এক ট্রিলিয়ন অর্থনীতি : স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার উপায়?
Posted: 16 আগস্ট, 2026
নির্বাচনী মেনিফেস্টো মোতাবেক বর্তমান সরকার আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে সম্প্রসারিত করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান মোতাবেক, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার ছিল ৫০ দশমিক এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বর্তমানে জিডিপি’র যে আকার আছে আগামী ৮ বছরে তাকে দ্বিগুণ করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড) জানিয়েছে। সুতরাং জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে সম্প্রসারিত করতে হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার প্রায় তিনগুণ বাড়াতে হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, সেটা অর্জনের জন্য আমরা কি extensive growth (সঞ্চয় বা বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি)-এ বেশি গুরুত্ব দেবো নাকি Intensive Growth (বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি)-এর দিকে বেশি গুরুত্ব দেবো?
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫০ শতাংশই বিদেশনির্ভর। অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ নির্ভর করে স্থানীয় অর্থনীতির ওপর। যেহেতু বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করে চলেছে তাই অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কী ঘটছে বা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং বাইরের অর্থনীতি যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে কোনো লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হবে না। আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হয় তাহলে আমাদের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণ যতটা সম্ভব কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান ঘাটতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় যদি ২০৩৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করতে হয় তাহলে আমাদের দেখতে হবে কোন ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কোনো পণ্যের বাজার বাইরে আছে, যেখানে আমাদের পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু গুণ ও মান অন্যদের তুলনায় কম হলেও তার বাজার হারায় না। দাম এবং মান দুই দিক থেকেই প্রতিযোগিতায় জেতার উৎপাদন কৌশল আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশ যদি জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে কাজ করতে চায় তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করা হলে আমাদের সার্বিক আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। তখন আমরা আমাদের রপ্তানি পণ্যের দাম কম রাখতে পারবো না। তাছাড়া মার্কিন রক্ষণশীল বাণিজ্যকৌশল উচ্চ শুল্ক আরোপ করে আমাদের রপ্তানির দাম বাড়িয়ে দেবে। যেমন, এলএনজি’র কথাই যদি আমরা বিবেচনা করি তাহলে দেখবো, ভারত বা চীন থেকে এলএনজি আমদানি করা হলে মূল্য অনেক কম পড়বে। কিন্তু একই পণ্য অর্থাৎ এলএনজি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয় তাহলে দাম অনেক বেশি পড়বে। তাতে আমাদের রপ্তানি পন্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, দামও তখন বেড়ে যেতে বাধ্য। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যদি এলএনজি আমদানি করা হয় তাহলে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে এবং আমাদের ষবধফ ঞরসব-ও বেড়ে যাবে। সে তুলনায় ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া বা চীন থেকে যদি এলএনজি আমদানি করা হয় তাহলে সময় কম লাগবে। সুতরাং আমাদের
জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো রকম শক্ত ও স্থায়ী সামরিক জোটে, তা সে যার সঙ্গেই হোক না কেন- যোগদান থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুসরণ করতে হবে এ যাবৎ অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি “Friendship to all, malice to none” ” । আর সেজন্য যে কোনো বৈদেশিক চুক্তি দেশের জনগণের কাছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিসম্পন্ন হতে হবে। তার একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক পন্থা হচ্ছে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে বৈদেশিক চুক্তিগুলি (গোপন নিরাপত্তার বিষয়টিসহ) গভীর গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত ও অনুমোদিত হতে হবে।
আর একথাও সত্য যে, আমাদের কৃষিখাতের বাজারও যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তারা যদি নিজ পণ্যকে ভর্তুকি দিয়ে আমাদের বাজারে ছাড়ে, আর উচ্চতর গুণের দাবি করে তাহলে আমাদের স্থানীয় কৃষিপণ্যসমূহ বাজার হারাবে। এমনকি পণ্যের দামও আরো বৃদ্ধি করে মান দিয়ে তারা বাজার দখল করে নিতে পারে।
এসব আশঙ্কার কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমান সরকার যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান, তাহলে সেই উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের সামরিক সহযোগিতা চুক্তি আছে বা হতে যাচ্ছে এবং সেই চুক্তির আওতায় মার্কিন যুদ্ধ জাহাজগুলো বাংলাদেশের বন্দরে এসে জ্বালানি তেল নিতে পারবে। লজিস্টিক সাপোর্ট নিতে পারবে। আমি সরকারের প্রতি অনুরোধ করবো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের যে কোনো সামরিক সহযোগিতার (তা সে যতই নিরীহ মনে হোক না কেন!) চুক্তিতে যাবার আগে দেশের সার্বিক স্বার্থ বিবেচনা করুন। এবং চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি জাতীয় সংসদে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন। জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের কোনো নিরীহ সামরিক চুক্তিও স্বাক্ষর করা মোটেও ঠিক হবে না। কারণ, প্রতিটি সামরিক চুক্তির অনেক প¦ার্শ-তাৎপর্য আছে। আর দেশটি যদি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হবে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা হলে ইচ্ছে করলেই তা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। বাংলাদেশ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সামরিক চুক্তিতে যায় তাহলে চীনের নিকট থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা নাও পাওয়া যেতে পারে। চীনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে তা ব্যাহত হতে পারে। চীনের সহযোগিতায় ব্রিকস জোটে অংশগ্রহণের স্বপ্ন ব্যর্থ হবে। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কার্যক্রমে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি বিঘ্নিত হবে। এমনকি চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সড়ক সংযোগ স্থাপনের যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, তা-ও সম্ভব হবে না। বঙ্গোপসাগরে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার স্বপ্নও বিঘ্নিত হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিদের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে তারা অর্থায়ন করেছে এবং আরো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুত অর্থ আর পাওয়া নাও যেতে পারে। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি বাংলাদেশ এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে পারবে কি না তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ আগামীতে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোন দিকে যায় তার ওপর। বাংলাদেশ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশি থাকবে নাকি চীনের সঙ্গে বেশি থাকবে তার ওপর নির্ভর করছে বাহ্যিক অর্থনীতির আকার কীভাবে এবং কতটা বিকশিত হবে।
তবে যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ভারতের প্রতি এককভাবে না ঝুঁকে বঙ্গবন্ধু প্রণীত ও পরীক্ষিত পুরনো পররাষ্ট্রনীতি অর্থাৎ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’ অনুসরণ করি তাহলে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনের কিছুটা সম্ভাবনা থাকবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও নীতি স্বাধীনতার প্রশ্ন
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। আনুষ্ঠানিক খাতের পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে কয়েকটি বড় হাউজের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এই বিগ হাউজগুলো প্রচুর টাকার মালিক। তারা কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য খাত সব যায়গায় প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। এদের কেউ কেউ নিজেদের ব্যাংক থেকে নিজেরা ঋণ নিয়ে তা আর শোধ করেন নি। ব্যক্তি খাতের কয়েকটি ব্যাংক এবং রাষ্ট্রিীয় কোন কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর মালিক ও প্রশাসকবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত দেশের ব্যাংকিং সেক্টর এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। একদিনে তা হয়নি। ঔপনিবেশিক বা নয়া ঔপনিবেশিক বিদেশ নির্ভরতা আমাদের মজ্জাগত। এই দেশের শাসক বিত্তবান শ্রেণির একটি বিরাট অংশের ‘এক পা দেশে এক পা বিদেশে।’ অনেকেই এখন দেশে বৈধ-অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বিদেশে পাচার বা বিনিয়োগ করেছেন। তারা বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই বহির্মুখী বিত্তবান শ্রেণির ওপর নির্ভর করে আপনি ওয়ান ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবেন না। প্রয়াত আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রায়ই আমাকে বলতেন “জাতীয় উন্নতির” পূর্বশর্ত হচ্ছে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। যারা জাতিকে নেতৃত্ব দিতে চান–তাদের তা সর্বাগ্রে মানতে হবে।
আমরা এই মুহূর্তে উন্নয়নের যে স্তরে রয়েছি- সেই পর্যায়ে নির্ভর করতে হবে “সিএসএম-ই” খাত (Collage, Small and Medium Enterprises) এবং আধুনিক ও গ্রন্থিত কৃষি খাত (Modern and Articulated Agriculture) এর উপর। এই নিম্নপর্যায় থেকে বাংলাদেশ যদি এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় তাহলে তাকে প্রথমাবস্থায় পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত মিশ্র অর্থনীতির ধারা অনুসরণ করতে হবে।
প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ানো ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, বর্তমানে জিডিপিতে- প্রাইভেট সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। এটা বিগত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট আহরণের ক্ষেত্রে মোটেও অনুকূল নয়। জুন, ২০২৬ প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা বিগত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য মোতাবেক, ২০২৫ ক্যালেন্ডার বছরে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। এটা বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। এই বিদেশি বিনিয়োগের একটি বড় অংশই এসেছে পুন: বিনিয়োগ থেকে। অর্থাৎ আগে থেকেই যেসব বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের অর্জিত মুনাফার একটি অতি সামান্য অংশ নিজ দেশে নিয়ে না গিয়ে বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট-জিডিপি রেশিও হওয়া উচিৎ অন্তত ৩ শতাংশ। শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ এটাই নির্দেশ করে যে, এখনো বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য উপযোগী মনে করছে না। বাংলাদেশে যে বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে তার একটি বড় অংশই পুনর্বিনিয়োগ। গ্রিন ফিল্ড বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা পর্বতপ্রমাণ। অথচ গ্রিন ফিল্ড বিনিয়োগ আহরণ করতে না পারলে কোনভাবেই একটি পুজিবাদী বা মিশ্র ধারায় পরিচালিত দেশ কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নত প্রযুক্তি ক্ষমতা ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে পারে না। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারি তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসবে না। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেই দেশের বিনিয়োগকারীদের অবস্থা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করে থাকেন। শিল্প স্থাপনের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চিত যোগান থাকতে হবে। বিদ্যুতের কাঁচামাল বিদেশ থেকে কম খরচে আমদানি করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের কাঁচামালের মূল্য যদি বেশি হয় তাহলে শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে শিল্প লাভজনক হবে না। অন্যান্য দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের যে মূল্য তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় যদি নিম্ন ও প্রতিযোগিতাক্ষম পর্যায়ে রাখা না যায় তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে বিনিয়োগের জন্য আসবে না। প্রয়োজনে শিল্প খাতের জন্য জ্বালানিতে বিশেষ বিশেষ শিল্পের জন্য ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ শর্তসাপেক্ষ ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক, আই.এম.এফ এসব সৃজনশীল উদ্যোগ সমর্থন করবে না। কারণ, তারা নিওলিবারাল বাজার মৌলবাদের (Market Fundamentalism) পক্ষে। কাজেই আরেকটি খুবই জরুরি বিষয় হচ্ছে সকল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা থাকতে হবে।
সামাজিক সম্পদ বা মানবসম্পদের বিকাশ
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই চলবে না। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ যেমন জরুরি তেমনি বিনিয়োগ তথা শিল্পায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত জনশক্তির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সস্তায় প্রচুর সংখ্যক শ্রমশক্তির নিশ্চিত যোগান রয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখি এই জনশক্তি উন্নয়ন কাজে অবদান রাখার জন্য কতটা সক্ষম? আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশ বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর ভিয়েতনামের অবস্থান তৃতীয়। কিন্তু ভিয়েতনাম যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি বাংলাদেশকে অতিক্রম করে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রতিস্থাপন করে সামনে চলে আসবে। ভিয়েতনামের তৈরি পোশাকশিল্পের এত বিস্ময়কর বিকাশের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন শ্রমশক্তি। ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি। একজন ভিয়েতনামী শ্রমিক প্রতি বছর জিডিপি’তে ৪ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন করে। আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিক প্রতি বছর জিডিপি’তে ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন করে থাকে। অর্থাৎ ভিয়েতনামী শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। ভিয়েতনাম পাশাপাশি শ্রিমিকদের জন্য নিশ্চিত করেছে সামাজিকভাবে জীবনধারণ উপযোগী মজুরি, উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সর্বজনীন আবাস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার। এগুলোই ভিয়েতনামী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশি হবার মূল কারণ। ভিয়েতনামী শ্রমিকদের ন্যূনতম প্রকৃত সর্বমোট মজুরি এবং পুষ্টি মান বেশি হওয়ার কারণে তারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে শারীরিকভাবে বেশি সক্ষম এবং কাজে অধিক মনোযোগি হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও শ্রমিকের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দক্ষ মানবসম্পদ পাওয়া যাবে, যা এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এবং আসলে এটা ছাড়া তা হবেই না।
নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দরকার
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি অতি ধনী সংকীর্ণ স্বজনতোষণকারী দেশপ্রেমহীন কতিপয় অসৎ আমলা-ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ-এর ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো বা Nexus-দের হাতে শৃঙ্খলিত হয়ে আছে। এদের হাত থেকে দেশের অর্থনীতিকে মুক্ত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেক্টরকে ঋণ খেলাপি কালচার থেকে বের করে আনতে হবে। সামান্য সংখ্যক বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাত থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে মুক্ত করে সঞ্চয় ও পুজিকে সিএসএমই খাতের উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। দেশের সম্ভাবনাময় সিএমএসএমই খাত বর্তমানে পুঁজির ও উপযুক্ত সরকারি অবকাঠামোর (ভৌত ও সামাজিক) অভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সঠিকভাবে অবদান রাখতে পারছে না। উন্নত দেশগুলোতে, বিশেষ করে জাপান, চীন দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে সিএসএমই খাতকে বৃহৎ শিল্পর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব দেশের বৃহৎ শিল্প পুরোপুরি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। জাপানের জিডিপি’তে এসএমই খাতের অবদান ৫০ শতাংশ, চীনে ৬০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান ২৭ শতাংশের মতো। অথচ শিল্পখাতের মোট শ্রমশক্তির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশ ৭৮ লাখ থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ সিএমএসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এদের একটি বড় অংশই হিসাবের বাইরে অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকে যদি আরো মানবিক করা যায় তাহলে মানব পুঁজির দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পাবে। উপযুক্ত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা গেলে দেশ দু’ভাবে লাভবান হতে পারে। এরা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম চালাতে পারবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করা সম্ভব। অভ্যন্তরীণ খাতে অর্থনীতির চালিকা শক্তি কারা হবেন এবং তাদের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার ও সুশাসন কেমন হবে তার ওপর নির্ভর করছে আমরা এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি বাস্তবায়ন করতে পারবো কিনা।
উপসংহার
শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে বা Extensive Growth দ্বারা দ্রুত এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। আমাদের সস্তা শ্রমের চেয়ে অধিক উৎপাদনশীল শ্রমিকের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে অতিক্রম করে যাবার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কাজেই আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত কারও ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়া উচিৎ হবে না। সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল সাজাতে হবে।
লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়