জন্মদিনে ভাবনা
Posted: 27 সেপ্টেম্বর, 2026
কমরেড ক্বাফী রতন একদিন ফোন করে জানান যে, পার্টি থেকে আমার জন্মদিন পালন করা হবে। আমি একটু অবাক হলাম। কেননা একমাত্র কমরেড মণি সিংহ ছাড়া কারও জীবদ্দশায় জন্মদিন পালন করা হয় নাই। তাঁর তুলনায় আমার অবস্থান অত্যন্ত নগন্য। ভাবলাম পার্টি থেকে সাতবার আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হয়তবা সে কারণে আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য এই ব্যবস্থা।
আমার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায়। বাবা তখন কনজিউমার সাপ্লাই বিভাগে ইন্সপেক্টরের কাজ করতেন। ১১/এ তাঁতিবাজারের দোতালায় একটি বাসায় আমরা এবং বড় খালারা থাকতেন। এক ভাই শিশুকালে মারা যাওয়ায় বাবা-মায়ের খুব আদরের ছেলে ছিলাম আমি। সবাই খুব ভালবাসতেন। বলা যায় অতিরিক্তই আমার যত্ন করতেন।
দেশভাগ হওয়ার পর আমরা পূর্ব পাকিস্তানের আমার দাদার বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুরে চলে আসি। এরপর বাবার ঢাকায় চাকুরি হলে আমরা চামেলীবাগ আমার নানার বাসায় একসাথে থাকতে শুরু করি। এরপর চট্টগ্রামে বাবা সহকারী পরিচালক হিসেবে চাকুরিতে যোগ দেন। সেখানে প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স পরে জুবলী স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ১৯৫০ সালে বাবা বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন এবং কন্ট্রোলার ঢাক রেশনিং হিসেবে ২৩/১ তোপখানা রোডে থাকা শুরু করি। নিচতলায় অফিস, দোতালায় বাসা। ছাদের ঘরে থাকতেন আমার ফুফু, পরে জয়দেবপুর গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষায়ত্রী হয়েছিলেন। নিচে সিঁড়ির ঘরে থাকতেন আমার ছোট চাচা, পরে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসর নেন। আরেক খালাত ভাই পরে সোনালী ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫০ সালে মিশরের সুয়োজ সংকটের সময় ব্রিটিশ হামলার প্রতিবাদে আমাদের বাড়ির ব্রিটিশ কাউন্সিলে বিক্ষুব্ধ জনতা অগ্নিসংযোগ করে। একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে বাইরে গিয়ে ফিরে এসে জানলাম হরতাল শুরু হয়েছে। পাশেই সেগুনবাগিচা স্কুলে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই। পরে কাছেই ঢাকা কলেজিয়েটের শাখা স্কুলে ভর্তি হয়ে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ি। ছোটবেলায় মা আমাকে আদর্শলিপি দেখে দশবার করে লিখতে বলতেন। সদা সত্য কথা বলিও, মিথ্যা বলা মহাপাপ ইত্যাদি।
এই কথা আমার মনে গেঁথে যায়। কোনোদিন মিথ্যা বা অন্যায়ের আশ্রয় নিইনি। বিপদ হতে পারে জেনেও মিথ্যা বলিনি। এমনকি পুলিশের কাছেও না। স্কুল পরীক্ষার সময় একজন শিক্ষক যিনি আমাকে বাসায় পড়াতেন তিনি আমাকে প্রশ্নগুলোর জবাব বলে দিচ্ছিলেন, আমি কেঁদে ফেলি। পরে শিক্ষক বাবাকে বলেন- আপনার ছেলে খুব বোকা। বাবা কিছু না বলে শিক্ষককে বিদায় দেন।
আমার বাবা খুব সৎ মানুষ ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় কলরায় মারওয়াড়ী ব্যবসায়ীরা ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে আসতেন ব্ল্যাকে রেশনের চাল কিনতে। সেই সংকটে টাকা নিলে বাবা সে সময় কলকাতায় কলোনির মালিক হতে পারতেন। কলেজিয়েট স্কুলে প্রধান শিক্ষক বাড়ির নেওয়ার সময় বাংলা অনুবাদসহ সুরা এখলাস ও তখনকার জাতীয় সংগীত পাকিস্থান জিন্দাবাদ গানে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন। লেখা ছোট করতে সংক্ষিপ্ত করছি। ৬১ সালে নটরডেম কলেজে ভর্তি হই। সেখানে বিএসসি পড়ার সময় প্রথম বর্ষের ছাত্রের সাথে এক ফাদার শিক্ষক খারাপ ব্যবহার করেন। ছেলেরা সব বেরিয়ে আসে, ফাদাররা এসে বাধা দেন। তাদের সামনে ছাত্ররা, কিছু যদি হয়ে যায়। সে সময় টেডি প্যান্টের যুগ, কিন্তু আমি সবসময় পায়জামা ফানুরা পড়ে যেতাম। ছেলেরা কী হয়েছে বুঝিয়ে আমাকে বললো ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে। আমি বক্তৃতা দিয়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকলাম। আমার সঙ্গে নাভানার কামাল, জসীমউদ্দীনের ছেলে ফিরোজ আনোয়ার বাবু, গভর্নর শেরে বাংলার ছেলেসহ কয়েকজন সচিবের ছেলে যোগ দিল। তিনদিনেই দাবি মেনে নেওয়া হলো। এবং প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে একটা সংসদ গঠন করা হলো।
আমি ছেলেবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়তাম। কবি গোলাম মোস্তফার “ইসলাম ও কমিউনিজম” নামে একটা চটি বই পড়লাম। সেখানে রেফারেন্স হিসেবে মার্ক্সের পুঁজি, কমিউনিস্ট ইশতেহারের উল্লেখ পাই। কলেজের পাঠাগারে একটি বই পাই, নাম পুঁজি। সেখানে কমিউনিস্ট ইশতেহার সারারাত জেগে রুদ্ধ নিঃশ্বাসে পড়ি। লেখাটি শক্তিশালী গভীর এবং ঝড়ের গতিতে লেখা। আমি কমিউনিস্ট হয়ে গেলাম।
পরে আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে আত্মগোপনে থাকা কমরেড নাসিম আলীর সাথে যোগাযোগ হয় এবং ৬৪ সালে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করি। ৬২‘র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কারফিউ ভাঙার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি।
পার্টির সদস্য হাওয়ার আগেই আমাদের বাসায় পৌরসভার ট্যাক্স আদায় করতে আসতো, তার মধ্যে পোস্তগোলা শিল্প এলাকায় উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের মধ্যে কাজ করা শুরু করি। ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নে, তেঁজগাও শিল্প এলাকায় এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সড়কে, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, উজালা, জাহাঙ্গীর মেটালে আমি নেতৃত্বে আসি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সনে পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে আমি সম্পাদকমণ্ডলীতে নির্বাচিত হয়। কংগ্রেসেই কমরেড ফরহাদ ও অনিল মুখার্জীর সাথে আওয়ামী সরকারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিরোধ হয়। আমি ঐক্য ও সংগ্রামের নীতি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে মত দেই। মণি সিংহ, খোকা রায় অনেকেই আমার সাথে একমত ছিলেন। ফরহাদ ভাইয়ের মতে চলার জন্য পার্টিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাকশালে যোগদান, শেখ সাহেবের মৃত্যু এবং মানিক ভাইয়ের আমলে পার্টি বিলোপ ইতিহাসের এক বড় ট্র্যাজেডি।
বিলোপবাদের বিরুদ্ধে আমি প্রথম বিদ্রোহ করি। পদত্যাগ করে বিবৃতি দেই এবং সবাইকে নিয়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষে এক ঐতিহাসিক মিছিল করি। সেই দুর্দিনে আমার সঙ্গে কমরেড ক্বাফী রতনও ছিল। ১৯৯৩ সালের পরে কেন্দ্রীয় কমিটির ভেতর থেকে মুজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৩ জন সফল সংগ্রাম করে বিশেষ সম্মেলনে পার্টি পুর্নগঠন করে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে ২০১২ পর্যন্ত আমি পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। একমাত্র আমিই তিন টার্ম সভাপতি ছিলাম।
আমার মা বলতেন, ‘পার্টি থেকে তোমাকে বহিষ্কার করার পর তো তোমার কাজ বেড়ে গেছে।’ আমি বলতাম, ‘আম্মা, আগে তো পার্টি সভ্যের কাজই করতাম। এখন তার সাথে অসভ্যের কাজও করতে হয়।’ আমি আমার পার্টির যে কমরেডরা আমাকে সমর্থন করেছেন তাদের কাছে এবং যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের কাছেও কৃতজ্ঞ। কেননা বিরোধিতা না করলে আমি সংশোধন করতে পারতাম না এবং আমার সত্যটা যাচাই করতে পারতাম না। আমি উপমহাদেশের কমিউনিস্ট অন্দোলনের কিংবদন্তি আমার শিক্ষাগুরু কমরেড মণি সিংহের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। যিনি সবসময় পার্টিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
লেখক : সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি