চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক মহড়া

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : চীন, ইরান ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে একটি যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এর মধ্য দিয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বৃদ্ধি পেল। অবশ্য এ ঘটনার আগে থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নিউজ২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা চায় ইরান মহড়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ না করে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকুক। এতে করে বোঝা যায়, এ মহড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে দেখছেন—সে বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যথেষ্ট সতর্ক। কেপ উপদ্বীপের সাইমনস টাউন এলাকায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান নৌঘাঁটিতে সম্প্রতি চীন, ইরান ও রাশিয়ার পতাকাবাহী যুদ্ধজাহাজ ভিড়তে দেখা গেছে। সপ্তাহব্যাপী এই সামরিক মহড়া (৯ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে। চলবে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। মহড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। এতে ২০০৬ সালে যাত্রা করা উন্নয়নশীল কয়েকটি বড় দেশের জোট ‘ব্রিক’-এর অন্য সদস্যরাও অংশ নিচ্ছে। পরে ব্রিকের নাম ব্রিকস হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলোর নামের আদ্যক্ষর নিয়ে ব্রিকের নামকরণ করা হয়েছিল। দেশগুলো হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে নামের শেষে যুক্ত হয় ‘এস’, ফলে জোটটির নতুন নাম দাঁড়ায় ‘ব্রিকস’। জোটটিতে সম্প্রতি মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যুক্ত হয়েছে। তাই জোটটি এখন ‘ব্রিকস প্লাস’ নামে পরিচিত। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা এ জোটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ‘যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, সমন্বিত নৌ-মহড়া এবং সমুদ্র সুরক্ষাবিষয়ক নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য’ বিভিন্ন দেশের যুদ্ধজাহাজগুলো একত্রিত হয়েছে। কোন দেশ কীভাবে মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভাষ্যমতে, ‘জাহাজ চলাচল এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ এ যৌথ মহড়ার উদ্দেশ্য। কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, ব্রিকস প্লাস মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট। তাহলে জোটটির সদস্যরা কেন যৌথ সামরিক মহড়া করছে? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডিন উইংরিন বিবিসিকে বলেন, ‘ব্রিকস প্লাসে এমন দেশও রয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিকভাবে পরস্পরের বিরোধী এবং দেশগুলোর মধ্যে সীমান্তে উত্তপ্ত সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।’ তবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণ এটাই প্রথম নয়। দেশগুলো সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। সেটির নাম ছিল ‘মোসি’। দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়ানা ভাষায় মোসি শব্দের অর্থ ‘ধোঁয়া’। সে সময় এ মহড়া নিয়ে তেমন একটা উত্তেজনা ছড়ায়নি। কিন্তু ২০২৩ সালে ‘মোসি-২’ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। রাশিয়া তখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় অভিযান পরিচালনা করছিল। তাই, এমন একটি সময়ে মহড়ার আয়োজন করায় যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছিল। মোসি-২ নিয়ে উইংরিন বলেন, ‘এটি রাশিয়ার (ইউক্রেনে) হামলার প্রথম বার্ষিকীর ঠিক একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময়ের কারণে মহড়ার আয়োজনকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল।’ বর্তমান মহড়া প্রাথমিকভাবে গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মোসি-৩’। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরের শেষের দক্ষিণ আফ্রিকায় জি-২০-এর শীর্ষ বৈঠক থাকায় তা স্থগিত করা হয়েছিল। পরে যৌথ মহড়ার নাম পরিবর্তিত এবং আমন্ত্রিত দেশের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়। উইংরিন বলেন, ‘গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমরা শুনতে শুরু করি, এটি আর মোসি-৩ নামে হবে না। বরং এটি ব্রিকস প্লাস সামুদ্রিক মহড়া হবে। এ মহড়ার স্লোগান হলো-শান্তির সংকল্প (উইল ফর পিস)।’ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মহড়ার সম্প্রসারণ কিছুটা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এতে করে নিজের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্কে আরও দূরত্ব তৈরি হলো। জোহানেসবার্গের উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম গুমেদে বিবিসিকে বলেন, ‘ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে এর আগে ডেমোক্র্যটরা ক্ষমতায় থাকাকালেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলে মনে করা হতো।’ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। আফ্রিকানারদের (যাদের মূলত ডাচ ঔপনিবেশিক বংশধর) যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করে ওয়াশিংটন। এরপর ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেন এবং দেশটিকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ ঘোষণা করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষোভের আরও কারণ ছিল। এ রকম একটি কারণ হলো-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) মামলায় দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমিকা। এ মামলায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘জাতিগত নিধনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলে এ অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্পর্ক মেরামত করার জন্য গত মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে হোয়াইট হাউস সফর করেন। প্রতিনিধিদলে দেশটির কয়েকজন সুপরিচিত শ্বেত গলফ খেলোয়াড়ও ছিলেন। কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রিটোরিয়ার সম্পর্ক মেরামতের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। উল্টো প্রশ্নবাণে রামাফোসাকে ওভাল অফিসে জর্জরিত করা হয়। অভিযোগ করা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের হত্যা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো রাজনৈতিক দল দেশটিতে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের ‘জাতিগত নিধনের’ কথা স্বীকার করেনি। এতে আফ্রিকানার এবং সাধারণ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোও রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করছে, চীন না যুক্তরাষ্ট্র-এটা নিয়ে ভিন্ন মত ও পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে। জোহানেসবার্গের উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গুমেদে বলেন, সংকটাপন্ন দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক অপরিহার্য। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত সরকারি তথ্যমতে, চীন দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৪ লাখ কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে গত বছর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৩০ শতাংশ শুল্কের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার রপ্তানি খাত প্রায় ১ লাখ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। এর মধ্যে কৃষি ও গাড়ি তৈরির খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গুমেদে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘১৯৯৪ সালে বর্ণবাদ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মুক্ত করা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) চীনকে আদর্শিক অংশীদার মনে করেন। দলটি রাশিয়াকেও সমীহা করে চলে। কারণ, দেশটি এএনসির বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর এএনসি নিজেদের বিদেশনীতিতে জোটের শরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন গুমেদে। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় দলটি। তাই বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব ও পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (ডিএ)-এর মতো দলের সঙ্গে জোট করতে বাধ্য হয় এএনসি। গুমেদে বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার সময়ে চীন ছিল এএনসি সরকারের কৌশলগত অংশীদার। কিন্তু এখন আমরা একটি জাতীয় ঐক্য সরকারের অংশ। তাই, নতুন পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা উচিত ছিল, যা এএনসির অংশীদারদের (দৃষ্টিভঙ্গিকে) অন্তর্ভুক্ত করে।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..