সামরিক জোট নয়, জনগণের স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি

Posted: 06 সেপ্টেম্বর, 2026

বাংলাদেশ কি একটি সামরিক জোটে যুক্ত হতে যাচ্ছে? গত কয়েক দিনে এই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করলে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। আবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ আসেনি। সরকারের এই অবস্থানের মধ্যেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র মক্কা প্যাক্টে যোগদানের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে। পার্টির বক্তব্য, এটি নিছক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগ নয়; এটি একটি সামরিক জোট। ফলে বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে অন্য দেশের সংঘাত ও যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। সিপিবি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, জোটনিরপেক্ষতা ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখছে আমরা মনে করি, এখানেই মূল প্রশ্নটি নিহিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো আবেগের বিষয় হতে পারে না। একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়াকেও জাতীয় স্বার্থের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি রাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত ধর্মীয় বা অন্য কোন আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া যায় না। দেখতে হবে, এই চুক্তির বাস্তব চরিত্র কী, এর বাধ্যবাধকতা কী এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্র সংঘাতে জড়ালে অন্য সদস্যদের ওপর কী ধরনের দায়িত্ব বর্তাবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলের প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। বাংলাদেশ যদি এমন কোনো সামরিক কাঠামোর অংশ হয়, যেখানে অন্য সদস্যের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশেরও অবস্থান নেওয়ার প্রশ্ন আসে, তাহলে দেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; কোনো সামরিক ব্লকের অংশ হয়ে যাওয়া নয়। বিবেচনায় রাখতে হবে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যা তাকে একটি নির্দিষ্ট সামরিক বলয়ের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কূটনৈতিক ভারসাম্য। আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি গ্রহণ করতে হবে; যেটি ঝুঁকি তৈরি করে, সেটি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ‘কারা আমাদের সঙ্গে আছে’ তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কোন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সুরক্ষিত থাকবে।’ সিপিবি বলেছে, নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি, জনগণের ঐক্য এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিই জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি। মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশ্ন কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে। অন্যের যুদ্ধের অংশীদার নয়, বাংলাদেশকে হতে হবে নিজের ভবিষ্যতের স্বাধীন নির্ধারক।