পরিবেশের ওপর কীটনাশকের প্রভাব
মনির তালুকদার
ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষিবিজ্ঞানীরা নিত্য নতুন উচ্চফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এতে করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, জনগণের খাদ্যাভাবও মোটামুটি মিটছে। এটা অবশ্যই আশার কথা। পাশাপাশি ফসল উৎপাদন ফলপ্রসূ করার স্বার্থে রাসায়নিক ও নানা ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার ও যথেষ্ট বেড়েই চলছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবেশ এবং মৎস্য সম্পদের জন্যে হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্যণীয় যে, ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন, নগরায়ন সেই সাথে অধিক জনসংখ্যার চাপের ফলে গোটা বিশ্ব পরিবেশটাই ক্রমান্বয়ে দূষিত হয়ে পড়ছে। পরিবেশ দূষণকারী পদার্থগুলোর মধ্যে কীটনাশক অন্যতম। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের পুঞ্জীভূতাংশ মাটিতে, বায়ুতে, পানিতে, শস্যে, মাছে, এমনকি মাতৃদুগ্ধেও সংক্রমিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে কৃষিজমিতে ব্যাপভাবে কীটনাশক ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ওইসব জমিতে বছরে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় বলে এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বৃষ্টির পানির মাধ্যমে কাছাকছি অবস্থিত উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রবেশ করে। এতে করে জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাছসহ অন্যান্য প্রাণীরও মৃত্যু ঘটে। এমনকি, ওই দূষণ প্রক্রিয়া এসব জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ শক্তিও নিঃশেষ করে দেয়। প্রাপ্ত এক তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত ২৮০টির মতো কীটনাশক রয়েছে। এগুলো হচ্ছে– অর্গানোক্লোরিন, অর্গানোফসফেট, কার্বমেট ও পাইরিথ্ররেড জাতীয়। অর্গানোক্লোরিন জাতীয় কীটনাশক এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত এলড্রিন, ডাই-এলড্রিন, ডি ডি টি, কেøারোডেন ইত্যাদি। এই জাতীয় কীটনাশকের প্রতিক্রিয়ায় প্রাণির মাংসপেশী সংকুচিত হয়-স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকর্ম বন্ধ হয়ে যায়।
অর্গানোফসফেট জাতীয় কীটনাশক: এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত ডাইমেক্রন, ডায়াজিনন, নগস, বাসুডিন, ম্যালথিয়ন, সুমিথিয়নর ইত্যাদি। এই জাতীয় কীটনাশকের প্রতিক্রিয়ায় প্রাণীর রক্তের এনজাইমের কার্যকারিতা নিশ্চল হয়ে পড়ে।
কার্বমেট জাতীয় কীটনাশক: গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত কার্পোফুরান, পাদান, কার্বারিল, মিপসিন ইত্যাদি। এই জাতীয় কীটনাশকের প্রতিক্রিয়ায় প্রাণীর রক্তের এনজাইমের কার্যক্রম বাধার সম্মুখীন হয়।
পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক:- সুমিসাইডিন, সিমবুশ, ডেসিস ইত্যাদি। এই জাতীয় কীটনাশকের উদাহরণ। এই শ্রেণির কীটনাশক খুবই ধ্বংসাত্মক। এই গ্রুপের প্রায় সব কীটনাশকই পানিতে প্রয়োগের সাতে সাথে মাছ মরতে শুরু করে। এক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ২০টির মতো পাইরিথ্রয়েড কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশের ওপর কীটনাশকের প্রভাব পরিবেশ বলতে সাধারণত বায়বীয়, স্থলজ (১) ব্যয়বীয় পরিবেশ : বায়ু থেকে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে কীটনাশক প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এতে করে বিভিন্ন প্রাণীর মতোই মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গ, যেমন- বৃক্ক, যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলি, মস্তিষ্ক ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(২) স্থলজ পরিবেশ : অধিকাংশ কীটনাশকের পুঞ্জীভূত কার্যকারিতা দীর্ঘ দিন মাটিতে অক্ষুণ্ন থাকে। তবে কোনো কোনো কীটনাশক ব্যবহারের ফলে শস্যবিনাশী সুনির্দিষ্ট পোকা ছাড়াও মাটিতে বসবাসরত অন্যান্য উপকারী ক্ষুদ্রকায় জীবও মারা যায়। ফলশ্রুতিতে সামগ্রিক পরিবেশ দিন দিন জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে।
(৩) জলজ পরিবেশ: কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ২৫ শতাংশ মূলত পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের পানিতে মিশে যায়। তাছাড়া কীটনাশক তৈরির কারখানা, স্প্রে করার যন্ত্রপাতি এবং ব্যবহারের পাত্র্যাদি ধৌত করার মাধ্যমে; এভাবে নানা প্রক্রিয়ায় জলজ পরিবেশ দূষিত হয়। ওই দূষণ মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী, যেমন ফাইটোপ্লাংটন (উদ্ভিদ কনা) এবং ঘটায়। লক্ষণীয় যে, ওই সকল উদ্ভিদ ও প্রাণিজকনা মাছের প্রিয় খাদ্য। অনেক ক্ষেত্রে জলজ প্রাণী জলজ উদ্ভিদের ওপর ডিম নিঃসরণ করে থাকে।
কীটনাশক ব্যবহারের কারণে জরজ উদ্ভিদ বিষাক্ত হয়ে পড়ে এবং ষিাক্ত পদার্থ ডিমে প্রবেশ করার ফলে স্বভাবতই ডিম নষ্ট হয়ে যায়। এতে মাছসহ অন্যান্য উপকারী জলজ প্রাণীর প্রজনন কার্যক্রম দারুনভাবে ব্যবহৃত হয়।
মৎস্য সম্পদের ওপর কীটনাশকের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় সকল প্রকার কীটনাশকই মাছের জন্যে ক্ষতিকর। তবে, অর্গানোক্লোরিন ও পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের বেশিরভাগ এবং অর্গানোফসফেট ও কার্বমেট গ্রুপের প্রায় অর্ধেক কীটনাশক মাছের জন্যে প্রচণ্ডভাবে ধ্বংসাত্মক। এই শ্রেণির বিষাক্ত কীটনাশক নিচু এলাকার ধানের জমিতে প্রয়োগের সাথে সাথে উক্ত স্থানসহ পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের মাছের তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুর কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে আমাদের দেশে আমদানিকৃত কীটনাশকের প্রায় ৬০ শতাংশ চরম বিষাক্ত, ৩০ শতাংশ অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত এবং ১০ শতাংশ বিষাক্ত নয়।
উল্লেখ্য যে, উক্ত ইনস্টিটিউটে গবেষণার জন্য নির্ধারিত ২০টি কীটনাশকের মধ্যে ১১টি চরম বিষাক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া ফসলের পোকা দমনের জন্যে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগের পর মাত্র ৯৬ ঘণ্টার মধ্যেই গবেষণাগারে পরীক্ষাধীন ১০০ শতাংশ মাছই মৃত্যুকবলিত হয়েছে। মারাত্মক ধরনের ওই কীটনাশকের মধ্যে ফেনভেলারেট ও ডায়জিনন জাতীয় কীটনাশক আমাদের দেশের নিচু এলাকার ধানের জমিসহ অন্যান্য ফসলের জমিতেও পোকামাকড় দমনের জন্যে বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই তথ্য থেকে দেশের মৎস্য সম্পদের ওপর কীটনাশকের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব সম্যক উপলব্ধি করা যায়। কীটনাশকের প্রতিক্রিয়ায় মাছের মধ্যে বিভিন্নভাবে শরীর বৃত্তীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় মাছের ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয়ের কার্যকারিতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। ফলে যথাযথভাবে ডিম্বানু ও শুক্রানু উৎপন্ন করতে পারে না। এছাড়া মাছের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন- যকৃত, বৃক্ক, পাকস্থলি, মস্তিষ্ক ইত্যাদিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশে মূলত সারা বর্ষাকালই বিভিন্ন মাছ ডিম দিয়ে থাকে। আমরা আবহমানকাল থেকে দেখে আসছি কৈ, পুঁটি, মাগুর, শিং, টাকি, শোল, গজার, বেলে ইত্যাদি মিঠাপানির মাছগুলো স্বল্প পানিতে ধানের জমিতে ডিম নিঃসরণ করে এবং বাচ্চা লালন-পালন করে থাকে।
উল্লেখ্য যে, কাতলা, রুই, মৃগেল, কালীবাউশ ওই মাছগুলোসহ অন্যান্য মাছের পোনাও বিশাল বিস্তৃত ধানের জমিকেই লালনভূমি হিসেবে ব্যবহার করে। সাম্প্রতিককালে এসব ধানক্ষেতে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ব্যবহৃত জমির পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে এসব স্থান মাছের জন্যে অত্যন্ত অনুপযোগী তথ্য বিপদসংকুল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। ফলশ্রুতিতে মাছের প্রজননক্রিয়া দারুণ ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের ঐতিহ্যবাহী অনেক মাছই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং বেশ কিছুসংখ্যক বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের আছে অফুরন্ত জলসম্পদ। প্রাচীনকাল থেকেই এ সম্পদ আহরণ করা হতো। তবে, বর্তমানে মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ক্রমশ প্রকটভাবে হ্রাস পাচ্ছে। মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কীটনাশকের মাধ্যমে জলজ পরিবেশ দূষণকেই মৎস্যবিজ্ঞানীরা দায়ী করেছেন। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কৃষকই জমিতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অধিক হারে কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। তবে মাছ ও পরিবেশের জন্যে ক্ষতিকর কীটনাশক যেমন, ডাইএনড্রিন, ক্লোরোডেন, ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর ইত্যাদি এবং বিশ্বাস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নিষিদ্ধ কীটনাশকও দেশের কোথাও কোথাও অবাধে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মাছ ও পরিবেশের ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্যে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে শিগগিরই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন