জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য
Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026
সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট, বাংলা ১৩৩৩ সালের ত্রিশ শ্রাবণ, কলকাতা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষের বাসস্থান ছিল ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী তাদের একান্নবর্তী পরিবারেই সুকান্ত ভট্টাচার্যকে লালন পালন করেছেন। তাদের পরিবারের পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রির ব্যবসা ছিল। তাদের প্রতিষ্ঠিত সারস্বত লাইব্রেরিটি সুকান্তের বাবা দেখভাল করতেন। সুকান্তের জ্যাঠা সংস্কৃতে অসাধারণ পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। সুকান্তের মা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি সারাজীবন পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলেন। তিনি নিজে পড়তেন এবং অন্যদের পড়ায় উৎসাহিত করতেন। এভাবে নিয়মিত লেখাপড়া চর্চার মধ্য দিয়ে তাদের বাড়িতে সংস্কৃত সাহিত্যচক্র নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। এই সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার আসরকে কেন্দ্র করেই, তাদের বাড়ির শিশু-কিশোরদের মনের বিকাশ ঘটেছিল। সুকান্তের স্বভাবের মধ্যেই যে কবিসত্তা লুকিয়ে ছিল, এই পরিবেশের মধ্যেই তার উন্মেষ ঘটে। ফলে সুকান্ত ভট্টাচার্য ৯-১০ বছর বয়সেই ছড়া ও কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে সুকান্তের ১২ বছর বয়সে তাঁর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং তাঁর ছোট ভাই মহল্লার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে বেলেঘাটার দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বন্ধুদের নিয়ে ‘সপ্তমিকা’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা ও ‘সঞ্চয়’ নামে দেয়াল পত্রিকা বের করেন এবং ‘রাখাল ছেলে’ নামের গীতিনাট্য রচনা করেন। তখনই পাঠ্য বিষয়ের অতিরিক্ত নানা বিষয়ের বই পড়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের সাথে ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পাঠেও সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রচুর সময় ব্যয় করতেন। স্কুলের বাঁধাধরা নিয়মকানুনও তিনি পছন্দ করতেন না। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়াটা তার কাছে দুঃসহ লাগতো, ফলে পরীক্ষায় ফেল করতেন। এজন্য তার কোন আক্ষেপ ছিল না। বরং জ্ঞানচর্চায় তার আগ্রহ বেশি ছিল। মূলত, জীবন ও জগতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি গতানুগতিক ছিল না।
অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন ছাত্র গণসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মতাদর্শের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। এতে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার প্রতি রুষ্ট হয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করেন। ১৯৪৩ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এবং মন্বন্তর মোকাবিলায় স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে কিশোর বাহিনী গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভারতে সর্বাত্মক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে সুকান্ত ভট্টাচার্য সে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। এসময় তিনি শ্রমিক আন্দোলনেও সক্রিয় থেকেছেন। এসব কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই সুকান্ত ভট্টাচার্য একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে সব ধরনের সংগ্রামে নিবিড়ভাবে যুক্ত রেখেছেন। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্য যে জীবন উপলব্ধি লাভ করেছেন তা তাঁর কবিতা এবং লেখায় ব্যক্ত করেছেন। মার্কসীয় মতাদর্শকে ধারণ করে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তাঁর কবি প্রতিভা বিশেষ রূপ লাভ করেছে। মার্কসীয় মতাদর্শে বিশ্বস্ত থেকে তিনি মতান্ধ হয়ে যাননি, বরং মার্কসের মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গির সকল প্রবণতা তাঁর মধ্যে সজীব ছিল। তিনি অন্তরের তাগিদ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মোৎসর্গ করেছেন কাব্যচর্চা ও রাজনৈতিক সংগ্রামে। সমাজের শ্রেণিবৈষম্য মুছে ফেলার স্বপ্নচারী বিপ্লবী রাজনীতিক হয়েও তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় একজন সার্থক ও সফল কবি। রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের কাব্য সাধনায় তিনি ছিলেন নজরুলের মতই বিদ্রোহী এবং সমাজ বিপ্লবী।
সুকান্ত ভট্টাচার্য যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখন বিশ্বজুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব। বাংলায় চলছে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের চেয়েও এক ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ এবং ভারতবর্ষের আকাশে নেমে আসে পরাধীনতার কালো ছায়া। চারপাশে অনাহার, লাঞ্ছনা আর মৃত্যুর মিছিল। এমন এক কঠিন বাস্তবতা সুকান্তের কিশোর মনকে অকালেই এক অদ্ভুত ও রূঢ় পরিপক্বতা দিয়েছিল। ফলে তিনি রোমান্টিক ভাবালুতায় মগ্ন থেকে, বসন্তের কোকিল কিংবা চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতার সৌন্দর্য নিয়ে, কবিতা লেখার বিলাসিতা করতে পারেননি। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল ক্ষুধার্তের হাহাকার এবং অধিকার হারাদের অধিকার আদায়ের এক জ্বলন্ত শিখা। তিনি শুধু নিজের যন্ত্রণাকে কবিতার শব্দে রূপ দেননি, বরং সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের একেবারে প্রান্তে থাকা অবহেলিত মানুষদের, যারা সভ্যতার সিঁড়ি হয়ে অন্যদের ওপর ওঠার সুযোগ করে দেন, অথচ নিজেরা পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন, সুকান্তের কবিতা তাদের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি পঙক্তিতে আছে জরাজীর্ণ পৃথিবীকে নবজাতকের বাসযোগ্য করে তোলার মরণপণ অঙ্গীকার, আছে অত্যাচারী শোষকদের বিরুদ্ধে অপরাজেয় স্পর্ধা। আছে ‘দেশলাই কাঠি’র মতো জ্বলে ওঠার তীব্র হুঙ্কার।
যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর বাতাস যখন কালো ধোঁয়ায় ভারী হয়ে ওঠে, দুর্ভিক্ষের কালো ছায়ায় যখন মানবতা বিপর্যস্ত, তখন সুকান্তের জীবন অন্যরূপ ধারণ করে, তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—
‘আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
যেখানে দুই হাতে শৃঙ্খল আর রাজপথে রক্তের হোলি খেলা
সেখানে শান্তির বাণী শুনিয়ে কোনো লাভ নেই।’
তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য মনে করতেন শোষকের বুটের তলায় দাঁড়িয়ে শান্তির ললিতবাণী আওরানো, চরম ভন্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তিনি এই কর্দমাক্ত পৃথিবীকে সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য করতে চেয়েছেন, কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন কালজয়ী মরণপণ অঙ্গীকার। ‘চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল।’ এ কাজ সহজ ছিল না, তবু তিনি তাঁর নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও নতুনের কপালে জয়তিলক এঁকে দিয়ে ইতিহাস হতে চেয়েছেন।
অবশেষে চারদিকে যখন ভারতের স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ আর বিপ্লবের উদ্দাম কলরব, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য এবং শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য যখন দিকে দিকে অবাধ্যতার ঢেউ, তখন কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয়—
‘বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে।’
এ সময়েই সুকান্ত ভট্টাচার্য সবাইকে স্বপ্নচূড়া থেকে নেমে এসে এই বাস্তব ও কঠিন লড়াইয়ে শামিল হতে আহ্বান জানান। ক্ষুধার্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি সুকান্তকে এক পরম উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জীবন যখন এত বিবর্ণ, তখন কবিতার স্নিগ্ধতা, পদের লালিত্য কিংবা ছন্দের ঝঙ্কার, তাঁর কাছে চরম বিলাসিতা মনে হয়েছে। তাই তিনি ঘোষণা করেছেন, ক্ষুধার্ত পেটে কাব্যের রস আস্বাদন করা অসম্ভব। তাঁর প্রিয় কবিতাকে ছুটি দিয়ে, বেছে নেন গদ্যের সেই কঠিন হাতুড়িকে, যা দিয়ে ভাঙা যাবে শোষকের দেয়াল। এখানেই কবির সেই অমোঘ ঘোষণা, যা আজও বিশ্বসাহিত্যের আকাশে এক দেদীপ্যমান সত্যের মতো জ্বলজ্বল করছে—
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক,
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর বিদ্রোহের দিনপঞ্জি লেখা থামাননি। প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের বাস্তবতায় ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আমাদের কাছে কতখানি প্রাসঙ্গিক। নির্দ্বিধায় বলা যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রাসঙ্গিকতা এখনো অপরিসীম। কারণ, মাত্র ২১ বছরের জীবনে তিনি ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে তীব্র দ্রোহ ও গণচেতনার বাণী রেখে গেছেন, তা বর্তমান সময়ের যে কোনো স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অনুপ্রেরণা যোগায়। সুকান্তের কবিতা ক্ষমতার দম্ভ ও বন্দুকের নলের কাছে মাথানত না করতে শেখায়। তাঁর কবিতা দেখিয়েছে, কিভাবে তারুণ্যের শক্তিকে সমস্ত বিপত্তি ও ভয়কে জয় করার সাহস নিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং কিভাবে ভাঙতে পারে স্বৈরাচারের প্রাচীরকে। ক্ষুধার বিরুদ্ধে সুকান্তের বিদ্রোহ আজও কোটি কোটি ক্ষুধার্ত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাতে প্রেরণা যোগায়। কাজেই বাসযোগ্য, বৈষম্যহীন নতুন পৃথিবী গড়ার যে স্বপ্ন ও পথ সুকান্ত ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন, সে পথে অগ্রসর হতে পারলে, আজকের বাসযোগ্য নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
লেখক : কলামিস্ট