একতার লড়াই চলছে, চলবে

Posted: 09 আগস্ট, 2026

সাপ্তাহিক একতার সাথে আামার সম্পর্ক ৫৩ বছর আগে। যখন কোনো কিছু বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই একতা পড়ছি। আমার বাবা একতা নিয়ে আসতেন এবং আইনজীবীদের মধ্যে বিক্রি করতেন। ট্যাবলয়েড সাইজের একতা পত্রিকা ছিল। ঢাকার বংশালে (আমার বাবার বাড়িতে) ছিল ‘একতার কার্যালয়’। পরবর্তীতে যখন সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হই তখন থেকেই একতা পড়ছি এবং ৮০ এর দশকে একতা লঞ্চঘাটে, বাসস্ট্যান্ডে বিক্রিও করেছি। ৮০ দশকে একতার জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল। সেসময় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেয়ালে একতা সাঁটা হতো। ধনীক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী শীর্ষক লেখা প্রতি সংখ্যায় প্রকাশিত হতো। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও একতা পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলশ্রুতিতে একতা নিষিদ্ধ হয়েছিল। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সিপিবি করে আসছে। সিপিবির রাজনীতিকে জানতে বুঝতে হলে একতা পত্রিকাকেই বেছে নিতে হবে। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে দৈনন্দিন খবর থাকে। কিন্তু একতা পত্রিকায় দেশ সমাজ রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশ্লেষণ থাকে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝতে হলে একতা পড়তে হবে। কেননা লুটেরা ধনীক শ্রেণির পত্রিকা, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াগুলো তাদের স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত খবরগুলো প্রচার করে যা সাধারণ শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের রাজনীতিকে অগ্রসর করতে হলে প্রচারমাধ্যমও একটা হাতিয়ার। পৃথিবীর যেখানে যেখানে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সংগ্রাম অগ্রসর হয়েছে সেখানেই খবরের কাগজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের দেশেও তাই। একতা পত্রিকা সাপ্তাহিক হলেও পার্টির বক্তব্য বা কখন কী করতে হবে তার ইঙ্গিত দিয়ে দিত। একতার একসময় সম্ভবত ৩৫,০০০ কপি ছাপানো হতো। বাংলাদেশের কোনো সাপ্তাহিক পত্রিকার এত সার্কুলেশন ছিল না। সাপ্তাহিক একতার সাথে থেকে বাংলাদেশে বহু বড় বড় সাংবাদিক তৈরি হয়েছে। যারা পত্রিকা জগতে যশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। সিপিবির প্রতিটি সদস্যের জন্য একতা পাঠ বাধ্যতামূলক ছিল। যারা পড়তে পারতেন না তাদেরকে পাঠ করে শোনানো হতো একতায় কী লিখেছে। জনসাধারণের কার্যক্রমের ভিতর দিয়ে একতা আমাদের দেশের লড়াকু সংগ্রামী মানুষের কাছে আদর্শের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। ৯০ এর দশকে সারা বিশ্বে বামপন্থি আন্দোলনের সামাজিক বিপর্যয় ঘটে তার প্রভাব আমাদের দেশে বামপন্থি আন্দোলনেও পড়ে এবং একতা পত্রিকাও এর বাইরে ছিল না। কিন্তু তারপরও একতা পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে তবে তার ছাপার সংখ্যা কমে যায়। তথাপি সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এত প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে একতা টিকে আছে। ৫৭ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে। আমার জানামতে কোনো সাপ্তাহিক পত্রিকা আমাদের দেশে এতদিন ধরে টিকে থাকার ইতিহাস খুবই বিরল। একতা পত্রিকার গুরুত্ব এখনো রয়েছে। সিপিবির নেতাকর্মীসহ প্রগতিশীল বামপন্থিদের মাঝে একতা আরও ব্যাপকভাবে প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পার্টির প্রতিটি স্তরে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে একতার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানে রাখা প্রয়োজন লুটেরা ধনীকশ্রেণির প্রচার প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে একতার মাধ্যমে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। সামাজিক মাধ্যমসহ অন্য মাধ্যমে আজ বামপন্থি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র-অপপ্রচার শুরু করেছে। এ প্রচারণা আগেও ছিল, এখন তা বিস্তৃত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে রাজপথে যেমনি বামপন্থি কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে পাশাপাশি মতাদর্শিক লড়াইও চালাতে হবে। এ লড়াই চালানোর অন্যতম একটি হাতিয়ার হলো একতা। অতীতেও একতা লড়াই চালিয়েছে এখনও লড়াই চালাচ্ছে, ভবিষ্যতেও লড়াই চালিয়ে যাবে। একতাকে শুধু কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র নয় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের মুখপত্রে উত্তরণ ঘটাতে হবে। তাদের সুখ-দুঃখের খবর সংগ্রহ করে একতায় ছাপাতে হবে। এই কাজগুলো কঠিন তবুও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, এটাই একতার অঙ্গীকার। একতার ৫৭ বছরের প্রকাশনায় একতাই গর্ব, একতার অহংকার। জয়তু একতা। লেখক : সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি