মার্কসবাদ ও শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতা

ডা. মনোজ দাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে মার্কস-এঙ্গেলস কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেননি। নন্দনতত্ত্বের বিষয়ে ১৮৫৭ সালে পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা ছিল মার্কসের। কিন্তু নানা কর্মব্যস্ততায় তা সম্ভব না হলেও মার্কস-এঙ্গেলসের বিভিন্ন লেখা ও চিঠিপত্রের মধ্যে তাঁদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ভাবনার মৌলিক অনেক কিছু ছড়িয়ে আছে। মার্কস-এঙ্গেলসের সংস্কৃতি ভাবনাকে লেনিন আরও অগ্রসর করে নেন। নন্দনতত্ত্বের প্রধান সমস্যা রপুমণ, শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে সমাজ বাস্তবতার সম্পর্ক নির্ণয়। মার্কস-এঙ্গেলস এই সমস্যাটির যেভাবে সমাধান করেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে তাঁদের মৌলিক অবদান। মার্কস-এঙ্গেলস শিল্পের সামাজিক চরিত্র ও ইতিহাসের গতিধারায় এর ব্যাখ্যা করেছেন তাঁদের মতে, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শিল্প-সাহিত্য বিশেষ বিশেষ শ্রেণির রাজনীতি-আদর্শ ও শ্রেণি-দ্বন্দ্বের দ্বারা প্রভাবিত। তাঁরা দেখিয়েছেন, বাস্তব জগৎ ও মানবসমাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়। প্রত্যেক ঐতিহাসিক স্তরে নিজস্ব শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য থাকে। পরিবর্তিত সামাজিক স্তরে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে না। মার্কস-এঙ্গেলস উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন গ্রিসের পরিবেশে রচিত মহাকাব্য বা পুরনো কাহিনী ঊনবিংশ শতাব্দিতে রচিত হওয়া সম্ভব নয়। যে প্রাকৃতিক ধ্যানধারণা ও সামাজিক সম্পর্ক গ্রিক কল্পনার জগৎ সৃষ্টি করেছে, তা স্বয়ংক্রিয় তাঁতকল, রেল, বাষ্পচালিত গাড়ি ও বৈদ্যুতিক তারের যুগে সম্ভব নয়। কিন্তু ভাববাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা শিল্প-সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার গুরুত্ব দেন না। তাঁদের মতে, সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে শিল্পের কোনো সম্পর্ক আছে কি নেই, সেটা বড় কথা নয়। শিল্পী-সাহিত্যিকের আত্মগত ভাবনার পটে ফুটে ওঠা ছবিই আসল কথা। অন্যদিকে যান্ত্রিক বস্তুবাদীরা বলেন, শিল্পের সত্য হলো বস্তুর নিখুঁত ফটোগ্রাফি। ভাববাদী ও যান্ত্রিক বস্তুবাদী চিন্তার বিপরীতে মার্কস-এঙ্গেলস বাস্তবতার শৈল্পিক চিত্রায়নকেই শিল্পের মূলনীতি ও মর্মবস্তু হিসেবে তুলে ধরেন। মার্কস মনে করতেন, শিল্প হচ্ছে সামাজিক চেতনার একটা নির্দিষ্ট রূপ, বাস্তবতা যার মধ্যে প্রকাশ পায় শৈল্পিক শর্তে। শিল্প শুধু অতীত-বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের দিকেও তাকায়। বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতের ছবি আঁকে। মার্কসের মতে—বস্তুবাদী উপস্থাপনা মানে বাস্তবের হুবহু রূপায়ণ নয়, ঘটনাবলির অন্তর্নিহিত সত্যে প্রবেশ করে শৈল্পিকভাবে তাকে রূপায়িত করা। ‘সাহিত্য রাজনীতির ঊর্ধ্বে ও শিল্পের জন্য শিল্প’—এই বক্তব্যের চরম বিরোধী ছিলেন মার্কস-এঙ্গেলস। আবার স্থূল উদ্দেশ্যপ্রবণতারও তাঁরা প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। শিল্পসম্মত না হয়ে যদি সাহিত্য শুধুমাত্র আত্ম-দর্শন ও আত্ম-রাজনীতি প্রচার করে, তা হলে সে সাহিত্য পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে না এবং তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। লাসালকে তাঁর ঐতিহাসিক নাটক ‘ফ্রান্ৎস ফন সিকিনগেন’-এর জন্য দুটি কারণে মার্কস-এঙ্গেলস সমালোচনা করেছেন। প্রথমত, নাটকে জীবনের যান্ত্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। নাট্যকার শুষ্কভাবে তাঁর আত্মদর্শন প্রচার করেছেন। নাটকটি বাস্তবের শৈল্পিক চিত্র তুলে ধরে সহজেই মানুষের অভিজ্ঞতা ও আবেগকে নাড়া দিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, মার্কস-এঙ্গেলস নাটকটির সমালোচনা করেছেন তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রবণতার জন্য নয়, ইতিহাস বিচারের বিভ্রান্তির জন্য। কারণ ইতিহাসের ভুল বিচার সমাজের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অনুযায়ী সমাজ থেকে ‘সমাজের চেতনা বা জ্ঞান’ জন্ম নেয়। আর এই জ্ঞানকে প্রয়োগ করে সমাজকে পরিবর্তন করা যায়। শিল্প-সাহিত্য যেহেতু মানুষের চেতনারই বিশিষ্ট রূপ, এ জন্য সামাজিক ভূমিকার বাইরে শিল্প-সাহিত্য গড়ে উঠতে পারে না। মার্কস-এঙ্গেলসের মতে, শিল্প-সাহিত্যের একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। শিল্প-সাহিত্যের পক্ষপাত ও লক্ষ্য-অভিমুখীনতা আছে। শিল্প-সাহিত্যের এই সামাজিক দায়বদ্ধতা, পক্ষপাত ও লক্ষ্য-অভিমুখীনতার প্রশ্নে মার্কস-এঙ্গেলস মনে করতেন, পৃথিবীতে কোনো শিল্প-সাহিত্যই উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সৃষ্টি হয় না। এঙ্গেলসের তো স্পষ্টভাবেই বলেছেন—‘বাস্তব পরিস্থিতি ও চরিত্রগুলোর কর্মসক্রিয়তার মধ্য হতে শিল্পের এই পক্ষপাত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বেরিয়ে আসা উচিত। যে সামাজিক বিরোধের ছবিগুলো আঁকা হয়, তার ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিক সমাধান শুধুমাত্র পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেয়া লেখকের পক্ষে সংগত নয়।’ এঙ্গেলস ১৮৫১ সালে ‘নিউইয়র্ক ট্রিবিউন’ পত্রিকায় এবং ১৮৮৮ সালে মার্গারেট হার্ননেসকে লেখা পত্রে ব্যাখ্যা করে বলেছেন—অতীতে সব শিল্প উদ্দেশ্যমূলক ছিল। ভবিষ্যতে তা-ই থাকবে। মার্কস-এঙ্গেলসের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে লেনিন শিল্প-সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘পার্টিজান ও প্রতিফলন তত্ত্ব।’ বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা, কিছু সমাজতন্ত্রীও, অনেক সময় মর্মবস্তু না বুঝেই লেনিনের ‘পার্টিজান তত্ত্বের’ সমালোচনা করেন। লেনিন একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগে শিল্প-সাহিত্যে কোনো না কোনো শ্রেণির পক্ষে শৈল্পিকভাবে নির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য ভূমিকা রাখাকে পার্টিজান হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু লেনিন সতর্ক করেছেন, পার্টি রাজনীতির কমিটমেন্ট আর শিল্প-সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা এক জিনিস নয়। লেনিন বলেছিলেন, শিল্প-সাহিত্যের যদি শৈল্পিক গুণ না থাকে, তবে তা রাজনীতির উপাদানে যতই বৈপ্লবিক হোক না কেন, জনগণ তা গ্রহণ করেন না। শিল্প-সাহিত্যে লেনিনের ‘প্রতিফলন তত্ত্ব’ও বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া ও কিছু সমাজতন্ত্রীর সমালোচনার সম্মুখীন হয়। লেনিন ঐতিহাসিক ক্লাসিক সাহিত্য, বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ধারার মহান শিল্প-সাহিত্য এবং বাস্তবনির্ভর গণসাহিত্যের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন—‘শিল্প আরও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে, যদি তা জনগণের সৃজনশীল উদ্যোগের সঙ্গে একাত্ম থাকে, যদি তা বাস্তববাদী হয়ে ওঠে।’ লেনিন তাঁর ‘প্রতিফলন তত্ত্বে’ জনগণের বিপ্লবী ভূমিকাকে শিল্প-সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা দিয়ে সমাজতান্ত্রিক শিল্প সাহিত্য সৃষ্টির ওপরে জোর দেন। প্রকৃতপক্ষে লেনিন মানুষের সামগ্রিক জ্ঞান-কর্ম ও অনুভবের একসঙ্গে সমাগমকে পুনর্নির্মাণের প্রেরণা রূপে সমাজতান্ত্রিক শিল্প-সাহিত্যের তত্ত্ব হিসেবে ‘প্রতিফলনের তত্ত্ব’ প্রদান করেছিলেন। লেনিন মার্কসের দ্বান্দ্বিকতাকে সম্প্রসারিত করে তাঁর প্রতিফলন তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন—কেবল সরল ও তাৎক্ষণিক বাস্তবতা নয়, ঘটনার অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিকাশের বাস্তবতার সামগ্রিক রূপ সৃষ্টিশীল কল্পনায় শৈল্পিকভাবে মূর্ত করে তোলার নামই বাস্তব সত্য। শিল্প-সাহিত্যের সত্যে সেই রকম স্বপ্ন ও কল্পনা থাকবে, যা সামগ্রিক বাস্তবতাকে উপযোগী ইমেজের দ্বারা প্রতিফলিত করবে। লেনিন শিল্প-সাহিত্যের কাছ থেকে, একইসঙ্গে জীবনের মানবিক ডকুমেন্ট ও তার ওপর ঐতিহাসিক বিকাশ-প্রক্রিয়ার শৈল্পিক প্রতিফলন পেতে চেয়েছেন। লেনিন সবসময়ই বাস্তব সত্য ও শিল্প সত্যের সমন্বয়ের কথা বলেছেন। প্রথমত লেনিনের মতে, শিল্পে বস্তুজগতের এক ধরনের ‘প্রতিফলন’ (রিফ্লেকশন)’ থাকতে হবে। এটা কোনো যান্ত্রিক প্রতিফলন নয়, এতে থাকবে বাস্তবের বিচার-বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। জ্ঞানতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেনিন দেখিয়েছেন, একজন শিল্পী যদি তাঁর শিল্প বিষয়ের পরিবেশ ও উদ্দেশ্যের সত্য রূপ রচনা করতে চান, তা হলে তাঁকে নির্দিষ্ট চরিত্র, বাস্তব কার্যাবলি ও নির্দিষ্ট পরিবেশ নির্বাচন করতে হয়। অর্থাৎ একমাত্র নির্দিষ্ট পরিবেশেই নির্দিষ্ট মানব চরিত্রকে উপস্থাপন করা যায়। সত্যিকারের স্বার্থক শিল্পী নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কাল, জীবনধারা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে জীবন্ত মানুষের চরিত্র অঙ্কন করেন। আর সেই চরিত্র ও জীবন প্রতিফলিত করে সেই ঐতিহাসিক কাল, জীবনধারা ও বাস্তব পরিস্থিতিকে। দ্বিতীয়ত, শিল্প হবে শিল্পীর ভাবনা-চিন্তা, আবেগ-কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতার অভিব্যক্তি (এক্স্প্রেশন)। তত্ত্ব ও প্রয়োগ, ইতিহাস ও পরিকল্পনা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চেতনা, যুক্তি ও সহজাত জ্ঞান, বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণ ও প্রতিফলন ঘটে শিল্পের জগতে। কিছু তত্ত্বজ্ঞান ও অনুশীলনের অভ্যাস ছাড়া শিল্প সৃষ্টি হয় না। শিল্পী রং-তুলি-কলম ও সুরের অভিনবত্বে তাঁর আহরিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুণগত ও রূপগতভাবে পরিবর্তন সাধন করেই নতুন শিল্প সৃষ্টি করেন। শিল্প একদিকে যেমন নির্দিষ্ট সমাজ বাস্তবতার যান্ত্রিক প্রতিফলন নয়, তেমনি তা শুধুমাত্র একটা স্বায়ত্তশাসিত পরিসরের সৃষ্টিও নয়। যেহেতু বাস্তবতার সঙ্গে শিল্প অবিচ্ছিন্ন, এ জন্য সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো শিল্পে মূর্ত থাকে। কিন্তু শিল্পের জগৎ বাস্তব জগৎকে খানিকটা অতিক্রম করে যায়। শিল্প সব সময় সময়ের শাসন মানে না। কিন্তু সামাজিক চেতনা থেকেই মানুষ তার সৃষ্টিকে মানবিক করে তোলে। শিল্প সৃষ্টির প্রকৃত তাৎপর্য শুধুমাত্র বস্তুর প্রতিফলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বস্তু বিশ্বের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তা শিল্পীর মনের গভীরে গড়ে ওঠা এক প্রক্রিয়া। শিল্পের ক্ষেত্রে বিষয়গত বাস্তবতা ও উদ্দেশ্যমূলকতা হলো প্রাথমিক ভিত্তি। মানুষ সচেতন সামাজিক জীব হিসেবে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করে। আপাতদৃষ্টিতে এই লক্ষ্যকে কখনও কখনও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তব প্রয়োজন ও বস্তুর প্রাকৃতিক নিয়মের দ্বারা অনিবার্যভাবে নিয়ন্ত্রিত। কোনো স্রষ্টা যখন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হন, তখন তার মনে হয় ইতিপূর্বে এ বিষয়ে কেউ কাজ করেননি। সৃষ্টির পরে দেখা যায়, এ ধরনের কাজের অস্তিত্ব আগে থেকেই আছে। যিনি সত্যিকারের শিল্পী তিনি সর্বদাই মনে রাখেন তাঁর সৃষ্টি কোনো স্বয়ম্ভু বস্তু নয়, বরং তা হলো স্রষ্টার মানসভূমিতে বিশ্লেষিত মানব জীবনধারার প্রতিফলন ও প্রকাশমাত্র। অভিজ্ঞতার আলোকে শিল্পীর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁর পক্ষে প্রয়োজন দৃঢ়তা, পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতা। এই উদ্দেশ্যমূলক শিল্প রচনার জন্য তাঁকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়। লেনিনের মতে, সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় শিল্পীর প্রকৃত স্বাধীনতা হলো ঐতিহাসিক প্রয়োজনীতার দিকে লক্ষ্য রেখে শিল্প সাধনা করা। তৃতীয়ত, শিল্প হচ্ছে এক ধরনের উদ্দীপক (‘স্টিমুলাস’), যার দ্বারা দর্শক-শ্রোতা-পাঠক-উপভোগকারীর মনে কিছু অনুভূতি, আবেগ, ভাবনা, কল্পনা বা চিন্তা উদ্দীপিত হয়। চতুর্থত, শিল্প তার দর্শক-শ্রোতা-পাঠক-উপভোগকারীর সঙ্গে এক ধরনের ‘কমিউনিকেশন’ তৈরি করে এবং এই প্রক্রিয়ায় শিল্প কিছু বার্তা পৌঁছে দেয়। পঞ্চমত, শিল্প একটি বিশিষ্ট ‘রূপ’ (ফর্ম)-এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। শৈল্পিক প্রকাশের নির্দিষ্ট ধরন হলো ফর্ম বা আধার। শৈল্পিক রূপকল্পের মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যে প্রতিফলিত জীবন হচ্ছে কনটেনট বা আধেয়। শুধুমাত্র বিষয়বস্তুর মাধ্যমে নয়, ফর্মের মধ্য দিয়েও সামাজিক সমালোচনা উৎসারিত হতে পারে। শিল্প মানুষের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে তার নিজস্ব ফর্মের মাধ্যমে, বাইরের কোনো নির্দেশের মাধ্যমে নয়। গোর্কির লেখায় লেনিন এসবের সার্থক প্রতিফলন দেখেছিলেন। যে শিল্পের কাল্পনিকতা ছিল পরাবাস্তবতার অলীক ও অন্তঃসারশূন্য বিষয়, লেনিনের প্রতিফলন তত্ত্বের সাহায্যে সোভিয়েত সাহিত্য সেখানে সমাজ ও মানুষের বাস্তব জীবনের সাহিত্যরীতিতে বাস্তবতার শৈল্পিক প্রতিফলন ঘটিয়েছে। শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষ ও তার স্বপ্ন রচনাতেই প্রকৃত শিল্প সৃষ্টিই ছিল তার লক্ষ্য। লেনিন পার্টি-মতাদর্শ ও শ্রেণির মতাদর্শকে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু হিসেবে দেখেননি। লেনিনের কাছে বিপ্লবী পার্টি ও জনগণ অবিচ্ছেদ্য, আলাদা কিছু নয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শিল্পীর শ্রেণি-অবস্থানের জন্য অথবা শিল্পীর ওপর বিভিন্ন শ্রেণির প্রভাব পড়ার কারণে সাধারণভাবে শিল্প-সাহিত্যে শ্রেণি-মানসের প্রতিফলন ঘটে। শিল্পীর শ্রেণি-অবস্থান, শ্রেণি-মানসিকতা থেকে শিল্প-সাহিত্যে সেই শ্রেণিগত মূল্যবোধ ও মতাদর্শের প্রশ্ন যখন এসে পড়ে, তখন সংগত কারণেই শ্রেণির রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্ন এসে পরে। কিন্তু শিল্পী-সাহিত্যিকের মধ্যে অনুভূতির গভীরতা, দৃষ্টির ব্যাপকতা, সহানুভূতিশীল মনোভাব, ব্যক্তিত্ববোধ ইত্যাদি কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রেণি-সংকীর্ণতার গণ্ডি অতিক্রম করতে দেখা যায়। লেনিন মনে করতেন—‘কোনো শিল্পী যদি প্রকৃতই মহৎ হন, তা হলে তাঁর রচনায় বিপ্লবের কোনো না কোনো মর্মগত অংশ প্রতিফলিত না হয়ে পারে না।’ কারণ, ‘যতদিন পর্যন্ত মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণ করার ব্যবস্থাবলির উচ্ছেদ না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সাধারণভাবে মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতাকে সর্বজনীনতার ওপরে দাঁড় করানো যাবে না।’ লেনিনের শিক্ষা হচ্ছে, অতীতের শিল্প-সাহিত্যের মধ্যে পরস্পর জড়িত থাকা বিপ্লবী উপাদান ও স্থিতাবস্থার অনুকূল উপাদানকে আলাদা করতে শিখতে হবে। জীর্ণ জরাগ্রস্ত উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করে জীবন্ত ও গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোর গতিমুখ আগামী দিনের ঐতিহাসিক বিকাশের পক্ষে সঞ্চালিত করতে হবে। লেনিনের মতে, শুধুমাত্র এভাবেই ইতিহাসের দ্বন্দ্বমূলক বিবর্তনে শিল্প-সাহিত্য মহৎ ও বিপ্লবী ভূমিকা রাখতে পারে। লেনিন শিক্ষা দিয়েছেন—কেমন করে শিল্প সৃষ্টিতে তার ঐতিহাসিক মর্ম খুঁজে বের করতে হয়, কেমন করে পৃথক করতে হয় তার মধ্যে মৃত থেকে জীবন্তকে, কেমন করে স্থির করতে হয় কোন অংশ ভবিষ্যতের অভিমুখী এবং কোন অংশ অতীতের দাসত্বে চিহ্নিত। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে যেমন নির্বিচারে গ্রহণ করা যায় না, আবার নির্বিচারে বর্জন করাও যায় না। মহান শিল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্য থেকে বা মহৎ শিল্পী-সাহিত্যিকদের সৃষ্টির মর্মবস্তুকে বিচার সাপেক্ষে গ্রহণ করতে না পারার মনোভাবকে ‘সাংস্কৃতিক নেতিবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন লেনিন। লেনিন পুঁজিবাদ সৃষ্ট লক্ষ্যহীন শৈল্পিক স্বাধীনতার গোলকধাঁধা থেকে শিল্পীদের বের হয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। অযৌক্তিক ‘আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা’, রাজনৈতিক অভিমুখীনতার অভাব, লাগামহীন স্বতঃস্ফূর্ততাকে লেনিন পুঁজিবাদী সমাজের শৈল্পিক স্বাধীনতা হিসেবে দেখেছেন। লেনিন আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দেখতে চেয়েছেন ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থের সমন্বয়। রাজনৈতিক লক্ষ্যহীনতা ও লাগামহীন স্বতঃস্ফূর্ততার পরিবর্তে তিনি চেয়েছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা, সচেতন ও শৈল্পিক রাজনৈতিক প্রয়াস। লেনিন শিল্প-সাহিত্য তথা সংস্কৃতির বিকাশে কর্তৃত্ববাদ, প্রশাসনিক খবরদারির বিরোধিতা করেছেন। শিল্পীর সৃষ্টিশীল যৌক্তিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি। আবার তিনি ভোগবাদ, স্বেচ্ছাচার, স্বতঃস্ফূর্ততা ও লাগামহীন সহনশীলতার পক্ষেও ছিলেন না। লেনিন মানুষের সহজাত গুণাবলি, সৃজনশীল উদ্যোগ ও সম্ভাবনাসমূহের বিকাশের জন্য সব প্রতিবন্ধকতার অবসান করতে চেয়েছেন। শিল্প-সাহিত্যকে সত্যিকার অর্থেই মানুষের জীবনধারার অংশ করে তুলতে চেয়েছেন লেনিন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..