অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরে সমালোচনার পাল্লা ভারী
মামুনুর রশিদ রাশেল
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছর অতিবাহিত হলো বেশ ডামাডোলের মধ্য দিয়ে। এ সরকারের জন্য বছরটি ছিল বহুলাংশেই সমালোচনাময়। সমালোচনা যেন এক মুহূর্তের জন্য সরকারের পিছু ছাড়েনি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের একটা আপদকালীন ও চরম সংকটপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিল। অভ্যুত্থান পরবর্তী পতিত সরকারি দল ছাড়া প্রায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সমর্থন দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার জন্য। জনমনে একটি সাধারণ ধারণা ছিল, ড. ইউনূস বৈশ্বিকভাবে একজন পরিচিত মুখ এবং বড় মাপের অর্থনীতিবিদ–উনি দায়িত্ব নিলে হয়তো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভাবমূর্তি চাঙ্গা হবে এবং দেশ এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কিন্তু আমরা অনেকটাই দুর্ভাগা জাতি। বানভাসি মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে এদেশের সাধারণ মানুষও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিপরীতে ড. ইউনূসকে আশ্রয় করেছিল। মানুষের আশা ছিল- উনি পারবেন, দেশের জন্য কিছু করবেন। অনেকের তখন এ আশার পক্ষে ব্যাখ্যা ছিল এমন–উনি তো রাজনৈতিক ব্যক্তি নন যে নিজের দলের প্রতি উনার দায় থাকবে। উনি অর্থনৈতিকভাবেও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। ফলে তিনি শুধু দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। এজন্যই দুঃসময়ে তিনি দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু মানুষের মোহভঙ্গ হলো–দায়িত্ব নিয়ে সর্বপ্রথম যখন তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে পাঁচ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দিলেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিঃশর্তভাবে কর মওফুফ সুবিধা পেয়ে থাকলেও ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় গ্রামীণ ব্যাংকের। ইউনূস সাহেব প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে নতুন করে প্রতিষ্ঠানটির সব আয়কে করমুক্ত সুবিধা দিলেন। ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সুবিধা ভোগ করবে গ্রামীণ ব্যাংক। শুরুতে মানুষ ভাবলো–আওয়ামী সরকার উনার প্রতিষ্ঠানের ওপড় জুলুম করছে, যা হোক এবার প্রতিষ্ঠানটির ওপর ন্যায়বিচার করা হলো। কিন্তু দ্রুতই মানুষ সরকারের এ সিদ্ধান্তে ড. ইউনূসের মনোভাব বুঝতে পারলো ও এর সমালোচনা করলো। একই সময়ে শ্রম আইনের পাঁচটি ও মানহানির অভিযোগে একটিসহ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে করা পৃথক ছয়টি মামলার কার্যক্রম বাতিল ঘোষণা করে রায় দিলেন হাইকোর্ট। তিনি নিজেকে খালাস করে নিলেন। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, সে সন্দেহ তৈরি হলো জনমনে। যা ড. ইনূসকে সমালোচনার মুখে ফেললো।
এ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে যে ‘মব ভায়োলেন্স’ তৈরি হলো সেটি গিয়ে ঠেকলো ‘মব কালচারে’। দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গর অবস্থা দৃশ্যমান হলো। সারাদেশে চুরি-ডাকাতি, লুটপাট বেড়ে গেল। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর সরকার নীরব ভূমিকা পালন করলো। একসময় শুরু হলো ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মবকারীদের কড়া হুঁশিয়ারিও দিলেন। কিন্তু তা খুব একটা কাজে এলো না। পতিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীকেই শুধু ধরা হলো। তাতে মব থামলো না। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কও বুমেরাং হলো।
জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের পরিবার অভিযোগ করলো তারা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এ ধরনের জাতীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে বিষয়টিও সরকার সুন্দরভাবে সামাল দিতে পারলো না। আগে বলা হলো ‘উন্নয়নের সরকার বারবার দরকার’। গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে উচ্চারিত হতে শোনা গেছে- ‘এইবার দরকার সারাজীবনের সরকার’। কেউ কেউ ড. ইউনূসকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখার কথাও বলেছেন। কারও কারও মুখে শোনা গেছে– ‘ড. ইউনূসের সরকার আজীবন দরকার’। কিন্তু দেশের মানুষ এসব ভালো চোখে দেখলো না। ফলে আস্থার প্রাচীরে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করলো। সবজির দাম কম, সমালোচনাকারী বলে চাল-তেলের দাম বেশি। ইউনূস সরকারের শুভাকাক্সক্ষীরা তখন বলতে শুরু করলেন- যারা এসব বলে তারা আদতে ‘ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচার তথা আওয়ামী লীগের দোষর’। গত এক বছরে ধর্ষণের মতো ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে দেশের শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে এই সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে। আবার কখনো কখনো আন্দোলনের নামে ‘নাটক মঞ্চস্থ করে’ সরকারের বোগলের নিচে থাকা অংশগুলোকে দেখা গেছে সরকারকে দাবি পূরণে বাধ্য করতে। যমুনার সামনে কারও ওপর জলকামান আবার কারও উপর শীতলবৃষ্টি নামাতেও দেখা গেছে। মানুষ সরকারের এসব কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। সেখানে আগুন দেওয়া হলো। ভাঙচুর-লুটপাট চালানো হলো। সরকার তাৎক্ষণিক সেটি থামানোর চেষ্টা না করে দুদিন পর বিবৃতি দিয়ে এধরনের কাজকে সমর্থন করা হবে না- এটুকু বলে দায় সারলো।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের দাবি তুললো। কিন্তু সরকার ও দু-একটি দল বলতে শুরু করলো–সংস্কার শেষ না করে নির্বাচন দেওয়া যাবে না। তাতে ফ্যাসিস্ট আবার চলে আসবে। এরই মধ্যে সামনে এলো রাখাইনে ‘মানবিক করিডোর’ প্রসঙ্গটি। সরকার ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ভাব দেখালো। অথচ জাতিসংঘ মহাসচিব কক্সবাজার পরিদর্শন করে গেলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সরকারের কোনো উদ্যোগ বা অগ্রগতি আছে তেমনটি দেখা গেল না। উল্টো মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির তৎপরতার খবর বেরিয়ে এলো।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দল করার অনুরোধ করলেন জুলাই আন্দোলনের
সম্মুখ শ্রেণির কিছু নেতা দিয়ে। পুরানো বন্দোবস্তের ওপর কবর রচনা করে নতুন বন্দোবস্তের সূচনা করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ, দেশের মানুষের উপকারের কথা ভেবে ব্যান্ড বাজিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে নব্য দলের আত্নপ্রকাশ করল। সরকার খুশী হয়ে কয়েকটি বাস দিসে নব্য দলকে জুলাই আন্দোলনকারীদের জন্য, সেও সমালোচনাকারীরা সহ্য করল না। তারা বলা শুরু করল এরা কিংস পার্টী, রাজার দল, সরকারী দল বা ইউনুসের দল এইসব।
নব্যরা দল করল, সেই দলকে ভালবেসে কোন ব্যবসায়ী চাদা দিলে তা জানাতে হবে। তাহলে গোপনীয় থাকল কিছু। যোগ্য নেতৃত্ব দেবার জন্য মন্ত্রালয়ের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন এক উপদেষ্টা। বাংলাদেশে এই প্রথম কোন ব্যাক্তি মন্ত্রালয় থেকে পদত্যাগ করলেন, এত অবিশ্বাস্য বিষয়। চারিদিকে নব্য দলের জয়জয়কার। সেই পদত্যাগকৃত উপদেষ্টা হবেন, ভবিষত প্রধানমন্ত্রী। তাইত এমন যোগ্য বাক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিৎ। সারাদেশে চাদাবাজী নিয়ে হাঙ্গামার শেষ নেই। সরকার এত চেষ্টা করছেন চাদাবাজ দের বিপরীতে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন অথচ পাথর চাপা দিয়ে মতবিরোধ, ব্যাগে করে ডোনেসান, ব্যাবসায়ীরা কিছু টাকা দেন বাকি টাকা নিতে গেলে ধরিয়ে দেন। সেইসব খবর সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এইসব কান্ডে সরকারী নব্য দলের কেউ কেউ জড়িত। নব্য দলে দোষী ব্যাক্তিদের দল থেকে বহিষ্কার করে দিল কিন্তু সমালোচনাকারীদের মুখ থামেই না আবার নতুন নতুন তথ্য সামাজিক মাধ্যমে আসতেই থাকে।
অবশেষে নব্যরা সিদ্ধান্ত নেন, জনগন কে নতুন বন্দোবস্ত বুঝাতে হবে। তারা দলীয়ভাবে সারাদেশব্যাপি পথযাত্রা করার উদ্দেশ্যে বের হলেন। উত্তর থেকে দক্ষিন যাওয়ার পথে গোপালগঞ্জে ফ্যাসিস্ট জনগণ বাধা দিল। নব্য সরকারী দল জীবন দিয়ে তাদের সাথে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত কিন্তু দেশপ্রেমিক আর্মিরা তাদের ট্যাংকে করে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে আসলেন। জাতীয় বীরদের পথযাত্রা সঠিকভাবে চলতে লাগল। বাকস্বাধীনতা থাকার পরও চট্টগ্রামের চকরিয়ায় আবারো কিছু গডফাদারের জনগন বাধা দিল। এই কেমন ব্যবস্থা! জুলাই আন্দোলনকারীদের জন্য সরকার একটি ঘোষণাপত্র একবছরেও দেয়নি। এতেই প্রমাণ হয় না, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কতটা নিরেপেক্ষ। তাও সমালোচনাকারীরা বুঝে না। আন্দোলনকারীরা একপর্যায়ে সরকারের কাছ থেকে ঘোষণাপত্র আদায় করেই ছাড়লো। অবশেষে সরকার ঘোষণাপত্র পাঠ করলো ঠিকই, কিন্তু নব্য ভূমিষ্ট দলের অনেক বড় বড় নেতা সেদিন চলে গেলেন কক্সবাজারে। এ নিয়েও নতুন দল তথা সরকারকে সমালোচনা হজম করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণ বারবার রক্ত দিয়েছে এই ভূখন্ডে, কিন্তু ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি, তারা প্রতিনিয়ত লড়াই করছে। ক্ষমতার মসনদ খুবই আরামদায়ক ও মজার। ক্ষমতাধরেরা মসনদে গিয়ে ভুলে যান কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কথা। তাদের হাতে রক্তের দাগ লেগে যায় মেহনতি মানুষের। জনগণ ভুল করে না, বেগতিক দেখলে রক্ত দিয়ে ক্ষমতাসীনদের উপড়ে ফেলে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। আজও বাংলার জনগণ স্বপ্ন দেখে নতুন দিগন্তের। আওয়াজ তোলে–‘বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচো না’।
লেখক : যুবনেতা
[মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব লেখকের। প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, যুক্তিতর্ক, এবং উপস্থাপনার জন্য লেখক নিজেই দায়ী থাকবেন। সম্পাদক দায়ী নয়।]
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন