জুলেখাদের চিকিৎসায় আমাদের করণীয়

শফিকুল ইসলাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এক জুলেখার বয়স ছিল ত্রিশ। তার দুচোখ থেকে পানি পড়ে। কেঁতর হয়। পানি আর কেঁতর মিলে তার দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়। চোখের এই অসুখ নিয়ে বিভিন্ন জনের কাছে জুলেখা গিয়েছে। কেউ বলেছে, পানি পড়া (তুকতাক চিকিৎসা) দিলেই ভালো হয়ে যাবে চোখ। কেউ পরামর্শ দিয়েছে ‘আমপাতার বোঁটার রস খুবই উপকারী। ওইটা দিলে তুমি উপকার পাবে।’ জুলেখা পরামর্শদাতাদের পরামর্শ মোতাবেক চলেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। পানি পড়াটা তার কমছেই না। বছরখানের আগে স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে। স্বামীর কথা ‘ঘরের বউয়ের চোখে জল সবসময় কেঁতর পড়ে। এরকম মাগীরে রাখার কোন দরকার নাই।’ জুলেখাকে বলেছে ঘর ছাড়তে। জুলেখা স্বামীর দিকে তাকিয়ে কাকুতি মিনতি করে। ‘চোখের অসুখতো আর নিজের বানানো না, আল্লাহ দিছে, আমি কি করাম। আপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।’ একসময় জুলেখা জানতে পারে তার স্বামী পাত্রী খুঁজছে বিয়ে করবে। স্বামীর উদ্যোগের কথা শোনে জুলেখা মন খারাপ করে। যে মানুষ বৌয়ের চিকিৎসার লাইগা ডাক্তারের কাছে নিয়া যায় না সে আবার নতুন বিয়া করতে চায়। চিকিৎসার জন্য টাকা নাই, বিয়ার টাকার অভাব নাই। জুলেখার মন বিদ্রোহী হয়। স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, যা শুনতাছি তাই কি ঠিক? আপনে নাকি বিয়া করতাছেন? হ্যাঁ করবাইতো। তর কি? তর মত পচা মাগীরে নিয়া ঘর করতে হইব? তরে ত আমার ঘর ছাড়য়া যাইতেই কইছি। না গেলে চুল ধরে বিদায় করব। জুলেখা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটাই কয়েক বছর আগে তাকে ঘরে তুলেছিল। দেখতে আহামরি সুন্দর না হলেও আর দশটা মেয়ে মাইনষের চেয়ে তার চেহারা খারাপ না। তখন চোখ দিয়ে পানিও পড়তো না। স্বামীর আদরের কমতি ছিল না। সেই মানুষটাই চোখের অসুখের জন্য তাকে তালাক দিতে যাইতেছে। এরপরে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায়। টেকা দায় হয়ে যাওয়ায় স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে চলে আসে। বাবার ভিটে উঠে। ইতোমধ্যে বাবা-মা দুজনে গত হয়েছেন। রেখে গেছেন সম্পদ হিসেবে কেবল একটা কুঁড়েঘর। জুলেখার সামনে অন্ধকার। সে কাজের সন্ধানে নামে। মিয়া বাড়িতে কাজ পেয়েছে সে। সে চোখ পরিষ্কার রেখে কাজ করে। তারপরও মাঝে মধ্যে কেঁতর আসে। দেখতে অসুবিধা হয়। কেঁতর পানি দেখে গৃহকর্ত্রী বলেন, ‘চোখের এই অবস্থা নিয়ে তো কাজ করতে পারবে না। চিকিৎসা করাও।’ টাকা নাই যে সদরে গিয়া বড় ডাক্তার দেখাইতাম। আম্মা গো যদি চিকিৎসার টাকা দিহাইন, তাহলে যাইতাম সদরে। ‘আমি তোমার চিকিৎসার লাইগ্যা আলাদা টাকা দিতাম না।’ জুলেখা ফার্মেসিতে গিয়ে চোখের ড্রপ আনে, তাতেও তেমন কোন কাজ হয় না। একদিন তার বামচোখের পাশে ব্যথা হয়ে ফুলে উঠে। বিকালের দিকে তা প্রচণ্ড ব্যথায় রূপ নেয়। গৃহকর্ত্রীকে বলে বাড়ি ফিরে আসে। গৃহকর্ত্রী কড়া কথা বলে দিয়েছেন, চোখ ভালো না কইরা আমার বাড়িতে আসবি না। কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করেন। রাতে জ¦র আসে। প্রচণ্ড ব্যথায় অস্থির। ফার্মেসি থেকে খাওয়ার যে ওষুধ দিয়েছেন তাতে ব্যথা কমে না। পরের দিনও আর কাজে যেতে পারেনি। প্রচণ্ড ব্যথায় কান্নাকাটি করে। ঘরের পাশ দিয়ে পরানের মা যাচ্ছিলেন। তিনি ঘরে ঢুকে জুলেখাকে দেখে বলেন, এই চোখ নিয়া তুই এতো কষ্ট করতাছস। তুইতো মহী ডাক্তারের কাছে যাইতে পারতে। মহী ডাক্তার আমেনা বেগমের চিকিৎসার ব্যবস্থা কইরা দিন না। ঘরে বসা আমেনা বেগম মহী ডাক্তারের সাহায্য নিয়া চিকিৎসা করাইয়া তো ভালোই আছে। পরানের মার কথা শোনে জুলেখার একটু সাহস হয়। সে যাবে মহী ডাক্তারের কাছে। মহী ডাক্তার স্থানীয় বাজারে বসেন। ইতোমধ্যে জুলেখার চোখের ফোলা জায়গা ফেটে পুঁজ বেরিয়েছে। পুঁজ বেরানোর ফলে একটু আরামবোধ হচ্ছে। এই চোখ নিয়াই মহী ডাক্তারের সাথে দেখা করেন। মহী ডাক্তার স্থানীয় চিকিৎসক। নাম মহিউদ্দিন। (পল্লী চিকিৎসক) তিনি সারাদিনই চিকিৎসা কর্মে ব্যস্ত থাকেন। গরিব মানুষদের দরদ দিয়ে চিকিৎসা দেন। ক্ষেত্র বিশেষ পরিচিত লোকজনদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে গরিব রোগীদের উপকার করেন। মহী ডাক্তার জুলেখাকে দেখেই বলেন, এইটা কি করছ তুমি। তোমার তো নানীর রোগ। এই রোগটা তো অনেক দিনের। এখন ফেটে পুঁজ আসতেছে। মহিউদ্দিন তার চেম্বারই স্যাভলন কটন দিয়ে পুঁজ পরিষ্কার করে দেন। এতে জুলেখার কিছু আরাম হয়। জুলেখা বলে, কাকা আমারও কেউ নাই। আপনারা চাইলেই আমার উপকার হয়। জুলেখা আরো অনেক কথা বলে। জুলেখার চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ কাছে একটা চিঠি নিয়ে জুলেখাকে পাঠিয়ে দেন। সদরের চোখের ডাক্তারের সাথে মহিউদ্দিনের ভালো সম্পর্ক। একই পার্টি করেন। মাঝেমধ্যেই মহিউদ্দিন চিরকুট লেখে রোগী পাঠান। মহিউদ্দিনের চিরকুট পেয়ে আন্তরিকাতর সাথে ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন। জুলেখার ক্ষেত্রেও তাই করেছেন। জুলেখাকে সদর হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। দুই হাসপাতালে কিন্তু জুলেখা ভর্তি হয়নি। এবার ভর্তি হয়ে হাসপাতালে তার নতুন অভিজ্ঞতা। তার চোখের যে অসুখ ‘নানী রোগ’ সে সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা হয়েছে। গত কয়েকদিনের অনিশ্চিত জীবনের কিছুটা ইতি টানা হয়েছে। হাসপাতালে বিছানা পেয়ে ও সরকারি খাবার খেয়ে তার ভালোই লাগছে। ডাক্তার সাহেব তাকে নিয়মিত দেখছেন। ওষুধের ব্যবস্থা করছেন। মহী ডাক্তার এসে তার খোঁজ নিয়েছেন ও বড় ডাক্তারের সাথে কথা বলেছেন। বড় ডাক্তার বলেছেন, তার অপারেশন লাগবে। মহিউদ্দিন তাকে বলেছেন, ট্যাকার চিন্তা তোমার করতে হইব না, আগে সুস্থ হও। হাসপাতালে তার তিন সপ্তাহের ওপর থাকতে হয়েছে। অপারেশন হয়েছে। চোখের পানি বন্ধ হয়েছে। কেঁতরও নাই। ডাক্তার সাহেব তাকে বলেছেন, সেলাই কেটে ছুঁটি দিবেন। জুলেখার মনে পড়ে স্বামীর আচরণ, বিয়াবাড়ির বরযাত্রীর আচরণের কথা। এদের কেউ তাকে সহায়তা করেনি উপক্ষো ছাড়া। মহী ডাক্তার বড় ডাক্তার তারা কেউ আত্মীয় নন, আপনও নন। অথচ, এই কঠিন সময়ে কত দরদ দিয়ে চোখের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। জুলেখার চোখে কৃতজ্ঞতার জল আসে। সেলাই কাটার সময় চোখের ডাক্তার তাকে বলেছেন, তোমার চিকিৎসার জন্য যে খরচপাতি হয়েছে মহী ডাক্তার তা জোগাড় করে দিয়েছেন। স্যার, ওনি আমার বাবার কাজ করছেন। আমার জগত সংসারে কেউ নাই। স্বামী চোখের অসুখের জন্য তালাক দিছে। কার সাহায্যে চিকিৎসা করবো। আপনে, মহী ডাক্তার যা করেছেন সেই উপকার শোধ করার ক্ষমতা আমার নাই। আল্লাহ আপনেরে মহী ডাক্তারকে হাজার বছর বাঁচায়া রাখুক। মহী ডাক্তার আমেনা বেগম আপনার কাছে আইস্যা চিকিৎসা করিয়া নিছেন। হেই খবর পাইয়াই স্যার মহী ডাক্তারের ধইরা আপনের কাছে আইছি। মহী ডাক্তার তোমারে বলেন না তিনি কোন পার্টি করেন এ সম্পর্কে? জুলেখা বলে- না স্যার জানি না। পার্টি টাটি ভালো লাগে না। সবাই ভোটের সময় মিষ্টি কথা কয়, তারপর আর খোঁজ নাই। মহী ডাক্তার তোমাদের পার্টির কথা বলেন না? না বইলে না। কখনো কিছু বলে না। তবে দেখছি তিনি মাঝেমধ্যে লাল নিশান নিয়া মিছিল করে। তিনি তোমারে মিছিলে যাইতে বললে যাবা? অবশ্যই যাইবার স্যার। যে মানুষ আমার লাইগ্যা দরদ করে তার কথা ফেলাই কেমনে। তিনি ত আমার কাজ করেন। আমি খুশি হইয়া যাইতাম। তিন ডাক্তার সাহেব এই অসহায় মেয়েটির দিকে তাকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলেন। মেয়েটির যে রোগ তা গরিবেরই বেশি হয়। বহু দিন ময়লা পানিতে গোসল করার থেকে এ রোগের সূত্রপাত হতে পারে। বংশগত কারণ, ব্যক্তিগত অপরিচ্ছন্নতা, পুষ্টির অভাব, রক্তশূন্যতা এ রোগের উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন রোগের ভেতর শতকরা দুজন এ রোগে আক্রান্ত। এ রোগের মূল চিকিৎসা অপারেশন। কিন্তু আজ পাড়াগায়ে এসব রোগীরা কোথায় যাবে চিকিৎসার জন্য? অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এসব গরিব রোগীদের চিকিৎসায় আগ্রহী তারা, আগ্রহী ছানি রোগীর চিকিৎসায়। সমাজে এরকম অনেক রোগ আছে যেসবে ডাক্তাররা দরদ দিয়া কাজ করে উপকার করতে পারেন। সমাজের এই গরিব রোগীদের ভেতরেই কাজ করা উচিত কমিউনিস্ট ডাক্তারদের। পার্টির প্রতি নিবেদিত প্রাণ ডাক্তারদের ও পাস করা ডাক্তারদের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে চিকিৎসা সেবায় ভিন্ন চিত্র। একই সাথে গরিব এই মানুষদের ভেতর গড়ে তোলা যায় পার্টির ভিত। লেখক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..