মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রয়োগ

আজিজুর রহমান আসাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে একটি অত্যন্ত কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে বিশেষত মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (CIA) এবং পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) দক্ষিণ এশিয়ায় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল চালু করে। এই প্রবন্ধে আমরা CIA-এর ডি-ক্লাসিফায়েড Psy-Ops ম্যানুয়াল ও বিভিন্ন তথ্যসূত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করবো কিভাবে এই কৌশলগুলো বাংলাদেশে বিশেষ করে বামপন্থি ও প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। ১. Psy-Ops (Psychological Operations): Psy-Ops হলো এমন এক সামরিক কৌশল, যার লক্ষ্য শত্রুর মানসিক শক্তি ভেঙে দেওয়া। এটি মিথ্যা প্রচার, গুজব, পোস্টার, মিডিয়া ক্যাম্পেইন, ভয় ছড়ানো ইত্যাদির মাধ্যমে চালানো হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে আমার দেশ পত্রিকা, কিছু ‘নিরপেক্ষ’ লেখক এবং হেফাজতের পাল্টা প্রচার Psy-Ops এর ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে জনমতের মেরুকরণ ঘটানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। ২. False Flag Operations: False Flag অপারেশনে কোনও হামলা বা অপরাধ এমনভাবে ঘটানো হয় যেন দায় চাপানো যায় প্রতিপক্ষের ওপর। যেমন হিন্দু বসতিতে আগুন দিয়ে দোষ দিয়েছে ‘ভারতপন্থি’ সরকারি দলের ওপর। এমনকি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পেছনেও ‘বিরোধী দল নিজেরাই করেছে’ এমন সন্দেহ প্রচার করা হয়েছে। ৩. Disinformation Campaign: এটি তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। উদ্দেশ্যমূলক ভুল তথ্য প্রচার করে জনগণের উপলব্ধি ও ইতিহাসকে বদলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামাত-শিবিরপন্থি মিডিয়া কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচার, কিংবা রাজাকারদের ‘গ্রহণযোগ্য’ রূপে তুলে ধরা এর উদাহরণ। ৪. Controlled Opposition: সরকার বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজেরাই বিরোধী দল তৈরি করে কিংবা বিরোধীদের ভেতর থেকে নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। এতে মূল বিরোধী শক্তি দুর্বল হয় এবং ব্যবস্থার কাঠামো টিকে যায়। বাংলাদেশে বাম দল বা এনজিওভিত্তিক আন্দোলনের ভেতর এধরনের উপাদান পাওয়া যায়। ৫. Overton Windwo Manipulation: ওভারটন উইন্ডো তত্ত্ব অনুসারে কোন চিন্তা বা দাবি ‘গ্রহণযোগ্য’ তা সামাজিকভাবে তৈরি করা হয়। যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও স্বাধীনতা বিরোধী জামাতকে এক কাতারে ফেলে তুলনা করা হয়। যুদ্ধাপরাধকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় যেমন এটি ছিল ‘গৃহযুদ্ধ’ অথবা ‘ভারতের পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধ’। ৬. Agent Provocateur: সরকারপন্থি বা গোপন সংস্থা থেকে কিছু ব্যক্তি আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনকে সহিংস করে তোলে যাতে সেটিকে দমন করা যায়। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সাদা পোশাকে ‘আন্দোলনকারী’দের ভেতর থেকে সহিংসতা এই কৌশলের ইঙ্গিত দেয়। ৭. Gaslighting: গ্যাসলাইটিং মানে এমনভাবে পরিস্থিতি উপস্থাপন করা যাতে মানুষ নিজের উপলব্ধি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ভোট কারচুপি নিয়ে প্রচুর প্রমাণ থাকার পরেও বারবার প্রশ্ন তোলা হয়: “আপনার প্রমাণ কী?”-এই ধরনের প্রশ্ন আসলে সত্য আড়াল করার হাতিয়ার। ৮. Crisis Actor / Manufactured Event: নাটকীয় কোনও ঘটনাকে বাস্তব বলে তুলে ধরা, যা জনমতকে প্রভাবিত করে। যেমন রামুতে ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বৌদ্ধপল্লীতে হামলা, যা পরবর্তীতে সাজানো বলে সন্দেহ জাগায়। ৯. Social Engineering: মানুষের আবেগ, বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা। উদাহরণস্বরূপ, “নাস্তিক বিরোধী জেহাদ” কিংবা “ধর্ম রক্ষা আন্দোলন” ইত্যাদি। এসব প্রচারে ISI ও মধ্যপ্রাচ্যপন্থি গোষ্ঠীর বিনিয়োগ রয়েছে। ১০. Media Control & Censorship: গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্সর, বিভ্রান্তিমূলক কাভারেজ ও প্রপাগান্ডা চালানো এই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মিডিয়া অনেক সময় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট খবর চেপে রেখে তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে তোলে। ১১. Color Revolution Techniques: NGO, বিদেশি মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজকে ব্যবহার করে একটি দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা। এই কৌশল কখনো গণতন্ত্র উদ্ধারের ছদ্মাবরণে হলেও বাস্তবে সরকার বদল বা রেজিমচেঞ্জ করে রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাস করা হয়। ১২. Information Overload / Noise: একই সাথে অনেক ‘বিশ্লেষণ’, ‘মত’, ‘তথ্য’ ছড়ানো হয় যাতে জনগণ বিভ্রান্ত হয় এবং কেউ জানে না আসলে সত্য কী। যেমন আন্দোলনের মধ্যে “কে ভারতপন্থি, কে আমলাপন্থি, কে জামাতপন্থি” বিভিন্ন মতামত প্রচার করে কেন্দ্রীয় দাবি বা ইস্যু ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে CIA ও পাকিস্তানী ISI এর ভূমিকা আছে। ১৯৪৭ সালে CIA এর জন্মলগ্ন থেকেই তারা শুধু গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ নয়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে এই কৌশলগুলো ব্যবহার করে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে প্রধান মিত্র বানিয়ে CIA তাদের মাধ্যমে জামাত, আল-বদর, ও ইসলামিক জেহাদি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। বামপন্থি ও প্রগতিশীল রাজনীতি দুর্বল ও বিভ্রান্ত করার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশলী প্রচারণা। সরকার, মিডিয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মিলে বামপন্থিদের প্রতি বিষোদগার করে, পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টি করে, বা ভুয়া মামলায় জড়িয়ে ফেলে। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশলগুলো সামরিক সংঘাত ছাড়াই জনগণের চেতনা, উপলব্ধি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্দোলন ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশে এই অস্ত্র ব্যবহার করে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সমাজকেও নিয়ন্ত্রণ ও মৌলবাদী আধিপত্যের চেষ্টা চলছে। বামপন্থি, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক শক্তির জন্য আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু শাসকের বিরুদ্ধে লড়া নয়, বরং ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রের’ বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা, বিকল্প বয়ান নির্মাণ করা এবং সংগঠনের মধ্যে বিশ্লেষণী সচেতনতা তৈরি করা। বিশ্লেষণই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র। লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..