নারীজাতির পরাজয় প্রসঙ্গে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস

শাহীন রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তথা সাম্যবাদের স্থপতি এবং নারীমুক্তির দিশারি। বিশ্ব সভ্যতার সাম্যবাদী রূপান্তরের সামাজিক জ্ঞান-তত্ত্ব কার্ল মার্কস এবং তাঁর যৌথ শ্রমের ফসল। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৮২০ সালের ২৮ নভেম্বর জার্মানির বার্মেনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৩৪ সালে এলবারফেন্ড জিমন্যাসিয়াম স্কুলে ভর্তি হন। পরে সাংসারিক কারণে স্কুল ছেড়ে বার্মেন-এ পিতার সওদাগরি অফিসে করণিকের কাজে যোগ দেন। কাজের মধ্যেও তিনি দর্শন চর্চা, বৈজ্ঞানিক চেতনা বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষার কাজ চালিয়ে যান। ১৮৪২ সালে উন্নত বাণিজ্যিক প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডের শিল্প কেন্দ্র ম্যানচেষ্টারে সওদাগরি সংস্থায় চাকুরি নেন। এ সময়ে ইংল্যান্ডে শ্রমিকদের দুর্দশা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে ১৮৪৫ সালে লিখতে শুরু করেন তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’। এ গ্রন্থে তিনিই প্রথম দেখান যে শ্রমিক শ্রেণী কেবল একটি ক্লেশভোগী শ্রেণী নয়; তাদের লজ্জাকর অর্থনৈতিক অবস্থাই তাদেরকে চূড়ান্ত মুক্তির জন্য সংগ্রামে বাধ্য করছে। এই গ্রন্থ হলো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ অভিযোগ পত্র। এই সময়ে আইরিশ শ্রমিক পরিবারের মেয়ে মেরী বার্নসের সঙ্গে বিয়ে হয়। বস্তুত ইংল্যান্ডে আসার পরই এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রী/সাম্যবাদী হয়ে উঠেন। ১৮৪৪ সালে কার্ল মার্কসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং দু’জনে বন্ধুত্বে আবদ্ধ হন। তাঁরা রচনা করেন সমাজতন্ত্রের বুনিয়াদী গ্রন্থ ‘পবিত্র পরিবার’ (Holy Family)। এসম শ্রমজীবী জনগণের আর্ন্তজাতিক সমিতি “কমিউনিস্ট লীগ”-এর সঙ্গে এঙ্গেলস ও মার্কসের যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং তাদের উপর সমাজতন্ত্র/সাম্যবাদের মূলনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবেই ১৮৪৮ সালে এঙ্গেলস ও মার্কস যৌথভাবে লেখেন বিপ্লবের মহাকাব্য ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ (Communist Manifesto)। ১৮৭৮ সালে এঙ্গেলসের দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ধারণা সমৃদ্ধ বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ্যান্টি ডুরিং’ (Anti-During) প্রকাশিত হয়। ১৮৮৪ সালে যথাক্রমে তিনি লেখেন কাল্পনিক বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র (Utopian and Scientific) নামক আকর গ্রন্থ। ১৮৮৩ সালে কার্ল মার্কসের মৃত্যুর পর এঙ্গেলস ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে মার্কসের পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারসহ অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশ করা। নিজের কাজ ফেলে তিনি এসময় মার্কসের অমর গ্রন্থ পুঁজির (Das Capital) শেষ দু’খণ্ড গুছিয়ে প্রকাশ করে এক দুর্লভ বন্ধুত্বের নিদর্শন স্থাপন করেন। বস্তুত ১৮৯৫ সাল থেকে এঙ্গেলস তাঁর নিজের এবং মার্কসের সমস্ত লেখা পূর্ণাঙ্গ সম্পাদনায় আত্মনিয়োগ করেন। এঙ্গেলস ছিলেন বহুভাষাবিদ এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বত্রগামী ও বহুমুখী। নারীমুক্তির প্রশ্নে এঙ্গেলসের চিন্তা ভাবনা এবং তাত্ত্বিক দিক নির্দেশনা পাওয়া যায় তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রের উদ্ভব’ নামক চিরায়ত গ্রন্থে। বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ আবিষ্কার থেকে তিনি এখানে প্রমাণ করে দেখান যে ‘সমাজের গোঁড়ায় নারী ছিল পুরুষের ক্রীতদাসী’–এ একেবারেই ভুল ধারণা। সমাজের অসভ্য যুগের সমস্ত স্তরে এবং বর্বরযুগের নিম্ন ও মধ্যস্তরে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উর্ধস্তরের মধ্যেও নারীদের স্বাধীনতা তো ছিলই বরং সমাজে তাদের সম্মানও যথেষ্ট ছিল। যৌথ পরিবারগুলোর অধিকাংশ অথবা সমস্ত নারীই একটি মাত্র গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত থাকতো, আর পুরুষরা আসতো নানা গোষ্ঠী থেকে। এই হলো নারীর প্রাধান্যর বাস্তব ভিত্তি। এঙ্গেলস-এর পরিবারের ক্রম বিকাশের ইতিহাস অনুযায়ী আদিম সমাজে গোড়ায় অবাধ যৌন সংসর্গের যুগে গোটা উপজাতি জুড়েই ছিল পরিবার, যা পরে সংকুচিত হয়ে অবশেষে এক জোড়া নর-নারীর মধ্যে পরিবার সীমাবদ্ধ হয়। অসভ্য যুগ থেকে বর্বর যুগে উত্তরণের সময় পর্যন্ত এই জোড় পরিবার প্রথার উৎপত্তি দেখা যায়। তাঁর মতে-‘সভ্যতার বিকাশের ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদের উদ্ভব এবং সম্পদের উপর পরিবারের মালিকানা জোড় পরিবার ও জননী বিধি (মাতৃতন্ত্র) শাসিত সমাজের ব্যবস্থার উপর প্রবল আঘাত হানে। কেননা আগে মাতৃবিধি অনুসারে মাতৃবংশ পরিচয়েই মানুষ চিহ্নিত হতো এবং আদিম উত্তরাধিকার প্রথা অনুযায়ী গোষ্ঠীর কেউ মারা গেলে তার অন্যান্য আত্নীয়-স্বজনরা তার সম্পত্তি ভাগ করে নিতো। ধনদৌলত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একদিক দিয়ে নারীর চেয়ে পুরুষের মর্যাদা বাড়তে থাকে; অন্যদিকে পুরুষের এই মর্যাদা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নিজের ছেলেমেয়েদের সুবিধার জন্য পুরনো উত্তরাধিকার প্রথার উচ্ছেদ করার দিকে অবস্থা এগিয়ে যায়। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত জননীবিধি অনুসারে বংশ-পরিচয় নির্ধারণের নিয়ম ছিল ততদিন পর্যন্ত উত্তরাধিকার প্রথা বদলানো সম্ভব ছিল না। তাই জননীবিধি উচ্ছেদ করার দরকার হলো এবং শেষ পর্যন্ত তাই হলো। একটা সাধারণ ডিক্রী জারি করা হলো যে– এখন থেকে পুরুষ সদস্যদের বংশধারা গোষ্ঠীর ভেতরেই থাকবে, আর নারী সদস্যদের ছেলেমেয়েরা তাদের মায়ের গোষ্ঠীভূক্ত না হয়ে বাবার গোষ্ঠীভূক্ত হবে। মাতৃবংশ অনুসারে সন্তানের পরিচয় এবং মাতৃবিধি অনুযায়ী উত্তরাধিকার নিয়মের অবসান করে তার জায়গায় পিতৃবংশ অনুসারে সন্তানদের পরিচয় এবং পিতৃবিধি অনুসারে উত্তরাধিকার প্রথার প্রবর্তন করা হয়। এভাবে তিনি জননীবিধি উচ্ছেদের মাধ্যমে নারীর অধঃস্তনতা বা পরাধিনতার এই কার্যকারণকে ‘নারীজাতির ঐতিহাসিক পরাজয়’ রূপে বর্ণনা করেন: জননীবিধি উচ্ছেদ সাধনে নারী জাতির বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে। পুরুষ গৃহেও কর্তৃত্ব অধিকার করে, নারী অবনমিত হয়। তাকে গোলামী স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। নারী তখন পুরুষের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার ক্রীতদাসী এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়। এক বিবাহ প্রথা যে নারীর হীন অবস্থানের সূচনা করেছিল তার উল্লেখ করে এঙ্গেলস বলেছে, ‘এক বিবাহ প্রথা নারী ও পুরুষের সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে উদ্ভূত হয়নি, নারীর উপর পুরুষের প্রাধান্যের রূপ হিসেবেই এই প্রথার প্রচলন। এক বিবাহ প্রথার মধ্যে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে শ্রেণী বিরোধ দেখা যায়, সেই হলো ইতিহাসের প্রথম শ্রেণী বিরোধ, আর প্রথম শ্রেণী শোষণ পুরুষের দ্বারা নারীর নিগ্রহ থেকে।’ গৃহস্থালি কাজ কিভাবে নারীর পরাধীনতাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন– ‘প্রাচীন সাম্যবাদী ব্যবস্থায় অনেকগুলো দম্পতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা একইসঙ্গে থাকতো। তখন নারীর উপর ন্যস্ত গৃহকর্মের কাজগুলোও পুরুষের খাদ্য আহরণ করে আনবার মতোই সামাজিক প্রয়োজনীয় কাজরূপে গণ্য হতো। কিন্তু পিতৃপ্রধান পরিবার প্রথা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল এবং এক বিবাহ প্রথার মধ্য দিয়ে অবস্থাটা আরো বদলে গেল। তখন ঘরকন্নার কাজের আর কোনো সামাজিক চরিত্র রহলো না ঘরকন্নার কাজ ব্যক্তিগত সেবাবৃত্তিতে পরিণত হলো। সামাজিক উৎপাদনের কাজে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়ে স্ত্রী হয়ে গেল সর্বপ্রথম ক্রীতদাসী।’ আর এ অবস্থা যে আজো বিদ্যমান তা জবানিতেই জানা যায়, ‘নারী যখন ব্যক্তিগত ঘরকন্নার কর্তব্যে রত তখন সে সামাজিক উৎপাদনের কাজের থেকে বাইরে থাকে এবং উপার্জনও করতে পারে না, আর যখন সে সামাজিক উৎপাদনের কাজে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনভাবে নিজের জীবিকা অর্জন করতে চায়, তখন সে আর তার পারিবারিক কর্তব্য পালনের অবকাশ পায় না। এ কথা কারখানার নারী শ্রমিকদের বেলায় যেমন খাটে, তেমনি সমস্ত বৃত্তির ক্ষেত্রেই এমনকি ডাক্তার, আইনবিদ নারীদের বেলায়ও খাটে। পরিবারের মধ্যে পুরুষ বুর্জোয়া এবং স্ত্রী সর্বহারা। আধুনিক পরিবারগুলো প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্নভাবে নারীদের গৃহদাসত্বের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।’ তবে এঙ্গেলস শুধুমাত্র নারীর অধীনতা, পরাধীনতা কারণ তালাশ করে ক্ষান্ত হননি, তিনি একইসঙ্গে নারীমুক্তির প্রকৃত পথও বাতলে গেছেন। তাঁর মতে– ‘নারীর মুক্তিলাভের প্রথম শর্তই এই যে, সমগ্র নারীজাতিকে আবার সামাজিক উৎপাদনের কাজে পুনঃপ্রবেশ করতে হবে। আর তারই ফলে বর্তমানে যে ধরনের ব্যক্তিগত পরিবারগুলো সমাজের অনুকেন্দ্র হিসাবে রয়েছে, সেভাবে আর সেগুলো টিকতে পারে না।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..