তীব্র গরমে বাড়ছে শিশুদের রোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা স্বাস্থ্য ডেস্ক : বাংলাদেশে প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গরম, দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ভাইরাস জ্বর, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, ত্বকের রোগ থেকে শুরু করে হিট স্ট্রোক পর্যন্ত নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত তাপ, ধুলাবালি ও বায়ুদূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গরমকালে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ভাইরাসজনিত জ্বর। এ সময় শিশুর শরীরে জ্বরের পাশাপাশি মাথাব্যথা, দুর্বলতা, খাবারে অরুচি, শরীর ব্যথা ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অনেক শিশুর ঘুম কমে যায় এবং তারা অতিরিক্ত ক্লান্ত অনুভব করে। চিকিৎসকদের মতে, ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী এই জ্বর তিন দিনেও সেরে যেতে পারে, আবার কখনও ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময় শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। ঘর যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাসপূর্ণ হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। জ্বর ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। গরমে শিশুদের আরেকটি সাধারণ সমস্যা হলো সর্দি-কাশি। অনেকেই মনে করেন শীতকালেই শুধু সর্দি-কাশি হয়, কিন্তু বাস্তবে গরমকালেও এটি ব্যাপকভাবে দেখা যায়। ঘামে ভেজা জামাকাপড় পরে থাকা, দীর্ঘক্ষণ ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা অথবা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি পান করার কারণে শিশুরা সহজেই আক্রান্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের হালকা সুতির পোশাক পরানো উচিত, যাতে শরীর কম ঘামে। বিশেষ করে মাথা ও চুলের গোড়া দীর্ঘসময় ভেজা থাকলে ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা বাড়তে পারে। গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে উদ্বেগজনক রোগগুলোর একটি হলো ডায়রিয়া। দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এতে খুব দ্রুত শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যায় এবং পানিশূন্যতা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর শিশুকে বয়স অনুযায়ী খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি ডাবের পানি, ফলের রস ও তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিঙ্ক ট্যাবলেটও উপকারী হতে পারে। তবে পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। গরমে টাইফয়েডের ঝুঁকিও বাড়ে। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, শিশু টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে। শিশুদের ত্বক তুলনামূলক সংবেদনশীল হওয়ায় অতিরিক্ত গরমে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দেয়। ঘামাচি, র্যাশ, চুলকানি, ফোড়া ও অ্যালার্জির মতো সমস্যা গরমকালে খুব সাধারণ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর শরীর পরিষ্কার ও শুকনো রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুদের গোসলের জন্য খুব গরম বা খুব ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা ঠিক নয়। সহনীয় তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করতে হবে। শরীরের ভাঁজের জায়গাগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে দিতে হবে, যাতে ঘাম জমে সংক্রমণ না হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে হিট স্ট্রোক হলে। অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে হিট স্ট্রোক হয়। এ সময় শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়, তীব্র মাথাব্যথা হয়, চোখে ঝাপসা দেখা দেয়, এমনকি খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে নিতে হবে। ভারী জামাকাপড় খুলে দিয়ে বাতাস করতে হবে এবং ঠাণ্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। অবস্থা গুরুতর হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, গরমকালীন রোগ প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। শিশুদের সরাসরি রোদে কম নেওয়া, বিশুদ্ধ পানি পান করানো, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে অনেক রোগই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও বাড়তে পারে। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এখন থেকেই আরও প্রস্তুত হতে হবে। কারণ শিশুরা শুধু পরিবারের নয়, ভবিষ্যৎ সমাজেরও সবচেয়ে মূল্যবান অংশ। তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..