নারীর সাজগোজ : আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদের ভাষা

Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026

আহমদ ছফা তার এক আত্মজৈবনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে বলেছেন, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী...’। তার ভাষ্যমতে, নারী শুধু দেবী নয়, নারীই ঈশ্বরী। নারীকে সৌন্দর্য (এখানে, সৌন্দর্য বলতে বাহ্যিক রূপ নয়), ভালোবাসা আর শিল্পে বাধা যায়। কারণ, নারী ভালোবাসতে জানতে, ভালো রাখতে জানে। আয়নার একপাশে সাজগোজ করা আত্মবিশ্বাসী নারী- যেমন সৌন্দর্য্যের প্রতীক, তেমনি আয়নার প্রতিচ্ছবিতে- নারী প্রতিবাদী এবং মহাশ্বেতা দেবীর ‘দ্রৌপদী’। প্রতিটি নারী বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো আয়নায় তাকান। শুধু নারী নন, পুরুষরাও আয়নায় অভ্যস্ত। মনোবিদরা মনে করেন, প্রতিটি মানুষের সৌন্দর্য এবং হাসিখুশি মনোভাব মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। নারীর সাজগোজ শুধু ব্যক্তিগত প্রতিবাদ নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী উপায়। নারীর টিপ, নারীর চোখ মনে করিয়ে দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহসের গল্প। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখের বেশি যাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নিয়মিত সাজসজ্জ্বার প্রসাধনী ব্যবহার করেন। তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে উচ্চ শ্রেণির পুরুষদের সাজগোজের তালিকায় লিপস্টিকও অন্যতম প্রসাধনী। তবে, লিপস্টিক কেবল ঠোঁট রাঙানোর প্রসাধনী বা আভিজত্য নয়। অনেকের কাছে এটি আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কারও কাছে নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি চিহ্ন। আবার কারো কারো মন খারাপের দিনে প্রিয় লাল রঙের লিপস্টিক ভালোবাসার মাধ্যম। তবে, এসবের বাইরেও লিপস্টিক প্রতিবাদের ভাষা। ১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক নারী লাল লিপস্টিক ব্যবহার করেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। দেশে দেশে নারীবাদী লড়াই-সংগ্রামে অংশ নেওয়া নারীরা রঙিন পোশাক, সাজগোজের মাধ্যমে প্রতীকী প্রতিবাদ জানায়। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কঠোর পোশাক বিধির বিরোধীতাকারী এবং নারীবাদী আন্দোলনকর্মী মাশা আমিনি নিজের সাজগোজ ও লিপস্টিককে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতেন। দেশটির মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি নারীর পোশাকের স্বাধীনতা ও ‘কট্টর হিজাব নীতি’র বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এখন সারাবিশ্বের প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী জনতার কাছে মাশা আমিনির ‘হিজাববিহীন সাজগোজ ও লিপস্টিক সম্বলিত প্রতিকৃতি (ছবি) নারীবাদী আন্দোলনের সাইনবোর্ড। লিপস্টিক শব্দটির সঙ্গে শুধু সাজগোজ, প্রেম কিংবা সৌন্দর্য নয়- যুদ্ধেরও গল্প লেখা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এক ভাষণে বলেছিলেন, লিপস্টিক মানুষের মনোবল বাড়াতে সাহায্য করে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান খলনায়ক জার্মানির শাসক অ্যাডলফ হিটলার লিপস্টিক (লাল লিপস্টিক) সহ্য করতে পারতেন না। সেময়ে লাল লিপস্টিক ছিল ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধের বিপ্লবের রং। তবে, এটা জেনে রাখা ভালো- লাল লিপস্টিক শুধু ‘পতিতাবৃত্তি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীরা ব্যবহার করতেন ব্যাপারটা এমন নয়! লাল লিপস্টিক সব শ্রেণির মানুষের সৌন্দর্যের ও লড়াইয়ের বাহক। ইতিহাসের তথ্য বলছে, মিসরীয় সভ্যতায় ব্রোঞ্জ যুগের পর থেকে লিপস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। মিসরীয় অঞ্চলের নারী-পুরুষ বিশেষ করে সংস্কৃতি কর্মীরা লাল লিপস্টিককে ‘অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেন। তারা লিপস্টিককে আধ্যাত্মিক সুরক্ষার এক অনন্য প্রতীক বলে মনে করেন। এবংকি বিষ্ময়কর তথ্য হচ্ছে- মিসরীয়দের একটা অংশ এখনো বিশ্বাস করেন, ‘মৃত্যুর পরও সাজগোজের ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে’। প্রাচীন মমি বা কবরে লিপস্টিকের উপস্থিতি থেকে ঐতিহাসিকরা এমনটাই ধারণা করছেন। লিপস্টিক এখন খুবই স্বাভাবিক একটি প্রসাধনী হলেও এর পিছনের গল্প অনেক লম্বা। লিপস্টিকের ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে মানুষ গাছের শিকড়, ফলের রস, মোম, মাটি, পাথরের গুঁড়ো ও নানা প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ঠোঁট রাঙাত। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক, মানসিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে জড়িত তারই জীবন্ত উদাহরণ লিপস্টিকসহ বিভিন্ন প্রসাধনী। তবে, নারীর সাজগোজ-লিপস্টিক শুধু ফ্যাশন, পোশাক কিংবা আভিজাত্যের পণ্য হয়ে নয়- থাকুক প্রতিবাদের ভাষা হয়ে।