বেকারত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়ছে মেধাবীরা
মোহাম্মদ আলী
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকজন শিক্ষার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে রাষ্ট্রের ব্যয় হয় ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ, প্রতিবছর দেশ থেকে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছে, যাদের সিংহভাগই আর ফিরে আসছে না। গত ১৫ বছরে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ গুণ। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, পড়াশোনা করে তারা চাকরি পাবেন না, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৯০ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগেরই ভবিষ্যতে বাংলাদেশে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। যে দেশের হাজারো তরুণ-যুবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়ে ঠেলে, ঐশ্বর্যময় জীবনের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; সেই দেশের শিক্ষিত তরুণেরা আজ কেন দেশত্যাগ করতে মরিয়া?
বিদেশে পড়তে যাওয়া সবাই যে স্কলারশিপে যাচ্ছে তাও নয়। বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী ডলার খরচ করে বিদেশে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে, তাদের একটি অংশকে যদি ফিরিয়ে আনা যেত তাহলেও বলা যেত ডলার ভেঙে শিক্ষা কেনাটা কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে। এদেশের কোন শাসকই এই জায়গায় কোনো গুরুত্ব দেয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়।
বিগত ১৫ বছরে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি, অথচ বাস্তবে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়া কমছে না, বরং বাড়ছে। এর কারণ শিক্ষার মান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার পরিবেশ ভালো নয় বলেই মনে করেন শিক্ষাবিদরা। বিশ্বে এত নিম্নমানের শিক্ষক এবং শিক্ষার পরিবেশ খুব কম দেশেই আছে রয়েছে বলে মনে করেন তারা। তাঁরা মনে করেন, শুধু ভবন বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিলেই একটা কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় না; এর জন্য প্রয়োজন যথাযোগ্য শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ, উন্নততর গবেষণার সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের ওপরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রোক্টর, ট্রেজারারসহ বিভিন্ন দায়িত্বে যারা রয়েছেন তাদের বিভিন্ন সময়ের কর্মকাণ্ড অসংলগ্ন বলেই মনে করেন অনেকে।
২০১৬ সালে গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছে। তবে বছরের পর বছর এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। অথচ এসব শিক্ষার্থীকে গ্রাজুয়েট করতে দেশের খরচ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
শুধু শিক্ষার্থীই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে নানান পেশার মানুষ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলেও পড়াশোনা শেষে অনেকেই সেখানে থেকে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই আছেন যারা উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, তৈলবৃত্তি, অনুন্নত বেতন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ নানাবিধ কারণে দেশ ছাড়ছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব ও মেধাসম্পদের যথোপযুক্ত স্বীকৃতি না পাওয়ায় দিশেহারা তরুণেরা আশার আলোর খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছে পরদেশে। দেশীয় চাকরির বাজারে বারবার ব্যর্থ হওয়া মেধাবী ছাত্রটিকেও বিদেশি কর্মক্ষেত্রে একজন সফল কর্মী হিসেবে প্রশংসিত হওয়ার নজির অনেক।
প্রতিবছর উচ্চশিক্ষার জন্য কত শিক্ষার্থী দেশ ছাড়ে, এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইউনেস্কো। ২০২২ সালে প্রকাশিত ইউনেস্কোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৯ হাজার ১৫১ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ৫৮টি দেশে পড়াশোনার জন্য গিয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪৪ হাজার ২৪৪ জন, ২০২০ সালে ৫০ হাজার ৭৮, ২০১৯ সালে ৫৭ হাজার ৯২০ এবং ২০১৮ সালে ৬২ হাজার ১৯১ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এদের সিংহভাগই বিদেশে থেকে যায়। শিক্ষিত তরুণদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা অনেক আগে থেকে থাকলেও বিগত এক দশকে তা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিক্ষিত তরুণদের অনেকে মনে করে, দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে ব্যস্ত। অনেকে মনে করে, মাফিয়াতন্ত্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে রাজনীতি ও অর্থনীতি।
এখন অনেকে উন্নত জীবনের জন্যও যাচ্ছেন বিদেশে। দেশে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের কেউ কেউ দেশ ছাড়ছেন। তাদের মধ্যে প্রশাসনের কর্মকর্তা আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন। প্রকৌশলী, শিল্পী এমন অনেকে আছেন যারা দেশে চাকরি করে সম্মানজনক জীবিকা উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু তারা যাচ্ছেন শুধু উন্নত জীবনের জন্য। তার মানে হলো- দেশে শুধু চাকরি বা পেশার নিশ্চয়তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চান না। তারা সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, পরিবেশসহ আরও অনেক বিষয়ে নিশ্চয়তা চান। এসব বিষয়ে ঘাটতি অনুভব করার কারণেই তারা দেশ ছেড়ে বিদেশে নিজেদের ঠিকানা খুঁজে নেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ-২০২২’-এর প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০.৬ শতাংশ। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের এক জরিপে জানানো হয়, বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠীর বড় অংশ আর্থসামাজিক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, পড়াশোনা করে তারা চাকরি পাবেন না, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অন্য এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন।
দেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী কাজ পাচ্ছে না। স্বাভাবিক মর্যাদাসম্পন্ন জীবন গড়তে পারছে না। যোগ্যতার যথাযোগ্য মূল্যায়ন হচ্ছে না। চাকরির বাজারে দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রতিনিয়ত রিজার্ভ কমছে, বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার। প্রতিহিংসার রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতায় ছেয়ে গেছে দেশ। এরূপ পরিস্থিতিতে কেউ যদি দেশে নিরাপদ বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করে তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সরকারের যথাযোগ্য পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। দেশের পরম লালিত মানবসম্পদ অন্যদেশে পাচার না হয়ে, দেশের সেবায় ব্রতী হোক–এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন