প্রসঙ্গ : বাল্যবিবাহ
মনির তালুকদার
বিশ্বব্যাপী ৭০০ মিলিয়ন বা ৭০ কোটি নারী বাল্যবিবাহের শিকার। তাদের মধ্যে আবার ২৫০ মিলিয়নের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের কম বয়সে। ইউনিসেফের তথ্য মতে– বাল্যবিবাহে বাংলাদেশের অবস্থান চার নম্বরে। আর এশিয়ার মধ্যে বাল্যবিবাহে বাংলাদেশ সবার চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪”-এর খসড়া। সরকার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ (সংশোধিত ১৯৮৪) সংশোধন করে বিবাহের ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স ১৮ ও মেয়েদের বয়স ১৬ বছর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আইনটি সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই মতামত গ্রহণ করা হয়নি। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৪”-এর খসড়া অনুমোদন পেয়েছিল।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। ওই সনদে ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০১১ সালে শিশু আইন (১৯৭৪ সালের শিশু আইনটি বিলোপ করে) পাশ করে। ওই নীতিমালা ও আইনেও বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীরা সবাই শিশু। তাই “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৪” এর খসড়া অনুসারে সরকার আইনগতভাবে শিশুবিবাহের বৈধতা দিয়েছে। যা জাতীয় শিশু নীতিমালা-২০১১, শিশু আইন-২০১৩ ও জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ও সিডো সনদ এর সাথে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া মুসলিম বিয়েকে চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং “মেজরিটি অ্যাক্ট-১৮৭৫” অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তি চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না। আইন সংশোধন করে মেয়েদের বিবাহের বয়স ১৬ করা হলে তা “মেজরিটি অ্যাক্ট” এর সাথেও সাংঘর্ষিক হবে। তা ছাড়া শিশু আইন-২০১৩ এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, “বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্যপূরণকল্পে অনূর্ধ্ব ১৮ (আঠারো) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে। ” অর্থাৎ ওই আইনকে অন্য আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
গর্ভধারণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এজন্য চাই মায়ের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি। আমাদের দেশে বেশিরভাগ গর্ভধারণই অপরিকল্পিত। গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মায়ের বয়স ২০ বছরের নিচে থাকলে জটিলতার আশংকা থাকে। আর সরকারের ঘোষিত ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হলে এবং এই বয়সে বাল্যবধূ গর্ভধারণ করলে প্রসবকালীন মৃত্যুর হার বাড়ার আশংকা রয়েছে। এমনিতেই প্রতিবছর গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবকালীন সমস্যার কারণে কমপক্ষে ৬০ হাজার বাল্যবধূ মারা যায়। আর বাল্যবধূর অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ফলে ভগ্নস্বাস্থ্য, অপরিকল্পিত পরিবার, দাম্পত্য কলহ, প্রসবকালীন মৃত্যু, শিশুর অকাল মৃত্যুসহ অনেক বিপদ হতে পারে। শারীরিক গঠন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই বিয়ে অতঃপর সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে বাল্যবধূরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। অপুষ্টির মধ্যে শারীরিক নানা উপসর্গ দেখা দেওয়া সত্ত্বেও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে গর্ভবতী হয় সে। এছাড়া গর্ভধারণের বয়সে উন্নীত হওয়ার আগেই অল্প বয়সী বালিকাদের বিয়ে দিলে পরবর্তী সময়ে যে গর্ভসঞ্চার হয়, তা নবজাতক ও মা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর হতে পারে। সেইভ দ্য চিলড্রেন’র তথ্যমতে, ভগ্নস্বাস্থ্য ও প্রসবকালীন নানা জটিলতার কারণে প্রতি এক হাজারটি শিশুর মধ্যে ৫০টি মারা যায়।
১৬ বছরে একজন কিশোরীর বিয়ে হলে শুধু নবজাতক, অল্প বয়সী নারী বা তার পরিবারই আক্রান্ত হবে না–এতে দেশ হবে অপুষ্ট ও দুর্বল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী। বাল্য বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে মেয়েরা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় বিবাহিত কিশোরীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সমস্যার কবলেও পড়ে।
কিশোরী বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এসব নারী মানসিক, শারীরিক ও যৌনজীবনে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। ওইসব নারী পরবর্তী সময়ে জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে না। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ ও জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর সরকারের ঘোষিত ১৮ বছর বয়সে একজন ছেলে বিয়ে করলে সে তার পরিবারের সদস্যদের ভরনপোষণ দিতে সক্ষম হবে না। এতে চরাঞ্চল, বস্তি ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কম বয়সে ছেলেদের বিয়ের প্রবণতা বাড়ার সাথে সাথে যৌতুকের জন্য বাল্যবধূর ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউরোপের কয়েকটি দেশের মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছরের উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর করার বিষয়ে মত দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে আইনকানুন যাচাই-বাছাই করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী এটা উল্লেখ করেননি যে ইউরোপের যে সব দেশে বিয়ের বয়স ১৬ বছর সে সব দেশে ১৬ বছরে বিয়ে করার ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে সাম্প্রতিককালে সিদ্ধান্ত নিয়েছে–বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে উভয় এর ন্যূনতম ২১ বছর হতে হবে। নেপালে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের ন্যূনতম বয়স ২১ ও মেয়েদের ২০ বছর, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়স ২১ বছর ও চীনে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের ন্যূনতম বয়স ২২ ও মেয়েদের ২০ বছর।
বাল্যবিবাহের সূচকে আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নাইজারের অবস্থান প্রথম। এখানে ৭৫ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়। আর নাইজারের ছেলে-মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স হলো মাত্র ১৫ বছর। গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৪, জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ, “শিশুদের জীবনমানের উন্নয়ন, ভবিষ্যৎকে বদলে দেয়” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের হার বাংলাদেশে। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিতেই কনের বয়স থাকে ১৮ বছরের নিচে।
আইনগতভাবে বিয়ের যে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বয়সে একজন নারী বা পুরুষ বিবেচনাপ্রসূত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। এ বয়সেই আবেগের আধিক্য থাকে বেশি। তাই এ বয়সেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল করে থাকে। বিয়ের বয়স যদি কমিয়ে ১৮ বা ১৬ বছর করা হয় তবে পরিবারের অমতে নিজের ইচ্ছায় বাল্যবিবাহের সংখ্যা বাড়বে। আর এ ধরনের বিয়ের পরিণতিতে বাড়বে পারিবারিক কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদের হার। আমাদের এখন ভাবতে হবে আইনের সংস্কার জরুরি কি না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ বলবৎ রয়েছে। বাল্যবিবাহের শাস্তি হিসেবে ১৯২৯ সালের আইনে এক মাসের জেল এবং এক হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল। ওই আইনটি কয়েকবার সংশোধন করা হলেও আইনটি যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না সেটা বাল্যবিবাহের উচ্চ হারই প্রমাণ করে।
জন্ম নিবন্ধন সনদের সহজলভ্যতার কারণে এটি বাল্যবিবাহ রোধে তেমন কোনো কাজে আসছে না। সেক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বয়স নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধের জন্য সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাবে না। সামাজিক সচেতনতা ও সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণে অনেক বাবা-মা বাল্য বয়সে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। বিশেষত, বস্তির ৮০ শতাংশ বাল্যবিবাহের শিকার, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকা, যেখানে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি, সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণে উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যতীত বাল্যবিবাহ রোধ করা যাবে না। আবার সীমান্তবর্তী এলাকা মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। এখানে নারী পাচারের সংখ্যা এত বেশি যে অধিকাংশ মা-বাবা মেয়ে একটু বড়ো হলেই বিয়ে দিয়ে দেন। তাই সীমান্তবর্তী এলাকায় দারিদ্র্য নিরসনের সাথে সাথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাফল্র অর্জনের চেষ্টায় শর্টকাট মেথড গ্রহণ করা হলে তার ফল ভালো হয় না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেরও কোনো শর্টকাট মেথড নেই। মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে এনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের দিবাস্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। এর উদাহরণ হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশের নাইজারকে উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে বিয়ের বয়স ১৫ বছর এবং বাল্যবিবাহের হার ৭৫ শতাংশ। শারীরিক গঠন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই বাল্যবধূ ও শিশু উভয়েই পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এতে করে মা ও শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন