পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর বঞ্চনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

[এই জরিপ রির্পোটটি মার্কসবাদী পথ পত্রিকা থেকে সংকলিত। আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বলে প্রকাশ করা হলো। (সম্পাদক)] দর্শনগতভাবে শিক্ষার মূল্য যে স্রেফ কোনো উপকরণের মূল্যের সমান নয়, বা কেবল রোজগারের প্রাক-আয়োজন নয়, শিক্ষার অন্তর্নিহিত মূল্য যে আসলে জীবনদৃষ্টি তৈরিতে সহায়ক- এ কেবল শিক্ষাবিদ বা শিক্ষা দর্শন নিয়ে চর্চায় থাকা বিদগ্ধ মানুষেরই দাবি নয়। এই দাবি এই উপলব্ধি বোধ করি সবচেয়ে জৈবিক হয়ে ওঠে অক্ষরজ্ঞানবঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের সংলাপে। সেজন্যই পেটের দায়ের বাস্তবতার সীমা পেরিয়েও তাঁরা যেতে চান সাক্ষরতা কেন্দ্রে। শিরোনামের সংলাপে মেয়েরা থাকলেও, লেখার শুরুতেই বলে রাখা জরুরি- ‘নারী’-কে লিঙ্গগত পরিচয়ের কোনো বগিতে সেঁধিয়ে দিয়ে এই লেখার মূল উপাদানগুলি চর্চায় উঠে আসবে না; বরং উৎপীড়িত লিঙ্গগত পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণিগত শোষণ, দারিদ্র্য, আর্থিক অসাম্য মেয়েদের সংলাপে কীভাবে ধরা পড়ে তা তুলে ধরবে এই লেখা। লেখার আধার হবে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির একটি পাইলট সমীক্ষা। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ ২০২৫-এ বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি কেন্দ্রীয়ভাবে একটি পাইলট সমীক্ষার কাজ করে। সমীক্ষাটি করা হেেয়ছ হুগলির কোন্নগর, উত্তর ২৪ পরগণার স্বরূপনগর ব্লক, পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লক এবং বীরভূমের সাঁইথিয়া ব্লকের মোট ৮টি গ্রামে। শহরাঞ্চলের মধ্যে সমীক্ষাভুক্ত এলাকাগুলি হল হাওড়া, বরানগর, সল্টলেক, নয়াবাদ, বেলেঘাটা ও কলকাতার মানিকতলা। ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মোট ২৭২ জন নারীর সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে এই কাজটি হয়। সমীক্ষার মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ লিঙ্গ-রাজনীতিতে কোন কোন উপাদানগুলি বৈষম্যের আবাদজমি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সে সংক্রান্ত কাজকে মাথায় রেখে তৈরি হয় প্রশ্নসূচি। তথ্য সংগ্রহের জন্য সূচক-ক্ষেত্রগুলি রাখা হয়- নারীদের শিক্ষা-সাক্ষরতা, স্বাস্থ্য, ঘরের কাজ, জীবিকা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা, বিবাহ ও সন্তানপালন, নারী-স্বাধীনতা সম্পর্কে বোঝাপড়া। এই সমীক্ষা কার্যত উক্ত প্রসঙ্গে ভিত্তিরেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে সমিতির ভবিষ্যতের কাজ পরিকল্পনা করার জন্য সংঘটিত করা হয়। প্রশ্নসূচি তৈরির কর্মশালায় বিশেষত নজর দেওয়া হয়েছিল বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির মূল তিন স্লোগান- সাক্ষরতা, সচেতনতা, সক্ষমতার প্রসার ও বিকাশের দিকে। প্রশ্নসূচি তৈরির কাজ থেকে শুরু করে সমীক্ষা পর্যন্ত, সমগ্র কাজটিতে যোগদান করেন সাক্ষরতা আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক, পেশাদার গবেষণা কর্মী, মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, বিদ্যালয় শিক্ষক ও নারী আন্দোলনের কর্মীরা। এই সংলাপে খুঁজে পাওয়া যায় নানা সংখ্যাগত ও গুণগত তথ্য, মতামত, জীবনবৃত্তান্ত। এই লেখার প্রথম পর্ব মুখ্যত আলোচনা করবে পাইলট সমীক্ষায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ক্ষেত্রে কী কী জানা যাচ্ছে উত্তরদাতা নারীদের কাছ থেকে, তা নিয়ে। আবার একই সঙ্গে এই ক্ষেত্রগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অবস্থা ঠিক কেমন- সে সংক্রান্ত কিছু গবেষণা ও সমীক্ষার প্রতিবেদনের তথ্যও থাকবে লেখায়। ‘ছোটবেলায় আব্বা মারা গেছে, আম্মি অসুস্থ ছিল। ঘরের কাজ সামলাতে হতো, পড়া হয় নাই। এখন খারাপ লাগে ভেবে, যেইখানেই যাই সেইখানেই দেখি, পড়াশুনার মূল্য সবখানে আছে। আমার সঙ্গে যে ভুল হয়েছে, আমার ছেলের সঙ্গে সে ভুল হতে দিব না। যত গরিবই হই, ছেলের পড়ালেখার জন্য খরচা করবই।’ রান্না করতে করতে নিজের অক্ষরজ্ঞান না থাকার কাহিনি শোনালেন উত্তর চব্বিশ পরগণার স্বরূপনগর ব্লকের এক দূর গ্রামের আঞ্জুরা বিবি। সমীক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে বত্রিশ বছর বয়সী আঞ্জুরা জানান, বয়স্ক সাক্ষরতা কেন্দ্র চালু হলে ‘কেউ যাক না যাক, আমি আগে যাব’। একই গ্রামের মাসকুরা বিবির আফসোসে জানা যায়, ‘লেখাপড়া জানলে ছেলেকে পড়া দেখাতে পারতাম, টিউশান বন্ধ করাতে পারতাম।’ হুগলির কোন্নগরের ৪২ বছর বয়সী বয়স্ক সাক্ষরতা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী শেফালি জানান, ‘আর্থিক সমস্যার জন্য না, মা বলতো- মেয়েদের পড়াশুনা শিখে কী হবে? আমরা তো পড়াশুনা শিখিনি, আমরা কি জীবনে চলিনি?’ আমাদের ছোটবেলায় ওরকমই ভাবত!’ দর্শনগতভাবে শিক্ষার মূল্য যে স্রেফ কোনো উপকরণের মূল্যের সমান নয়, বা কেবল রোজগারের প্রাগায়োজন নয়, শিক্ষার অন্তর্নিহিত মূল্য যে আসলে জীবনদৃষ্টি তৈরিতে সহায়ক- এ কেবল শিক্ষাবিদ বা শিক্ষা দর্শন নিয়ে চর্চায় থাকা বিদগ্ধ মানুষেরই দাবি নয়। এই দাবি, এই উপলব্ধি, বোধ করি, সবচেয়ে জৈবিক হয়ে ওঠে অক্ষরজ্ঞানবঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের সংলাপে। সেজন্যই পেটের দায়ের বাস্তবতার সীমা পেরিয়েও তাঁরা যেতে চান সাক্ষরতা কেন্দ্রে। বিশ্ব লিঙ্গ অসাম্য সূচক প্রতিবেদন ২০২৪ (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স রিপোর্ট ২০২৪) জানাচ্ছে, সাক্ষরতায় লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্নে ১৪৬টি যোগদানকারী দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১২৪তম। এদেশে নারী ও পুরুষের মধ্যে সাক্ষরতার হারের তফাৎ ১৭.২ শতাংশ বিন্দু। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৩-২৪ অনুযায়ী, গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে ৭০.৪ শতাংশ নারী এবং ৮৪.৭ শতাংশ পুরুষ সাক্ষর। শহরাঞ্চলে এই লিঙ্গগত তফাৎ তুলনায় কম, প্রায় ৮ শতাংশ বিন্দু। আবার স্কুলছুট হয়ে যাওয়া নারীদের কাহিনির তাৎপর্য খানিক ভিন্ন। এঁদের আক্ষেপের সঙ্গে যেন জড়িয়ে থাকে একপ্রকার ‘উচ্চাশা’ । ২৫ বছর বয়সী উমা জানান, ‘কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে পড়তে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলাম। আর পড়া হল না। এখন আর হবেও না।’ সাঁইথিয়ার আদিবাসী গ্রামের পূর্ণিমা ঝুড়ি বুনতে বুনতে সহাস্য বলেন, ‘দশ ক্লাস অবধি পড়িয়েছে, তারপর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। খুব ইচ্ছা ছিল মাধ্যমিক পাসের সার্টিফিকেটটা হাতে নেব।’ সাক্ষরতা, বিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে সংলাপের অংশ এখানে শেষ করার আগে উল্লেখ করতে চাই যে, লিঙ্গগত বঞ্চনা, দারিদ্র্য, সামাজিক অসাম্যের বোধের এক সংমিশ্রিত অভিব্যক্তি, যেখানে লিঙ্গ বৈষম্যের দিকটি খানিক উহ্য- ‘ক্লাস সেভেন-এ যখন পড়তাম তখন ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছিলাম!’ ‘কেন?’ ‘এক জোড়া সাদা জুতার জন্য। বুদ্ধি ছিল না। ইস্কুলের মাস্টাররা বলেছিল স্বাধীনতা দিবসে এক জোড়া সাদা জুতা পরতে হবে। ঘরে এসে বাবারে বলছিলাম। বাবা বলছিল, টাকা নাই, পারবে না কিনে দিতে। কান্না করছিলাম খুব। তখন বলে, সাদা জুতার জন্য লেখাপড়া না হইলে, যেতে হবে না ইস্কুলে। সেই কথা শুনে খুব রাগ হল, আর কোনওদিন ইস্কুলে যাই নাই। পরে বুঝি কী ভুল করছিলাম! তবে পড়াশুনা কিছু মনে নাই, এ পাড়ায় বড়দের ক্লাস হলে যাব আবার।’ এ দেশে, মায় এ রাজ্যে ‘পরিসংখ্যানের সাক্ষরতা’ আর ‘কার্যকরী সাক্ষরতা’-র মাঝের এই তফাৎ অনস্বীকার্য- যে তফাতের কারণে উচ্চ প্রাথমিকের শেষ ক্লাসে স্কুলছুট হিসাবে নথিভুক্ত এই নারীর ফের অক্ষর চেনার দরকার পড়ে। সংলাপ এগোতে থাকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে। বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির বহুমাত্রিক কাজ কেবলমাত্র অক্ষরজ্ঞান বঞ্চনায় চারপাশে ঘোরাফেরা করে না। সচেতনতা ও সক্ষমতার লক্ষ্যে সমিতির নানা কাজের পরিকল্পনায়ও এই পাইলট ভিত্তিরেখার নিরীক্ষণের মাধ্যমে হবে। ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে-৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৭১.৫ শতাংশ অ্যানিমিয়া আক্রান্ত (পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩৯.২ শতাংশ)। অথচ নিজেদের পুষ্টি ও রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা সম্পর্কে জানাবোঝা বেশিরভাগ নারীর নাই। ‘গায়ে খেটে বেঁচে থাকি, মাথা ঘোরে না, তাতেই বুঝি শরীর ঠিকই আছে। পরীক্ষা হয়নি কখনও।’ জানান সাঁইথিয়ার এক আদিবাসী গ্রামের খেতমজুর নারী। জানা যায়, এই নারী-মজুরের গোটা মাসের খাবার মূলত ভাত, আলু, টমেটো। রোজের খাবারে আমিষ প্রোটিন কার্যত শূন্য। এই ব্লকের চারটি গ্রামের মোট ৭৪ জন নারীর সংলাপ জানায়, এঁদের মধ্যে ৫০ জন নারী সপ্তাহে একদিন বা তার কম আমিষ খাদ্য খেতে পারছেন। অর্থাৎ পুষ্টি খুব সুবিধার জায়গায় থাকার কথা না। মোট ২৭২ জন উত্তরদাতা নারীর মধ্যে ১৮৯ জন জানেন না, তাঁদের শরীরের হাল হকিকত- পুষ্টিকর খাবারের এই স্পষ্ট অভাবের বাস্তবতা সত্ত্বেও, রক্তাল্পতার পরিসংখ্যানের দুরবস্থা সত্ত্বেও রাষ্ট্র এমন কোনও কার্যকরী বন্দোবস্ত রাখেনি যা দিয়ে, সর্বজনীনভাবে নারীদের বুনিয়াদি স্বাস্থ্যের ধারাবাহিক নিরীক্ষণ সম্ভব হয়। ‘প্রাইভেটে যাই, পয়সা দিয়ে ডাক্তার দেখাই’- সংলাপের এই বাক্য প্রতিটি জেলায় ঘুরেফিরে আসে বারবার। কোথাও কোথাও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে (উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র) চিকিৎসার কথা শোনা গেলেও নিত্যদিনের জ্বরজারিতে বেশিরভাগই যাচ্ছেন প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বারে। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক গ্রামের এক নারীর সঙ্গে সংলাপের শুরু হয়েছিল এভাবে, ‘চিকিৎসা কাকে দিয়ে করান, পাশ করা ডাক্তার?’ তাতে করে মধ্যবয়সী নারীর ঝাঁঝালো উত্তর আসে- ‘আমি কী করে জানব আমার ডাক্তার পাশ করেছে না ফেল করেছে? গ্রামে ওকে কাছে পাই ওকেই দেখাই।’ ‘ব্যাটাছেলেরা তো বেশি খাবেই। বাইরে খাটবে, মেয়েদের চেয়ে বেশি খাবে না?’ বিস্ময়ের সঙ্গে দেওয়া এই প্রায়-অবশ্যম্ভাবী উত্তরের পিঠেই শোনা যায় উত্তরদাতা এই নারীর দশ বছরের সন্তানের কথা, খানিক স্বগতোক্তি- ‘খেতেই দেয় না ঠিক করে মাকে, ঘরের কাজের জন্য আবার টাকা দেবে কী!’ নিজের বাবা সম্পর্কে ছেলের এই মন্তব্য বুঝিয়ে দেয় কেন তার মা মনে করছেন ‘ব্যাটাছেলেরা তো বেশি খাবেই’! এই মা বিড়ি বাঁধেন। সমীক্ষার কাজে গিয়ে জানা যায়, মূলত নারী মজুররা করেন বিড়ি বাঁধার কাজ। সেই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এই মজুরদের ‘শ্বাসের টান’-এর রোগ, এবং কখনও নিরাময় হয় না। এমন পিঠে ব্যথার রোগ! নারী মজুরদের এই পেশাগত ঝঞ্ঝাট সম্ভবত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছেও অবান্তর। মেয়েদের সংলাপে আলাপী এক নারীর বলা একটি বাক্য বিশেষত প্রণিধানযোগ্য – ‘উচিত সবসময় ঘরেই বাচ্চা হওয়া, মেয়েদের ইজ্জত-আব্রু বজায় থাকে। কিন্তু এখন তো নিয়ম, হাসপাতালেই বাচ্চা হতে হবে!’ বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির সচেতনতা, সক্ষমতা প্রসারের কাজ শুরু করার সম্ভাবনা এখানেই- যে কাজ ‘নিয়ম’ নয় কেবল, প্রতিষ্ঠা করতে পারে বিজ্ঞানমনস্কতা ও সচেতনতার তাৎপর্য। সংলাপের ফাঁকে যা ভোলা কাজের কথা নয় তা হলো বিশ্ব লিঙ্গ অসাম্য সূচক প্রতিবেদন ২০২৪ (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স রিপোর্ট ২০২৪) অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যে বিশ্বের ১৪৬টি যোগদানকারী দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৪২তম। সৌজন্যে : মার্কসবাদী পথ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..