নাট্যকার মুনীর চৌধুরী
একতা ফিচার :
মুনীর চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালে, শহীদ হয়েছেন ১৯৭১ সালে। এই ৪৬ বছরের ঘটনাবহুল জীবনের বলা চলে প্রথম ২০ বছর তাঁর প্রস্তুতিপর্ব, আর বাকি ২৬ বছরে বহুমুখী প্রতিভার আলোকরশ্মি বিতরণ। এই আলোকের ঝর্ণাধারায় একাধারে মুনীর চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক, গবেষক, নাট্যকার, ভাষাতত্ত্ববিদ, ভাষাসৈনিক, বাংলা টাইপরাইটার কি-বোর্ড প্রবর্তক, ছোট গল্পকার, অনুবাদক, শিল্প ও সাহিত্য সমালোচক, কুশলী বক্তা, নাট্য নির্দেশক। তাঁর ক্লাস নোট-এ বিভিন্ন লেখকের প্রতিকৃতি ও নিজের পুস্তক প্রচ্ছদ নকশা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাঁর অঙ্কনশৈলীও সাধারণের ঊর্ধ্বে ছিল।
মুনীর চৌধুরীর চিন্তা-চেতনা, সৃষ্টিশীলতার প্রস্তুতি পর্বকে আরও দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। পারিবারিক তথ্য ও মুনীর চৌধুরীর নিজের সাক্ষাৎকারের গ্রন্থনা থেকে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত গৃহশিক্ষা পেয়েছেন তিনি – যা তাঁর পিতা খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী, ১৪ সন্তানের প্রত্যেকের জন্য কঠোর নিয়মানুবর্তিতার সাথে দিক নির্দেশনা দিতেন। নোয়াখালীর প্রত্যন্ত এলাকা চাটখিল থেকে আব্দুল হালিম চৌধুরী নিজের কঠোর চেষ্টা ও অধ্যাবসায়ে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেন এবং ব্রিটিশ আমল থেকে সরকারি চাকরি শুরু করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। সন্তান শিক্ষায় সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, দেশি-বিদেশি সাহিত্যের পারিবারিক সংগ্রহকে পিতা কাজে লাগিয়েছেন। ইংরেজি ও আরবিতে তিনি নিজেই বিদ্বান ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক তিনি নিজেই অনেক সময় সংশোধন করে ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাই বই পড়ার নেশা মুনীর চৌধুরীর শুরু হয়েছিল স্কুলে যাওয়া শুরু করার আগে থেকেই।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হবার পর মুনীর চৌধুরীকে পিতা বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন। ইচ্ছে ছিল এই ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবেন। বিজ্ঞান শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক মুনীর চৌধুরীকে আকৃষ্ট করেনি। সেখানে মুনীর চৌধুরী দুটো পেপার সম্পূর্ণ পরীক্ষা না দিয়েই চলে এসেছিলেন, তার পরেও দ্বিতীয় বিভাগে আইএ পাশ করেন। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারের বিশাল ভাণ্ডার থেকেই মুনীর চৌধুরীর প্রতিভা বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায় ধরা যায়। বহু সময় কাটিয়েছেন এই পাঠাগারে এবং পরিচিত হয়েছেন বিশ্বের অনেক লেখকের লেখার সাথে। আলীগড় থেকে ফিরে এসে বিজ্ঞান শিক্ষা ছেড়ে যখন ১৯৪৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেন, ইতিমধ্যে ১৮ বছর বয়সের মুনীর চৌধুরীর তলস্তয়, শেক্সপিয়ার, বার্নার্ড শ, চার্লস ডিকেন্স, ভিক্টর হুগো, পাশ্চাত্যে মানবতাবাদের বিকাশ- এসব পড়া শেষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে মুনীর চৌধুরীর জীবন দর্শন গঠনের তৃতীয় আরেক অধ্যায়ের শুরু, যা ছিল আমৃত্যু পর্যন্ত। আলীগড়ে যে বাহ্যিক আভিজাত্যে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর বেশ কয়েকজন বাম চিন্তাধারার ছাত্রদের সংস্পর্শে মুনীর চৌধুরীর এলো আরও একটি পরিবর্তন। এঁদের মধ্যে ছিলেন সরদার ফজলুল করিম, মদন বসাক, দেব প্রসাদ, রবি গুহ প্রমুখ। মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্বাধিকার আন্দোলন- এসব কিছুর পাঠ তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থাতেই যার সূচনা।
বিশ্বসাহিত্য ও বিশ্ব রাজনীতিও মুনীর চৌধুরীর জীবন ও লেখনীকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। তার তরুণ বয়সের একটি সময়ের কিছু সাহচর্য এই মনন গঠনে তাৎপর্যপূর্ণ। চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের সৈনিকেরা অনেক সময়ই ঢাকায় বিমান বিরতি নিতেন। অধিকাংশই মার্কিন সামরিক ও বিমান বাহিনীর সৈন্য যারা বিভিন্ন পেশা থেকেই ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা করতে সেনা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদেরই মধ্যে কেউ শিক্ষক, কেউ গবেষক আবার কেউ সাহিত্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বল্পকালীন শিক্ষক অধ্যাপক অ্যালেক্স অ্যারন্সনের বাড়িতে এইসব সেনাদের কর্মবিরতিতে চলত আড্ডা। বাঙালিদের প্রতি অধ্যাপক অ্যারন্সনের ছিল অগাধ ভালোবাসা। ঢাকার আগে তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়ের সাহচর্য পেয়েছেন। এঁর বাড়িতেই কোন এক সাহিত্য আড্ডায় মুনীর চৌধুরীর পরিচয় হয় মার্কিন বৈমানিক নরম্যান স্প্রিঙ্গারসহ বেশ কিছু তরুণ মার্কিনীদের সাথে যারা প্রগতিশীল বামপন্থি চিন্তায় বিশ্বাসী। নরম্যান স্প্রিঙ্গার পরবর্তীতে নিজেও নাম করেছিলেন মার্কিন অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে। তাঁদের আলোচনায় শুধু সাহিত্য নয়- তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি ও বিশ্বে তার প্রভাব, বিশ্বে কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ এবং আরও কত কি।
মুনীর চৌধুরীর বয়স তখন ২০। ইংরেজি সাহিত্যের আগ্রহী ছাত্র হিসেবে যেমন সমসাময়িক বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে তিনি মেতে আছেন, তেমনি দেশে ও বিদেশে স্বাধিকার, স্বাধীনতা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা নিয়েও চিন্তা করছেন, আলোচনা করছেন। মার্কিন শিক্ষক-ছাত্রদের কারো কারো সাথে মুনীর চৌধুরীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেও যোগাযোগ ছিল। অ্যারন্সন, নরম্যান ও তার সহযোগীদের সাথে এই যে আলোচনার জগত মুনীর চৌধুরীর বিশ্বাস, বিশ্লেষণ ও সৃষ্টিশীলতা – সবকিছুকেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও শানিত করেছে। মুনীর চৌধুরীর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ও পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ১৭৬১ সালের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানবিকতা ও মানব সম্পর্কের বিপর্যয় তাঁকে প্রভাবিত করেছে বলে অনুমান করা যায়। সমগ্র নাটকটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরোধী মনভাবের ছাপ সুস্পষ্ট। বিশ্ব সাহিত্য পদচারণায় বাংলা রুপান্তরের জন্য বেছে নিয়েছিলেন ইংরেজ নাট্যকার জন গলসওআরদীর নাটক ‘সিলভার বক্স’ বা ‘রূপার কৌটা’। সামাজিক শ্রেণীবিভেদ ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নাটক ‘রুপার কৌটা’। একই আচরণের জন্য যখন নাটকের শেষে আদালতে শুধু গরিবের দণ্ডাদেশ হয়, তখন সে চিৎকার করে বলে ওঠে-
‘এই তোমাদের ন্যায় বিচার, না? ঐ বড়লোকের বাচ্চার জন্য কোন সাজা নেই, না? ও মাতাল হয়নি? আরেকজনের জিনিস ও তুলে আনেনি? ওর যে টাকা আছে, সাজা দেবে কি করে ওকে? থুক তোমাদের বিচার কে’।
এভাবেই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধ হয়ে উঠেছিল মুনীর চৌধুরীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ১৮-১৯ বছর বয়স থেকেই তাঁর লেখার অন্তর্নিহিত উপজীব্য। এঁর কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি মাত্র। বাংলাসহ সারা ভারতবর্ষে যখন হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছে, সেই ১৯৪৬-৪৭ সালে তরুণ মুনীর চৌধুরী সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়লেন। ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন বিপদে পড়া কাউকে না কাউকে সাহায্য করতে। আবার ছাত্রাবস্থায় অসাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনার জন্য কট্টর ইসলামপন্থি ছাত্ররা মুনীর চৌধুরীকে একসময় বই, বিছানাপত্র সহ হল থেকে বের করে দেয়, যদিও পরবর্তিতে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে তিনি আবার ফেরত আসতে পেরেছিলেন। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে কাছাকাছি সময়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবতাবোধ তুলে ধরে মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন একাঙ্কিকা নাটক ‘মানুষ’, ‘মিলিটারি’ ও ‘একটি মশা’।
শুধু নাটক নয়, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অপব্যাখ্যাকে কটাক্ষ করে ছোট গল্প লিখেছিলেন ‘একটি তালাকের কাহিনী’ ও ‘মানুষের জন্য’। শেষোক্ত নাটকে তাই আমরা একদিকে যেমন দেখি হিল্লা বিয়ের কষ্টকর নারী অবমাননা, তেমনি সন্তান সম্ভবা নারীকে নির্যাতনের জন্য মুন্সি সাহেবের চিৎকার -
‘শরিয়ত তোগো লাইন্য, তোগো লাই শরিয়ত ন্য। হাইওয়ান জানোয়ারের লাই শরিয়ত অয় ন্য। শরিয়ত অইছে মাইনষের লাই।’
দেশ বিভাগের পরে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানী শোষণ তথা সাম্প্রদায়িকতার প্রতি বিদ্রুপ করে মুনীর চৌধুরী যেমন সৃজনশীলভাবে তখনকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে সামিল হয়েছেন, তেমনি তাঁর সহজাত বাগ্মিতার বলে বিভিন্ন মহলে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে গেছেন। স্বভাবতই এসময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কারাগারে বসে ১৯৫৩ সালে লিখিত বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক নাটক ‘কবর’। কিন্তু একজন ভাষা সৈনিক হিসেবে মুনীর চৌধুরীর তৎপরতা, পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের রোষানলের কারণে বারংবার কারাবরণের বিশ্লেষণ- কবর নাটকের আলোচনার ব্যাপ্তির অন্তরালে থেকে গেছে।
সেই ১৯৪৭ সালেই ডিসেম্বরে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে প্রথম ছাত্রসভা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে বক্তব্য রাখেন তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুনীর চৌধুরী। পরের বছরেই তিনি সক্রিয়ভাবে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন, কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে যোগ দেন এবং ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টির এক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু অচিরেই সেসময় বাম রাজনীতির চর্চার সর্বদিক তিনি মেনে নিতে পারেন নি। তাঁর একটি উদাহরণ সেসময় কমিউনিস্ট পার্টির রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা। তারপরেও প্রকাশ্যত বিরোধিতা করেন নি, বরং বলেছেন সক্রিয় রাজনীতির পরিবর্তে সাহিত্যচর্চা ও অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার কথা। তবে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনা ও বাংলা ভাষা নিয়ে সাহিত্যকর্ম, গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে তিনি কখনই সরে আসেন নি। যে কারণে বারবার পাকিস্তানের রক্তচক্ষু তাঁকে হয় শাসানী দিয়েছে, নয়তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফরেন সার্ভিসে চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছে। সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসার অল্প কিছুদিন পর, সক্রিয় বাম রাজনীতি ও বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবী আদায়ে কাজ করার জন্য, সেই সক্রিয় রাজনীতির জন্যেই মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তান সরকার ১৯৪৯ সালে কয়েক মাসের জন্য কারাগারে আটকে রাখে।
কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করার অপরাধে পাকিস্তান সরকার আরও কঠোরভাবে মুনীর চৌধুরী ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের দমন করার চেষ্টা করে। জন নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয় মুনীর চৌধুরীসহ অধ্যাপক মজাফফর আহমেদ, অধ্যাপক প্রিত্থিশ চক্রবর্তী ও অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ। একুশে ফেব্রুয়ারি গুলির প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁরা ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সংগঠিত করেন। শেষ পর্যন্ত ২৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবনের পূর্ব দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কমন রুমের উল্টো দিকের একটি বড় হল ঘরে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। হলরুম ভরা শিক্ষকরা ছিলেন। সেখানে যারা জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন, মুনীর চৌধুরী ও মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। শিক্ষকবৃন্দের একটি লিখিত রেজলুশন সেই সভা থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। পরদিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি এই সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সেই একই দিন রাতে মুনীর চৌধুরী ও মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করে। আর মে মাসে সরকারী অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যনির্বাহী পরিষদ মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক মজাফফর আহমেদ, এই দুই শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে ও জুলাই মাসের মধ্যে সকল রকম বকেয়া চুকিয়ে পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিশ দেয়। শিক্ষকদ্বয় অন্তরীন থাকায় তাঁদের পরিবার আবাসিক এলাকার বাসা ছাড়তে বাধ্য হন। রাজবন্দী হিসেবে এইবার দুই দফায় মুনীর চৌধুরীর কারাবরণ ছিল প্রায় আড়াই বছর। এর মধ্যেই তিনি পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন এবং কারাগার থেকেই বিশেষ অনুমতিতে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এটা শুধু তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্য নয়, বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি মুনীর চৌধুরীর অগাধ ভালবাসা।
উল্লেখযোগ্য সেই একই সময় একই আইনের আওতায় গ্রেফতার ও কারাবরণের শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। রাজবন্দি হিসেবে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের সাথে বুদ্ধিজীবীদের অন্তরীণ অবস্থার যোগাযোগ, উভয়পক্ষকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে কৌশল ও পরকল্পনা গ্রহণ করতে সাহায্য করেছে। যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায়
এলে এরা সকলে মুক্তি পান। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিবরণ আছে।
তবে পাকিস্তান বিরোধী অবস্থান থেকে শুধু ‘কবর’ নাটক নয়, মুনীর চৌধুরী ১৯৫০ সালে লিখেছিলেন নাটক ‘নষ্ট ছেলে’। নাটকে একটি পরিবারের মেয়ে যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত, তাঁকে ঘিরেই নাটকের কাহিনী আবর্তিত। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে গিয়েও পারে না। মুনীর চৌধুরীর নিজেরই বোন নাদেরা বেগম ১৯৪৮-৪৯ সালে বাম রাজনীতি ও ভাষা আন্দোলনের সহ বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, মুনীর চৌধুরীর অনুপ্রেরণাতেই। সেসময় নাদেরা বেগমের মত ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছাত্রীদের দেখা যেতো না বললেই চলে এবং পুলিশি নির্যাতন থেকে কারাবরণ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে পাকিস্তানীদের হাতে অপদস্থ হলেও সেসময় তিনি ছিলেন কিংবদন্তি। তিনিও মুনীর চৌধুরীর মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে পড়েছেন এবং পরবর্তী জীবনে বড় ভাই কবীর চৌধুরীর মত একই বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। নষ্ট ছেলে নাটকটিতে সেই প্রতিবাদী বোন নাদেরা বেগমের ছায়া চোখে পড়ে। আবার ‘কবর’ নাটকে পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতার যে স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, তারই আরও খোলস ছাড়িয়েছেন ‘নেতা’ একাঙ্ক নাটকটিতে। মূলত ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের মুসলিম লীগের দুই পক্ষের সংঘাত ও জনগণ বিচ্ছিন্নতা এই বিদ্রুপাত্মক নাটকের উপজীব্য। নারীলোভী এক নেতার চরিত্রায়ন করতে গিয়ে তার একান্ত সচীবের সংলাপ রচনা করেছেন এভাবে-
‘মনটাকে অত কোমরের নিচে ফেলে রাখবেন না। টেনে তুলে আরেকটু ওপরেও ঘোরান ফেরান। নইলে যে গেরো বেঁধেছে তাতে আমার মত দশটা সেক্রেটারিও আপনাকে বাঁচাতে পারবে না’।
অন্য আরেক স্থানে সেই নেতার সংলাপ-
‘তোমার মত অত ডিগ্রি আমার নেই। বিলাত গিয়ে মোটা মোটা রাজনীতির বই ঘেঁটে কোন পরীক্ষায় আমায় কোন দিন পাশ করতে হয়নি। কিন্তু তবু আমি রাজনীতি করি, করে বড় হয়েছি, পয়সা করেছি। এবং এই পয়সার জোরে তোমার মত লোককে নিজের কাজে খাটাচ্ছি।’
পরাধীন বাংলাদেশে শাসক নেতাদের প্রতি এই ধরনের বক্রোক্তি করার সৎ সাহস মুনীর চৌধুরী পেয়েছেন তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের সাথে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অবিচল থাকার মিশেলে।
[মুনীর চৌধুরীর কনিষ্ঠ সন্তান আসিফ মুনীর রচিত ‘মুনীর চৌধুরী: জীবন দর্শন, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি’ প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষ এখানে মূদ্রিত হলো-সম্পাদক।]
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন