আদর্শ কমিউনিস্টরা মরে না
কারো কারো জীবন মৃত্যুর চেয়ে মহান। কমরেড তাজুল ইসলাম ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর মৃত্যু ছিল অসীম সাহসী এক বীর যোদ্ধার মতো। তাঁর স্বল্পকালের জীবন ছিল অসাধারণ দৃষ্টান্তের উদাহরণ। সেই সময়কালে তাজুলের আত্মদান অগুণিত তরুণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মৃত্যু প্রেরণা দিয়েছিল শ্রমজীবীদের, সাহস দিয়েছিল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মীদের।
তাজুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেও সেটাকে গোপন করে আদমজীতে সাধারণ বদলি শ্রমিকের জীবন বেছে নেন। তিনি একজন আদর্শ কমিউনিস্টের ভূমিকা পালন করেন, যা আজকের দিনে সত্যিই বিরল। মানবমুক্তির মহান আদর্শ, সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণিকে জাগিয়ে তুলতে ও সংগঠিত করতে নিরলসভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অর্থকষ্ট, অক্লান্ত পরিশ্রম, পারিবারিক সংকট কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।
বর্তমানে কমরেড তাজুলের স্মৃতি প্রায় বিস্তৃত। আজকের তরুণ প্রজন্ম তাজুলকে খুব একটা জানে বলেও মনে হয় না। এটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। তাজুল ছাত্র হিসেবে ছিলেন মেধাবী, অর্জন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা বিভাগের সর্বোচ্চ ডিগ্রি। কিন্তু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেও আদমজীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কারণ, তিনি চেয়েছিলেন নিজেকে ‘শ্রেণিচ্যুত’ করে শ্রমিকের সঙ্গে মিশিয়ে শ্রমিকদের বিপ্লবের জন্য সচেতন ও সংগঠিত করতে।
তাজুল ছিলেন একজন লড়াকু সৈনিক, যিনি আদমজীর শ্রমিকদের এরশাদ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। এই সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের কাতারের বীর যোদ্ধা। সেজন্য সেদিনের সামরিক শাসনের ভাড়াটিয়া দালালরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। সেই দিনটি ছিল ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।
১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনেও সাড়া সৃষ্টি করে। গড়ে উঠে ১৫ ও ৭ দল। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) গড়ে উঠে। রাজনৈতিক জোটদ্বয় ও স্কপের পক্ষ থেকে হরতাল ডাকা হয়েছে ১ মার্চ। সেই হরতাল সংগঠিত করার জন্য ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতের বেলায় শ্রমিকদের নিয়ে মিছিল বের করা হয়। তাজুল মিছিলের সামনে ছিলেন। মিছিলে এরশাদের দালালরা হামলা চালায়। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল তাজুল। এতে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরে মারা যান। তাজুলের এই মৃত্যু ছিল সাহসী বীরের মৃত্যু।
কমরেড তাজুলের মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। তিনি জেনে-বুঝে, সচেতনভাবে মৃত্যুভয়কে বৃদ্ধাঙ্গুগুলি দেখিয়ে, আদমজীতে শ্রমিক ধর্মঘট সফল করতে শ্রমিক-মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। এ মৃত্যু ছিল বীরোচিত, অনন্য সাধারণ। এই মৃত্যু তাজুলকে দিয়েছে অমরত্ব। তাজুল চিরঞ্জীব। এই বীর বিপ্লবীরাই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা। তাজুল কমিউনিস্ট হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে পরাজিত হননি। জীবন-প্রদীপ নিভে গেছে কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয়নি। বিপ্লবীর যেমন মৃত্যু নেই, তেমনই তাজুল ইসলামেরও মৃত্যু নেই।
এখন প্রয়োজন মৃত্যুহীন তাজুলের অসামান্য জীবন আদর্শকে নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আজকের বুর্জোয়া রাজনৈতিক ধারাকে বদলিয়ে সুস্থ প্রগতিশীল রাজনীতির ধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন কমরেড তাজুলকে। দেশ ও মানুষকে বাঁচাতে হলে সমাজ প্রগতির ঝান্ডাকে অগ্রসর করে নিতে হবে। এ কর্তব্য পালন করতে হলে আজ অনেক নিবেদিত কর্মীর প্রয়োজন। প্রয়োজন অসংখ্য ‘কমরেড তাজুলের’।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন