ঘনঘন ব্লিচিংয়ে মারাত্মক হুমকির মুখে প্রবাল
Posted: 06 সেপ্টেম্বর, 2026
প্রকৃতি ডেস্ক :
সাগরের পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বে প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ ধ্বংসের ঘটনা এতটাই ঘনঘন ঘটছে যে তা কাটিয়ে উঠে আবার আগের অবস্থায় ফেরার সময় পাচ্ছে না এই সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একদল গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক প্রবাল প্রাচীরের পরিধি এরইমধ্যে স্বাভাবিক মাত্রার নিচে নেমেছে ও তা অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বের সার্বিক সামুদ্রিক জীবনের চার ভাগের এক ভাগের আশ্রয়স্থল এসব প্রবাল প্রাচীর। আর এ প্রচীর উপকূলীয় এলাকাকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষের খাবার ও জীবিকার জোগান দেয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
দূষণ ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটা একের পর এক ‘মাস ব্লিচিং’ বা ব্যাপকহারে বিবর্ণতার ঘটনায় এদের অস্তিত্ব এখন মারাত্মক হুমকির মুখে ।
প্রায় ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি প্রবাল স্থান থেকে গেল ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে তৈরি করেছে ‘গ্লোবাল কোরাল রিফ মনিটরিং নেটওয়ার্ক’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে দুটি ব্লিচিং ঘটনার মধ্যবর্তী ব্যবধান ছিল কয়েক দশক। তবে এখন সেই ব্যবধান কেবল পাঁচ থেকে ছয় বছরে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনটির মূল লেখক ম্যানুয়েল গঞ্জালেস রিভেরো বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত সময় দিলে প্রবাল প্রাচীরগুলোর আবার আগের অবস্থায় ফেরার সক্ষমতা রয়েছে। তবে আমরা সেটুকু সময় এদের দিতে পাচ্ছি না। এখন ঘনঘন ব্লিচিং ঘটার হার দ্বিগুণ হয়েছে।’
উচ্চ তাপমাত্রার দরুন প্রবালের টিস্যুতে বসবাসকারী রঙিন বিভিন্ন শৈবাল বেরিয়ে গেলে প্রবাল তার স্বাভাবিক রং হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে, যা ‘ব্লিচিং’ নামে পরিচিত।
এসব শৈবালই প্রবালকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। এগুলো ছাড়া প্রবাল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগব্যাধি ও অনাহারে মারা যেতে শুরু করে।
ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া প্রবাল মানেই যে তা পুরোপুরি মৃত তা নয়, উপযোগী পরিবেশ পেলে এগুলো আবারও বেঁচে উঠতে পারে। তবে, এর জন্য সমুদ্রের তাপমাত্রা ঠান্ডা হওয়া জরুরি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পালাউয়ে শুরু হওয়া শীর্ষ সম্মেলন ‘প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরাম’-এর প্রেক্ষাপটে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ পেয়েছে।
এ বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ৩১’-এর আগে জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণে একত্র হয়েছেন এ অঞ্চলের নেতারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শক্ত প্রবাল প্রাচীরের পরিমাণ
গড়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে,
যা ভঙ্গুর প্রবাল বাস্তুতন্ত্রের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভারেরই প্রতিফলন।
উদ্বেগ প্রকাশ করে গবেষণার মূল লেখক গঞ্জালেস রিভেরো বলেছেন, ‘গেল ৪০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে প্রবাল প্রাচীরের পরিমাণ ২০১০ সাল পর্যন্ত মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল। তবে ২০১০ সালের পর থেকেই এতে মারাত্মক ও দ্রুত ধস নামতে শুরু করে।’
ধসের সিঁড়ি
১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক মাত্রায় প্রথম প্রবালের ‘মাস ব্লিচিং’ রেকর্ড করেন এবং ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আরও চারটি বড় ব্লিচিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা কমে গেলে প্রবাল প্রাচীরগুলো তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যেমন, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক প্রবাল পরিধি ৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা ২০১৬ সালের ব্লিচিংয়ে হওয়া ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষতি প্রায় পুষিয়ে দিয়েছিল।
তবে ২০২৩ সালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ব্লিচিংটি ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ও ভয়াবহ রূপ নেয়, যা বিশ্বের প্রায় ৭৭ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর অঞ্চলকে ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
বিষয়টিকে প্রবাল বিনাশের ‘ধসের সিঁড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন গবেষক রিভেরো।
রিভেরো সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনোর তীব্রতা বেড়ে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ রেকর্ডে পৌঁছে যাওয়ার ফলে এ বছরেই বিশ্বজুড়ে আবারও বড় ধরনের ব্লিচিংয়ের ঘটনা ঘটতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে এমনটা ঘটার আশঙ্কা বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন হুমকি, যেমন অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ও উপকূলীয় অঞ্চলের অতিরিক্ত উন্নয়ন ঠেকানো গেলে আরও ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এ বিষয়ে ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’-এর চেয়ারম্যান ডেভিড ওবুরা বলেছেন, ‘এই ধস থামাতে ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে এমন অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফেরানা সম্ভব হবে না।’