কীভাবে আমি কমিউনিস্ট হলাম
Posted: 16 আগস্ট, 2026
একজন জোতদারের সন্তান ছিলাম আমি– যে একটি কারণের জন্য আমি সহজেই হতে পারতাম একজন প্রতিক্রিয়াশীল।
আমি পড়েছি ধর্মীয় স্কুলে, যেখানে আমার সহপাঠীরা ছিল বিত্তশালী পরিবারের সন্তান– আরেকটি যে কারণের জন্য আমি অনায়াসে একজন প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারতাম।
আমি থাকতাম কিউবায়, যেখানে সমস্ত সংস্থা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা এবং গণমাধ্যম ছিল ‘মেড ইন ইউএসএ’– তৃতীয় যে কারণের জন্য আমি স্বাভাবিকভাবেই হতে পারতাম একজন প্রতিক্রিয়াশীল।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়তাম, সেখানে ২০,০০০ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৩০ জন ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী– এবং আমি ছিলাম ওই তিরিশ জনের একেবারে শেষে। যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম, একজন জোতদারের সন্তান হয়েই আমি ছিলাম এবং রাজনৈতিকভাবে নিরক্ষও ছিলাম।
বিশ্বাস করুন, কোনো পার্টি সদস্য, কোনো কমিউনিস্ট, কিংবা কোনো সোস্যালিস্ট, অথবা কোনো অতিবিপ্লবী এসে আমার হাত ধরেননি, আমায় প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা করেননি।
বরং, আমায় দেওয়া হয়েছিল একটি মোটাসোটা, ভারী, অসহ্য, অপাঠ্য টেক্সট বই– যাতে ছিল একজন বুর্জোয়ার দৃষ্টিভঙ্গীতে রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যাখ্যার চেষ্টা; ওরা তাকেই বলত ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’!
এবং, সেই অসহ্য বইয়ে ছিল অতি উৎপাদনের সংকটসহ অন্যান্য সমস্যার কথা, যা বিশ্বের সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়। যেমন এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, ব্রিটেনে যখন কয়লার প্রাচুর্য, তখন কীভাবে ইতিহাসের অমোঘ অপরিবর্তনীয় নির্মম আইন বয়ে আনে বেকারী, অনাহার। যখন প্রচুর কয়লা, শ্রমিকদের বেতন তখন একই জায়গায়, অনাহার, অনাহারে মৃত্যু।
ফলে জোতদারের ছেলে, যে পড়েছে বুর্জোয়াদের স্কুলে, বেড়ে উঠেছে ইয়াঙ্কি প্রচারে, সে ভাবতে শুরু করে কিছু একটা ভুল আছে এই ব্যবস্থার মধ্য।
আমার বাবা, একজন গরিব থেকে যিনি পরে জোতদার হয়েছিলেন, তাঁর সন্তান হিসেবে আমার অন্তত গ্রামে কৃষকদের সঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল, যারা সবাই ছিল আমার বন্ধু। যদি আমার দাদু জোতদার হতেন, তবে নিশ্চিত আমার বাবা আমায় নিয়ে যেতেন রাজধানীতে। তাহলে অবশ্য এই ইতিবাচক প্রভাবগুলি আমায় প্রভাব ফেলত না। শহুরে আত্মকেন্দ্রিকতা, অহংবোধ এবং অন্যান্য নেতিবাচক দিকগুলি গোড়া থেকেই আমায় চেপে বসত।
যেসব স্কুলে আমি পড়েছি, সেখান কিছু ইতিবাচক উপাদান আমার মধ্যে গড়ে উঠেছিল। একটি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন আদর্শবোধ, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ- তা বিচার করার ক্ষমতা, ন্যায্য ও অন্যায্যর মধ্যে ফারাক এবং শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মানসিকতা আমাকে মানব সমাজের ব্যাখ্যা করার দিকে প্রভাবিত করেছিল। এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল, পরে আমি বুঝেছি তা ছিল এক কাল্পনিক কমিউনিস্ট। সেসময় একজন কমিউনিস্ট, কিংবা কোনো কমিউনিস্ট নথিপত্র পড়ার সুযোগ আমার হয়নি।
পরে একদিন হাতে এল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র একটা কপি- বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো! গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম, যা আমি কখনও ভুলব না। কী অসাধারণ শব্দবন্ধ! কী অকাট্য সত্য এবং আমরা সেইসব সত্য দেখেছিলাম প্রতিটি দিন।
আমার মনে হলো আমি যেন অরণ্যের সেই ছোট্ট পশুর মতো, যার কিছুই সে জানে না। তারপর, একদিন হঠাৎই সে খুঁজে পায় সেই জঙ্গলের মানচিত্র– তার বিবরণ, তার ভূগোল, সবকিছু।
একবার তাকিয়ে দেখুন, যদি মার্কসের মতাদর্শ ন্যায্য, যথার্থ এবং প্রেরণাদায়ক না হতো, যদি আমাদের সংগ্রামের বুনিয়াদ মার্কসবাদ না হতো, তবে আমরা এখানে আসতে পারতাম না। আমরা পারতাম না এখানে আসতে।
তারপর কি আমি কমিউনিস্ট হলাম?
না, আমি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন, যে আবিষ্কার করতে পেরেছিল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব, পুরোদমে একজন কমিউনিস্ট হওয়ার আগে যে ঘুরপাক খাচ্ছিল কিউবার রাজনৈতিক সংকটের প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে।
তারপর আমি নিজেকে উন্নত করতে থাকলাম।
লেনিনের বইয়ের চেয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আকারে সাম্রাজ্যবাদকে জানার সুযোগ ছিল আমার। আমি দেখলাম, জানলাম সাম্রাজ্যবাদকে সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে আগ্রাসী– এবং, আমি বিশ্বাস করি জীবন আমাকে দিয়েছে বাস্তবকে উপলব্ধি করার একটি উন্নততর বোঝাপড়া।
জীবনই আমাকে তৈরি করেছে আরও বিপ্লবী, আরও সোস্যালিস্ট, আরও কমিউনিস্ট।
[১৩ আগস্ট ছিলো কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর ১০০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭১’র ১৮ নভেম্বর চিলির কনসেপশন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রশ্নের জবাবে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন- কীভাবে আমি কমিউনিস্ট হলাম।]