শহীদ রবি দাম : কিছু নতুন তথ্য ও ভ্রান্তি নিরসন

Posted: 30 আগস্ট, 2026

দেশভাগ-উত্তর বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা; নানকার আন্দোলন, হাজং কৃষক বিদ্রোহ ও টঙ্ক বিরোধী আন্দোলন; আগামী বছর বিশেকের মধ্যে শতবর্ষ পূর্ণ করার দিকে এগিয়ে চলেছে। কৃষক আন্দোলনগুলোর মধ্যে পঞ্চাশের দশকের দুটি ঘটনা চার মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে ৭৬ বছর পূর্ণ করেছে-নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ, ব্যক্তি ইলা মিত্রসহ নাচোল অঞ্চলে সংঘটিত পাকিস্তানী নিরাপত্তা বাহিনীসমূহের ঠাণ্ডা মাথায় বর্বরতম নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ এবং সিলেটের সুনামগঞ্জ মহকুমার ধর্মপাশা থানার মোহনপুর গ্রামে পুলিশের গুলিতে কমিউনিস্ট নেতা ও সংগঠক রবীন্দ্রনাথ দাম ওরফে সাধুবাবুকে হত্যার ঘটনা। দুটি ঘটনাই ঘটেছিল ১৯৫০ সালে; প্রথমটি ৫ই জানুয়ারি থেকে তৎপরবর্তী সময় জুড়ে এবং দ্বিতীয়টি ৬ই মে। সে সময়ে দুই বছরের শিশুপুত্রের মাতা ইলা মিত্রর বয়স ছিল ২৫ বছর। অন্যদিকে স্বল্পকাল আগে তাঁর কমরেড অনিমা দাসকে বিয়ে করা শহীদ রবি দামের বয়স ছিল ৩৪ বছর। দুটি ঘটনা, আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও অঞ্চল এবং ইলা মিত্র ও রবি দামের মধ্যে সাজুয্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে অনেক বৈসাদৃশ্য। কিন্তু দুজনেই ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ ও একনিষ্ঠ সদস্য। তাঁদের তুলনামূলক আলোচনার সূত্রপাত করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তবুও, প্রায় সমসময়ে ঘটা দুটি ঘটনার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো নাচোল ও ইলা মিত্র এত বছর পরও সকলের স্মৃতি, আবেগ, চর্চা ও মনোযোগে যতখানি জাজ্জ্বল্যমান ও আলোচিত; রবি দাম ঠিক ততোধিক অনালোচিত ও বিস্মৃতিতে বিবর্ণ-ধূসর। এখনও তাঁর মৃত্যুর তারিখটি পর্যন্ত সঠিকভাবে লেখা হয়নি। রবি দামের মতোই প্রায় একই কথা প্রযোজ্য সেই একই সময়ের নানকার আন্দোলনের জঙ্গী সংগঠক ও নেত্রী কালই বিবি এবং কমিউনিস্ট পার্টির সিলেটের তিন বীরকন্যা অপর্ণা পাল চৌধুরী, অসিতা পাল চৌধুরী ও সুষমা দে প্রমুখের ক্ষেত্রেও। তদুপরি, আমাদের সৌভাগ্য যে তিন বীরকন্যার মধ্যে অপর্ণা পাল চৌধুরী সংগ্রামের স্মৃতিকে ধরে রাখতে একটি নাতিদীর্ঘ স্মৃতিচারণা (‘নারী আন্দোলন: স্মৃতিকথা’-কলকাতা, ১৯৯০) লিখে গিয়েছেন। বইটির মুখবন্ধ ও প্রকাশের তারিখ থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, তিনি এ কাজ করতে পেরেছিলেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে; তাও সিপিএম পার্টির নেত্রী কনক মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগ ও চাপে। এমনই আরেকটি মূল্যবান কাজ করে গিয়েছেন সিলেট জেলা কমিউনিস্ট পার্টির ছয়জনার সাংগঠনিক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ১৯৩৭ সালে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়া চঞ্চল শর্মা (‘শ্রীহট্টে বিপ্লববাদ ও কমিউনিস্ট আন্দোলন: স্মৃতিকথা’-কলকাতা, ১৯৮৪)। তথ্য দুটি দেবার কারণ, কলকাতার দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় রবি দামের লেখালেখির কথা জানা গেলেও, রবি দামের ক্ষেত্রে নিজের ও সেই সময় নিয়ে কিছু লিখে যাবার সুযোগ ঘটেনি। এমনকি তাঁকে যাঁরা বাল্যকাল থেকে চিনতেন তেমন কেউও ১৯৭৯ সালের আগে রবি দামের জীবন ও কাজ নিয়ে কোনো স্মৃতিচারণা করেছেন বলে জানা যায় না। শহীদ রবি দাম বিষয়ে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সঠিক তথ্যের প্রায়-বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাবার এটি মূল কারণ বলে মনে হয়। রবি দামের নাম এবং শেষ জীবনের রাজনৈতিক তৎপরতা ও অন্তিম দিনটির সামান্য কিছু ঘটনার কথা কাজের বিবরণের সূত্রে উঠে এসেছে প্রধানত অজয় ভট্টাচার্যর ‘নানকার বিদ্রোহ’ (পুঁথিপত্র, ঢাকা, ১৯৭৩) বইতে এবং বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (২য় খণ্ড-১৯৭৫/১৩৮২) গ্রন্থের জন্য গৃহীত লালা শরদিন্দু দে, অজয় ভট্টাচার্য ও প্রমোদ দাসের (রবি দাম নিহত হবার ঘটনার সময় তাঁর আহত ও পুলিশের হাতে বন্দী সঙ্গী) দেয়া লিখিত বিবরণ থেকে। এক্ষেত্রে অজয় ভট্টাচার্যর বইটি নিঃসন্দেহে অনেক দিক থেকে ক্ষেত্রে অধিক মূল্যবান। বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সুনামগঞ্জ শাখা ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে (প্রচলিত ভুল তারিখের ভিত্তিতে) ‘শহীদ রবি দাম স্মৃতি উদযাপন কমিটি’ গঠন করে তাঁকে স্মরণের উদ্যোগ নেয় এবং সাধারণ সম্পাদক মুতাসিম আলীর সম্পাদনায় ‘বিপ্লবী রবি দাম’-শীর্ষক স্মৃতিকথার প্রশংসনীয় ও বিরল সংকলনটি প্রকাশ হয় রবি দামের একমাত্র বিরল আলোকচিত্রসহ। তাঁদের অনুরোধে ভারতে চলে যাওয়া সুনামগঞ্জের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন নেতার জবানীতে রবি দামের জীবন ও কাজ সম্পর্কে জানার জন্য পুস্তিকাটি কয়েকজনের বিবরণ পাবার একমাত্র প্রকাশনা। পূর্বে অসংকলিত এবং নতুন আরও কিছু লেখা ও উপকরণ নিয়ে দুষ্প্রাপ্য ক্ষীণকায় পুস্তিকাটি নব-কলেবরে বের করার জন্য মুতাসিম আলী বর্তমানে কাজ করছেন। পুস্তিকাটির লেখকদের মধ্যে ছিলেন-লাউতা-বাহাদুরপুরের কৃষক আন্দোলনের সংগঠক মৌলভীবাজারের রমানাথ ভট্টাচার্য, দীনেশ চৌধুরী, সুনামগঞ্জ মহকুমা পার্টি কমিটির সাধারণ সম্পাদক যতীন্দ্রকুমার দাস, রবি দামের ভ্রাতা শিবেন্দ্রনাথ দাম রায়। এই সংকলনটির বাইরে, রবি দাম সম্পর্কে চার পৃষ্ঠার আরেকটি বিবরণ পাওয়া যায় ১৯৩৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সিলেট জেলা শাখার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণকারী চঞ্চল শর্মার পূর্বে উল্লিখিত বইটিতে। বিবরণটি শিরোনাম: ‘হঠকারী লাইনের বলি : রবীন্দ্রনাথ দাম’। রবি দাম সম্পর্কিত স্বল্পকয়টি লেখার মধ্যে এটিতে ও শিবেন দামের লেখায় তাঁর জন্মের সাল-তারিখের উল্লেখ রয়েছে: ১০ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬। রবি দামের রাজনৈতিক তৎপরতার শুরু হয়েছিল তাঁর কিশোরকালে, স্কুলে পড়ার সময় থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতায় নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে। উল্লেখিত স্মৃতিচারণাসমূহের ভিত্তিতে এখানে রবি দামের জীবনীবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলির পুনরাবৃত্তি না করে কেবল চঞ্চল শর্মার লেখা থেকে কয়েকটি লাইন তুলে দেয়া হলো। তিনি লিখেছেন- ‘রবীন্দ্রনাথ দাম তার ডাক নাম সাধু, নামে সুনামগঞ্জের হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেরই পরিচিত। তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমার সিচনী গ্রামের রায় সাহেব গোকুলনাথ দামের পুত্র এবং তরুণ সংঘের খ্যাতনামা নেতা শিবেন্দ্রনাথ দামের ছোট ভাই। সাধারণতঃ মননশীলতা ও শারীরিক শক্তিমত্তা এক সঙ্গে চলে না। মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম দেখা যায়। রবি দাম ছিলেন সেরকম একটি ব্যতিক্রম। যেমন ছিল তাঁর নিয়মিত ব্যায়াম অনুশীলনে সুন্দর সুগঠিত দেহ তেমনি ছিল প্রবন্ধ লেখায় ও কার্টুন চিত্র আঁকায় তাঁর পারদর্শিতা। ... আমরা শ্রীহট্ট জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সুনামগঞ্জের অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে একই সঙ্গে এসে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ... ঐ সময়েই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। কাজকর্মের ভিতর দিয়ে দিনের পর দিন সেই পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাঁকে ভাল করে জানার সুযোগ ঘটে। এরূপ নিষ্ঠাবান কর্মী আমার জীবনে আর দেখেছি কিনা সন্দেহ। ... কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যেখানে যে আন্দোলনই হ’ক না কেন-সেই আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীই হ’ক আর জমিদার বিরোধীই হ’ক, রবি দাম থাকতেন তার পুরোভাগে। ... [কমিউনিস্ট পার্টির] হঠকারী লাইন ও পাক বর্বরতার ফলে একটি মহান, অমূল্য জীবন অকালে ঝরে যায়।’ রবি দাম সম্পর্কিত সম্প্রতি দুটি নতুন প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। প্রথমটি হলো ১৯৫০ সালের ৩০শে মে তারিখে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্ব সহকারে রবি দামের দুই কলামের মৃত্যুর সংবাদ এবং দ্বিতীয়টি হলো ১৯৫০ সালে পুলিশের গুলিতে রবি দাম নিহত হবার পর পাকিস্তানের পুলিশের নিজস্ব ‘তদন্ত’ প্রতিবেদন (‘ওহয়ঁরৎু জবঢ়ড়ৎঃ জবমধৎফরহম চড়ষরপব ঋরৎরহম ধঃ ঠরষষধমব গঁযবহঢ়ঁৎ ডরঃযরহ উযধৎসধঢ়ধংংধ চ.ঝ.’ শিরোনামে ইংরেজিতে টাইপ করা দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদন) এবং সে সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকর্তার হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার দাপ্তরিক নোটসমূহ। পুলিশ দফতরের প্রতিবেদন ও কাগজপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, বিশ্লেষণ ও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে; যা হয়তো পৃথকভাবে করা যেতে পারে। প্রতিবেদনটিতে ঘটনার তারিখ বলা হয়ে ৬ মে ১৯৫০, রাত ৮টা এবং তাতে স্থানীয় গৃহস্থ মণিকান্ত হাজং এবং মৃত ও আহত বন্দী হিসেবে যথাক্রমে রবি দাম ও প্রমোদ দাসের নাম রয়েছে। একইভাবে রয়েছে অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদের নাম ও নম্বর। সীমান্তের দুই পারের হাজং কৃষকদের মাঝে ধান তুলে আনা ও ভাগ করা নিয়ে বিবাদের কথা রয়েছে। সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসকের তৈরি করা প্রতিবেদন সুপারিশসহ পরে সিলেটের ডিসি, এসপি এবং চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। রবি দামের মৃত্যুর তারিখ নিয়ে একটি গুরুতর তথ্যগত গড়মিল নিরসন করা প্রয়োজন। সেই গড়মিল বা ভ্রান্তি দূর করার ক্ষেত্রে ‘যুগান্তরে’ প্রকাশিত সংবাদ ও পুলিশের তৈরি ‘তদন্ত’ প্রতিবেদন সহায়ক হতে পারে। ‘যুগান্তর’ ও পুলিশের প্রতিবেদনে, উভয় ক্ষেত্রেই, গুলিবর্ষণ ও মৃত্যুর প্রকৃত তারিখ পরিবর্তনের যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। উভয় প্রতিবেদনই বলছে মোহনপুরে ঘটনাটি ঘটেছিল ৬ই মে ১৯৫০। তাঁর মৃত্যুর ঘটনার তারিখ বিষয়ে এ পর্যন্ত সকলে; যার শুরু হয়েছে অজয় ভট্টাচার্যর বিবরণ (২৬শে মার্চ ১৯৫০/১২ই চৈত্র ১৩৫৬) ও তার পুনরাবৃত্তিতে বদরুদ্দীন উমরের বিবরণেও (২৬শে মার্চ ১৯৪৯। তাঁর বিবরণে ইংরেজি সালটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এবং বাংলা সন মুদ্রণ প্রমাদবশত লেখা হয়ে ১৩৬৫); বলছেন বা বলে থাকেন রবি দাম পুলিশের গুলিতে মারা যান ২৬শে মার্চ ১৯৫০ (যতীন্দ্র কুমার দাস), তাঁর ভ্রাতা শিবেন্দ্রনাথ দাম জানিয়েছিলেন ২৬শে মার্চ ১৯৪৯। পরে তিনি হেমচন্দ্র চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছেন, এই তারিখটি তাঁকে সুনামগঞ্জের ‘মরহুম মফিজ মিঞা সাহেবের ছেলে’ ‘চৌধুরী মনসুর আহমদ তাঁহার প্রথম পত্রে জানাইয়াছিলেন। ... তাহারা বহু কষ্টে যোগার করিয়াছেন। আমি আমার চিঠিতে ঐ তারিখটি দিয়াছিলাম। কারণ ঐ সময় আমার কাগজপত্র শিলংয়ে ছিল। সাধুর মৃত্যু হইয়াছে ৬ই মে ১৯৫০ইং তে। কলিকাতার ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় ৩০শে মে ১৯৫০ইং সংখ্যায় ঐ খবর বাহির হয়। কাজেই ১৯৫০ইংর কথা স্থির।’ সবশেষে অন্য ধরনের বিষয়ে নিয়ে ভ্রান্তি নিরসনের মধ্য দিয়ে নিবন্ধটি শেষ করা হবে। এই ভ্রান্তিটি রবি দামের যে মৃত্যু সংবাদ ৩০শে মে ১৯৫০ সালে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; সেটি প্রসঙ্গে। তাদের বড় হরফে বড় আকারে প্রকাশিত ছোট সংবাদটি নিচে তুলে দেয়া হলো: পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রচারেরও রেহাই নাই সভার সংবাদ পাইয়া গ্রাম ঘেরাও করিয়া শ্রীহট্ট পুলিশের গুলি চালনা: একজন হিন্দু কর্মী নিহত (স্টাফ রিপোর্টার) পূর্ব-পাকিস্তানের শ্রীহট্ট জেলার ধর্মপাশা থানার মোহনপুর গ্রামে গত ৬ই মে একটি রাজনৈতিক দলের সহিত সংশ্লিষ্ট কয়েক হিন্দু কর্মী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রচার ও পাকিস্তানী দমননীতির প্রতিবাদে সভা করিতে যাইয়া পুলিশের গুলীতে নিহত হইয়াছেন বলিয়া কলিকাতায় সংবাদ আসিয়াছে। নিহত হিন্দু নেতার নাম রবীন্দ্রনাথ দাম। পুলিশের গুলীতে শ্রীপ্রমোদ দাস নামক অপর ব্যক্তি আহত হইয়াছেন বলিয়া জানা গিয়াছে। ঘটনা সম্পর্কে প্রকাশ যে, সভার সংবাদ পাইয়া নিকটবর্তী বহেড়াতলী শিবির হইতে সশস্ত্র পাকিস্তানী পুলিশ মোহনপুর গ্রাম ঘেরাও করিয়া গুলী চালাইতে থাকে এবং তাহার ফলে শ্রীযুক্ত দাম নিহত ও শ্রীযুক্ত দাস আহত হন। ‘যুগান্তর’ এর এই সংবাদটির কয়েকটি দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয়: ১. ঘটনাস্থল, পুলিশের গুলী চালনা এবং রবি দাম নামক একজন নিহত ও প্রমোদ দাস নামক একজন আহত হবার তথ্যটি ছাড়া বাকি সকল তথ্যই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও কল্পিত বিবরণ। ২. নিহত ও আহতরা ওই গ্রামে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রচারের সভায়’ যাননি। তাঁরা গিয়েছিলেন ধানের হিস্যা নিয়ে সীমান্তের দুই পাশের হাজং কৃষকদের মধ্যকার বিবাদ মেটাতে। ২. সংবাদে ‘হিন্দু’ বিশেষণটি তিনবার ব্যবহৃত হলেও একবারও বলা হয়নি যে নিহত ও আহত ব্যক্তিদ্বয় ‘একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট’ নয়; তাঁরা খুব স্পষ্টভাবে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। ‘কমিউনিস্ট কর্মী’ বলতে ‘যুগান্তর’ এর শরম পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কারণ ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে সমগ্র ভারতেও পাকিস্তানের অনুরূপভাবে কমিউনিস্টদের উপর প্রবল নিপীড়ন, অত্যাচার, জেল ও হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছিল। এ ব্যাপারে উভয় সদ্য-স্বাধীন দেশের অবস্থা ছিল কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সামান! কৃষক আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সাম্প্রদায়িকতা মোড়কে পরিবেশনের এটি একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত! সাম্প্রাদায়িকতার দোষে পরস্পরকে দোষারোপ করা এবং মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়াতে উভয় দেশের সংবাদমাধ্যমও ছিল সমানে-সমান। মহাফেজখানার কাগজপত্র সাক্ষ্য দেবে যে উভয় দেশের হাইকমিশন ও স্বরাষ্ট্র/পররাষ্ট্র দফতর মিথ্যা সংবাদ ও প্রচারণা বিষয়ে কী পরিমাণ পারস্পরিক আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র চালাচালিতে নিজেদের ব্যস্ত রাখত! রবি দামের মৃত্যুসংবাদটি ‘যুগান্তর’ পত্রিকার কোনো ব্যতিক্রমী সংবাদ ছিল না। সিলেটের সানেশ্বরে নানাকার প্রজাদের ওপর পুলিশি হামলা, শারীরিক আক্রমণ এবং পুলিশের ক্রমাগত লাথি চালনায় অপর্ণা পাল চৌধুরীর গর্ভপাত হয় গ্রামের ফসলের মাঠে। সুষমা দে, অসিতা পাল চৌধুরীসহ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীত্রয়ীর বিচার করা হয়েছিল সিলেট কারাগারে অভ্যন্তরে। সেই আদালতে তাঁরা তিনজনা উকিল ছাড়াই নিজেদের মামলা নিজেরা সওয়াল-জবাব করে মোকাবিলা করেছিলেন। এই ঘটনা নিয়েও ‘যুগান্তর’ ভিত্তিহীন বানোয়াট সংবাদ ছেপে বলেছিল আদালত রায় ঘোষণা করার পর তাঁরা প্রতিবাদী ধ্বনি তুললে তাঁদেরকে কারাগারে বসানো আদালতের মধ্যেই লাটিপেটা করা হয়। অথচ, অপর্ণা পাল চৌধুরীর পূর্বে উল্লেখিত স্মৃতিকথার বিস্তারিত বিবরণে এমন লাটিচালনা করার কোনো বিবরণ তিনি দেননি। ঘটনা সত্যি হলে অ. পা. চৌধুরীর এহেন ঘটনা আড়াল করার কোনো কারণই ছিল না। বরং সেটি প্রকাশ করার মধ্যেই থাকত তাঁদের চারিত্রিক ও আদর্শিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত। তবুও, ‘যুগান্তর’ পত্রিকাকে ধন্যবাদ দেয়া দরকার। তারা অন্তত রবি দামের মৃত্যু সংবাদটি প্রকাশ করেছিলেন দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে। ১৯৫০-১৯৫৪ সালে কোনো সময়ই ইলা মিত্র সংক্রান্ত সংবাদ ‘যুগান্তর’ এর প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান পায়নি। একমাত্র ব্যত্যয় ঘটেছিল ১৯৫৪ সালের ২৫শে মে প্যারোলে মুক্ত হয়ে দমদম বিমানবন্দরে তাঁর অবতরণের সংবাদটি; যা এক কলামে এক দেড় ইঞ্চির সংবাদ হয়ে বের হয়েছিল। পরিশেষে বলা দরকার, এদিক থেকে পূর্ববাংলায় ‘আজাদ’ এর অবস্থা হয়েছিল বিস্ময়কর রকমের ‘কিছু শুনিনি, কিছু দেখিনি, কিছু লিখব না’ মার্কা। ১৯৫০ সালের ৭ই মে থেকে ৩১শে মের পত্রিকাগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজেও মোহনপুর গ্রামে পুলিশের গুলিতে রবি দাম নামে কোনো ব্যক্তির নিহত হবার সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। রবি দামের মৃত্যুর ঘটনাটি কেবল পূর্ব বাংলার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখার হিমঘরে রয়ে গেল ৭৬ বছর ধরে; যার সংবাদ এই প্রথম এখানে তুলে ধরা হয়েছে! শহীদ রবি দাম আমাদের স্মৃতিতে চির জাগরূক থাকুন!