বাজেটে উন্নয়নের মূলশক্তি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী যেন উপেক্ষিত না হয়
আবিদ হোসেন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কৃষকের আকাঙ্ক্ষা ছিলো বিস্তর। অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর টিকিয়ে রাখার মূল শক্তি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী কৃষকদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ‘কৃষি সংস্কার কমিশন’ গঠন করা জরুরি ছিলো। কিন্তু শ্রমজীবী কৃষকের ফসল উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার বা বৈষম্য নিরসনে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। কৃষক আশা করেছিল-চলতি মৌসুমে বোরো ধান বিগত সময়গুলোর চেয়ে বেশি পরিমাণে ক্রয় করবে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের দাবি ছিল মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ২০% বা ৫০ লক্ষ টন বোরো ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করার।
কিন্তু সরকারের মাত্র ৫ লাখ টন ধান আর ১২ লাখ টন চাল ক্রয়ের ঘোষণা কৃষকদের চরমভাবে হতাশ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কৃষক তার ফসলের লাভজনক দাম থেকে বঞ্চিত হবে। প্রকারান্তরে সিন্ডিকেট চালের ব্যবসায়ীদের স্বার্থক্ষার জন্যই সরকারের এই সিদ্ধান্ত।
কৃষক কষ্ট করে উৎপাদন করে ধান। ফড়িয়া আর দালালদের মাধ্যমে চাতাল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে নামেমাত্র দামে ধান নিয়ে চাল তৈরি করে কম দামে সরকারি গুদামে ও খোলা বাজারে বিক্রি করে। সরকার প্রতিবছর জেলাভিত্তিক তালিকাভুক্ত চালকল থেকে চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। চালকলের মালিকরা সিন্ডিকেট হয়ে অধিক মুনাফার জন্য বোরো এবং আমন মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে চালের সংকটকালে খোলা বাজারে বিক্রি করে। একদিকে ধান ক্রয়ের জটিল পদ্ধতির কারণে কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে আগ্রহী না হয়ে বাধ্য হয়ে কম দামে নগদ টাকায় ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অপরদিকে মাফিয়া চাল ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে বেশি দামে তাদের সুবিধা মতো খোলা বাজারে চাল বিক্রি করে। ফলে প্রতি বছরই সরকার ধান এবং চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এভাবেই চাতাল মালিক আর চালের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। আমেরিকার সাথে বানিজ্য চুক্তি আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
সরকার চাল এবং ধান ক্রয়ের পরিমাণগত বৈষম্যের মধ্যদিয়ে মূলত ব্যবসায়ীদের স্বার্থকেই রক্ষা করে। কৃষকের কাছ থেকে কম পরিমাণে চাল ক্রয়ের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধান থেকে চাল ভাঙানোর ব্যবস্থা সরকারের নেই, তাছাড়া ধান সংগ্রহ করে গুদামজাত করার ব্যবস্থাপনাও পর্যাপ্ত নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যগুদাম, হিমাগার নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। বিগত পতিত সরকার খাদ্যগুদাম নির্মাণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্প শেষ করার মেয়াদকাল বারবার বৃদ্ধি করে এবং সেই প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করে মূলত জনগণের টাকা লুটপাট করে। প্রকল্পের মেয়াদকাল শেষ হলেও ব্যবহার্য অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান হয় নাই। সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সরকারের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন চালকল ও চাতালের গুদামগুলোতে কৃষকের কাছ থেকে সরকারের ক্রয়কৃত ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চাতাল কলে কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করে সরকারের ধান ভাঙানোর উদ্যোগ দিতে হবে। বিআইডিএস ২০১৯ সালে এক গবেষণায় প্রকাশ করে যে, দেশে নিবন্ধিত চাল মিল ও চাতাল আছে প্রায় ২০ হাজার, অনিবন্ধিত আরও বেশি। কিন্তু দেশে সারা বছরে যত চাল কেনাবেচা হয়, এককভাবে তার সবচেয়ে বড় অংশ এখন প্রায় ৫০টি বড় চালকল প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে। এই অটো রাইস মিলের প্রতিটি প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন চাল উৎপাদন করে। মূলত তাদের নিজস্ব গুদামে থাকা ধান ভাঙিয়ে তারা ওই চাল উৎপাদন করে থাকে। এই বড় কর্পোরেট চালকলগুলোই সিন্ডিকেট হয়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ধানের ভরা মৌসুমে সরকারের খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভারতে সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ধান ক্রয় করে ব্যক্তি পর্যায়ে চাতাল কলের গুদামে সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে খাদ্য সংকটকালে সেই ধান ভাঙিয়ে খোলা বাজারে বিতরণের ব্যবস্থা করে ভারতের সরকার। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ লক্ষ টন। আমাদের দেশেও চলতি বোরো মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ২০% বা ৫০ লক্ষ টন বোরো ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করার বাজেট থাকতে হবে। আগামী বাজেটে সরকারিভাবে চালকল চালু করার অর্থ বরাদ্দ করে দ্রুতই বাস্তবায়ন করতে হবে।
দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার এদেশের কৃষকদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা ও বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের অবিলম্বে কতিপয় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ঘোষণা থাকলেও প্রকৃত উৎপাদক কৃষকের কৃষি কার্ড না থাকা এবং ধান ক্রয়ের জটিল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রয় করতে পারে না। কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে আগ্রহী হন না। এই কারণে প্রতিবছরই সরকার তার খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
সরকার নির্বাচনের পরপরই ঘোষণা করেছে কৃষকদের কৃষি কার্ড বিতরণ করবে। গত পহেলা বৈশাখ টাঙ্গাইলে এই কার্যক্রম শুরুও হয়েছে। বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সকল কৃষককেই এই কৃষি কার্ড বিতরণ করবে এবং কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের প্রণোদনা দেবে।
বিগত সরকারের আমলে গ্রহণ করা সরকারি প্রণোদনা এবং অন্যান্য কৃষি পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩২১টি কৃষক পরিবারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। এই প্রকল্পের অধীনে বিগত সরকার কৃষকদের কৃষি সহায়তার জন্য মাত্র ১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার কৃষি কার্ড বিতরণ করেছে বলে সরকারি তথ্যসূত্রে জানা যায়। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, যাদের কৃষি কার্ড দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষির সাথে সম্পৃক্ত নয়। বিগত দিনে কৃষি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে নিছক রাজনৈতিক বিবেচনায়। প্রকৃত কৃষকদের এই কৃষি কার্ড থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলের ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পটির কার্যক্রম এখন কোন দশায় আছে- বর্তমান সরকারের তা খতিয়ে দেখে জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
ভূমিহীন কৃষকসহ প্রকৃত উৎপাদক কৃষকদের কৃষি কার্ড বিতরণ করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র চালু করে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে। সার, বীজ কীটনাশক, সেচসহ ফসল উৎপাদন উপকরণের দাম কমাতে হবে। কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি দিতে হবে। চাতাল কল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষক ও ভোক্তা সমবায় বাজার চালু করতে হবে। সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকদের পর্যাপ্ত সার দিতে হবে। বিএডিসি সক্রিয় করতে হবে। পল্লী রেশন ও শস্য বিমা চালু করতে হবে। স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দিতে হবে। কৃষকের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আমূল ভূমি সংস্কার, কৃষি জমি রক্ষা ও ভূমি আইনের জটিল প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সরাসরি উৎপাদক কৃষকের কাছ থেকে ন্যূনতম ৫০ লাখ টন ধান ক্রয় করতে হবে।
বাজেট করা হবে। সরকারের কাছে কৃষকদের প্রধান দাবি হবে- গ্রামীণ অর্থনীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা। প্রতি বছর কৃষিখাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রকৃত উৎপাদক কৃষক বাজেটের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বাজেটে বরাদ্দের অধিকাংশই নানান প্রকল্পের নামে লুটপাট করা হয়েছে।
কৃষিবিষয়ক ৫টি মন্ত্রণালয়ের (১. কৃষি ২. মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ৩. পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ৪. ভূমি ৫. পানি সম্পদ) জন্য বরাদ্দ বাজেটের প্রকল্পসহ ভর্তুকির টাকার বিরাট অংশ লুটপাট করা হয় ক্রয়ের নামে।
মোট বাজেটের আকার বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের তুলনায় এই খাতে বাজেটের প্রকৃত বরাদ্দ মোটেই বাড়ে না। আগামী বাজেটে কৃষিখাতে সরাসরি কৃষকদের স্বার্থরক্ষা করে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের মোট পরিবারের সংখ্যা ৩,৫৫,৫২,২৯৬টি। এর মধ্যে কৃষক পরিবার ১,৬৮,৮১,৭৫৭টি। মোট জনশক্তির মধ্যে কৃষিতে ৪৫.৪% নিয়োজিত থেকে এদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে।
এদেশের কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার খাদের কিনারায়। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান থেকে সরকারকে এখনই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এদেশের হাজার বছরের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস থেকে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ শক্তি সঞ্চয় করছে। কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সম্মিলিত সম্ভাব্য গণঅভ্যুত্থানের আগেই বর্তমান সরকারকে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন