বিপ্লবী কৃষক নেতা জীতেন ঘোষ
শেখ রফিক :
“পদ্মা পাড়ের মানুষ জীতেন ঘোষ। কিশোর বয়সে পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের মত ছিল তাঁর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’ ‘চিত্ত ভাবনাহীন’- এই পণ করিয়া সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের গণআন্দোলনের প্রথম যুগে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ কংগ্রেসকর্মী। সবশেষে জনগণের একমাত্র শোষণমুক্তির পথ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্ব গ্রহণ করেন।
চরম আত্মত্যাগ, শত লাঞ্ছনা, দুঃখ, ক্লেশ, জুলুম-অত্যাচারের মধ্যেও তিনি ছিলেন হিমালয়ের মত অটল। আদর্শের উপরে ছিল তাঁর ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ়তা। তাই অনেক উত্থান পতনের মধ্যেও তাঁর সংকল্প ছিল অটুট। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের কাছে অতি প্রিয় নাম জীতেন দা, অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্র্ণ এক বিপ্লবী চরিত্র। তাকে আগামী দিনের বংশধরদের নিকট চির ভাস্কর করিয়া রাখিবার দায়িত্ব তাঁর সাথী ও সহকর্মীদের”– কমরেড মণি সিংহ
প্রখ্যাত কৃষক নেতা জীতেন ঘোষ জন্মেছিলেন ১৯০১ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার কুমারভোগ গ্রামে। বাল্যকাল থেকে তিনি গীতা, পাঠ করে আত্মিকশক্তি ও সংগ্রামী মনোভাবকে উদ্দীপ্ত করে সাধারণ মানুষকে সেবা করার জন্য সেবাশ্রম ও লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। এখান থেকে তিনি দেশপ্রেমের ভাবধারাকে সহপাঠী তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। বিক্রমপুরের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রদেরকে নিয়ে বিপ্লবী গ্রুপ গঠন করেন। ১৯১৭ সালে এই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৯ সালে আই.এ. পাস করার পর ১৯২০ সালে বি.এ. ভর্তি হন। ১৯২১ সালে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।
তিনি ইংরেজ জেলের নিয়ম-কানুন মানতেন না। একদিন তাকে ঘানি টানার জন্য নেয়া হল। তিনি প্রথম থেকেই একাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। জেলের কর্মকর্তা তাকে প্রচণ্ড মারধর শুরু করেন। জীতেন ঘোষও হাতের কাছে যা পান তা দিয়ে মার প্রতিরোধ শুরু করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ পাগলাঘণ্টি বাজালো। ততক্ষণাৎ লাঠি, বন্দুকধারী সিপাহীসহ সকলেই মরতে শুরু করে। তার নিজের বিবরণ থেকে বুঝা যাবে সে মারের রূপ কি ছিল।
“চলল মার। উঃ কি দারুণ সে মার। আমার গা দিয়ে রক্ত বেরুল। নাক দিয়ে রক্ত ছুটল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে নিয়ে ডিক্রিতে বন্ধ করে দেওয়া হল। আমি মেঝেতেই পড়ে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পড় জেগে দেখি পানির কলসিটাও নেই। সরানো হয়ে গেছে। একটু পানিও খেতে পেলাম না। ডাক্তার আসাতো দূরের কথা, একফেঁাঁটা ঔষধও পেলাম না। পানির অভাবে নাক-মুখের রক্তও ধোয়া গেল না। কম্বলটা বেশ করে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম” (জেল থেকে জেলে, পৃষ্ঠা: ১৩)।
১৯২৩ সালে জেল থেকে মুক্তি পান। তারপর ঢাকা শহরে কিছুদিন কাটিয়ে কলকাতা যান। এখানে তিনি দেখা পেলেন বিপ্লবী যতীন দাসের। যতীন দাস জেলখানার অবিচারের বিরুদ্ধে ৬১ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। তার ধারাবাহিকতায় একসময় জীতেন ঘোষ জেলখানার অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। যার ফলে তাকে আবারও নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হতে হল। “উঃ সে কি মার! যেমন অমানষিক তেমন নির্মম। ঢাকা জেলের মার এর কাছে তুচ্ছ। সুপারিন্টেনডেন সাহেব সয়ং সবুট কিক করতে লাগলেন, আমরা যে একটা ফুটবল।.. এসময় ৪/৫ দিনে ডাক্তারের দেখা মিলল না। না পাওয়া গেল এক ফেঁাাঁ ঔষধ, না একটু ব্যান্ডেজের কাপড়” (জেল থেকে জেলে, পৃষ্ঠা: ৫৮)। “তারপর আমাকে যে ডিগ্রিতে নেওয়া হল, তা যেমন ছোঁ ছিল তেমনি শেওলাধরা স্যাঁতস্যাঁতে। কম্বল বিছালে তা পর্যন্ত ভিজে যায়। ডিগ্রিতে পা ফেলতেই মনে হয় যেন পানি ঢেলে ভিজিয়ে রেখেছে। রোদ বাতাস কিছুই ঢুকত না। এমন অন্ধকার যে দিনেও কিছু দেখা যেত না।” (জেল থেকে জেলে, পৃষ্ঠা: ৫৯)। ১৯২৪ সালে তিনি মুক্তি পেয়ে কলকাতায় কিছু দিন পর বিপ্লবী পার্টির সংগঠক হিসেবে বার্মা যান। সেখানে তিনি রেলওয়ের একাউন্টসে চাকুরি নেন। তখন বার্মার অধিবাসী বাঙালিদের ভিতরে গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠে। তিনি সেই বিপ্লবী সংগঠনের শুরু একজন উদ্যোগী কর্মী। তারপর তিনিই সেখানকার ওই বিপ্লবী গ্রুপটিকে শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলেন। বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি হলেন অন্যতম।
১৯৩০ সালে বার্মায় এক কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। এই কৃষক বিদ্রোহে জীতেন ঘোষের বিপ্লবী দল সমর্থন জানায়। বার্মা সরকার এসময় অর্ডিনেন্স জারি করে জীতেন ঘোষসহ কয়েকজন বাঙালি যুবককে গ্রেফতার করে ইনসিন জেলে পাঠায়। কিছুদিন পর তাকে রেংগুইনের একটি ডিস্ট্রিক্ট জেলে পাঠিয়ে দেয়। এখানে তার সাথে দেখা হয় পশ্চিমবঙ্গের প্রসিদ্ধ বিপ্লবী হরিনারায়ণ চন্দ্রের সাথে। যিনি ২০ বছর সাজা নিয়ে পাঁচ বছর ধরে জেলে রয়েছেন। ১৯৩১ সালে তিনি মুক্তি পান।
মুক্তির চারমাস পর তাকে কলকাতা থেকে বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ পুলিশ আবার গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠায়। তিনি এই জেলে অবস্থানকালে তিনি পুরোপুরি কমিউনিস্ট মতাদর্শ গ্রহণ করেন। সাত বছর বিনা বিচারে আঁক থাকার পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। তারপর তিনি নিজ গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য, কৃষকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বিক্রমপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবী অনেকেই তখন জীতেন ঘোষের মাধ্যমে কৃষক সংগঠনে যুক্ত হলেন। তারপর তিনি ঢাকা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য কাজ করেন। এসময় তিনি কৃষকদের সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ পান।
১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করেন। ব্রিটিশ সরকার এই কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে। সেদিন কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীরা ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে। কমরেড নেপাল নাগ ও নরেশ গুহ, বঙ্গেশ্বর, ফুী গুহ, প্রমথ নন্দী, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, জ্ঞান চক্রবর্তী, সুশীল সরকার, জীতেন ঘোষ প্রমুখ এই সম্মেলনের নেতৃত্ব দেন। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন অগ্নিযুগের বিভিন্ন বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য। এসময় ১৭ জন কমিউনিস্ট নেতার সাথে আবার তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৪১ সালের শেষের দিকে মুক্তি পান। মুক্তির পর তিনি মুন্সিগঞ্জ মহকুমায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৪২ সালে পুনরায় গ্রেফতার এবং প্রায় এক বছর পর মুক্তি লাভ করেন।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ থেকে বিক্রমপুরের মানুষকে বাঁচাতে জীতেন ঘোষ অমানুষিক পরিশ্রম করেন। তিনি দুর্ভিক্ষের সময়ে চাঁদা তুলে বিক্রমপুরে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বিক্রমপুর তাঁতি ও জেলেদের মধ্যে কো-অপারেটিভ সোসাইটি গড়ে তোলার ব্যাপারে তার উদ্যোগ ও শ্রম তুলনাহীন।
১৯৪৭ সালে জীতেন ঘোষ ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে পাক-পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে। আর কি করার বরাবরের মতে জেলে নিম্নকর্মচারী ও সহবন্দীদের নিয়ে রাজনৈতিক পড়াশুনার স্কুল চালু করলেন। মানুষের মুক্তি কিসে, কিভাবে এবং এক্ষেত্রে কার কী করণীয় এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত পড়াশুনা হতো। জেলের সাধারণ কয়েদিরা তার সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালের শেষ ভাগে মুক্তি পান। ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এক কৃষক সমাবেশের মাধ্যমে কৃষক সমিতির সভাপতি হন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সম্পাদক হন জীতেন ঘোষ। ওই বছর অক্টোবর মাসে জীতেন ঘোষকে গ্রেফতার কওে, ১৯৬২ সালে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক সংগঠনের কাজে যুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে জীতেন ঘোষ ও হাতেম আলী খান একসঙ্গে ওসমান গনি রোডে কৃষক সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জীতেন ঘোষ থাকতেন ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির অফিসে (১৫৪/এ রেবতী মোহন দাস রোড, সুত্রাপুর)। সন্তোষ গুপ্তও মাঝে মাঝে ঢাকায় এলে কোনো কোনো সময় জীতেনদার সাথে থাকতেন।
১৯৬৫ সালের মধ্যে তিনি ঢাকা জেলায় একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন। ওই বছর সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার কিছু দিন পর আবার তাকে জেলে যেতে হয়। কারণ পাকিস্তান সরকার তাকে জেলের বাইরে রেখে স্বস্তি পাচ্ছিল না। ১৯৬৯ সালে গণ অভ্যূত্থানের সময় মুক্তি পান।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে বস্ত্র, টাকা ও খাদ্য সংগ্রহ করেন। ১৯৭৫ সালে রেকর্ড বর্গার অধীনস্থ আন্দোলন শুরু করেন। হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে এই আন্দোলনে জয়যুক্ত হলে দেশের ১৫ হাজার কৃষক জমির পূর্ণ মালিকানা লাভ করে। জীতেন ঘোষ ১৯৭৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান।
লেখক : সম্পাদক, বিপ্লবীদের কথা
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন