বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শন : ঔপনিবেশিক অতীত, সাম্প্রদায়িক বাণিজ্যিক বর্তমান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

কাবেরী গায়েন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত ১ জুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এ বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জিডিপি’র ১.৭৬ শতাংশ। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে আশা করেছিলেন এবার হয়তো শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। আশাবাদের কারণ, গত বছর শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন শিক্ষা নিয়ে ‘মেগা প্রজেক্ট‘ করার চিন্তা রয়েছে সরকারের। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রস্তাবিত বাজেটে চলতি বছরের চেয়েও কমেছে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ। সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছিলো জিডিপি’র ১.৮৩ শতাংশ। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিলো ২.০৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ক্রমাগতভাবে কমছে শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বরাদ্দ, যা বহু বছর ধরেই এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের প্রগতিশীল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আন্দোলন সেই দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই ইউনেস্কো প্রস্তাবিত জিডিপি’র ৬ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছে। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনেও জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছিলো। শিক্ষাক্ষেত্রে এই ক্রমহ্রাসমান বরাদ্দ এখনো যদি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত না হয়, তবে আর কবে? এই পরিস্থিতিতে দাবি-দাওয়া আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষানীতিতে প্রতিফলিত রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শন নিয়েও গভীর চিন্তাভাবনা প্রয়োজন, করণীয় নির্ধারণের জন্য। বিশেষ করে একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল কীভাবে তার শিক্ষাদর্শন নির্ধারণ করবে, সেজন্য গত ৫০ বছরের শিক্ষানীতি এবং এই উপমহাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শনের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা কওে এই প্রবন্ধটি উত্থাপন করা হয়েছিলো গত ১৯ মে, সিপিবি’র শিক্ষা শাখার সারাদেশ থেকে আসা শিক্ষকদের দিনব্যাপী কর্মশালায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থার রেটোরিকের মধ্যেই কি আমরা আমাদের শিক্ষাদর্শনের মুক্তি খুঁজবো, যা তাৎক্ষণিক দাবিদাওয়াভিত্তিক নাকি আমাদের আলোচনায় একটি অপুঁজিবাদী শিক্ষাদর্শনের প্রশ্নও আবর্তিত হবে? সেই আলোচনাটি শুরু করার উদ্দেশ্য থেকেই এই প্রবন্ধটি খসড়া হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিলো। এবছরে ঘোষিত প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দের আরো একধাপ ক্রমাবনমনের ভেতর দিয়ে পুঁজিবাদী শিক্ষাদর্শনের দেউলিয়াত্ব আরো একবার প্রমাণিত হলে, শিক্ষাদর্শন নিয়ে আমাদের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। এই প্রবন্ধটি তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রথমত, শিক্ষাদর্শন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের শিক্ষানীতিসমূহে প্রস্তাবিত শিক্ষাদর্শন। তৃতীয়ত, সম্ভাব্য বিকল্প প্রস্তাব। শিক্ষাদর্শন আদিম সাম্যবাদী সমাজে শিক্ষানীতি বলে কিছু ছিলো কি না, তার প্রত্যক্ষ দলিল না থাকলেও অনুমান করা যায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এই সম্পত্তির কারণে শোষণের বাস্তবতার অনুপস্থিতির কারণেও যেমন, তেমনি অজানা প্রকৃতির কোলে অস্তিত্বের স্বার্থেই সামাজিক সহযোগিতার শর্ত পূরণের জন্য এই সমাজের শিক্ষাদর্শন ছিলো সামাজিক বৃদ্ধি এবং সামাজিক সংহতিমূলক। অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা প্রজন্মান্তরে প্রবহমান রাখাই ছিলো মূল দর্শন। কিন্তু দাস সমাজে এসে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হয়ে গেছে। দাসরা খাটছে মালিকদের জন্য। অতএব, মালিকের স্বার্থে দাসদের নিরস্কুশ আনুগত্য নিশ্চিত করাই হয়ে উঠলো সমাজের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শন। এই শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শনের বিস্তৃত রুপরেখা পাওয়া যায় পাশ্চাত্যে গ্রীক দার্শনিক, মধ্যপ্রাচ্যে হিব্রু ধর্মযাজক, ভারতে বেদ-উপনিষদ প্রণেতা এবং দূরপ্রাচ্যে লাওৎসে, কনফুসিয়াস প্রমুখ ভাববাদী দার্শনিকদের চিন্তাচেতনায়। দেশ এবং সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও এসব শিক্ষাদর্শনের মূল সাদৃশ্যের জায়গাটি ছিলো শ্রেণিবিভক্ত সমাজ এবং সেই সমাজে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার জন্য শ্রমজীবী মানুষকে পরলোকের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি-লোভ-মোহ-নির্বাণ-স্বর্গরাজ্য-বেহেস্তের স্তোক দিয়ে ইহকালের শোষণকে ভুলিয়ে রাখা, এবং সম্পদসহ শিক্ষা-সংস্কৃতি-আইন-ক্ষমতা জাতীয় সকল ইহজাগতিক প্রাপ্তি মালিকদের জন্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। এবং এই ব্যবস্থা এমনভাবে নিরঙ্কুশ করা যেনো যারা অত্যাচারিত, তারা বিদ্রোহী হয়ে না ওঠে। চ্যারিটি, দান, দক্ষিণা, সদকা-খয়রাত ইত্যাদির সাথে কঠোর সামরিক শাসনের বিধান রচনা করাই ছিলো তখনকার শিক্ষাদর্শন। ভাববাদী এসব বিধির বাইরে কেউ গেলেই তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থার বিধান দিয়েছেন এসব যাজক, দার্শনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। অন্যদিকে অধিপতি শ্রেণির মধ্যে যারা শিক্ষা গ্রহণের অধিকারী, তাদের জন্য রচিত হয়েছে শিক্ষার মহানুভব আদর্শ, সমরবিদ্যার কৌশল, সংগীত-নৃত্যকলা-রেটোরিক-ক্রিড়াবিদ্যাসহ যাবতীয উচ্চভাব। সেইসব উচ্চচিন্তা, উচ্চভাবকেই আমরা ক্ল্যাসিক্যাল শিক্ষা হিসেবে জেনে এসেছি। দাসসমাজের এই শিক্ষাদর্শন আরো জোরদার হয়ে সামন্ত ও পূঁজিবাদী সমাজে অব্যাহত থেকেছে। শিক্ষা কুক্ষিগত থেকেছে অধিপতিশ্রেণির হাতেই। ইউরোপে সামন্ত সমাজে শিক্ষার অধিকার ছিলো যাজকশ্রেণি এবং অধিপতিশীল শ্রেণির মধ্যে। ভারতে বর্ণপ্রথা প্রচলনের মধ্য দিয়ে বেদ ও দর্শন শিক্ষা কেবল বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের মধ্যে এবং অন্যান্য বিদ্যা উচ্চবর্ণের জন্য নির্ধারণ করা হয়। শূদ্র তথা বিপুল শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিদ্যায়তনিক শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিলো। পৃথিবীর দেশে দেশে গণশিক্ষা প্রচলনের ইতিহাস বলতে গেলে সাম্প্রতিক। একদিকে পুঁজিবাদের বিকাশের স্বার্থে গণশিক্ষার প্রচলন ঘটেছে, অন্যদিকে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার দ্বার আজও পৃথিবীব্যাপী ধনিক শ্রেণির হাতেই কুক্ষিগত। এই পরিসরের মধ্যেই শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এ পর্যন্ত হয়েছে এবং শিক্ষার লক্ষ্য, তার আধেয় এবং প্রয়োগের প্রকৃতিকে শিক্ষার দর্শন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কারা শিক্ষা গ্রহণ করবেন, কোন পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করবেন, শিক্ষা প্রদানের পথ-পদ্ধতি কেমন হবে, এসব নিয়েই গড়ে উঠেছে শিক্ষাদর্শন। কেবল বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠানে নয়, আইনি, সরকারি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যারা অর্থ বরাদ্দ করে, চাহিদা তৈরি করে এবং সেবা প্রদান করে- এসব প্রতিষ্ঠানও শিক্ষাদর্শন নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার। বলে নেয়া দরকার, এই শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাদর্শন বিপুলভাবে পাশ্চাত্য দর্শনের প্রভাবাধীন- সক্রেটিস, অ্যারিস্টোটল, প্লেটোসহ গ্রিসের অন্যান্য দার্শনিক এবং ইউরোপীয় আলোকায়নপর্বের যৌক্তিক বুদ্ধিবৃত্তির পথ অতিক্রমন করে বর্তমান দিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষার রুপ পরিগ্রহ করেছে। আর শিক্ষার দর্শন হিসেবে ৭টি ধারা মান্যতা পেয়েছে। সেগুলো হলো: ১। অপরিহার্যতাবাদ (Essentialism)- এই ধারায় জ্ঞান অর্জনের জন্য শেখানো হয় দক্ষতা এবং মূল্যবোধ। একেবারে মৌলিক দক্ষতা যেমন সাক্ষরতা, সংখ্যা জ্ঞান এবং যথাযথ ব্যবহার ও মূল্যবোধ সম্পর্কে শেখানোর ওপর জোর দেয়া হয়। ২। প্রগতিবাদ (Progressivism)- এই ধারায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, আলোকিত হওয়া, বুদ্ধিমান হওয়া এবং সমাজের সাথে সংগতিপূর্ণ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। ৩। স্থায়ীত্ববাদ (Perennialism)- শিক্ষার্থীদের ভেতর যুক্তিবাদী এবং নৈতিক শিক্ষার বিকাশ গঠনের ওপর জোর দেয়া হয় যা কালোত্তীর্ণ হবে। ৪। অস্তিত্ববাদ (Existentialism)- চিন্তা ও সক্রিয়তার জন্য শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কাজের মূল্যায়ণ ও দায়িত্ব গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। ৫। আচরণবাদ (Behaviourism)- শিক্ষার্থীদের আচরণ পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়া হয়। ৬। ভাষাগত দর্শন (Linguistic Philosophy)- যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ মুখ্য। ৭। গঠনবাদ (Constructivism)- শিক্ষার্থীদের স্বপ্রণোদিত এবং স্বাধীন করে গড়ে তোলাই মুখ্য এই ধারায়। (Curran et al ২০০৩) ইউটোপিয়ানরা মনে করেন এবং প্রচার করেন, এইসব দর্শন ধারণ করলে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী এবং ঊর্ধ্বমুখী জ্ঞানসমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ দর্শনের এই তালিকা থেকে যে উদ্বেগটি উঠে আসে, তা হলো, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কি সাদৃশ্যকরণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সকলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এক অনুগত শ্রেণি তৈরি করা? প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষা কি তবে, জর্জ অরওয়েলের বক্তব্য অনুযায়ী, শাসক অভিজাতের জন্য প্রয়োজনীয় খড়বিচালি তৈরি করা? সমস্যা তৈরি হয় ফের এসব দর্শন কীভাবে প্রয়োগ হয়, তার উপর। চারটি বিষয়কে মূলত দেখা হয় শিক্ষাদর্শন বোঝার জন্য: শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা এবং ন্যায্যতা, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন এবং অর্থায়ন। এই চারের আলোকেই আমাদের শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাদর্শন প্রসঙ্গটি বোঝার চেষ্টা করা হবে। বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষানীতিসমূহ উপমহাদেশের আবহমান ধারা থেকে ভিন্ন নয়। ভারতবর্ষে লোকায়তিক ও চার্বাকপন্থিদের মতবাদ নিশ্চিহ্ন করার পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখল পর্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে ভাববাদী শিক্ষার প্রাবল্য বহাল ছিলো। ভাববাদী দর্শনের প্রাধান্যের কারণে ভারতে বস্তুবাদী ও ইহ-জীবনবাদী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার পরিবর্তে ইতিহাসের দীর্ঘ কালপর্ব জুড়ে ভারতে টোল চতুষ্পাঠী, মুসলিম যুগে এসে মক্তব-মাদ্রাসা ও পাঠশালার পাঠদান ছিলো মূলত পৌরানিক কাহিনী ও বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা যা জন্ম দিয়েছে ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গীর। ফলে উপমহাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা একাডেমি জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েই ওঠেনি। ইংরেজ দখল নেবার পরে, মূলত তাদেরই প্রয়োজনে, এদেশে পাশ্চাত্য ধারায় আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার প্রচলন শুরু হয়। পাশ্চাত্য মিশনারি, বণিকশ্রেণি এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতেই এই শিক্ষার সূচনা। এ শিক্ষাদানের পেছনে ঔপনিবেশিক বৃটিশ সরকারের মূল অভিপ্রায় ছিলো এদেশ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারের কাজটি নির্বিঘ্ন করার জন্য এদেশে একদল সমর্থক এবং লাঠিয়াল বাহিনী তৈরি করা, যাদের ত্বক ভারতীয় কিস্তু এই শিক্ষার ভেতর দিয়ে তাদের মন হয়ে উঠবে ব্রিটিশ। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত শিক্ষানীতিতে কখনো জোর দেয়া হয়েছে প্রাচ্যবিদ্যা বা ধর্মীয় শিক্ষাদানের প্রতি (কলিকাতা মাদ্রাসা এবং বেনারস হিন্দু কলেজ দিয়ে যার শুরু), কখনো বা জোর দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্য শিক্ষাদানের দিকে (ইংরেজি স্কুল, কলেজ স্থাপন ও কলিকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে)। প্রতিষ্ঠান যাই হোক, তাদের প্রণীত শিক্ষানীতির লক্ষ্য একটাই ছিলো, এদেশের মানুষের প্রতি শোষণ নিরঙ্কুশ করার জন্য দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যে ১৭৯২ সালের চার্লস গ্র্যান্টের শিক্ষা বিষয়ক সুপারিশমালা, ১৮৩৫ সালের মেকলের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদন, ১৮৩৮ সালের উইলিয়াম অ্যাডামসের শিক্ষা বিষয়ক জরিপ, ১৮৫৭ সালের চার্লস উডের শিক্ষা বিষয়ক ডেসপ্যাচ, ১৮৮২ সালে উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে প্রথম ভারতীয় শিক্ষা কমিশন নিয়োগ এবং শেষে ১৯০৪ সালে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বর্তমান রূপটি প্রদান করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে, চার্লস উডের শিক্ষাবিষয়ক ডেসপ্যাচে কলিকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজে ডাইরেক্টরেট অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনস বা ডিপিআই স্থাপন ও এই তিন শহরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও কেবল সরকারি বিদ্যালয়ের স্থলে গ্র্যান্টস ইন এইড দিয়ে বেসরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে উৎসাহিত করার সুপারিশ করা হয়। আর হান্টারের নেতৃত্বে গঠিত ভারতীয় শিক্ষা কমিশন উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিবর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করেছিলো। নীতি হিসেবে সার্বজনীন শিক্ষাদান বৃটিশ সরকার কখনো গ্রহণ করেনি, তবে উচ্চ শিক্ষার প্রসারে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ সম্ভানার কথা চিন্তা করে উচ্চশিক্ষা সংকোচন ও প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের কথা বলা হয়েছিলো, যদিও ভারতীয় এলিটরা এ কথায় গুরুত্ব দেয়নি। শিক্ষা ভারতবর্ষে আবহমান কালের মতো, ইংরেজ আমলেও মুষ্টিমেয়র উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার উপলক্ষ্যই থেকে যায়। শিক্ষার দর্শন হয়ে ওঠে: ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’ দেশ বিভাগের পরে, নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রেও শিক্ষা ইংরেজ আমলের মতোই সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রায় একচেটিয়া দখলে থাকে যা আপামর জনগণকে শোষণের কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান হয়ে পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ। পশ্চিম পাকিস্তানে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা সংকোচন নীতি অনুসরণ করা হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমতে থাকে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সেই সংখ্যা দ্রুত বড়তে থাকে। গুণগত দিক থেকেও পশ্চিম পাকিস্তানে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার উপর জোর দেয়া হচ্ছে, তখন পূর্ব পাকিস্তানের উপর দায়িত্ব দেয়া হয় পাকিস্তানের ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার। উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করা, আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রচলন চেষ্টা, আরবি-উর্দূ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা ভাষার ইসলামিকরণ করা- এসব কাজেই বাঙালিদের ব্যস্ত রেখে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ সাধনে ব্রতী হয়। শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের পাশাপাশি শ্রেণিবিভক্তির কাজটিও অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক করা হয়। পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা সম্মেলনে (১৯৪৭) সিদ্ধান্ত নেয়া হয় দ্রুত একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করতে হবে। ১৯৪৬ সালে, ভারত বিভক্তি নিয়ে যখন দরকষাকষি চলছিলো, তখনই মার্কিন সামাজ্যবাদ পাকিস্তানী নেতাদের সাথে সখ্য গড়ে তোলার প্রয়াস নেয় এবং পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে একদম চেপে বসে। পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি নয়া-উপনিবেশে পরিণত হয়। বৃটিশ সামাজ্যবাদের পরিবর্তে মার্কিন নয়া সামাজ্যবাদের অন্তর্ভুক্তি পাকিস্তানী নেতাদের ইচ্ছায় হয়েছিলো। স্বাক্ষরিত হয়েছিলো সিয়েটো ও সেন্টোর মত সামরিক চুক্তি। ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য প্রয়োজন একটি অনুগত ও দক্ষ প্রশাসন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলে এই শক্তির যোগান পাওয়া যেতো ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস বা আইসিএস নামের আমলাতন্ত্রে। এই আইসিএস ক্যাডার ছিলো ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিভূ। আইসিএস ক্যাডারদের কাছে বৃটিশ সবকিছুই ছিলো শ্রেষ্ঠ। একইভাবে, পাকিস্তানে গড়ে তোলা হলো সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান বা সিএসপি, যারা মার্কিনীদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে শিখলো। ইংরেজদের বদলে মার্কিনীদের শ্রেষ্ঠত্বে, মার্কিন স্বার্থরক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে শিখলো। তাই ব্রিটিশ আমলের মতো পাকিস্তান আমলেও শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হয়ে উঠলো দেশের মেধাকে বিদেশি সেবায় নিয়োজিত রাখা এবং দেশের মধ্যেই নয়া উপনিবেশ গড়ে তোলা। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় শিক্ষা সম্মেলনেও পূর্বেকার শিক্ষনীতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হয়। উচ্চাকাক্সক্ষী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের উদ্দেশ্য হয়ে উঠলো সিএসপি হওয়া যদিও পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের প্রবেশগম্যতা ছিলো খুবই সীমিত। ১৯৫২ সালে মওলানা আকরাম খাঁর নেতৃত্বে যে শিক্ষা পুনর্গঠন কমিটি গঠিত হয়, সেখানে বেশ কিছু ভালো সুপারিশ থাকলেও পাকিস্তানের ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার তাগিদ থেকে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের উপর জোরারোপ করা হয়। পাকিস্তান আমলে আরো তিনটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিলো- ১৯৫৯ সালের শরীফ কমিশন, ১৯৬৬ সালের হামদুর রহমান কমিশন এবং ১৯৬৯ সালের অন্তর্বর্তীকালীন নূর খাঁ কমিশন। প্রত্যেকটি শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য একই - মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে শিক্ষার সকল সুযোগ নানা কৌশলে সীমাবদ্ধ রাখা। পূর্বপাকিস্তানের লড়াকু ছাত্রসমাজের প্রতিরোধে এসব নীতির প্রকাশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও অনেক সুপারিশই কার্যকর করা হয় নীরবে। স্কুলে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় ধর্মশিক্ষা, প্রথম শ্রেণি থেকে আরবি ভাষা শিক্ষা এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ইংরেজি সাহিত্যের পরিবর্তে ফাংশনাল ইংলিশ নামে কাজ চালাবার মত ইংরেজি শিক্ষা কোর্স চালু করে। কিন্তু পাশাপাশি চালু করে ব্যয়বহুল মডেল স্কুল, ক্যাডেট কলেজ এবং মাদ্রাসা । এসব প্রতিষ্ঠানে মূল ধারার স্কুলের তুলনায় ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে চারশো গুণ বেশি ব্যয় করা হতে থাকে। সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি ও জীইয়ে রাখার প্রকল্প হিসেবেই এসব শিক্ষা সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়। একই উদ্দেশ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেতন বাড়ানো হয়, বেসরকারি কলেজগুলোতে শুধু পাসকোর্স রাখার অনুমতি দেয়া হয় এবং শিক্ষাকে শিল্পে মূলধন বিনিয়োগ করার দৃষ্টিতে দেখার পরামর্শ দেয়া হয়। ফলে গোটা পাকিস্তান আমল জুড়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং শিক্ষাসংকোচন নীতির বীজ বপণ করে চারাগাছ তৈরির কাজ সম্পন্ন হতে দেখি, যার লিগেসি বাংলাদেশ এড়াতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান হয় বাংলাদেশে প্রণীত শিক্ষানীতিগুলোর সমূহ পাঠ থেকে। শিক্ষানীতিসমূহ (১৯৭৭-২০০৩) সামরিক সরকার প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে তখনকার শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি নামের শিক্ষা কমিশনের নিয়োগ দেন। মূলত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ রিভিউ করার জন্যই এই কমিশন গঠিত হয়েছিলো। এই কমিশন একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করেছিলো। কিন্তু এই শিক্ষানীতির সুপারিশ সম্পর্কে কেউই ঠিক অবগত নন, কারণ এই নীতি প্রনয়ণের কিছু দিনের মধ্যেই তিনি বরখাস্ত হন। এরপরে সামরিক শাসক হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে, ১৯৮৩ সালে, ড. আবদুল মজিদ খান ‘শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। তিনি ভূমিকায় ‘বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে উৎপাদন পদ্ধতি ও বাস্তব পেশাসমূহের সাথে বিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে’ বলে দাবি করলেও আসলে এই রিপোর্টে প্রাথমিক স্তরে আরবি ও ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক করা, মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায় আরো দু’বছর বাড়ানো, স্নাতক ক্লাসের পূর্বে প্রাক-স্নাতক পর্ব যুক্ত করা, উচ্চ শিক্ষার জন্য মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থী বাছাই করা, মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো ইত্যাদি সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানোর সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার্থী সমাজ এই শিক্ষানীতির বিপরীতে আন্দোলন গড়ে তুললে সরকারি বাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষাথীকে। এই রিপোর্ট বাস্তবায়ন থেকে তখনকার মত সরকার পিছু হটলেও এই রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় পরে। ১৯৮৭ সালে মফিজ উদ্দিন খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। কমিশন জনমত যাচাই করে এবং ব্যাপক পাঠ, প্রতিক্রিয়া সবকিছু বিবেচনা করে যে সুপারিশ করেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে, রাজনীতিবিদদের একটি সম্মিলিত আচরণবিধি প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাঙ্গনে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলসমূহকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ন্যূনতম কর্মসূচি গ্রহণ। কমিশন বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়ানোর জন্য ল্যাবরেটরি নির্মাণ, উন্নতমানের বিজ্ঞান বইয়ের যোগান বিষয়ে ভালো ভালো কথা বলে মাদ্রাসা শিক্ষার এমন বিস্তার চেয়েছেন যে এসব পদক্ষেপ মাদ্রাসাকে স্কুলে নয়, স্কুলকে মাদ্রাসায় পরিণত করতে সক্ষম। এই নীতিও বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ১৯৯৭ সালে গঠন করে শামসুল হক শিক্ষা কমিটি। স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সক্রিয়তাবৃদ্ধি, ২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা, প্রাথমিক শিক্ষায় এক ধারার সিলেবাস প্রণয়ন, শিক্ষক- শিক্ষার্থী অনুপাত ১ঃ৩৫ করা, বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়ানো এসব বিষয়ে সুপারিশ থাকলেও এই নীতিও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৩ সালে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠিত হয়, সেই কমিশন মানসম্মত শিক্ষার জন্য নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সুপারিশ করেছিলো। এই কমিশনও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১০সালে কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ছিলো প্রথম শিক্ষানীতি, যেটি বাস্তবায়িত হয়েছে। তাই এই নীতির ঘোষিত দর্শন বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি। শিক্ষানীতি ২০১০ কবির চৌধুরী শিক্ষানীতি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং শামসুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত যেখানে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার উপর জোরারোপ করা, কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিক ও যুগোপযোগী করণ যা মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূল ধারার চাকরির জগতে প্রবেশগম্যতা দিয়েছে, ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় স্থানীয় মসজিদের আওতাধীন করা, এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে জোরারোপ করা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক নিয়োগের মত সুপারিশ থাকায় এই নীতিকে ‘না গণতান্ত্রিক না অসাম্প্রদায়িক’ মর্মে সমালোচনা উঠেছে খসড়া নীতি প্রণয়নের পর। তবুও অতীতের সকল শিক্ষানীতি থেকেই এই শিক্ষানীতিকে অধিকতর বাস্তবসম্মত বলেও মতামত দিয়েছেন অনেকে। বাস্তবতা হলো, অনেক সম্ভাবনা সত্ত্বেও ২০১০ সালের শিক্ষানীতি সাথে নিয়েই বাংলাদেশে গত ১২ বছরে শিক্ষাখাতের সমস্যা প্রকটতর হয়েছে। এই নীতি প্রণয়নের সাথে সংশ্লিষ্টরা অবশ্য ঘোষিত নীতির অনেক সুপারিশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়াকেই দায়ি করেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করার কথা ছিলো, তা এখনো চালু করা হয়নি বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে চালানো হয়, যা হয় খুব ব্যয়বহুল নয়তো নিচুমানের সেবা প্রদানকারী। শিশুদের মানসিক-শারীরিক বিকাশের জন্য যুতসই না। গত ১০/১২ বছরে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক এবং শ্রেণিকক্ষের জন্য পৃথক পদ তৈরি করা ছাড়া, প্রতিষ্ঠানগুলিতে অভিন্ন মান বজায় রাখা বা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু রাখার জন্য মন্ত্রণালয় কোনও নির্দিষ্ট আদেশ প্রচার করতে পারেনি। অবকাঠামোর অভাবে সর্বজনীন এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করা স্থগিত হয়েছে। আবার পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা এবং অষ্টম শ্রেণি শেষ করে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি) চালু হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়েছে। প্রথম থেকেই বিশেষজ্ঞরা আশংকা করে আসছেন যে, এগারো বা বারো বছর বয়সে পাবলিক পরীক্ষায় বসলে শিশুদের ওপর ক্ষতিকর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে এবং তা তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারে। এসব পাবলিক পরীক্ষা চালু হওয়ার পর অনেক শঙ্কাই সত্যি হলো। শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের অভিভাবকদেরকে যে কোন উপায়ে সব বিষয়ে এ+ পাওয়ার ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হলো। পরীক্ষায় নকল করা নতুন উচ্চতা পেয়েছে, বইয়ের বাজার বেআইনি গাইড বইয়ে সয়লাব হয়ে গেছে। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে কিংবা আগের রাতে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এমনকি শিক্ষার্থীরা সন্তোষজনক ফলাফল নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে অনেক। এসব পাবলিক পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্ন প্রবর্তনও আশানুরূপ ফল বয়ে আনতে পারেনি। সৃজনশীল প্রশ্ন হল এমন প্রশ্নপত্র যা শিক্ষার্থীদের স্মরণ করার, উপলব্ধি করার এবং শেখানো পাঠকে তার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে যাতে শিক্ষার্থীরা বাক্যগুলি মুখস্থ না করে ধারণাটির উপলব্ধি থেকে উত্তর লিখতে পারে। তবে, প্রকল্পটি প্রায় নিষ্ফল হয়ে পড়েছে কারণ বাজারে অসংখ্য অবৈধ গাইডবই এবং কোচিং সেন্টার রয়েছে যা শিক্ষার্থীদের সব ধরণের সৃজনশীল প্রশ্ন সরবরাহ করে। শিক্ষার্থীরা উত্তর মুখস্থ করার জন্য কোচিং সেন্টারগুলি থেকে দেওয়া এই গাইডবই এবং নোটগুলি কিনতে ছুটে আসে কারণ তাদের পরীক্ষায় একই ধরনের প্রশ্ন পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই গাইডবই প্রকাশক এবং কোচিং সেন্টারগুলির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান সত্ত্বেও, এখনও তারা এ+ পাওয়ার ‘সহজ’ উপায় শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করতে পারে। কওমি মাদ্রাসার জন্য পৃথক কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতিও এখনো প্রতিশ্রুতি রয়ে গেছে। সারা দেশে হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে যার ওপর সরকারের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বর্তমান শিক্ষানীতির সাথে তাদের পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষণ-শেখানো প্রক্রিয়ার কোনো যোগসূত্র নেই এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে তাদের স্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। এমনকি মূলধারার মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে আসা শিক্ষার্থীরাও চরম অবহেলার শিকার হয়েছে। শিক্ষানীতিতে সকল স্তরের শিক্ষার মান উন্নয়ন বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার অগ্রাধিকার ছিল। নীতিমালায় শিক্ষকদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি ও কৌশলের বিপরীতে সরকারের নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-মর্যাদা নিম্নমুখী করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমস্ত স্তরের নির্দেশাবলি, শিক্ষকদের বিক্ষোভ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং এখনও সমস্যার সমাধান হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় তলানিতে ঠেকেছে। চোখের সামনে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। নীতিমালার বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের সময় যে অপ্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া গেছে তা সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রস্তুতির অভাবের ফলাফল হিসেবে দিখেছেন বিশেষজ্ঞরা। যে কারণই চিহ্নিত করা হোক গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা যে এখন মারাত্মক সংকটে নিমজ্জিত, সেই বাস্তবতা ঢেকে রাখতে পারছে না সাক্ষরতা বৃদ্ধি, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার কিছু পদক্ষেপ এবং দেশের সব জায়গায় পাঠ্যপুস্তক সময়মতো বিতরণ জাতীয় কিছু সাফল্য। তৈরি হচ্ছে মুখস্ত বিদ্যায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত একটি একমাত্রিক সমাজের নাগরিক, যারা কেবল নিজের এ+ নিয়ে সন্তুষ্ট। এই সংকট কেবল প্রয়োগের সংকট নয়, এ সংকট প্রচলিত শিক্ষাদর্শনেরই সংকট। বোঝাই যাচ্ছে লক্ষ্য হিসেবে সুনাগরিক বানানোর কথা থাকলেই কেউ সুনাগরিক হয়ে ওঠে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে নিউক্লিয়াস পরিবারে একটি/দু‘টি সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে অভিভাবকরা কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে সাহস পান না। শিক্ষক হারাতে চান না টিউশনের সুযোগ। তিনি শ্রেণিকক্ষে পড়ান না বা এক ঘণ্টার ক্লাসে ১০০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো সম্ভব না। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফলের ওপর স্কুলের টিকে থাকা নির্ভর করে। শিক্ষকরা খারাপ ফলের চাপ নিতে পারবেন না। সরকার কম পাশের ঝুঁকি নেবেই না, তাই সবাইকে পাস করিয়ে দেয়াই একমাত্র সমাধান হয়ে উঠেছে। শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত সকল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই একটা অনৈতিক চক্রে ঢুকে গেছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকের এই নকলকেন্দ্রিক মুখস্তবিদ্যার যে উৎসব, তার অন্তর্নিহিত কারণ সম্ভবত প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী সমাজকাঠামো। যোগ্যতমের ঊর্ধ্বতনের টিকে থাকার দর্শনেই বিকৃত হয়ে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা। এই কারণ নির্ধারণের আগেই, সেসব বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অলোচনা শুরু করার আগেই, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির জন্য নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনের ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে, যেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোন পরীক্ষা নেই এবং চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কেবল আটটি বই পড়তে হবে। শিক্ষার্থীরা হয়ে গেছে একের পর এক শিক্ষা কমিশনের বিজ্ঞ কমিশন সদস্যদের ইচ্ছাপূরণের গিনিপিগ। এক শিক্ষানীতি চালু হবার আগেই ভিন্ন শিক্ষানীতি শুরু হয়। ঔপনিবেশিক অতীত, সাম্প্রদায়িক বাণিজ্যিক বর্তমান নিয়ে চালিত শিক্ষানীতি নিয়ে ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কী আশা করা যায়! সুপারিশের আগে চাই অনুধাবন লেখাটি লিখতে গিয়ে বুঝলাম, সারা পৃথিবীতে শিক্ষা দর্শনের নামে যে ভালো ভালো কথা বলা হয় কিংবা যেসব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে, সারা পৃথিবীতেই সেই ভালো ভালো শিক্ষা এবং দক্ষতা আসলে কিনে নিতে হয় চড়া দামে। শিক্ষা এখন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য। কেউ প্রশ্ন করে না দামের। যে সেই দাম চুকাতে পারে, সে কিনে নেয় শিক্ষা। যে পারে না, নয়া উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থায়, আজো, সে কিনতে পারে না মানসম্মত শিক্ষা। উন্নতদেশে এই বিপণনে এক ধরনের আভিজাত্য এসেছে। টাকার বিনিময়ে ভালো পণ্য কেনার মতোই ভালো শিক্ষা কেনা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা আটকে আছে এখনো ফটকা বাজারে। তাই রাজনৈতিক প্রয়োজনে সাক্ষরতা বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়েনি, বরং তলিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত সাধারণের শিক্ষার মান। পাশাপাশি তৈরি আছে ধনবানের জন্য স্কুল। মাসে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সেই স্কুলে পড়ে তাদের সন্তানেরা। বাংলাভাষা এবং বর্ণমালা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এখন দুয়োরানী, ইংরেজি সুয়োরাণীর কাছে সে হেরে ভুত হয়েছে অনেক আগে। কাজেই মুখে কুদরাত-ই-খুদার শিক্ষানীতির কথা বললেও, সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম বাংলা চালু করাকে শ্লোগান হিসেবে নিলেও, আমাদের, যাদেরই সক্ষমতা আছে, লক্ষ্য ইংরেজি শিক্ষায় সন্তানকে শিক্ষিত করা, শিক্ষাশেষে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া। কাজেই শিক্ষানীতি নামের যে বাণিজ্যিক-সাম্প্রদায়িক শিক্ষাদর্শনে আমরা আটকে আছি, তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে আমরা রাষ্ট্রের সাথে দর কষাকষি করতেই পারি, কিন্তু সমাজবিপ্লবের অভিমুখীন একটি রাজনৈতিক দল কি কেবল আটকে থাকবে দফাওয়ারি দাবি-দাওয়ায়, একথা জেনেই যে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে কিংবা বিকল্প প্রস্তাব জনগণের কাছে উত্থাপন না করতে পারলে ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকারে পাওয়া, নিওলিবারাল পুঁজির মোড়কে বাণিজ্যিক ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষাদর্শন আসলে একটি কাক্সিক্ষত শিক্ষাব্যবস্থা দিতে পারে না? তাহলে, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা কেমন দেখতে চাই? আমাদের চিন্তাপদ্ধতির মূলে যদি মার্কসীয় দর্শন কাজ করে, তবে বলতেই হয়, প্রথম চাওয়া অ-পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থা। শ্রেণিবৈষম্যের ঊর্ধ্বে সর্বজনীন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাই। রাষ্ট্র অর্থ যোগাবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সরকারি আমলা করবেন না, করবেন শিক্ষায়তনিক বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয়ত, চাই অসাম্প্রদায়িক, ইহজাগতিক শিক্ষাব্যবস্থা। বিজ্ঞানচেতনা এবং যুক্তি হবে এই ইহজাগতিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। এমনকি ধর্ম যদি ক্লাসে পড়তে হয়, সেটি একটি বিষয় হিসেবে পড়তে হবে, বিশ্বাস হিসেবে নয়। কারণ, শিক্ষায়তন একটি সেক্যুলার স্থান। তৃতীয়ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশের জন্য চাই রাষ্ট্রের উদ্যোগ। জ্ঞান উৎপাদন এবং বণ্টন, দুই-ই যদি শিক্ষায়তনে না থাকে, তবে রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উৎকণ্ঠিত হবার কারণ আছে। চতুর্থত, শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত মানুষদের সমাজে সম্মানের আসনে রাখার বাস্তবতা তৈরি করা, যেনো শ্রেষ্ঠ মেধাবীরাই শিক্ষার জগতে আসেন, যেমন চেয়েছে খুদা কমিশন। কল্যাণরাষ্ট্র ফিনল্যান্ডে যে উদ্যোগ সাফল্য এনেছে। এজন্য বাজেট বরাদ্দ চাই। শিক্ষাক্ষেত্রে এখনো রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সবচেয়ে কম। আর চাই বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা। ক্ষমতাসীনের বিপরীতে কথা হলেই যদি জেল-জুলুম হয়, সেখানে জ্ঞানচর্চার বিকাশ হতে পারে না। অর্থাৎ শিক্ষানীতি ও শিক্ষাদর্শন হবে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক ইহজাগতিক এবং স্বাধীন। আমাদের কাজ কী হবে সে‘বিষয়ে কার্ল মার্কস বলে গেছেন তিনটি করণীয় কথা। প্রথমত, পুঁজিবাদী সমাজ এবং এর শিক্ষাব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অনৈতিকতা নানা মুখোশে মুখ ঢেকে আছে, সেই পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোর সমালোচনা দৃশ্যমানভাবে জারি রাখা। দ্বিতীয়ত, মানুষের প্রয়োজন এবং শিক্ষার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের সাথে দৃশ্যমান ডিসকোর্স তৈরি করা। তৃতীয়ত, স্বাধীনতা এবং শিক্ষার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কাজ করা। তথ্যসূত্র দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯৮৭)। ভারতে বস্তুবাদ প্রসঙ্গে। অনুষ্টুপ প্রকাশন: কোলকাতা। শহীদুল ইসলাম (১৯৮৮/১৯৯০)। বাংলাদেশের আধুনিক শিক্ষা: ঐতিহাসিক পটভূমি (আনু মুহাম্মদ সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিক্ষাঃ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত)। বাংলাদেশ লেখক শিবির: ঢাকা। আবদুল মতিন খান (১৯৮৮/১৯৯০) এযাবতকালের শিক্ষানীতি ও বিকল্প কাঠামো (আনু মুহাম্মদ সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিক্ষা: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত)। বাংলাদেশ লেখক শিবির: ঢাকা। Bangladesh Education Committee Report 1974. Ministry of Education, Government of the PeopleÕs Republic of Bangladesh. National Education Policy 2010. Ministry of Education, Government of the PeopleÕs Republic of Bangladesh. Curren, R., Robertson, E. and Paul Hager, P. (2003). The Analytical Movement, in Curren 2003: 176– 191. doi:10.1002/9780470996454.ch13 Rikowski, G. (2004). Marx and Education. Policy Future in Education, 2(November 3&4). Marx, K. & Engels, F. (1846/1976). The German Ideology, Progress: Moscow. Marx, K. & Engles, F. (1845/1976) Theses on Feuerbach, addendum to The German Ideology, Progress: Moscow.

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..