সাম্যবাদী আন্দোলনের অগ্রপথিক কমরেড প্রমথ ভৌমিক

বেনজির আহমেদ জুয়েল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বিশ শতকের বাংলা মানে পরাধীনতার শেকল ভাঙার উদগ্র কামনায় বাঙালি তরুণদের আত্মদানের মিছিল। বঙ্গ ভঙ্গের প্রতিবাদে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে বাংলার হিমালয় থেকে সুন্দরবন। বাংলার স্বদেশি আন্দোলন আর সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজ কেঁপে ওঠে। শুরু হয় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন ধারা ‘অগ্নিযুগের স্বাধীনতা সংগ্রাম’। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এক আওয়াজ ‘মৃত্যু অথবা স্বাধীনতা’। সোভিয়েত রাশিয়ার ‘অক্টোবর বিপ্লব’ তথা মেহনতি মানুষের বিপ্লবের প্রত্যয় ও প্রতীতি যখন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চেতনাকে আলোড়িত করে তখন যে সকল স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন এবং মার্কসবাদ ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সংগ্রহপূর্বক পঠন পাঠন শুরু করেন তাদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামী কমরেড প্রমথ ভৌমিক ছিলেন অন্যতম। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল প্রমথনাথ ভৌমিক। তিনি ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর খুলনার দেবীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল পার্বতী চরণ ভৌমিক। অসহযোগ আন্দোলন মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অনুশীলন সমিতির সাথে প্রমথ ভৌমিকের যোগাযোগ হয় এবং তিনি পাশাপাশি কংগ্রেসের বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যোগ দিতে থাকেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে খুলনার বাজারে মদের দোকানে পিকেটিং করার অপরাধে পুলিশ রাতের আঁধারে সত্যাগ্রহ শিবিরে হানা দিয়ে প্রমথনাথ ভৌমিক, নির্মলচন্দ্র দাস, বিভূতি ভূষণ ঘোষসহ ছয়জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করেন। এই ঘটনায় তাঁদের তিন মাস করে কারাদণ্ড হয়। তিনি খুলনা জিলা স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রতি বিশেষ ঝোঁকের কারণে তিনি একাডেমিক পড়ালেখা বাদ দিয়ে দর্শন, ধর্ম ও সাহিত্য বিষয়ক পুস্তক পাঠে অধিক মনোযোগী হন। ১৯২২ সালে তিনি জেল থেকে বের হয়ে কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হন। ১৯২২ সালে সাতক্ষীরা মহকুমায় তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে সেবাকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। উত্তরবঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে স্বেচ্ছাসেবী দলে যোগ দেন। যশোর খুলনা যুব সঙ্ঘ ১৯২২ সালে যশোরের অনুশীলন সমিতির সদস্য ও সংগঠক অতুলকৃষ্ণ ঘোষ ও কৃষ্ণবিনোদ রায়’র সাথে তার দেখা হয়। ১৯২৩ সালে যশোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে খুলনা হতে প্রমথনাথ ভৌমিক, নির্মলচন্দ্র দাস, বিভূতি ভূষণ ঘোষ প্রমুখ প্রতিনিধি ও দর্শক হয়ে উপস্থিত হন। উক্ত সম্মেলনে স্বদেশী ভাবাপন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাথে আলাপ ও পরিচিতির উদ্দেশ্যে নির্মলচন্দ্র দাস একটি খাদিবস্ত্রের দোকান খোলেন। সম্মেলন চলাকালে একরাতে যশোরের সন্ন্যাসী আশ্রমে যশোর ও খুলনার দুইটি স্বতন্ত্র যুব সংগঠন প্রমথনাথ ভৌমিক ও কৃষ্ণবিনোদ রায়’র নেতৃত্বে গোপন বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকে ‘যশোর খুলনা যুবক সমিতি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে মূলঘরে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে যুবক সমিতি সাংগঠনিক কাজ শুরু করে। উক্ত সম্মেলনে খানকার রমাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায় (বিষ্ণু চ্যাটার্জী), খালিশপুরের হরিপ্রসাদ দাস, নগেন দে, মূলঘরের বিশ্বেসর সেনগুপ্ত, ভবানী সেন, ফকিরহাটের সতীশ চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। কিছুদিনের মধ্যে যুবক সমিতিতে মহিলা কর্মীদের যোগদানের মধ্য দিয়ে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘যশোর খুলনা যুব সঙ্ঘ’। এই সংগঠনটি অল্প সময়ের মধ্যে রোগীর সেবা, মৃতের সৎকার, আর্তত্রাণ, ব্যায়াম সমিতি, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯২৪ সালে কলকাতার এক অনুষ্ঠানে ড. ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভাই)-এর সাথে প্রমথনাথ ভৌমিক ও নির্মল চন্দ্র দাসের সাক্ষাৎ হয়। প্রথম সাক্ষাতে তাঁর বক্তব্য ও ব্যক্তিত্বে তাঁরা মুগ্ধ হন। তাঁরা নিজেদের আগ্রহে তাঁর সাথে পরিচিত হন। কালক্রমে এই পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। ১৯২৬ সালে যশোরের বি.আর সিং হলে যুব সঙ্ঘ কর্তৃক আয়োজিত যুব সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ড. ভূপেন্দ্র নাথ দত্ত। সেই সম্মেলনে ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ‘সমাজতন্ত্র’ নিয়ে আলোচনা করেন। তখন দেশের সর্বত্র এই নতুন মতবাদ সম্পর্কে ছিল অজ্ঞতা, অবিশ্বাস ও ভীতি। ১৯২৬ সাল হতে যুব সঙ্ঘ রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করতে শুরু করে। সংগঠনটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মৃনাল কান্তি বসু। ব্রিটিশ সরকার এই সংগঠনটির নাম দেয় ‘টেরো কমিউনিস্ট’ আর সর্বাপেক্ষা বিপদজনক ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করে বিপ্লবী নেতা প্রমথ ভৌমিককে। স্বরাজ আশ্রম ও সাম্যবাদ ১৯২৬ সালে প্রমথ ভৌমিক ও নির্মলচন্দ্র দাসের উদ্যোগে খুলনার প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা যামিনীভূষণ মিত্র প্রতিষ্ঠিত বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘স্বরাজ আশ্রম’ পুনরায় চালু হয়। তাঁরা প্রথমে আশ্রমের চরকা ও তাঁতগুলি মেরামত করে সচল করেন। অল্প সময়ের মধ্যে আশ্রমটি বস্ত্রবয়ন, কৃষিকাজ, ব্যায়াম ও শরীর চর্চা, পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। আশ্রমে প্রমথ ভৌমিক, ভবানী সেন, বিশ্বেশর সেন, ননী বসু রায়, শচীন সেন, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায় (বিষ্ণু চ্যাটার্জী) প্রমুখ মার্কসবাদী পুস্তিকাদি পাঠ করে সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন। এঁদের বক্তৃতা ছিল শুধুমাত্র ইংরেজ বিতাড়ণ করে এই বিরাট দরিদ্র দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না-সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে নিপীড়িত জনগণের দুঃখ ঘুচবে না। ১৯২৭ সালে কালিয়ায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে প্রমথ ভৌমিক সহ যুব সঙ্ঘের কর্মীরা যোগদান করেন। উক্ত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। উক্ত সম্মেলনে প্রমথ ভৌমিক শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ গঠন করার এক চাঞ্চল্যকর (সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে) প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যাদবেশ্বর ভট্টাচার্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করে জোরালো বক্তৃতা দেন। ১৯২৮ সালে লিলুয়ার ইস্ট ইন্ডিয়ান ও সাউথ ইন্ডিয়ান রেলে ধর্মঘট হয়। ওই ধর্মঘটে নেতৃত্বে ছিলেন ধরণী গোস্বামী, গোপেন চক্রবর্তী, কিরণ মিত্র ও শিবদাস বন্দোপাধ্যায়। শিবদাস বন্দোপাধ্যায় ছিলেন খুলনার মানুষ সেই সূত্রে প্রমথনাথ ভৌমিক, কালীপদ বসু ও ত্রিদিব চৌধুরী শিবদাস বন্দোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করতে লিলুয়াতে যান এবং রেল শ্রমিক আন্দোলনে শামিল হন। রেলের আন্দোলনে পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ধর্মঘটী শ্রমিকদের অকুতোভয় লড়াই দেখে তাঁরা উপলব্ধি করেন-শ্রমিক শ্রেণি-ই সংগ্রামী শক্তির অপরাজেয় আধার। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের ফলে তাঁদের বিশ্বাস জন্মে-ঔপনিবেশিক শক্তির কবল হতে দেশকে মুক্ত করতে এবং মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বিপ্লবের জন্য শ্রমিক শ্রেণির লড়াই-সংগ্রাম অপরিহার্য। ১৯২৮ সালে ব্রিটিস সরকার মিথ্যা ডাকাতির মামলায় প্রমথনাথ ভৌমিক ও যুব সঙ্ঘের বারো জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেন। এই মিথ্যা মামলায় তাঁকে ৯ মাস বন্দী রাখা হয়। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে বিপ্লবীদের একটা গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই গোপন বৈঠকে প্রমথ ভৌমিক, নির্মল চন্দ্র দাস, কৃষ্ণবিনোদ রায় প্রমুখ যুব সঙ্ঘের নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। উক্ত অধিবেশে যুব সঙ্ঘের উদ্যোগে প্রমথ ভৌমিকের সম্পাদনা ও প্রকাশনায় স্বামী বিবেকানন্দের সাম্যের বাণী ও শোষণ-বৈষম্যবিরোধী উক্তিগুলি নিয়ে ‘Vibekananda the socialist’ নামে পুস্তিকা প্রচার করেন। এই সম্মেলনের পাশাপাশি গদর পার্টির কিংবদন্তি বিপ্লবী সর্দার সোহন সিং যোশ’র সভাপতিত্বে বামপন্থি ‘পেজান্টস এন্ড ওয়ার্কাস পার্টি’র উদ্যোগে আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনেও প্রমথ ভৌমিক সহ যুব সঙ্ঘের নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। সম্মেলনে একটি কার্যকরী কমিটি গঠিত হলে প্রমথ ভৌমিক অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশ পুলিশ বাংলা জুড়ে ধরপাকড় শুরু করে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও পুলিশের চোখে খুলনার সর্বাপেক্ষা বিপদজনক ব্যক্তি প্রমথ ভৌমিক গোপনে খুলনা ত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালেই হাওড়ার লিলুয়ার গোপন আস্তানা থেকে পুলিশ প্রমথ ভৌমিককে গ্রেফতার করেন। তিনি বেঙ্গল অর্ডিন্যান্সে দীর্ঘ আট বছর বিনা বিচারে কারাবন্দী থাকেন। বন্দী জীবনের দীর্ঘ আট বছরের অধিকাংশ সময় তিনি বক্সা ও দেওলী বন্দী শিবিরে আটক ছিলেন। বন্দী জীবনের দিনগুলিতে তিনি মার্কসবাদ ও প্রগতিশীল পত্রপত্রিকা পাঠ ও অধ্যয়ন করে বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। বক্সা বন্দী শিবিরে তাঁর লেখা বিশিষ্ট প্রবন্ধ ‘মার্কসবাদ বনাম বেদান্ত দর্শন’ তাঁকে বন্দী শিবিরে কমিউনিস্ট কনসোলিডেশনের অন্যতম প্রধান সংগঠক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতায় প্রাদেশিক কমিটির গণসংযোগ রক্ষাকারী হিসাবে বেশ কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে খুলনাতে ফিরে বৃহত্তর যশোর ও খুলনা অঞ্চলে শক্তিশালী ছাত্র-যুব ও কৃষক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর দলের নির্দেশে তিনি কলকাতা চলে যান। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান) প্রাদেশিক কমিটি গঠন হলে তিনি অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ‘কালান্তর’ পত্রিকা প্রকাশিত হলে সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৭৭ সালের ২ জানুয়ারি উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাম্যবাদী আন্দোলনের অগ্রপথিক, সাংবাদিক কমরেড প্রমথ ভৌমিক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় স্বাধীনতা ও সাম্যবাদী আন্দোলনের এক সর্বস্বত্যাগী অকুতোভয় বিপ্লবীর নিরবিচ্ছিন্ন এক জীবন ও সংগ্রামের।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..