আলোদূষণের বাস্তুতাত্ত্বিক অভিঘাত ও করণীয়

বিধান চন্দ্র দাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী গ্যেটে (জোহান ভলফগ্যাং ফন গ্যেটে: ১৭৪৯-১৮৩২) মৃত্যুর আগে যে শেষ শব্দদ্বয় জার্মান ভাষায় উচ্চারণ করেছিলেন তা হচ্ছে: মেয়ার লিখ্ট–যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘আরো আলো’। আসলে জীবনের অস্তিত্বের জন্য আলো অপরিহার্য। আলো আমাদের মহাবিশ্বকে দেখার এবং বোঝার একটি মাধ্যম বা সুযোগ প্রদান করে। কিন্তু আমরা যখন শুনি যে, আলোরও অন্ধকার দিক রয়েছে, তখন আমরা চমকে উঠি। বিশেষ করে এ ধরনের কথা যখন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল ‘নেচার’-এ কোনো প্রবন্ধের শিরোনাম করা হয় (নেচার: ২০১৮)। অবশ্য প্রবন্ধটির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের মাঝামাঝি যেতেই বুঝা যায় যে আসলে এই আলো বলতে প্রাকৃতিক আলো–অর্থাৎ সূর্য থেকে যে আলো আমরা পাই–তার কথা বলা হয় নি। এই আলো হচ্ছে বৈদ্যুতিক আলো–যাকে কৃত্রিম আলো বলেও অভিহিত করা হয়। বর্তমান লেখাটির শিরোনামসহ সব জায়গায় ‘কৃত্রিম আলো দূষণ’ না লিখে ‘আলো দূষণ’ লেখা হয়েছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে বলা হয়েছে: ‘অবাঞ্ছিত অত্যধিক আলোই হচ্ছে আলো দূষণ’। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে আলো দূষণ হচ্ছে: ‘দিন-রাত চক্রের অন্ধকার পর্যায়ে কৃত্রিম উৎস থেকে আলোক নির্গমন–যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অথবা তীব্রতা পিনিয়াল মেলাটোনিন উৎপাদন ও তার প্রতিদিনের ছন্দকে ব্যাহত করে জীবদেহে প্রতিক্রিয়া শুরু করে।’ বিগত কয়েক বছরে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম (বিবিসি, গার্ডিয়ান সিএনএ ইত্যাদি) এবং প্রভাবশালী অনেক বিজ্ঞান জার্নাল (নেচার গ্রুপ, ল্যানসেট গ্রুপ, সায়েন্স ডাইরেক্ট ইত্যাদি) আলোদূষণ সম্পর্কে নানা প্রতিবেদন কিংবা গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদন ও গবেষণা প্রবন্ধগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে আলোদূষণের অভিঘাতকে মোট চারভাগে ভাগ করা যায়। ভাগগুলো হচ্ছে: ১. বাস্তুতাত্ত্বিক অভিঘাত (প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব, বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া) ২. মানব স্বাস্থ্যের ওপর অভিঘাত (সার্কাডিয়ান ছন্দ ভেঙে যাওয়া, ক্যান্সারসহ নানা ধরণের রোগ ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া) ৩. জ্যোতির্বিজ্ঞানগত এবং সাংস্কৃতিক অভিঘাত (নক্ষত্রের আলো অস্পষ্ট হওয়া, রাতের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাওয়া) ৪. অর্থনীতি বা জ্বালানির ওপর অভিঘাত (জীবাশ্ম জ্বালানি অত্যধিক খরচ হওয়া)। উপরোক্ত চার ধরনের অভিঘাত প্রমাণিত হওয়ার পরেও আলোদূষণের বিষয়টি অনেক দেশে তেমনভাবে আলোচনা করা হয় না। সচেতনতাও নেই। অথচ, গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ কিংবা মাটিদূষণের চাইতে আলোদূষণঘটিত ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। আলোদূষণ যে মানুষ তথা জীব জগতের জন্য ক্ষতির কারণ–এই সত্যটি অনেকে এখনো সেভাবে বুঝতে পারছেন না। না বুঝতে পারার কারণও রয়েছে। আসলে বায়ুদূষণ, পানিদূষণ কিংবা শব্দদূষণ প্রত্যক্ষভাবে (কটু গন্ধ, শব্দ) আমরা অনুভব করতে পারি; কিংবা এ ধরণের দূষণের মধ্যে থাকার প্রতিক্রিয়া হিসেবে খুব দ্রুত আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি–সেই তুলনায় আলোদূষণের ক্ষেত্রে তেমনটি হয় না। এছাড়া, রাতের বৈদ্যুতিক আলো আমাদের নিরাপত্তা, সৌন্দর্য, সুবিধা এবং উন্নয়নের সঙ্গে মিশে গেছে বলে মনে করা হয়। ফলে, আমাদের অবচেতন মনে আলো দূষণের ধারণা সাধারণভাবে স্থান পায় না। বরং রাতে আমাদের চারধার কিভাবে আরো বেশি করে আলোকিত করা যাবে, সেই ভাবনাই প্রাধান্য পায়। আলোদূষণের কারণে মানুষ যে প্রাণঘাতী অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য, পাল্টে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র–এই চরম সত্য আমরা অনেকে অনুধাবন করতে পারছি না। আলোদূষণ সম্পর্কে অনেক দেশে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এই সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করা প্রয়োজন। পূর্বেই বলা হয়েছে যে আলোদূষণের চার ধরনের অভিঘাত (বাস্তুতাত্ত্বিক, মানব স্বাস্থ্যগত, জ্যোতির্বিজ্ঞানগত, অর্থনৈতিক) রয়েছে। কাজেই প্রতিটি অভিঘাত ও তার প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। আজকের লেখাটি আলোদূষণের বাস্তুতাত্ত্বিক অভিঘাত ও করণীয় সম্পর্কে। কৃত্রিম আলো দ্বারা বাস্তুতন্ত্রে বিরাজমান প্রাকৃতিক আলো-অন্ধকারের ধরনের পরিবর্তন হলে তাকে বাস্তুতাত্ত্বিক আলোদূষণ বলা হয় (লংকোর এবং রিচ, ২০১৩)। ধরা যাক এমন একটি জায়গা (জলাশয়, তৃণভূমি, রাস্তা, বনভূমি ইত্যাদি)–যেখানে কয়েক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে কোনো বৈদ্যুতিক আলো কোনো সময়ই ছিল না। অর্থাৎ সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের জীবজ উপাদানসমূহ (প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব) বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদের জীবন চক্র অতিবাহিত করছে। এখন হঠাৎ করে, সেখানে যদি বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা হয়–তাহলে সেই আলোর বিচ্ছুরণ ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেখানকার প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীবদের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব সৃষ্টি করবে। পরিবর্তন হবে তাদের শারীরবৃত্ত। ফলে তাদের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য তাৎপর্যপূর্ণ হ্রাস পেয়ে সেখানকার বাস্তুতত্ত্বে নেতিবাচক অভিঘাত তৈরি হবে। তবে, বিষয়টি এমন নয় যে, আজ বৈদ্যুতিক আলোশূন্য কোনো জায়গায় আলোর ব্যবস্থা করা হলো–আর সাত দিন কিংবা সাত মাসের মধ্যে সেখানকার বাস্তুতত্ত্ব পরিবর্তন হয়ে গেল। আসলে পরিবর্তন হতে সময় লাগবে এবং সেই পরিবর্তন কেমনভাবে কতদিনে হবে সেটি নির্ভর করছে সেই স্থানের আলোর বিচ্ছুরণ ক্ষমতা, বৈশিষ্ট্য এবং বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য উপাদানসমূহের ওপর। আমি ইংল্যন্ডে পোস্টডক্টরাল গবেষণার সময় একটি পতঙ্গের প্রজনন বৈশিষ্ট্যের ওপর কৃত্রিম আলোর অভিঘাত পরীক্ষা করে বুঝেছিলাম যে, কৃত্রিম আলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। বিগত গয়েক বছরে ল্যাবরেটরি কিংবা মাঠ পর্যায়ে আলোদূষণের ওপর নানা ধরণের গবেষণা কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব তথা বাস্তুতন্ত্রের ওপর আলোর অভিঘাত নিয়ে কাজ হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, পৃথিবীতে নথিভুক্ত প্রায় ত্রিশ শতাংশ মেরুদণ্ডী ও ষাট শতাংশ অমেরুদণ্ডী প্রাণী নিশাচর। সেই হিসেবে পৃথিবীতে মোট নয় লক্ষেরও বেশি নথিভুক্ত প্রাণী প্রজাতি নিশাচর। আলোদূষণযুক্ত পরিবেশে এসব নিশাচর প্রাণী গ্রুপ (স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, পতঙ্গ, মাছ ও পতঙ্গ ছাড়া অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী) বিভিন্ন সমস্যা (জৈবিক ঘড়ি ভেঙে যাওয়াসহ নানা ধরনের শারীরবৃত্তীয় কাজ এবং স্বাভাবিক আচরণ, প্রজনন, খাদ্য শিকার ইত্যাদি বাধাগ্রস্ত হওয়া)-র সম্মুখীন হয়। মৃত্যু হয় অসংখ্য প্রাণীর। এছাড়া, দিবাচর প্রাণীদেরও জৈবিক ঘড়ি ভেঙে যেয়ে তাদেরও শারীরবৃত্তীয় নানা ধরণের সমস্যা তৈরি হয়। বিবিসি (৯ মার্চ ২০২৩)-এর মতে: কৃত্রিম আলো বাস্তুতাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, উদ্ভিদের ঋতুগত ছন্দকে বিঘ্নিত করছে এবং গাছপালার সঙ্গে পরাগায়নকারীদের সূক্ষ্ম সম্পর্ককে ব্যাহত করছে। প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল ‘নেচার’ (২০১৮) লিখেছে: ‘পৃথিবীর অধিকাংশ জীব–মানুষ, আরশোলা কিংবা পানিতে ভাসমান কোনো জীবের আচরণ আলো ও অন্ধকার চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।...জীবন উৎপত্তির সময় থেকে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু অতীতে জীবন সব সময়ই দিনের বেলায় আলো ও রাতে অন্ধকার নিয়ে বিবর্তিত হয়েছে।...যখন এটার পরিবর্তন হয় তখন ধরে নিতে হবে যে, এর দ্বারা খারাপ কোনো কিছু সংঘটিত হতে চলেছে’। আলোদূষণের কারণে উদ্ভিদের মুকুল, ফুল ও ফল তৈরিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে পরাগায়নেও। বিশেষ করে, সপুষ্পক উদ্ভিদে পরাগায়ন ঘটানোর জন্য প্রধান ভূমিকা পালনকারী অসংখ্য কীট-পতঙ্গ আলোদূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করছে। ফলে, কীট-পতঙ্গকেন্দ্রিক বাস্তুতান্ত্রিক সেবা হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালে ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তৃণভূমির উপর পরিচালিত এক পরীক্ষার ফলাফলে জানা গেছে যে, বৈদ্যুতিক আলোর কারণে নৈশপরাগায়নকারী কীট-পতঙ্গ পরাগায়ন করতে পারছে না। মেরুদণ্ডী ও অমেরদণ্ডী প্রাণীদের প্রজনন থেকে শুরু করে তাদের শারীরবৃত্তীয় নানা কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক ডার্কস্কাই সংস্থার মতে: কোটি কোটি বছর ধরে, পৃথিবীর সমস্ত জীবন দিন ও রাতের ছন্দের ওপর নির্ভর করে বিকশিত হয়েছে। এটি সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর ডিএনএ-তে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। চক্রাকারে দিন ও রাতের কাজগুলো হচ্ছে আবর্তিত। মানুষ রাতকে আলোকিত করে এই চক্রটির মূলে আঘাত করছে। ফলে, পরিবর্তন হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র তথা বাস্তুতত্ত্ব। বাংলাদেশে আলোদূষণের ওপর গবেষণা কাজ খুব সামান্যই হয়েছে। বিশেষ করে প্রাণী, উদ্ভিদ তথা বাস্তুতত্ত্বের ওপর আলো দূষণের অভিঘাত সম্পর্কিত গবেষণা তেমন একটা হয় নি বললেই চলে। তবে, আলোদূষণের স্থানিক বিস্তরণ (রহিম ও অন্যান্য: ২০২৪); চট্টগ্রাম জেলায় আলো দূষণের প্রবণতা (বড়ুয়া ও অন্যান্য: ২০২৪); আলোদূষণ ও বায়ুর তাপমাত্রার সম্পর্ক (হাওলাদার এবং ইসলাম: ২০১৮) ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে আলোদূষণ দিন দিন বৃদ্ধি (দশ বছরে চারগুণ) পাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলায় ত্রিশ বছরের হিসেবে দেখা যায় যে, ১৯৯২ সালে সেখানে আলোদূষণ ছিল ৯.২% শতাংশ, কিন্তু ২০২১ সালে এটি দাঁড়িয়েছে ২৪.৩%। বাংলাদেশে প্রাণী, উদ্ভিদ তথা জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতত্ত্বের ওপর আলোদূষণের অভিঘাত কমানোর জন্য বেশ কিছু কাজ করা যেতে পারে। এর মধ্যে উল্লেযোগ্য হচ্ছে: ১. প্রাকৃতিক আবাসস্থলগুলোতে (যেমন- সুন্দরবন, হাওড় অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা) প্রকৃতিবান্ধব আলো ব্যবহার করা এবং অতিরিক্ত আলো ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করা ২. জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কিছু এলাকায় ডার্ক স্কাই জোন তৈরি করে রাতের আঁধার সংরক্ষণ করা ৩. শহরাঞ্চলে রাস্তা, পার্ক ও অন্যান্য খোলা জায়গায় তীব্র আলো ব্যবহার না করা ৪. নিশাচর প্রাণীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য উঁচু ভবন/স্থাপনা থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়া আলো নিয়ন্ত্রণ করা ৫. উপকূলীয় এলাকায় উজ্জ্বল আলো বন্ধ করা–যাতে সামুদ্রিক প্রাণীদের (যেমন, সামুদ্রিক কচ্ছপ) অসুবিধা না হয় ৬. আলো দূষণকেন্দ্রিক গবেষণা বৃদ্ধি করা। এছাড়া, যুগোপযোগী এ সংক্রান্ত আইন/বিধি তৈরি করাও দরকার। তবে সবচেয়ে বড় দরকার আমাদের সবার সচেতনতা। লেখক : অধ্যাপক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..