
২০২৫ সাল হচ্ছে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী। নানা বিচারের পক্ষ-বিপক্ষ মোকাবিলা করে তার কবিতা আজও উদ্ভাসিত। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের এই লেখা সুকান্তকে নতুন করে চিনতে প্রেরণা যোগাবে।
সুকান্তর চেহারায় বৈশিষ্ট্য ছিল, ব্যঞ্জনা ছিল, কবিজনোচিত বলতে যা মনে আসে সে জলুস ছিল না। নিভৃত নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত আরাম কৈশোরের লাবণ্য মসৃণ মোলায়েম করে তোলেনি, জীবনযুদ্ধের সৈনিকোচিত রুক্ষশ্রী এসে মিশেছিল।
লাজুক মুখচোরা বলে সে পরিচিত ছিল, আমি তার ভেতরের হলকা মাঝে মাঝে অনুভব করতাম তার শান্ত স্বল্প কথায়, তার কবিতায়।
সুকান্তর কবিতার সহজ সরলতা অনেককে আশ্চর্য ও মুগ্ধ করেছে, সেই সরলতার সমগ্র তাৎপর্য সকলের কাছে ধরা পড়েছিলো কিনা জানি না।
জীবনে যেমন, কাব্য-সাহিত্যেও সরলতা বিশেষণটিতে রিক্ততার ইঙ্গিতটাই আমাদের কাছে বড় বেশী জোরালো। গভীরতা, ব্যাপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতি-কবিতা পর্যন্ত। সুকান্তর কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিল।
রবীন্দ্রোত্তর বৈপ্লবিক ভাবধারাকে সমসাময়িক করে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে পারেন নি, নতুন চেতনা যাদের স্মৃতির প্রেরণা তাঁরাও খুঁজে পান নি আত্মপ্রকাশের পথ ও পদ্ধতি। বাংলা গদ্য-সাহিত্যের অগ্রগতির সঙ্গে পিছিয়ে পড়া কাব্য-সাহিত্যের মন্থরগতি মিলিয়ে দেখলে, আন্তরিক পরীক্ষা গবেষণাদির সীমার বহু বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে মৌলিক কবিতার দৈন্য বিচার করলে আমরা এক শোচনীয় সিদ্ধান্তে আসি, কিশোর কবি সুকান্তের অকালমৃত্যু যার মর্মান্তিক বাস্তব পরিচয়। কাব্য-সাহিত্যে নতুন যুগকে প্রাণ দিতে আজ কবির যে অভিজ্ঞতা ও সাধনা দরকার তার পুরস্কার মৃত্যু, সুকান্ত এই ভয়ানক সত্য ও কাব্য-সাহিত্যের চরম সাফল্যকে, আমাদের সমস্যাকে স্পষ্ট করে দিয়ে গেছে।
প্রতিভার অকালমৃত্যু বাংলায় বা জগতে এই প্রথম নয়, কিন্তু গত যুগেও কবির পক্ষে সমাজের সঙ্গে বেঁচে থাকার মতো একটা আপস করা সম্ভব ছিল যা তার কাব্য-সাধনাকে ব্যাহত করতো না। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আজ কবির পক্ষে অপরিহার্য, তখন তা পরোক্ষ হলেও চলতো।
আজ সেটুকু আপসের সুযোগও শেষ হয়ে গেছে কবির পক্ষে। কোনো জীবিকার জন্য প্রস্তুতি তার নিজেকে অপচয় করা, কোনো জীবিকা গ্রহণ তার কাব্য-সাধনার সুনিশ্চিত ব্যর্থতা।
শৈশব থেকেই কবি প্রতিভা আজ এই সঙ্কটের সম্মুখীন, চাষি মজুর বা ভদ্রঘরে যেখানেই তার আবির্ভাব হোক, মানুষের বাঁচার ব্যবস্থা এমনি দেশে যে কোনো মতে বেঁচে থাকার উপায়টুকু আয়ত্ত করতে গেলেও অন্ত দৃষ্টিকে ঝাপসা হয়ে যেতে দিতে হবে।
গদ্য-সাহিত্যের সাধকও যে এ অভিশাপ থেকে একেবারে মুক্ত তা নয়, কিন্তু কবির সঙ্গে তুলনায় সে অনেক ভাগ্যবান। গদ্য-সাহিত্যের যেটুকু উর্বরতা দেখি, সাহিত্য-বিচারকের আসনে বসে এই নতুন প্রাণ সঞ্চারের মতো জটিল ও পরোক্ষ কারণই আবিষ্কার করি, মূল কারণ ওই। কাব্য-সাহিত্যের অনুর্বরতাও এই জন্য যে কবিতা লেখার মজুরিতে কবি বাঁচে না। নতুন যুগের অলঙ্ঘ্য নির্দেশে তাকে আজ দেহমনে চব্বিশ ঘণ্টার সাহচর্য বরণ করে নিতে হয় তার যে উলঙ্গ ছেলেরা আজ বুলেট খেয়ে মরছে তাদের, কাব্যচর্চা আর জীবিকাচর্চার শোষণে সে ক্ষয় হয়ে যায়। নয়তো বাধ্য হয় আপস করে নিজেকে গুটিয়ে এনে সীমাবদ্ধ জীবনের কল্পনা দিয়ে নতুন যুগের পরীক্ষামূলক কবিতা রচনা করতে। কত সস্তায় মেলে কবির প্রাণ, যে প্রাণ কিনবার ক্ষমতাটুকুও কাব্যলক্ষ্মীর নেই।
সুকান্ত তা মানতে চায়নি, আপস করেনি।
সে বুঝি টের পেয়েছিলো চলতি অবস্থা অব্যবস্থা উলটে দিতে কবিরও শহীদ হওয়ার প্রয়োজন আছে।
ছোট গল্পে ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে তরুণ লেখককে প্রশংসা করেছি, উৎসাহ দিয়েছি; সুকান্তকে কবিতার প্রশংসা শোনানোর সম্পর্কে সতর্ক ছিলাম। কাব্য সমালোচনার সঠিক পদ্ধতি আমার জানা নেই, বিচার বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে খানিকটা হাওয়ার তারিফ শোনাতে ইচ্ছা হতো না। তা ছাড়া, নিজে থেকে সে যে কঠিন সংগ্রাম গ্রহণ করেছিলো, যে বিস্ময়কর দ্রুততার সঙ্গে বিকাশলাভ করছিল তার প্রতিভা, তাতে তাকে উৎসাহ দেবার প্রয়োজনও ছিল না কিছুমাত্র বরং স্বীকার করি যে একটু আশঙ্কা আমার ছিল তার সম্পর্কে ; বয়স তার কম, বড় তাড়াতাড়ি তার খ্যাতি বাড়ছিল, এতে তার ক্ষতি না হয়। কে জানতো, তার লেখনীই এমন হঠাৎ চিরতরে থেমে যাবে। আজ আপশোস করছি, তার ক্ষতির মিথ্যা আশঙ্কায় প্রাণ খুলে তার প্রতিভাকে অভিনন্দন জানাইনি, যক্ষ্মা হয়ে সে হাসপাতালে গেছে খবর পাওয়া পর্যন্ত আমার এ বিশ্বাস ঘোষণা করা স্থগিত রেখেছিলাম বলে যে, “বাঁচা গেলো, কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ।”
স্বাধীনতাকে সুকান্ত বড় ভালোবাসতো। সুকান্ত কবি ছিল তাদের, ‘স্বাধীনতা’ যাদের কাগজ। ‘পরিচয়ে’ সুকান্তর কবিতা সাগ্রহে ছাপা হতো। সুকান্তকে স্মরণ করে আমি ‘স্বাধীনতার আর্থিক সচ্ছলতা যতোদিন না হবে ততোদিন ‘পরিচয়ে’ লেখার জন্য যা মজুরি পাই ‘স্বাধীনতা’ তহবিলে জমা দেবো।