একতার জন্য প্রত্যয়
Posted: 09 আগস্ট, 2026
১৯৮০ সনে ছাত্র ইউনিয়ন ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। কমরেড জ্যোতিষ বোস তখন সিপিবি জেলা কমিটির সম্পাদক। ছাত্র গ্রুপের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা বিক্রি করতে হবে। কি আজব ব্যাপার, পত্রিকা বিক্রি করতে হবে, এটা কিভাবে করবো। কিছু দিন আগে ছাত্র ইউনিয়ন জেলা সম্মেলন গিয়েছে, চাঁদা তুলেছি টানা এক মাস, জীবনে এর আগে আব্বার কাছে টাকা চাওয়া ছাড়া কোনোদিন কারো কাছে চাইনি। সে সময় গণচাঁদা উঠানো শিখলাম। এবার সোজা হকারি। কী আর করা, পার্টির নির্দেশ। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা এর আগে আমি পড়িনি। জয়ধ্বনি পড়েছি। পত্রিকা দেখেছি ১৯৭৪ সনে। আমার শিক্ষক তপন চৌধুরী আমাকে রেললাইনের কাছে একটা অফিসে নিয়ে যান। দেখলাম এটা কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। সেই অফিসের টেবিলে একতা পত্রিকা দেখেছি। গোটা গোটা অক্ষরে লেখাগুলো পড়েছি, কিন্তু ভেতরে মনোযোগ নিয়ে পড়িনি।
এবার পত্রিকা পড়তে হবে। ভাল লাগার টান যেমন আছে, বিরক্তিও আছে। নিয়ম করে কেউ কিছু করতে বললে, আমার শিশুবেলার ওষুধ খাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। কেমন জানি পরীক্ষার মতো লাগে। এবারের বিষয় তা নয়, এবার বিক্রি করা। সাহস করে তিনটি পত্রিকা নেই বিক্রি করার জন্য। আনন্দ মোহন কলেজে যাই। বাংলা ডিপার্টমেন্টে স্যারদের রুমে উঁকি দিয়ে দেখি দুজন স্যার বসা রফিক স্যার, প্রণব স্যার। ঢুকে পড়লাম, স্যাররা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলেন কী ব্যাপার? কিছু না বলে পত্রিকা দুটি রাখলাম, এবং চলে আসতে চাইলাম- স্যাররা বললেন, পয়সা নেবে না? বললাম, জ্বি নেব স্যার। রফিক স্যার বললেন একতা তো বিনা পয়সায় চলবে না, পয়সা নিয়ে যাও। সম্ভবত তখন একতা পত্রিকার মূল্য পঞ্চাশ পয়সা। দুজনে এক টাকা দিলেন। আমার হকারি শুরু।
একতা পত্রিকার হকারি শুরু করতে যেয়ে, খোঁজ শুরু করলাম প্রতিবেশী কার কাছে বিক্রি করা যায়। নাজিম ভাই রাজি হলেন। এভাবে একতা পত্রিকার হকার হয়ে গেলাম। অনেক দিন পর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, নাজিম ভাই ডাকছেন সাধারণ সৌজন্যমূলক আলাপের পর যা বললেন তা হচ্ছে এইরকম, “আমি কমিউনিস্ট পার্টি পছন্দ করি”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাই কিভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন, সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা পড়ে আমি কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী হয়েছি। একতা পত্রিকা যে একজনকে পার্টিতে নিয়ে আসতে পারে তা নিজে থেকে প্রত্যক্ষ করলাম। রফিক স্যার আজীবন পার্টির সমর্থক হয়ে ছিলেন। পত্রিকার সাংগঠনিক ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কেন এটি সম্ভব? কারণ একতা শ্রেণি চেতনার পত্রিকা। কমিউনিস্ট পার্টিও তাই। আমরা যারা কমিউনিস্ট পার্টি করি তাদের শ্রেণি চেতনা বরঞ্চ কম। কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদ, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে অগ্রাহ্য করে না। কিন্তু কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদী না। কমিউনিস্ট চেতনা নিয়ে জাতীয়তাবাদকে ডিল করে। এখন তো দেখছি আমরা জাতীয়তাবাদের দ্বারা মানসিকভাবে শাসিত হচ্ছি। শ্রেণি চেতনার ধারা তিরোহিত হচ্ছে। এই যে বৈপরীত্য আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বৈশ্বিক অগ্রগতির হাত ধরে। শিক্ষা ও সভ্যতার অগ্রগতিতে সংবাদপত্র আজ অপরিহার্য অঙ্গ। বিশ্বের সবক্ষেত্রে মানবতার এগিয়ে চলার সারথি সংবাদপত্র। আসলে সংবাদপত্র হচ্ছে বিশ্বে জনমত গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরা। মানবিক চেতনা জাগ্রত করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদপত্র স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করলেও, বিপর্যস্ত কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের যথাযথ ভূমিকা পালন করা খুব কঠিন। সেখানে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের দায়িত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। গণতন্ত্রকামী মানুষের পাশাপাশি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয় গণমাধ্যমকেও। আর সেজন্য সাংবাদিক ও তার প্রতিষ্ঠানকে নানা ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হয়। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা এই গুরুত্বের দিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। একতা পত্রিকা সমাজ বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক এবং হাতিয়ার।
সমাজ বিপ্লবে ইসক্রা, প্রাভদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিউবান বিপ্লবে এবং বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গ্রাম্মা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। শ্রেণি চেতনা সম্পন্ন পত্রিকা বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে সাপ্তাহিক একতা এই ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই চেষ্টার সাথে পার্টির ভূমিকা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। পার্টির ভূমিকা কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। পার্টি মেম্বারদের ভূমিকাই মূর্ত করে তোলে পার্টির ভূমিকা। এ ব্যাপারে আমাদের আত্মসমালোচনা থাকা জরুরি। এখন পত্রিকার বিষয়ে আমাদের কাজ খুব বুড়ি ছোঁয়া।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সাপ্তাহিক একতায় সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিলো, তা গোটা আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একতা সকলের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। সাংবাদিকতার সেই কঠিন কাজ সেদিন পালিত হয়েছিলো বলে এটি সম্ভবপর হয়েছিলো।
আন্তোনিও গ্রামসির দর্শনগত চিন্তা ছিলো এমন, উন্নত আধুনিক চিন্তাকে জনগণের মাঝে বিলিয়ে দেয়া, কেন? কারণ, তার মূল লক্ষ্য ছিলো ইন্টেলেকচুয়াল মর্যাল অর্থাৎ বৌদ্ধিক-নৈতিক মিতালি গড়ে তোলা, যার মধ্য দিয়ে ব্যাপক জনগণের বৌদ্ধিক অগ্রগতি হবে। এটি করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে পার্টির মুখপত্র। একতা সেই কাজটি করতে পারে, যদি একতা যাদের মুখপত্র তারা একতাকে তেমন জায়গায় নিয়ে যেতে চান।
এমন অঙ্গীকারই এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একতা পত্রিকার জন্য প্রয়োজন।
আমরা যে পিছিয়ে আছি, একতাও পিছিয়ে আছি, একতাও পিছিয়ে পড়ছে, তা থেকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়–
“আমরা আছি অন্ধকারে,
আলোর নেই যে সাড়া।
অন্ধকারের কবল থেকে
মুক্ত করবে কারা?
লাল কমলের সঙ্গী যারা,
তারা, তারা, তারা।”
লেখক : সভাপতি, সিপিবি, ময়মনসিংহ জেলা কমিটি