সুভাষ মুখোপাধ্যায় : চেতনা ও শিল্পসৌকর্যের কবি
গোলাম কিবরিয়া পিনু :
যে কবি তাঁর কাব্য-ভূমিকার মাধ্যমে বাংলা কবিতার এক নতুন ভূমি তৈরি করেছেন, সেই ভূমির ঔজ্জ্বল্যে বাংলা কবিতা পেয়েছে–ভিন্নমাত্রা। সেই ভিন্নমাত্রায় স্বাদ নিতে পাঠক হয়ে তাঁর কবিতা গ্রহণ করি, তাঁর কবিতার কাছে যাই। সেই কবি হলেন–কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দর্শনায় কবি জন্মগ্রহণ করেন, শৈশব কাটে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায়, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় থিতু হন, মৃত্যু হলো অবশেষে সেখানেই–কলকাতায়, ৮ জুলাই ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে।
কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী এ অন্যান্য লেখা নিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ৭০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আরও লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বিভিন্ন সংগঠন, পত্রিকা সম্পাদনাসহ নানা রকম কাজেও তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নানামুখী সংবেদনশীল ভূমিকায়ও তৎপর ছিলেন তিনি।
১৯৩৫ সালে ডিসেম্বরে ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক’-এর ইস্তেহার প্রকাশিত হয়, এরই সূত্র ধরে ১৯৩৬ সালে ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’-এর গোড়াপত্তন হয়। এর ফলে ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানস-চেতনা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হতে থাকে। ১৯৩৬ সালের ২৫ জুন কলকাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠিত হয়। এই উদ্যোগের সঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও জড়িত ছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই লেখক সংঘের প্রথম সভাপতি ছিলেন নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (১৯১৬-১৯৮৪), প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী এবং কোষাধ্যক্ষ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৯১-১৯৫৪)। এই উদ্যোগের সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন–হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নীরেন্দ্রনাথ রায়, হিরণকুমার সান্যাল, আবু সায়ীদ আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ও সমর সেন প্রমুখ।
আমরা লক্ষ্য করি যে, ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সৃজনশীল সাহিত্যে মার্কসীয় চেতনার প্রকাশ ছিল খুবই সীমাবদ্ধ। পরিচয় (১৯৩১) সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশ হলে–তা মার্কসবাদী চেতনা ধারণের অন্যতম বাহন হয়ে ওঠে। ১৯৩৯ সালের মধ্যেই অবিভক্ত বাংলায় ২৮টি জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সংগঠন গড়ে উঠলে–সমাজে সমাজতাত্ত্বিক চেতনার প্রভাববলয় বিস্তৃত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় লেখক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা জীবনবাদী প্রগতিশীল চেতনার উন্মেষ ঘটাতে থাকেন। অন্যদিকে অবিভক্ত ভারতবর্ষ তখন ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসন দ্বারা শৃঙ্খলিত ও পরাধীন। এমন সময়কালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে।
‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতার ধারাবাহিক অবস্থানে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে; শুধু সাম্যবাদী চেতনাগত দিক থেকে নয়, কবিতায় প্রকরণগত নিরীক্ষা ও শিল্পসৌকর্যের বৈশিষ্ট্যের কারণেও। উল্লেখ্য, বাংলা কবিতায় সাম্যবাদী চেতনা শুধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রথম উচ্চকিত হয়নি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়ও তা প্রবলভাবে উচ্চকিত। জীবনানন্দ দাশও এ ধারায় কবিতা লিখতে উৎসাহিত হয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন প্রমুখ কবির কবিতায়ও সাম্যবাদী চেতনার উজ্জ্বলতা আমরা লক্ষ্য করি। পরবর্তীকালে সাম্যবাদী চেতনার অভিজ্ঞান বহুভাবেই কবিতায় ও সাহিত্যে স্থান পেয়েছে।
১৯৪০ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’ যখন গ্রন্থাকারে বের হয়, তখন কবির বয়স মাত্র একুশ। গ্রন্থের কবিতাগুলো লেখা হয়েছে–১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে কবির এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই হৈচৈ ফেলে দেয়। গ্রন্থের কবিতাগুলো ছড়িয়ে পড়লো মানুষের মুখে মুখে, সাম্যবাদী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে হয়ে উঠলো এই কাব্যগ্রন্থের পংক্তিগুলো অগ্নিময় উচ্চারণ, যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরণিত করলো। যেসব সমালোচক রাজনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়ে লেখা কবিতাকে বাঁকাচোখে দেখতে অভ্যস্ত, তাঁরাও ‘পদাতিক’ এর কবিতাকে অস্বীকার না করে, বরং প্রশংসা করতে এগিয়ে এলেন।
‘পদাতিক’ প্রকাশের বছরেই কবি, সমালোচক ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু এই গ্রন্থের কবিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা লিখলেন। বুদ্ধদেব বসু লিখলেন: ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায় দুটি কারণে উল্লেখযোগ্য: প্রথমত, তিনি বোধ হয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে কাব্যজীবন আরম্ভ করলেন না। এমনকি, প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাও তিনি লিখলেন না; কোনো অস্পষ্ট, মধুর সৌরভ তার রচনায় নেই, যা সমর সেনেরও প্রথম কবিতাগুলিতে লক্ষণীয় ছিলো। দ্বিতীয়ত, কলাকৌশলে তাঁর দখল এতই অসামান্য যে কাব্য রচনায় তাঁর চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও এই ক্ষুদ্র বইখানায় শিক্ষণীয় বস্তু আছে বলে মনে করি।’ এই আলোচনায় বুদ্ধদেব বসু ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন, আলোচনা করেছেন ছন্দ ও বিষয় নিয়েও। এই আলোচনার এক অংশে যথার্থ বলেছেন তিনি : ‘জনগণের কবি’ হতে যাওয়ার এই বিপদ সম্বন্ধে সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনবহিত নন। ‘পদাতিকে’ রয়েছে সরলতার পাশাপাশি জটিলতা, নিঃসংকোচ, উচ্চ ঘোষণার পাশে-পাশে ব্যঙ্গের চাতুরি, ধ্বনির বিচ্ছুরিত আভা। সমসাময়িক অনেক কবির কাছেই তিনি পাঠ নিয়েছেন–বিশেষত বিষ্ণু দে ও সমর সেনের কাছে– কিন্তু তাঁর লেখা অন্য কারো অক্ষরের উপর মকশো-করা নয়; এত অল্প বয়সে যে নিজের একটি বিশিষ্ট রীতি তিনি নির্মাণ করতে পেরেছেন, এতেই তাঁর প্রতিভার পরিচয়।’
‘পদাতিক’ গ্রন্থের বহু সংস্করণ বের হয়েছে। প্রথম বাংলাদেশে সংস্করণ বের হয় ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার ২৬২ বংশাল রোডের ‘লালন প্রকাশনী’ থেকে। সম্ভবত এই প্রকাশনী দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এই সংস্করণে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘এ পর্যন্ত ‘পদাতিক’র বহু সংস্করণ হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম এই বই ছাপা হচ্ছে। ‘লালন প্রকাশনী’র হাতযশে যদি ‘পদাতিক’ বাংলাদেশের ব্যাপকতম পাঠকমণ্ডলীর কাছে পৌঁছায়, তাহলে আমি যে খুশি হব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমি তখন এই ভেবে তৃপ্তি পাব যে, আমার কবিতা যেখান থেকে আমি কুড়িয়ে নিয়েছিলাম আবার সেইখানেই ছড়িয়ে দেওয়া গেল।’ জন্মভূমির প্রতি তাঁর যে আকুলতা, তাঁর যে এক ধরনের হৃদয়জাত পক্ষপাত ছিল, তা সহজে অনুমেয়–শুধু এই কাব্যগ্রন্থের বাংলাদেশ সংস্করণের ভূমিকায় এটি প্রতিভাত হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির সহ-সভাপতি হয়ে জন্মভূমির ঋণ শোধে এগিয়ে এসেছিলেন কবি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি ছিলেন ভিয়েতনামে, সেখান থেকে এসেই তিনি বলেছিলেন ‘চোখের সামনে জ্বলছে আমার প্রিয় জন্মভূমি, বাংলাদেশ। বাতাসে ভাসছে আমার ধর্ষিতবোনের চিৎকার–দু’আঙুলে কান চাপা দেই। বানের জলের মতো সর্বহারা মানুষ আসছে এপারে, প্রাণ নিয়ে সম্ভ্রম বাঁচাতে। কী লিখবআমি ভিয়েতনাম নিয়ে? আমার সামনে আর এক ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ।’ প্রকৃত কবির মানববোধের উচ্চারণই সেদিন অন্তর্গূঢ়-চৈতন্যের কণ্ঠলগ্ন হয়ে জেগে উঠেছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় ক্লান্তিহীনভাবে কবিতা লিখেছেন, উপহার দিয়েছেন চেতনা জাগানো স্মরণীয় কাব্যপংক্তি। তিনি ছন্দ ও শব্দের বিচিত্র ব্যবহার করেছেন কবিতায়, কবিতার আঙ্গিক পরিবর্তনেও হয়েছেন বিভিন্ন অধ্যায়ে সফল। তাঁর কাব্য-ভূমিকা দীর্ঘতর হয়েছে, এই দীর্ঘকালে অনেক বাঁকবদল রয়েছে। তবে, তাঁর কাব্যিক জীবন-দর্শনে বিভিন্ন মোচড় লাগলেও, মূল ভূমি পুরোপুরি পরিবর্তন করে ফেলেননি।
পদাতিক কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘মে-দিনের কবিতা’– এই কবিতার পংক্তি:
‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’
এই ধরনের স্মরণীয় পংক্তির মত আরও স্মরণীয় পংক্তি ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থে রয়েছে, যেমন–
‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?
কুয়াশা কঠিন বাসর যে সম্মুখে।
লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা–
দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে,
কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?’
‘পদাতিক’র পর ‘চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা রচিত হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এই কাব্যগ্রন্থে ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহের আরও সংহত ও উজ্জ্বল রূপ আমরা পাই। যেমন–
‘পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে
হুজুর, জেনে রাখুন
খাজনা এবার মাপ না হলে
জ্বলে উঠবে আগুন।’
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আর একটি কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিকোণ’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে আবেগ ও সরলীকরণ অনেকটা সংহত বাক্যে স্ফূর্তি লাভ করে। যেমন :
‘লক্ষ লক্ষ হাতে
অন্ধকারকে দু’টুকরো করে
অগ্নিকোণের মানুষ
সূর্যকে ছিঁড়ে আনে।
কোটি কণ্ঠের হুঙ্কারে লাগে
বজ্রের কানে তালা।’
পদাতিক, চিরকুট ও অগ্নিকোণের পর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ‘ফুল ফুটুক’ কাব্যগ্রন্থে ভিন্নমাত্রায় বাঁকবদলের পরিচয় নিয়ে উপস্থিত হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লেখা এই গ্রন্থের কবিতাগুলো শহর-গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনের গভীর তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনায় উন্মুখ হয়। এই সময়কালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সংসার জীবনে প্রবেশ করেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও বিভিন্নমুখী পরিবর্তন ঘটে, বিশ্বে বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাত নতুন তাৎপর্যে উপস্থিত হয়, ভারতবর্ষ স্বাধীন ও বিভক্ত হয়, কমিউনিস্ট পার্টির রণরীতি বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে পড়ে। এমন পরিস্থিতি নিয়ে কবির মানস-প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতেই পারে। কবির দায়িত্ব শুধু কবিতা লেখা নয়, যুগের সত্যকে আবিষ্কার করা, সেইসাথে সেই সত্যকে কবিতার প্রাণময়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা। এই দিক থেকে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত কবিরা–তো অগ্রগামী।
‘ফুল ফুটুক’ কাব্যগ্রন্থের ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’ কবিতায় সেই বহুল পরিচিত পংক্তি আমরা পাই–
‘ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।’
এই পংক্তিতে কবির কাব্য-ব্যঞ্জনা নতুন মাত্রা লাভ করে। আমরা পাই ‘সালেমনের মা’ নামক কবিতার পংক্তি:
‘মিছিলের গলায় গলা মিলিয়ে
পিচুটি পড়া চোখের দুকোণ জলে ভিজিয়ে
তোমাকে ডাকছে শোনো,
সালেমনের মা–’
আমরা পাই চিত্রকল্প নির্ভর পংক্তি–যে লোকটা একটু আগে গলায় দড়ি দিতে চেয়েছিল/এতক্ষণ সে বউয়ের গলা জড়িয়ে শুয়েছে (অগ্নিগর্ভ), কী এক গভীর চিন্তায়/কপাল কুঁচকে আছে/চড়িয়ালের রাস্তা (এক অসহ্য, রাত্রি), যখন ভোঁ বাজতেই/মাথায় চটের ফেঁসো জড়ানো এক সমুদ্র (সুন্দর) ইত্যাদি।
‘ফুল ফুটুক’ কাব্যগ্রন্থের পর্যায়ে এসে যে বাঁক বদলের শক্তি নিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আরও এগিয়ে যাওয়ার সৃজনশীলতা আয়ত্তে আনেন, তারই বিকশিত পথে তিনি ষাটের দশক, সত্তর দশক, আশির দশক, নব্বইয়ের দশক হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পথ হেঁটেছেন।
২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ অক্টোবর সংখ্যা ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পিছু হটো’ নামক কবিতা:
‘ঝাঁঝালো রোদে বুঁজে আসছে চোখ
মাথা ঝিমঝিম করছে
মুখ থুবড়ে পড়ার আগে
চেয়ারটা ধরে
কেউ তাকে
পেছনে হটিয়ে দিক।’
উল্লিখিত কবিতার পংক্তিতে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিজস্ব কবিতা-ভঙ্গিরই রূপ আমরা খুঁজে পাই। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ও কবিতা নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, তাতেও তাঁকে ‘পেছনে হটিয়ে’ দেওয়া সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে না, বাংলার কবিতার ঐশ্বর্যে বিকাশে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জবানীতেই শুনি তিনি কেন কবিতা লিখতেন–‘কথায় চিড়ে ভেজে না, কিন্তু মন ভেজে। অন্যের মনকে নাড়ানো যায়। তাতে কাজ হয়। কথা আর কাজের মধ্যস্থ হল মন। মনকে নাড়াতে পারলেই হাত চলে। আমি চাই কবিতা দিয়ে মানুষের হাতগুলোকে এমনভাবে লাগাতে যাতে দুনিয়াটা মনের মত করে আমরা বদলে নিতে পারি।’ [দেশ, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮] কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতা বদলিয়েছেন কিন্তু তাঁর বোধের ভিত্তি ও দর্শন আমূলে বদলে ফেলেননি, ধারাবাহিকতার সামঞ্জস্যে নিজের প্রতিকৃতি ও কবিতার প্রকৃতি গড়ে তুলেছেন। তাই তিনি দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন–
‘আমি চাই কথাগুলোকে
পায়ের ওপর দাঁড় করাতে।
আমি চাই যেন চোখ ফোটে
প্রত্যেকটি ছায়ার।
স্থির ছবিকে আমি চাই হাঁটাতে।
আমাকে কেউ কবি বলুক আমি চাই না।
কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত
যেন আমি হেঁটে যাই।
আমি যেন আমার কলমটা
ট্র্যাক্টরের পাশে
নামিয়ে রেখে বলতে পারি–
এই আমার ছুটি
ভাই, আমাকে একটু আগুন দাও।’
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন