সংবাদপত্র ও রাজনীতি

Posted: 09 আগস্ট, 2026

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ-এর এই লেখাটি একতার ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা (১৭ আগস্ট ১৯৮৪) থেকে পুনর্মুদ্রিত হলো। একতার জন্মলগ্ন থেকেই মোহাম্মদ ফরহাদ পার্টির এই মুখপত্রটির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন একতার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। একতায় তিনি লিখেছেন অনেক। বিচ্ছিন্নভাবে একতাকে সাহায্য করা ছিল তার নিয়মিত কাজের অংশ। একতার ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। সংবাদপত্র একটি শক্তিশালী অস্ত্র। বিশ্বের প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহান নেতা ভ.ই. লেনিন পত্রিকা সম্পর্কে যে বিখ্যাত কথাগুলো বলেছিলেন, কমবেশি সকলেই তা জানেন। আমাদের সমাজ শ্রেণিবিভক্ত। শোষক শ্রেণি রাষ্ট্রযন্ত্রকে তাদের করায়ত্তে রাখতে চায়, সমাজে তাদের শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধনিকরা অনেক পন্থা বের করেছে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রও তারই একটা পন্থা। অবশ্য মানবসমাজে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিকগুলোর গুরুত্বও বিশেষভাবে রয়েছে। আমাদের দেশে আমরা বিশেষভাবে তা উপলব্ধি করি। কিন্তু সাধারণভাবে দেখা গেছে বুর্জোয়া গণতন্ত্র বুর্জোয়া শ্রেণি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করে। তবে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিকগুলোর কারণে বুর্জোয়ারা যখন বিব্রত অবস্থায় পড়ে তখন তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। আর যখন বিপদজ্জনক অবস্থায় পড়ে তখন হামেশাই গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করতে এবং খোলাখুলি একনায়কত্ব ও স্বৈরতন্ত্র চাপিয়ে দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। তারা তখন বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল গঠন করে গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকে, আবার রাজনৈতিক দল এবং নেতাকে নিয়ে একনায়কত্ব বা স্বৈরাচারী শাসনও কায়েম করে, যেমনটি হিটলার করেছিলেন যুদ্ধপূর্ব জার্মানিতে। আবার রাজনৈতিক দল বা নেতার ওপর ভিত্তি করেও বুর্জোয়ারা যখন দেশ কর্তৃত্বে রেখে শোষণের ধারা চালাতে অক্ষম হয়ে পড়ে তখন সামরিক শাসন, সামরিক রাজনৈতিক মিশ্রিত শাসন চালু করে দেয়। মোদ্দা কথা, বিশেষতঃ আজকের যুগে ধনবান যখন ক্ষয়িষ্ণু, বুর্জোয়াদের তখন নীতি বলে কোনো বালাই নেই। যে কোনো পন্থায় তারা ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়। তাই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চলে শ্রেণিসংগ্রাম। শোষিত মানুষেরা সচেতন হয়ে উঠে, শোষক ধনিকদের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়ে নতুন সমাজ গড়তে চায়। আর এটাই হলো শ্রেণিসংগ্রাম। আসলে রাজনীতির মূল হলো এ বিষয়টি। তবে শোষিত মেহনতিদের চেতনার দুর্বলতা, সংঘশক্তির দুর্বলতা প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে রাজনীতির উল্লেখিত মূল বিষয়টি সবসময়ে একটি দেশের জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে পরিণত হতে পারে না। ধনিকদের আবার নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে। বুর্জোয়া শাসন বজায় রাখা এবং শোষণের কৌশলের কায়দা-কানুন সর্ম্পকেও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকে। ফলে একাধিক রাজনৈতিক দলে তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকলে সে বিষয়ে মতপার্থক্য ঘটে। বুর্জোয়াদের অংশবিশেষ অধিক গণতন্ত্র দাবি করে অথবা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। শোষিত মেহনতি জনগণের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব থাকলে রাজনীতিতে তেমন অবস্থায় অনেক সময় একমাত্র গণতন্ত্রের ইস্যুই মুখ্য হয়ে ওঠে। আজকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সকলেই জানেন। গণতন্ত্র নাই। সামরিক শাসন চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতায় টিকতে দেওয়া হচ্ছে না। আরো খারাপ এবং মারাত্মক যে হত্যা এবং শক্তির ক্ষমতাবলে ক্ষমতা বদল করার ধারাই ৭৫-এর আগস্ট থেকে চালু রয়েছে। এই ধারা থামাতে হবে। গণতন্ত্র আনতে হবে। এই মূর্হুতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হলো সবচাইতে বেশি জরুরি। এ বিষয়ে দ্বিমত আছে বলেও মনে হয় না। তাই সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে এবং ব্যাপক গণঅন্দোলন গড়ে উঠেছে। কিন্তু একটু সচেতন সাধারণ মানুষ সামান্য গভীরতা নিয়ে ভাবলেই এই প্রশ্ন বিবেচনায় আনা স্বাভাবিক যে, কার স্বার্থে গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করা হয়েছে। এই প্রশ্নের জবাব বাস্তব জীবন থেকেই পাওয়া যায়। বিরাষ্ট্রীকরণ থেকে শুরু করে ব্যাংকের টাকা বস্তুতঃ হরিলুট করে সে টাকাতেই প্রাইভেট ব্যাংক খুলে বসা–প্রভৃতি ঘটনাগুলোই প্রামাণ করে গণতন্ত্র নস্যাৎ কার স্বার্থে করা হচ্ছে। মার্কিন রাষ্টদূত মিসেস কুন চট্টগ্রাম বণিক সমিতির সভায় ভাষণ দিলেন। পরে দেখা গেল আমাদের জাতীয় বাজেট সে ধারাতেই প্রণীত হলো। অতএব কার স্বার্থ হাসিল হচ্ছে, বাস্তব ঘটনা থেকেই তা বুঝতে কষ্ট হয় না। কিন্তু গণতন্ত্রের সংগ্রামে শরিক সকল শক্তিই কি একই সুরে বলবে যে লুটেরা ধনিক ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে এদেশে গণতন্ত্র স্থায়ী হতে পারছে না। একই সুরে বলবে না। কারণ? কারণ, আগেই ব্যাখ্যা করেছি। আজকের প্রেক্ষাপটে বুর্জোয়াদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শরিক থাকলেও, অতএব দেখা যাচ্ছে যে, অর্থবহ গণতন্ত্র অর্জন এবং সেটি স্থায়ী করতে হলে অবুর্জোয়া বিশেষতঃ শ্রমিক ও অন্যান্য মেহনতি জনগণের নিজস্ব স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি এবং সে শক্তির স¦াধীন অবস্থানের বিশেষ গুরুত্ব এবং তাৎর্পয রয়েছে। এটা গণতন্ত্রের জন্যও রয়েছে। আর আমাদের দেশেতো বুর্জোয়া নেতাদের দল বদলের স্বভাব একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে কাজ করেছে। এটাই বাস্তব। এই বাস্তবতার নিরিখে আজ তাই শ্রমিক ও মেহনতি জনগণের নিজস্ব স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা ও শক্তিকে গড়ে তোলা একটা ঐতিহাসিক কর্তব্য হয়ে সামনে এসেছে। মেহনতি জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ব্যতীত এবং সে শক্তির সঙ্গে গণতন্ত্রকামী ধনিক অংশের ন্যূনতম সমঝোতা ও ঐক্য ব্যতীত ইতিবাচক বুর্জোয়া গণতন্ত্র অর্জন সম্ভব নয়। এই ঐক্য আজ বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনে একটি উপদান হিসেবে কাজ করছে। বৃহত্তর ঐক্য রক্ষায় যেমন গুরুত্ব দেওয়া দরকার, তেমনই মেহনতি জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কাজটিকেও কোনোভাবে কম গুরুত্ব দিলে চলবে না। বরং একটু বেশি গুরুত্ব দিলেও ভুল হবে না। সংবাদপত্র মুখপত্র, সংবাদপত্র হাতিয়ার, সংগঠক ও জনমত সৃষ্টিকারী এবং প্রচারক। সংবাদপত্র অনেক কিছু। স্বাভাবিকভাবেই ধনিকতন্ত্রের সমাজে ধনিকদের হাতেই বেশি সংবাদপত্র থাকে। ধনিকদের মুখপত্র হিসেবে তাদের ভূমিকার সীমাবদ্ধতাও একই রকম। তারা প্রকৃত ও গভীর সত্যগুলো প্রকাশ করে না। এসব কথা কমবেশি সবাই বোঝেন ও জানেন। আমাদের দেশের প্রত্রিকা জগতে একটা বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে সাপ্তাহিক ‘একতা’। তথ্যসহ লুটেরা ধনিকদের কেচ্ছা ‘একতাই’ প্রকাশ করেছে। সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত্বঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিভাবে আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ করে চলেছে তাও প্রথম প্রকাশ করেছে ‘একতা’। প্রকাশ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন নৌবহরের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির কাহিনী। একই সঙ্গে ‘একতা’ নিরলসভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছে গণতন্ত্র এবং শ্রমজীবী মানুষসহ সাধারণ মানুষের স্বার্থ অর্জন এবং রক্ষায়। একটি সপ্তাহিক পত্রিকা হয়েও ‘একতা’ নিজস্ব স্বাধীন সত্তার ভিত্তি সৃষ্টি করতে বেশ কিছুটা সক্ষম হয়েছে। এটা এজন্য সম্ভব হয়েছে যে, এই পত্রিকা মেহনতি মানুষের মুখপত্র। ৩১ জুলাই ১৯৭০ সালে ‘একতা’র যাত্রা শুরু হয়েছিল, তেরটি বছর পার করে চৌদ্দতে পৌঁছুলো ‘একতা’। আজকের এই দিনে একতার আরো সাফল্য অবশ্যই কামনা করবো। একই সঙ্গে বিশেষভাবে পাঠক মহলের উদ্দেশে বলবো যে, একতা যে নীতি ও আর্দশের ঝাণ্ডা তুলে ধরেছে, তা আরো সমুন্নত করুন। কেবলমাত্র সে পথেই গণতন্ত্র, প্রগতি, রাজনৈতিক স্থিতি ও শান্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব। সম্ভব লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা।