আদর্শের রাজনীতিতে উজ্জ্বল ‘দুর্গা বাবু’

Posted: 06 সেপ্টেম্বর, 2026

আমার বাবা শ্রী দুর্গা প্রসাদ তেওয়ারী। কোনো এক সময় স্কুল-কলেজ জীবনে মনে হতো, আমার চেয়েও আমার বন্ধুজগতে আরও বেশি ‘বাবা’ হয়ে উঠেছিল আমার বাবা। মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিক পড়বার জন্য বাবা যখন আমাকে নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুর থেকে ময়মনসিংহ পাঠায়, তখন একটা চিঠিতে লিখেছিল, “আমি আমার মেয়েকে পাঠাইনি। আমি পাঠাচ্ছি এক সচেতন নাগরিককে। যার জীবনে শিক্ষা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ না হয়ে ওঠে যেন। বরং এই শিক্ষা যেন তোমাকে দেশ, সমাজ ও জাতির জন্য যোগ্য নাগরিক করে তোলে।” আমি অসম্ভব প্রগতিশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে বড় হওয়া মেয়ে। ২০২৬ সালেও যখন ঘরে ঘরে পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়া ভাঙতে যুদ্ধ করতে হয়, তখন ভাবি, আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগেও আমার পরিবারে আমার মা, ঠাকুমা, জেঠিমা, দিদারা পুরুষতান্ত্রিকতাকে অনেক পেছনে ফেলে দৌড়িয়েছেন। সেরকম এক পরিবারের উচ্চ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বাবার সন্তান আমি। ২০ আগস্ট বাবার জন্মদিনে তাকে প্রণাম জানিয়ে লিখছি। বাবা সারাজীবন বাম রাজনীতি করেছেন। মৃত্যুর শেষ দিন অবধি ন্যাপের সম্মানকে বহন করেছেন আত্মায়, মননে, কর্মে এবং বিশ্বাসে। বাবা তৎকালীন সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়বার অফার লেটার পেয়ে কলকাতা গমন করেন। আমার ঠাকুমা এক চিঠিতে বাবাকে লিখেছিল, “এত বড় জমিদারি দেখবার লোক প্রয়োজন। সবাই অনেক পড়ালেখা করছে। এখানে তোমাকে প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন।” বাবা সব ফেলে চলে এল সুসং দুর্গাপুরে। আর তাঁর আজীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের ঘাঁটি দুর্গাপুর আর সেই মাটির মানুষদের ছেড়ে এক দিনের জন্যও অন্য কোথাও স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন বাবা দেখেননি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চিরায়ত নিয়মে বাবার চলে যাওয়াও সেই মাটিতেই- তাঁর আজীবনের শয্যায়, ঘুমন্ত অবস্থাতেই। কেন্দ্রীয় রাজনীতির নাম দেখানো স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের রাজনীতি বাবার আদর্শে অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল। বাবা চাইলেই কেন্দ্রে এসে বড় বড় চেয়ারে বসে বাগ্মিতার রাজনীতি করতে পারত। কিন্তু বাবাকে টানত তৃণমূলের মানুষ। অসহায়, নিঃস্ব, হতদরিদ্র লোকেরা, যাদের তাকে প্রয়োজন। বাবা তো এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক আগেই দুর্গাপুরবাসীর কাছে ‘দুর্গা বাবু’ হয়ে উঠেছিল। আমার সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই এক কৌতূহল ছিল, ‘দুর্গাপুর’ এর নাম বোধহয় ‘দুর্গা বাবুর’ নামেই। কারণ পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য লোকের এই প্রশ্ন তাঁদের কৌতূহলী করে তুলত। করাটাও স্বাভাবিক। বেঁচে থাকা অবস্থায় এই দুর্গা বাবুর বাড়ি ঘিরেই দুর্গাপুরের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হতো। বাবার রাজনৈতিক আদর্শ খুব উচ্চমানের ছিল বলেই বাম-ডান কোনো বিভেদ তিনি তাঁর বাড়ির সীমানায় আসতে দেননি। সকল রাজনীতির একত্রে বসবাস ছিল এই দুর্গা বাবুর বাড়িতে। স্কুল, কলেজ, মন্দির, মসজিদ, ব্যক্তি থেকে শুরু করে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সকল প্রতিষ্ঠানে সম্মানের মর্যাদায় এই মানুষটা অধিষ্ঠিত ছিলেন-সকল ভেদাভেদ ও মতবিরোধের ঊর্ধ্বে। ব্যক্তিজীবনে এক নিঃস্বার্থ মানবপ্রেমিক ছিলেন আমার বাবা। ছোটবেলা থেকে আমরা দেখেছি তথাকথিত ব্রাহ্মণ সমাজের নিয়মতান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে ছিল আমাদের পরিবার। মনে হতো, দুর্গাপুরের খেটে খাওয়া নিঃস্ব, অসহায় মানুষের এক শেষ আশ্রয় ছিল দুর্গা বাবুর বাড়ি। সাধ্যের গণ্ডিতে থেকে অসহায়, দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে মানসিক দৃঢ়তা প্রদান করে জীবনের এক নতুন রূপ দেখানোর মানুষ ছিল আমার বাবা। আমাদের বিশাল বাগানবাড়ি। পরবর্তীতে শুনেছি, অনেক বড় বড় লোক তাঁদের বিভিন্ন লেখায় বা কলামে এই বাড়ির বর্ণনাও দিয়েছেন। এই বাড়িতে ভোরের আলোর ফুটতে শুরু করলেই মানুষের আনাগোনার শব্দ পাওয়া যেত। বাবা ঘুম থেকে উঠে টিনের চালওয়ালা চারপাশ উন্মুক্ত মধ্য উঠানে করা বৈঠকখানায় এসে বসতেন রবীন্দ্রনাথের মতো। আর মানুষ সকলে তাঁদের আবদার, চাওয়া-পাওয়া, জমানো সুখ-দুঃখের গল্পগাঁথা নিয়ে এসে লাইন ধরে তাঁর চারপাশ ঘিরে বসত। বাবা সব শুনতেন। চেতন-অচেতন সবভাবেই লোক ভাবত, এই মানুষটা বোধহয় কোনো না কোনো সমাধান নিয়েই বসেছেন। নিরাশ হয়ে এই বাড়ি থেকে কেউ ফেরেনি। আর এই বিশাল সামাজিক, রাজনৈতিক আর ব্যক্তিজীবনের চিরকালীন সঙ্গী ছিল আমার মা। স্বামী হিসেবে আমার বাবাকে পাওয়ার চেয়েও বেশি একজন আদর্শবান ব্যক্তি হিসেবে বাবাকে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত আমার মা। কোনো রকম বিরক্তি কিংবা অবহেলাকে দূরে ঠেলে মানুষকে ভালোবাসার এক অকৃত্রিম মনোবাসনাকে সঙ্গী করে আজীবন আমার বাবার সত্যিকারের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে ছিলেন আমার মা। যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত, মতামত, বক্তৃতা, মিটিং কিংবা পরিস্থিতির আগেই বাবার সবচেয়ে বড় সাহসের সঞ্চারিণী ছিলেন মা। এ এক অভূতপূর্ব সংগ্রামী ভালোবাসার বৈবাহিক নিদর্শন আমার মা-বাবা। উপমহাদেশের মহান রাজনীতিবিদ কমরেড মণি সিংহের সহযোদ্ধা ছিলেন বাবা। তৎকালীন সেই রাজনীতির কী সৃজনশীল এবং ত্যাগী তাৎপর্য, তা আমাদের এখনকার প্রজন্ম অনেকটাই দেখতে পায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মৃত্যু অবধি মণি সিংহ মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাবা। অনেক সময় অনেক রকম সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাবাকে নানা মতামত ও বাক্যবাণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সেইসব পরিস্থিতি তার বিশালাকার মহান দৃষ্টিভঙ্গি আর ব্যক্তিত্বের কাছে একান্তই তুচ্ছ বলে গণ্য হতো। কারণ তার কাছে আদর্শের উপরে কিছু স্থান পায়নি। ‘মণি মেলা’ ছিল আমাদের বাড়ির সৌন্দর্য। সারা দেশ থেকে আসা অনেক নেতা-কর্মীদের সাদরে গ্রহণ করা এবং এই বাড়িতে তাঁদের যথাযথ আপ্যায়নের গুরুভার বাবা বহন করতেন। অনেক বড় বড় নেতা আমাদের বাড়িতে এসেছেন, খেয়েছেন, থেকেছেন এবং পরবর্তীতে তার বর্ণনাও করেছেন আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সহিত। বাবার সূত্রেই ছোটবেলা থেকে আমাদের অনেক মহান মানুষের সান্নিধ্যে বড় হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এই সান্নিধ্য আমাদের বেড়ে ওঠাকে প্রভাবিত করে আর অনেক মহিমান্বিত করে। নীচুতাকে দূরীভূত করে মানসিকতার উদার দ্বার উন্মোচন করে। বাবার সমসাময়িক অনেকেই তাই সম্পর্কে আমার কাকা, মামা, দাদা হন। ব্যক্তিজীবনে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ সেই সব সান্নিধ্যের জন্য, যারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বেড়াজাল থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করে তাকে মানুষের করে তুলেছিলেন। আমি রসায়নের মতো বেরসিক বিষয়ের ছাত্রী হওয়া সত্বেও বাবা আমার জীবনকে রাজনীতি আর উদারতা দিয়ে গেঁথে গেঁথে অনেক বেশি উন্মুক্ত আর উদার করে তুলেছিল। একমাত্র মেয়ে হিসেবে অনেক বেশি দায়িত্বের ভার বহন করে চলতাম দুর্গা বাবুর মেয়ে হিসেবে। এখনও তাই করি। অন্তত বিশাল পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার একদিকে রেখে, আদর্শের সাথে আপস না করার দৃঢ়তাকে রক্তে বহন করে চলি। কারণ সেটা বাবার শিক্ষা- “আদর্শের সাথে আপোস কোরো না। যে কাছে আসার সে আসবে। যে না আসার, তাকে দূরে থাকতে দাও।” আমার বান্ধবীদের কাছ থেকে আমি শুনতাম, তারা বলত, “তুই আমাদের থেকে আলাদা। আমাদের বাবা এভাবে আমাদের স্বাধীন আর দৃঢ়চেতা হতে দেয়নি।” আমার এই লেখার একটা বিশেষ উদ্দেশ্যই ছিল এই বিষয়ে আলোকপাত করা। তিন ভাইয়ের এক বোন আমি। আমিই বড়। ছোটবেলা থেকে আমি কখনও ‘মেয়ে’ হয়ে বড় হইনি। বড় হয়েছি ‘মানুষ’ হয়ে। বাবা আমাকে চিঠি লিখত, আমি যেন নির্ভীক মানুষ হই। আমি যখন হোস্টেলে থাকতাম, বাবা কখনও কোনোদিন আমার শারীরিক কিংবা খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নেয়নি। বরং চিঠিতে খোঁজ নিত, আমি রাজনৈতিক আর সামাজিক আদর্শ ধরে রাখছি কিনা। রাজনৈতিক জীবনকে পিছনে ফেলে দিচ্ছি কিনা। রাতদিন কিংবা সামাজিকতার ভয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে আপোস করছি কিনা। বলতেন, “মাথা উঁচু করে হাঁটো। মানুষের জন্য হাঁটো। মানবতার জন্য হাঁটো। ভয় মানুষকে পিছিয়ে রাখে। কোনো রকম তুচ্ছ সামাজিকতা আর ভয়কে আশ্রয় দিয়ো না। তুমি দুর্গা প্রসাদ তেওয়ারীর মেয়ে।” আমি সেই আদর্শের বীজ আমার সন্তানদের মধ্যেও বপন করেছি। সমসাময়িক বেড়ে ওঠার সাথে ভিন্নতা রয়েছে ওদেরও। মানুষ যখন সত্যিকারের স্বাধীনতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনায় বড় হয়, তখন তার দায়িত্বশীলতা আর জীবনের প্রতি মূল্যবোধ আরও অনেক বেশি গভীর হয়ে ওঠে। এই শিক্ষা আমি বাবার কাছেই পেয়েছি। ২০ আগস্ট বাবার জন্মদিন। বাবা পৃথিবীতে নেই। কিন্তু এই ভাবনাটা এত প্রশান্তির যে, জীবন নিয়ে বাবার কোনো অনুশোচনা ছিল না, এক বিন্দুও না। এই বেঁচে থাকা অনেক গর্বের, অনেক মহিমার। আমি এখন অনুভব করি, আদর্শ আর মূল্যবোধের আবডালে বেড়ে ওঠা, লোকচক্ষুর তাৎপর্যের চেয়ে নিজের রুচিবোধ আর নিজের ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে অধিক মূল্যায়ন করায় জীবন অনেক সুন্দর হয়, অনেক প্রশান্তির হয়। কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি জানি না। কিন্তু ওই যে সারাক্ষণ বাবার আদর্শের তাড়না নিয়ে একেকটা দিন অতিবাহিত করি, এই তো অনেক গর্বের। পৃথিবীর একটা মানুষও কোনোদিন বাবার কারণে কষ্ট পায়নি, বরং অনেক মানুষ আজও তাকে আনন্দ আর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করে- এই ভাবনা সন্তান হিসেবে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ জীবনের জন্য আগ্রহী করে তোলে। বাকি জীবনটুকু এই আদর্শ বহন করেই বেঁচে থাকতে চাই। বাবাকে প্রণাম।