নিষ্ঠাবান ডা. মহবুবর রহমান
Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026
ডা. মহবুবর রহমান ছিলেন ব্যক্তিত্ববান-সৎ এক গুণী মানুষ। রাজনৈতিক জ্ঞান আহরণ, অধ্যয়ন এবং চর্চা ছিল তার দৈনন্দিন জীবনচারণ, প্রয়োগ ছিল বিশেষ তত্ত্বগত। রাশভারী ব্যক্তিত্ববান হয়েও তিনি ছিলেন সামাজিকভাবে সুবেদিত ও গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা মহবুন ভাই (ডা মহবুবর রহমান)-এর সাথে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হতে থাকি। এই পরিচিতি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মহবুন ভাই’র পরিবারের সাথে আমাদের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও যাতায়াত অদ্যাবধি অবারিত। মহবুব ভাইয়ের স্ত্রী শিরী দি-কে আমরা সম্বোধন করতাম ভাবি বলে, আবার আমাদের মধ্য থেকে অনেকেই ডাকতেন শিরী আপা বলে। মহবুব ভাই’র পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজন সবাই রাজনৈতিক সচেতন। এই পরিবারটা খুলনার গোটা অঙ্গনে পরিচিত এবং প্রভাবিত। খুলনার মুকুটহীন রাজা সুপরিচিত রাজনীতিক প্রয়াত আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস ভাবির বড় ভাই। প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের ধারার রাজনীতিক অঙ্গনসহ এই পরিবারগুলো খুলনার সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিশু-কিশোর আন্দোলনসহ সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান ছিল। ড. মহবুবর রহমান তাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। ডা. মহবুবর রহমান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসেসিয়েশন (বি এম.এ) খুলনা জেলা শাখার সভাপতি এবং কেন্দ্রের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি খুলনাসহ গোটা দেশের চিকিৎসকদের সুপরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, চিকিৎসা গ্রহণ করে তার কাছে পেতেন আস্থা-নিরাময়। গরিব রোগীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিতেন না, পক্ষান্তরে ফ্রি ওষুধ দিয়ে দিতেন। বেশি ফ্রি ওষুধ পেয়েছি আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা। তবে শ্রমিক কমরেডরাও বঞ্চিত হতেন না বিনামূল্যে সেবা ও ওষুধ থেকে।
তিনি পরিশ্রমী জীবনকে ভালবাসতেন। বিশ্বাস করতেন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক গতি পাবে সম্মুখপানে। মানুষে মানুষে থাকবে না বিভেদ। কৃষি, শিল্প ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ হবে দেশ। লাখো শহীদের আত্মদানে মুক্ত স্বদেশ হয়ে উঠবে সোনার বাংলা। ডা. মহবুবর রহমান সিপিবি খুলনা জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’র কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য ছিলেন। কথা-বার্তা চাল-চলনে তিনি যেমন নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতেন তেমনই সময়ের প্রতি ছিলেন যত্নবান। তিনি নিয়মতিভাবে পার্টির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন আবার যত্নসহকারে যথার্থভাবে রোগীদেরও সময় দিতেন। মুনাফা নয়, বরং সেবার ব্রত নিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম করতেন। তত্ত্বগত দিক (পার্টির ক্লাস নিতেন) ডা. মহবুবর রহমান শ্রমিক-কৃষকদের আলাদাভাবে নিতেন। আমরা ছাত্ররা তার কাছ থেকে পৃথক ও বৈঠকি জ্ঞান পেতাম। তত্ত্বগত ক্লাসসমূহ তিনি খুব কুশলীভাবে পরিচালনা করতেন। এ বিষয়ে পরবর্তী ক্লাসে আমরা প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম, যে কারণে মহবুব তাই জবভবৎবহপব বইপত্রের নাম ও চ্যাপ্টার বাতলে দিতেন। ডা. মহবুব শিশু-কিশোর সংগঠনে খেলাঘরের খুলনা জেলার উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি খুব যত্নসহকারে সাংগঠনিক বিষয়ে ৪টি মতামত ও পদ্ধতি বলে দিতেন। এই সময়কালে খুলনাতে খেলাঘর সাংগঠনিকভাবে বিস্তার লাভ করে এবং সকল মানুষের নজর কাড়ে, প্রশংসিত হয়। ডা. মহবুবর রহমান খুলনা জেলা উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং উদীচীর মাধ্যমে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতেন। তিনি উদীচীতে সময় দেয়ায় খুলনা উদীচী নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকেও সমহিমায় আপামর গণমানুষের মাঝে ব্যাপক পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
মহবুব ভাই বাগান করা, বাগানে ফুল ফোঁটানো এবং পশু-পাখি পালনে বেশি আনন্দ পেতেন। বাগানের ফুলের ছবি তুলে তৃপ্তি বোধ করতেন। বই ছিল তার বিশেষ সঙ্গী। দুপুরে খাবারের পরে, রাতে ঘুমানোর আগে এবং যে কোনো সুযোগে তার হাতে উঠে আসতো বই। বই-এর মধ্যে নিজেকে নিবিষ্ট করে মহৎ থেকে মহত্তর হয়েছেন। মহবুব ভাই-এর বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য বই তিনি রতন সেন স্মৃতি পাঠাগারে দান করে যান। পাঠাগারের বইয়ের বিশাল সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে। বই-এর সাথে সাথে বই রাখার আলমারিও তিনি দান করেছেন।
ডা. মহবুবর রহমান বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি খুলনা জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘকাল। খুলনার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এইসব সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন মহবুব ভাই-এর কারণে। মহবুব ভাই কর্তৃত্বময় দায়িত্ববান হয়েও নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। আত্মপ্রচারবিমুখ এই সত্তা নিয়ে আপন আলোয় উদ্ভাসিত থাকতেন। তার কর্মকাণ্ড ঘিরে অবস্থানরত মানুষগুলোকে আশ্রয় দিতেন সযত্নে। তার অধীনস্তদের দেখতেন মানুষ হিসেবে-স্বজন হিসেবে। মেয়ে ডা. সানিয়া তাহমিনা ঝরা, জামাতা অ্যাড. জোয়াদ আল-মালুম এবং ছেলে ডা. মনসুর হাবীব তনু এবং তার পুত্রবধূ ডা. রীনা শাদ ফেরদৌসীর ইচ্ছা ও পীড়াপীড়িতে খুলনা ছাড়তে বাধ্য হন এবং কয়েক বৎসর যাবৎ ঢাকায় ছেলের বাসায় বসবাস করেছিলেন।
সময়কালে খুলনার বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রয়াত মানিক সাহার পরিবার মহবুব ভাই’র খুলনায় বাসায় অবস্থান করছিলেন কোনোরকম বিনিময় ছাড়া। এখনও ওই বাসায় তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কর্মচারী আশুতোষ বসবাস করছেন বিনিমিয় ব্যাতিরেকে। নিচের ফ্লোরটায় উদীচী খুলনা জেলা শাখার কার্যালয়। উদীচী এবং খেলাঘর কার্যালয়ের পাশাপাশি অবস্থান। প্রবেশ করলেই মনে হয় কলকাকলীর আনন্দ নিকেতন। মহবুব ভাই ২০০১-এর শেষ দিকে খুলনা ছেড়েছেন আর সম্প্রতি ছেড়ে গেলেন আমাদের। তার অতিপ্রিয় খুলনায় আনন্দধামে বইয়ে শোকের ছায়া। খুলনার প্রগতিশীল অঙ্গনে বইছে এক গভীর শূন্যতা। কমরেড রতন সেনের মৃত্যু, মানিক সাহার মৃত্যু, নূরুজ্জামান বাচ্চুর মৃত্যু, আবু মোহাম্মদ ফেরদৌসের মৃত্যু এবং সম্প্রতি সাইফুল হক ছিপুর আকস্মিক মৃত্যুর পর ডা. মহবুবর রহমানের চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হয় খুলনার প্রগতিশীল অঙ্গনে। মৃত্যুর পর খুলনার উদীচী, খেলাঘর, রতন সেন পাঠাগার সব সময়ই মহবুব ভাইয়ের বুদ্ধি-পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়ে আসছিল। এখন মহবুব ভাইকে হারিয়ে বড় একটা শূন্যতা আর ‘নাই’-এর মধ্যে আবর্তিত খুলনা। খুলনার নাগরিক শোকসভাতেও ওই একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেল সব বক্তার অক্রমাখ্য কথামালায়।
ডা. মহবুব রহমান একজন ভাষাসৈনিক। ভাষা আন্দোলনে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সত্য উপলব্দিতে তিনি রাজনীতির নবধারায় উজ্জীবিত হন। ডা. মহবুব রহমান চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে সেবা হিসেবে নিয়েছিলেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ সামাজিকতায় তিনি দেশের বহু বিশিষ্টজনের শ্রদ্ধা আর ভালবাসার মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তার এই চলে যাওয়ায় আমরা শোকাহত। তার অনন্ত চরাচরের সাথে বিছিয়ে রাখলাম আমাদের ব্যথাহত বহু হৃদয়ের শ্রদ্ধাজলি।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ছাত্রনেতা