কৃষকের হাতে থাকছে না কৃষি
Posted: 30 আগস্ট, 2026
এ অঞ্চলের কৃষির রয়েছে ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস। হিমালয় ও বঙ্গোপসাগরের মাঝের এই বদ্বীপে জমির উর্বরতা ছিল বিস্ময়কর। নাতিশীতোষ্ণ বায়ু ছিল বসবাস ও কৃষিকাজের জন্যে উৎকৃষ্ট। স্বাদু পানির মাছ, চাষযোগ্য উর্বর ভূমি, নদ-নদী খাল বিলে ছিল পর্যাপ্ত পানি। সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ ছিল কৃষি ও কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্যে নানা রকম কুটির শিল্প ও হস্ত শিল্প।
বর্তমানে কৃষির প্রতি সরকারের অবহেলা, বহুজাতিক কোম্পানির প্রবেশ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে দিনে দিনে চাষবাসে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক। কৃষকের হাত থেকে কৃষি তাই ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দেশি-বিদেশি কোম্পানির হাতে। কৃষিতে অল্প কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করেই কোম্পানিগুলো পাচ্ছে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা। ফলে কৃষিতে ধীরে ধীরে করপোরেট পুঁজির প্রবেশ ঘটছে। আর হাত গুটাচ্ছে কৃষক।
সরকার ৪৪টি শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এতে কিছু শিল্পপতি ব্যবসায়ী লাভবান হবে। আর এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা হারাবে জনগণ। আশির দশক থেকে জাতীয় পার্টি, বিএনপি, আওয়ামী লীগ সকল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও জোট বেসরকারিকরণের পথে হেঁটেছে। সবক্ষেত্রেই লোকসান হচ্ছে এই অজুহাতে শিল্পকারখানাগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলোতে লোকসান হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে তবে প্রধান কারণ যে অযোগ্যতা ও দুর্নীতি এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। জনগণের সম্পদ জলের দামে কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া যেন নির্বাচিত-অনির্বাচিত সকল সরকারের অবশ্য করণীয়গুলোর একটা।
পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিলকে ধ্বংস করে ছোট ছোট অনেকগুলো শিল্প কারখানা তৈরি করা হয়েছে। যেগুলোর মালিক কিছু দেশি-বিদেশি কোম্পানি। এর ফলে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়েছে। ছোট ছোট দোকানপাট উঠে গেছে। ছোট মাঝারি পাট ব্যবসায়ীরা বসে গেছে। পাট চাষে উৎসাহ ও সাহস হারিয়েছে চাষি।
বেসরকারি বিনিয়োগের আওতায় ৪৪টি কারখানার মধ্যে রয়েছে ১৩টি চিনিকল ও ৫টি জুটমিল। যেগুলো কৃষকের আখ ও পাট সরবরাহের সাথে সরাসরি যুক্ত। এছাড়া ২টি সার কারখানাও এই তালিকায় রয়েছে। বেসরকারিকরণের এই উদ্যোগ তাই পাট ও আখ চাষিদের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সার কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে কৃষি উপকরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরিবর্তে সারের আরো কিছুটা ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
দেশের যে আপাত জৌলুস তার সবটুকু কৃতিত্ব এদেশের কৃষক ক্ষেতমজুরকে দিলেও ভুল হবে না। ধান-চাল, মাছ-মাংস, আলু-সবজি ইত্যাদিতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কৃষকের সন্তান বিদেশে শ্রমিকের কাজ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। কৃষক-ক্ষেতমজুরের মেয়েদের শ্রমে ঘামে তৈরি পোশাকই আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত। আর এই তিনের ওপর ভর করে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাচ্ছে। যা নিয়ে পতিত হাসিনা সরকারের গর্বের অন্ত ছিল না। অথচ কৃষকের অবস্থা পরিবর্তনে এ যাবৎকাল কোনো সরকারই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৩দিন আগে ইউনুস সরকার গোপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি বাংলাদেশকে অনেকগুলো ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। তার একটা হচ্ছে কৃষি খাত। চুক্তি মোতাবেক কৃষি উপকরণ অর্থাৎ সার-বীজ-ডিজেলের উপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। এর ফলে কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাবে। চাষাবাদে উৎসাহ কমবে কৃষকের। ফলে দেশীয় কৃষি পণ্যের দাম বাড়বে। আবারও খাদ্য আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে দেশ। সেইসাথে দীর্ঘমেয়াদে রয়েছে খাদ্য খাটতির ঝুঁকি। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে বছরে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষি পণ্য আমদানি করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে গম, গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, সয়াবিন, তুলা ইত্যাদি। ইতিমধ্যে চুক্তি অনুসারে আমেরিকা থেকে আমদানি শুরু হয়েছে। আর এসব খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে জেনেটিক্যালি মোডিফাইড অর্থাৎ জিএমও ফুডও রয়েছে। জিন প্রকৌশল বা বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে উদ্ভিদ বা প্রাণীর ডিএনএ পরিবর্তন করে জিএমও ফুড উৎপন্ন করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এ ধরনের খাবার আমদানি করা মোটেই সমীচীন না। কিন্তু বিএসটিআই বা বাংলাদেশের অন্যকোনো প্রতিষ্ঠান আমেরিকা থেকে আমদানি করা এই পণ্যগুলোর মান যাচাই করতে পারবে না। ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে প্রতি বছর ১ শতাংশ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। নতুন নতুন বাড়িঘর, শিল্প কারখানা, ইট ভাটা নির্মাণের কারণে কমছে চাষের জমি। আবার দেশের বড় বড় পুঁজিপতিরা পোলট্রি, ডেইরি ও কৃষি খামার গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছে। ফলে কৃষক কখনো উচ্চমূল্য পেয়ে কখনো চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করছে বা ছেড়ে দিচ্ছে। এভাবেই হাতছাড়া হচ্ছে কৃষকের জমি। আর পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জুম ও চাষের জমির অনেকটাই ইতিমধ্যে হাতছাড়া হয়ে গেছে।
শৈশব-কৈশোরে দেখা আমাদের দেশের কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ কৃষক নিজেই তৈরি করতো। একেকটা জমির উর্বরতা বিবেচনা করে প্রয়োজনমতো আলাদা আলাদা সার সে নিজেই তৈরি করতো। নিজেই তৈরি করতে জানতো কীটনাশক। সব ধরনের ফসলের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল এদেশের কৃষকের। নিত্যনতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা ছিল তার। পরম্পরায় প্রবাহিত ও বিকশিত জ্ঞানের এই ধারা আজ শুষ্ক। এই জ্ঞানের মালিক আজ বহুজাতিক কোম্পানি। সেই জ্ঞানকে সার্বজনীনতার পরিবর্তে নিজেরা কুক্ষিগত করতে চায়। এজন্য নানা রকম আইন তৈরি করা হচ্ছে। পেটেন্ট আইন যার অন্যতম। এই পেটেন্ট আইন দিয়েই আমেরিকার রাইসটেক কোম্পানি ১৯৯৭ সালে বাসমতী জাতের ধান/চাল এর নাম ও স্বত্বাধিকার দাবি করে। অথচ শত শত বছর ধরে ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের কৃষকেরা বাসমতী চাষ করে আসছে। শেষ পর্যন্ত ভারতের আইনি প্রতিবাদে সে যাত্রা তিন দেশের বাসমতী চাষিরা রক্ষা পান। অথচ এই পেটেন্ট আইন হলে বাসমতীর বীজ কিনতে হতো আমেরিকান কোম্পানি রাইসটেক’র কাছ থেকে।
সার, কীটনাশক, বীজ ইত্যাদি বিক্রি করে অথবা দেশীয় কোনো কোম্পানিকে উৎপাদনের অনুমতি দিয়ে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ডলার আমাদের কৃষকের কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। কৃষি উপকরণ উৎপাদক মনসেন্টো বা সিনজেন্টার মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আজ আর কৃষকের অপরিচিত নয়।
কৃষি পণ্যের বাজার অনেকদিন আগেই কৃষকের হাতছাড়া হয়েছে। এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে চাষাবাদ করে কৃষক। ফসল ওঠার পরপর সুদ সমেত ধারের টাকা শোধ করতে হয়। ফলে ফসলের দাম তখন একেবারে কমে যায়। ব্যবসায়ীরা কিনে গুদামজাত করার পর ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকে। ফলে ফসলের লাভজনক দাম পায় না কৃষক। আবার স্থানীয় বাজারগুলোতে ফসল বেচতে গিয়ে কৃষককে প্রতি মণে ২ কেজি থেকে ৪ কেজি ধলতা দিয়ে আসতে হয়। সেইসাথে রয়েছে কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও অপ্রতুলতা। সারাদেশের নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দক্ষিণ বাংলার নদী-মাঠে-বিলে লবণাক্ততা, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জলাবদ্ধতা, হাওরে বাঁধ ভাঙা, বন্যা, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর নেমে যাওয়া, উপকূলে আইলা-সিডরের মতো ঝড় জলোচ্ছ্বাস। প্রায় সব এলাকায় কমবেশি চাষের পানির সংকট। এর মধ্যেই চলে কৃষকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ফলে কৃষি জমি, কৃষি উপকরণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি পণ্যের বাজার কিছুই আজ আর কৃষকের হাতে নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যারা কৃষি কাজ করেছে সেই কৃষক পরিবারগুলোই এখন সন্তানদের বিদেশে অথবা দেশে কোনো মিল-কারখানায় শ্রমিকের চাকরিতে পাঠাতে উৎসাহী।
এ দেশের ৯০ ভাগ মানুষের পেশা ছিলো কৃষি। কমতে কমতে আজ তা ৪০ ভাগে দাঁড়িয়েছে। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে প্রতি বছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে রক্ষা করতে হবে। কৃষককে সম্মানের সাথে বাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্যে চাই আন্তরিক প্রয়াস। কৃষিতে বড় পুঁজির সন্ধানে বড় বড় প্রাইভেট কোম্পানির কাছে না গিয়ে সরকারি উদ্যোগে কৃষক সমবায় গঠন করে এলাকায় এলাকায় যৌথ চাষ ও বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে।
সামগ্রিক একটা নীতিমালা ছাড়া কৃষিকে রক্ষা করা যাবে না। খাদ্য খাটতির আশঙ্কাও দূর হবে না। কৃষক বান্ধব কৃষিনীতি প্রণয়ন করেই কৃষিকে কৃষকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাহলেই কৃষি, কৃষক ও দেশ বাঁচবে। একটা দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল, বামপন্থি সরকার ছাড়া তা যে অসম্ভব, ইতিমধ্যে সেটি প্রমাণিত হয়েছে।
লেখক : সহ-সভাপতি, কৃষক সমিতি