সংগ্রামী নারী আয়শা খানম

Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026

নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর আয়শা খানমের জন্ম। তার বাবার নাম গোলাম আলী খান এবং মা জামাতুন্নেসা খানম। আমার জন্মও একই জেলায়। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে আমার তখনকার বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অল্প বয়সেই পরিচয় ঘটে। সে সময় আমি তার নাম শুনতে পাই। পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং দীর্ঘদিন তার সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ ঘটে। আমি যতদূর জানি যে তিনি নেত্রকোনা থেকে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ময়মনসিংহের মমিনুনেচ্ছা কলেজে ভর্তি হন। তিনি স্কুলজীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় তিনি রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ঢাকায় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে নামেন তিনি। ডামি রাইফেল হাতে ঢাকায় নারী শিক্ষার্থীদের মিছিলের যে ছবি আলোচিত হয়, তাতে আয়শা খানমও ছিলেন। এছাড়া ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন আয়শা খানম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত করেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজও করেন তিনি। স্বাধীনতার ঠিক আগে আগেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের গণসংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। সিপিবির তৎকালীন নেতৃত্বের পরামর্শে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গঠিত হয়। তখন কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। এ সময় তখনকার ছাত্র আন্দোলনের নারী নেতৃত্ব অর্থাৎ আয়শা খানম, মালেকা বেগম, প্রয়াত রাখি দাশ পুরকায়স্থ এই গণসংঠন গড়ে তোলায় উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। আমরা জানি, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের এই সময়কার যত প্রগতিশীল আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সে সবগুলোতে আয়শা খানম শুধু অংশগ্রহণই করেননি, সংগঠকের ভূমিকাও পালন করেছেন। মহিলা পরিষদের গঠনের পর থেকে তিনি বাংলাদেশের নারীমুক্তি এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমৃত্যু নিরলস পরিশ্রম দিয়ে গিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী হলেও তারা অনগ্রসরতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। এই পিছিয়ে পড়া নারীদের তৃণমূল পর্যায় থেকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আয়শা আপার নেতৃত্ব ছিল অসামান্য ও অতুলনীয়। তিনি একটি আদর্শের ভিত্তিতে নারীদের নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে আগুয়ান হয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দেশে প্রথম নারীদের গণসংঠন। এই মহিলা পরিষদকে অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে আয়শা আপা শুধু গড়েই তোলেননি, উপরন্তু তিনি এই সংগঠনকে বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। তিনি এই সংগঠনের সঙ্গে সারা বিশ্বের একটি আন্তঃসংযোগ গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ঠিক সেই জন্যই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে। দেশের নারীমুক্তির আন্দোলনে আয়শা খানমকে যেমন আগেও স্মরণ করতে হয়, তেমনি ভবিষ্যতে এই মহান নারী নেত্রীকে আন্দোলনের গতিবৃদ্ধিতে ধারণ করতেই হবে। আয়শা খানম অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। তিনি যখন বক্তৃতা করতেন, তখন সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তব্য শুনত। তার এই অসাধারণ গুণ আমাদের খুবই আকর্ষণ করত। তার বক্তৃতার সাবলীলতায় আমরা যেমন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়তাম, তেমনি তা আমাদের মধ্যে অনুপ্রেরণার জোয়ার তৈরি করত। আমরা তার সঙ্গে নারী আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলার সময়, সংগঠনের ব্যাপারে কথা বলার সময় তার বাগ্মিতার বিষয় প্রশ্ন করে শিক্ষা নিতে চেষ্টা করতাম। আমরা জিজ্ঞাসা করতাম, ‘আপা, ভালো বক্তৃতা দেওয়ার উপায় কী?’ তখন তিনি হাসি দিয়ে বলতেন, ‘ভালো বক্তৃতা দেওয়া তো কোনো সাধারণ উপায়ের বিষয় নয়। ভালো বক্তা হতে হলে তোমাকে দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো মানের জ্ঞান রাখতে হবে। এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।’ আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন তিনি আমাদের পড়াশুনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলতেন, ‘তুমি যখন পরীক্ষায় ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবে, তখন প্রশ্নের উত্তরও ভালোভাবে দিতে পারবে। তেমনি তুমি যখন মাইকের সামনে বক্তৃতা দিতে যাবে, তখন বিষয়টি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতে পারলে ভালো বক্তৃতা দিতে পারবে।’ তার এই যে অনুপ্রেরণাদায়ক পরামর্শ, বর্তমান সময়ের নেতৃত্বের মধ্যে খুবই বিরল। আসলে তার মৃত্যুতে দেশের নারী আন্দোলনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ করা কঠিন হবে। আয়শা আপা প্রচুর পড়াশুনা করতেন। তিনি যখন মহিলা পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করতেন, তখন দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তার বক্তব্য শুনে বোঝা যেত তিনি এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। শুধু তাই নয়, বিশ্বায়নের এই যুগে গোটা পৃথিবী কি গতিতে চলছে, সে সম্পর্কে তার বিশ্লেষণও খুবই জ্ঞানগর্ভ এবং গভীর ছিল। তার এই পড়াশুনার যে চর্চা, সেটার ব্যাপারে এখনকার নারী আন্দোলনের প্রজন্মের মধ্যে অনেক ঘাটতি আছে। আমাদের দেশের নারীদের পরিবারের মধ্যে অনেক ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং পশ্চাৎপদ ধারণার শিকার হতে হয়। তিনি এজন্য নারীদের পরিবারের দিকে তাকাতে বলতেন। তিনি বলতেন, ‘তুমি যদি তোমার পরিবারের দিকে তাকাও, তাহলে দেখতে পাবে যে নারী-পুরুষের বৈষম্য সেখানেই বিদ্যমান। তাই তুমি যদি তোমার পরিবারকে এই ধারণাগুলো থেকে উত্তরণ ঘটাতে সচেষ্ট হও, তাহলে এক সময় সমাজ ও দেশকে পরিবর্তন করতে পারবে।’ তিনি এভাবে আমাদের বিভিন্ন সময়ে দিকনির্দেশনা দিতেন। আয়শা আপার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তার সুদুরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা। তিনি ১৯৮০ সালে বসে ২০২০ সালে নারীর অবস্থা কেমন হতে পারে, সেই চিন্তা করার ক্ষমতা রাখতেন। এই অবস্থায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কীভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা নিতে পারে, সেই দিকনির্দেশনা তিনি দিতে পারতেন। তার মতো একজন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ সংগঠকের মৃত্যুতে দেশের নারীমুক্তি এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।