস্পারিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দিকগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার মতো সময়, স্থান বা সুযোগ আমরা পাইনি। কিন্তু ইতিহাসের কোন যুগকে উপস্থিত করার প্রশ্ন যখন এসেছে, অর্থাৎ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের প্রশ্ন যখন এসেছে, তখন অন্য কথা এবং ভুল হবার সম্ভাবনা থাকেনি।’ ভিত্তি ও উপরিকাঠামো সম্পর্কে ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা এমন একটি দিকদর্শন যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উপাদান ও তা থেকে উদ্ভূত অন্যান্য উপাদানগুলো এবং এদের পারস্পারিক সম্পর্ককে বোঝা যায়। এ বিষয়ে এঙ্গেলস বলেন: ‘ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা সেটা হলো সর্বোপরি অধ্যয়নের দিকদর্শন মাত্র, ছক নির্মাণের হাতল নয়...। সমস্ত ইতিহাসকে নতুনভাবে অধ্যয়ন করতে হবে, সমাজের বিভিন্ন গঠনরূপ থেকে তাদের অনুযায়ী রাজনৈতিক, আইনগত, নন্দনতাত্ত্বিক, দার্শনিক, ধর্মীয় ইত্যাদি ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার আগে এ গঠনরূপগুলির অস্তিত্বের অবস্থা বিশদরূপে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।’ (এঙ্গেলস : সি স্মিটের কাছে লিখিত পত্র, ৫ আগস্ট ১৮৯০) সুতরাং এটা বলা যায় মার্কস-এঙ্গেলস অথনীতি ও উপরিকাঠামোর যান্ত্রিক কার্যকরণ সম্পর্কের বিপরীতে অর্থনীতি ও উপরিকাঠামোর মধ্যে দ্বান্দ্বিক কার্যকরণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। মার্কস-এঙ্গেলসের এ দ্বান্দ্বিক চিন্তা অনুযায়ী- অর্থনীতি হচ্ছে কারণ এবং উপরিকাঠামো হচ্ছে অর্থনৈতিক কাঠামোর কার্য। একই সাথে উপরিকাঠামো আবার গৌণ কারণ হিসেবে কার্য সৃষ্টি করতে পারে এবং অথনীতি নামক ভিত্তিকাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। লেখক : মার্কসবাদী তাত্ত্বিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..