পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কী যেভাবে তৈরি হয় বিদ্যুৎ?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম শুনলেই অনেকের মনে জটিল বিজ্ঞান, ভয়ংকর বিস্ফোরণ কিংবা চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার কথা ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ধারণাটি খুব কঠিন নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্র পরমাণুর ভেতরে সঞ্চিত বিপুল শক্তিতে। আর সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করেই তৈরি করা হয় বিদ্যুৎ। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, পারমাণবিক শক্তি মূলত দুটি প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হতে পারে–“নিউক্লিয়ার ফিউশন” এবং “নিউক্লিয়ার ফিশন”। নিউক্লিয়ার ফিউশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে দুটি ক্ষুদ্র পরমাণু একত্রিত হয়ে বড় পরমাণু তৈরি করে এবং বিপুল শক্তি নির্গত হয়। সূর্যের ভেতরে প্রতিনিয়ত এই প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে হাইড্রোজেন পরমাণু একত্রিত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করছে এবং সেই বিক্রিয়া থেকেই সূর্যের আলো ও তাপ উৎপন্ন হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও এই ফিউশন প্রক্রিয়াকে পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে “নিউক্লিয়ার ফিশন” বা পরমাণু বিভাজন। এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম-২৩৫ নামের বিশেষ পরমাণুকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা হয়। আঘাতের ফলে পরমাণুটি ভেঙে যায় এবং বিপুল তাপশক্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে আরও নতুন নিউট্রন বের হয়, যা আবার অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে আঘাত করে। এভাবে একের পর এক বিক্রিয়া চলতে থাকে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন “চেইন রিঅ্যাকশন”। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিক্রিয়া যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা সেই কারণেই ঘটেছিল। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই চেইন রিঅ্যাকশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ কাজের জন্য রিঅ্যাক্টরের ভেতরে “কন্ট্রোল রড” ব্যবহার করা হয়। এই রডগুলো অতিরিক্ত নিউট্রন শোষণ করে নেয়। ফলে বিক্রিয়া অতিরিক্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে না। বিজ্ঞানীরা প্রয়োজন অনুযায়ী এই রড ওপরে-নিচে সরিয়ে বিক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়ামকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করতে হয়। কারণ প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগই ইউরেনিয়াম-২৩৮, যা সহজে বিভাজিত হয় না। মাত্র শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ থাকে ইউরেনিয়াম-২৩৫। তাই বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “সমৃদ্ধকরণ”। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ইউরেনিয়ামকে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এরপর এই ইউরেনিয়াম ছোট ছোট পেলেট আকারে তৈরি করে বিশেষ ধাতব নলের ভেতরে রাখা হয়। এগুলোকে বলা হয় “ফুয়েল রড”। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আকবরের তথ্যমতে, একটি ফুয়েল রডে প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৮০টি ইউরেনিয়াম পেলেট থাকে। প্রতিটি রডের দৈর্ঘ্য প্রায় চার মিটার এবং ব্যাস প্রায় ৯ মিলিমিটার। একটি রিঅ্যাক্টরে মোট জ্বালানির ওজন ৮০ টনেরও বেশি হতে পারে। যখন রিঅ্যাক্টরে বিক্রিয়া শুরু হয়, তখন প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ দিয়ে পানি উত্তপ্ত করা হয়। তবে সাধারণ পানির মতো এটি সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে না। কারণ রিঅ্যাক্টরের ভেতরে পানি অত্যন্ত উচ্চচাপে রাখা হয়। ফলে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাতেও পানি তরল অবস্থায় থাকে। এরপর এই অতিরিক্ত উত্তপ্ত পানি অন্য একটি চেম্বারের পানিকে ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করে। সেই বাষ্প অত্যন্ত দ্রুত গতিতে টারবাইন ঘোরায়। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশাল জেনারেটর। জেনারেটরের কাজ অনেকটা উল্টো মোটরের মতো। সাধারণ মোটর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ঘোরে, আর জেনারেটর ঘূর্ণন থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। টারবাইনের ঘূর্ণনের মাধ্যমে জেনারেটরের ভেতরে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং সেটি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো–অল্প জ্বালানি থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিপুল কার্বন ডাই-অক্সাইডও তৈরি করে না। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামান্য ভুলও ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে নিরাপত্তা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..