ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আড়াল করা এবং ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও সাবেক ছাত্রনেতারা। তারা বলেন, ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা সময়ের খেয়াল খুশির বিষয় নয়, এটি একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অর্জনের প্রামাণ্য স্মারক। সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ দেওয়া কিংবা তার চরিত্র বদলে দেওয়া নিছক কোনো সংস্কার কার্যক্রম নয়, এটি ইতিহাস বিকৃতির পরিকল্পিত উদ্যোগ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এক বিবৃতিতে বলেন, এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধিকার ও মুক্তির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ষাটের দশক থেকে শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে প্রতিটি সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসু ভবনেই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’এর নির্মম আঘাতে রক্তাক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একাত্তরের নয় মাসে অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর জীবন ও রক্ত স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে। এই গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার কোনোভাবেই মুছে ফেলা বা সংকুচিত করা যাবে না। মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নেয়ার ঘোষণাকারী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে উদীচী নেতৃবৃন্দ বলেন, যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কার্জন হলে দাঁড়িয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় স্থান দেওয়া বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একই সময়ে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও স্মারক বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলেন, যে বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেখানকার সংগ্রামের ইতিহাসকে খণ্ডিত করে জিন্নাহকে সামনে আনা শহীদদের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি চরম অবমাননা। ‘ইচ্ছা হয়নি তাই রাখিনি’এ ধরনের বক্তব্যও ইতিহাস ও জনগণের প্রতি চরম অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধাকেই প্রকাশ করে। উদীচী অবিলম্বে ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে বিতর্কিতভাবে স্থাপিত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের গণসংগ্রামের ধারাবাহিক ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস যথাযথভাবে পুনঃস্থাপনের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্মারক ও দলিল সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানাচ্ছে উদীচী। উদীচী মনে করে, একটি জাতির ইতিহাস থেকে তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অধ্যায় মুছে ফেলার চেষ্টা আসলে তার আত্মপরিচয়কে দুর্বল করার অপচেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের রক্তে অর্জিত জাতীয় উত্তরাধিকার। তাই ইতিহাস বিকৃতির যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং নাগরিক সমাজকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ডাকসু সংগ্রহশালায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের পর পুনরায় চালু হয়েছে। সংগ্রহশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাস, বিভিন্ন গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানের নানা আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে বলে সংবাদপত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি নতুন করে সংযোজন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রের উপস্থাপনে পরিবর্তনের বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিবৃতিতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সংগীতা ইমাম বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা কেবল ছবি প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় কোন ছবি থাকবে, কোন ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কী প্রেক্ষাপটে দেখানো হবে- এসব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং জনগণের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা একটি অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। একইভাবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা, তার রাজনৈতিক চরিত্র এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে তার সম্পর্কও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোনো ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করা হলে তা ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। উদীচী মনে করে, ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, ইতিহাসকে তার পূর্ণ প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করাই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং আলোকচিত্র যথাযথ মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা জরুরি। ইতিহাসের নির্বাচিত অংশকে সামনে এনে অন্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আড়াল করা হলে একটি সংগ্রহশালা তার শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী তাই ডাকসু কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে- ১. সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত সব ঐতিহাসিক ছবি ও দলিলের সঠিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তথ্যসূত্র নিশ্চিত করতে হবে। ২. ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে। ৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাবলির ঐতিহাসিক দলিল যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে। ৪. সংগ্রহশালার ভবিষ্যৎ সংস্কার ও কিউরেশনে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মতামত গ্রহণ করা উচিত। ৫. সংগ্রহশালাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার জায়গা না বানিয়ে তথ্য, দলিল, গবেষণা ও বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক স্মৃতির একটি উন্মুক্ত শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উদীচী বিশ্বাস করে, একটি জাতির ইতিহাস তার সংগ্রাম, অর্জন, ভুল, বেদনা ও প্রতিরোধের সমন্বিত স্মৃতি। সেই স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের খণ্ডিত উপস্থাপন, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা ইতিহাসের পুনর্লিখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর। জিন্নাহকে যারা স্মরণ করে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতারবিরোধী শক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতৃবৃন্দ। তারা ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে অবিলম্বে জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গৌরবের ইতিহাসকে বিকৃতি ও প্রতিস্থাপন করতে মরিয়া হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত জামাত শিবির ও তার সহযোগীরাই আজকে ইতিহাসকে পুনঃস্থাপনের মতন দুঃসাহস দেখাচ্ছে। আর এর পেছনে শক্তি যুগিয়েছে বিগত ইউনুস সরকার। নেতৃবৃন্দ, অবিলম্বে এই চিহ্নিত শক্তির বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান। তারা আশংকা ব্যক্ত করে বলেন, এদেরকে এখনি শক্ত হাতে প্রতিহত না করলে তারা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করতে আরও মরিয়া হবে, এখনি সময় তাদের রুখে দেয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের এই হীন চক্রান্ত রুখে দেয়ার আহবান জানান তারা। বিবৃতিতে সাক্ষরদানকারীরা হলেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রুহিন হোসেন প্রিন্স, আসলাম খান, হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, হাসান তারিক চৌধুরী সোহেল, শরিফুজ্জামান শরীফ, লুনা নূর, সামছুল আলম সজ্জন, খান আসাদুজ্জামান মাসুম, মানবেন্দ্র দেব, ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল, এস এম শুভ, হাসান তারেক, লাকী আক্তার, জিএম জিলানী শুভ, মেহেদী হাসান নোবেল, ফয়েজউল্লাহ, দীপক শীল প্রমুখ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..