গণমাধ্যমের গলায় দড়ি

Posted: 09 আগস্ট, 2026

গণমাধ্যমের গলায় দড়ি পরানো হয়েছে বলাটা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি শোনাবে। কিন্তু শৃঙ্খল বলার চেয়ে গলায় দড়ি বলাই বোধকরি অধিক সঙ্গত। কেননা গণমাধ্যম যা করে তা হলো কথা বলা, তা সে কথা ছবি হয়ে আসুক, কিংবা আসুক ছাপার অক্ষর হয়ে, অথবা টেলিভিশনে দেখা দিক ছবি ও কথায় মেশামেশি ঘটিয়ে। সেই কথা বলার যে স্বাধীনতা তাকেই ভীষণভাবে এখন নিয়ন্ত্রিত করা হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের যে-চেহারা ও দশা তা শৃঙ্খলিত মূর্তির নয়, চোখে ঠুলি-পরানো রয়েছে বললেও তার যথার্থ ছবি ফুটিয়ে তোলা যাবে না, বলতে হবে তার গলায় ফাঁস পরানো হয়েছে। যাতে করে সে যা দেখে তা লিখতে না পারে, বলতে না পারে। অস্বস্তিতে রয়েছে ফাঁস কখন ফাঁসিতে পরিণত হয়। সমস্যাটা শেষ পর্যন্ত কিন্তু মানুষেরই অর্থাৎ সাংবাদিকেরই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে মালিকের স্বাধীনতা নয়, মালিক তার স্বাধীনতার জন্য পরোয়া না-ও করতে পারে; কেননা তার যেটা দরকার তা হলো মুনাফা, মুনাফার সুযোগ থাকলেই হলো। মুনাফা কখনোই বিবেকবান হয় না, বিবেকবান হলে অসুবিধা আছে, লাভের টাকা গুনতে গেলে হাত কাঁপতে পারে, মনে হতে পারে ওই টাকায় প্রতারণা তো বটেই, শ্রমিকের ঘাম রয়েছে জমাট বেঁধে। মুনাফার মুক্তি আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই এক ব্যাপার নয়; বরং তারা পরস্পরবিরোধীও হতে পারে। হওয়াটাই বরং স্বাভাবিক। কেননা গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে পুঁজির সেবা করতে চায় তবে তার পক্ষে পুঁজির দাসত্ব করাটাই ভাল, মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করাটা বাদ দিয়ে। গণমাধ্যমে স্বাধীনতা বলতে তাই আমরা মালিকের স্বাধীনতা বুঝি না, বুঝি কর্মরত সাংবাদিকদের স্বাধীনতা। বিশ্বে এখন তথ্য বিপ্লব ঘটে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। কথাটা মিথ্যা নয়। যে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এখন তথ্য পাওয়া সম্ভব, সেদিক থেকে পরিবর্তনটাকে বিপ্লব বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু এই অত্যাশ্চর্য ঘটনার অর্থ এই নয় যে, তথ্যের প্রবাহ অবাধ হয়েছে। বরং তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে এখন অনেক গভীর ও সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে। এমনকি মূল কর্তৃত্ব যে হ্রাস পেয়েছে তাও নয়। যেমন ধরা যাক, ইরাকের যুদ্ধের ব্যাপারে তথ্য প্রদান। সেখানে নতুন এক ধরনের সাংবাদিকতার খবর পাওয়া গেল। যার নাম এমবেডেড জার্নালিজম, অর্থাৎ আবদ্ধ সাংবাদিকতা। নামই বলে দিচ্ছে ব্যাপারটা আসলে কী। মার্কিনীরা ইরাক দখল করবে, তারা গণহত্যা ঘটাবে, বিভিন্ন দেশে গিয়ে হানা দেবে, সাংবাদিকদের কর্তব্য বিজয়ের সেই কাহিনী ও মাহাত্ম্যকে বিশ্বময় প্রচার করা। সাংবাদিক স্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা বটে। এটা তো স্থূল ঘটনা। সূক্ষ্মভাবে বড় ঘটনা ঘটেছিল ওই যুদ্ধের সময়ই। বিবিসি খুবই নিরপেক্ষ বলে খ্যাত, তার সাংবাদিকদের কেউ কেউ যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে যেসব তথ্য দাঁড় করানো হচ্ছিল সেগুলো কতটা সঠিক সেই বিষয়ে খোঁজখবর করতে গিয়েছিলেন, গিয়ে বড় রকমের ফাঁক ও ফাঁকি দেখতে পেয়ে সেটা প্রচার করেছেন। পরিণামটা হয়েছে ভয়াবহ। যে-বিজ্ঞানী সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি বাধ্য হয়েছেন আত্মহত্যা করতে। সাংবাদিকদের কারো প্রাণ যায়নি ঠিকই, কিন্তু একজনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, চাকরি ছেড়েছেন বিবিসির সর্বোচ্চ কর্তাদের দু’জন। ‘নাক গলিয়ো না’, এই গোপন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার হঠকারিতার অবশ্যই শাস্তি হবে, উপযুক্ত রকমের। প্রতি বছর ৩ মে সারাবিশ্বে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপিত হয়। এ উদযাপন আনন্দের নয়, বরং দুঃখের। শোকেরও বটে। কেননা এই দিবস উপলক্ষে তৈরি হিসাবপত্র আমাদের জানিয়ে দেয় যে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চলছে। সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে। বহু সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। কিন্তু এই দিবস আবার আশাও জোগায়, দুই কারণে। প্রথমত জানা যায় যে, সাংবাদিকতা তবুও তাদের জায়গা ছাড়েননি, সাংবাদিকতাই করছেন। দ্বিতীয়ত, আমরা টের পাই যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটি কেবল সাংবাদিকদের জন্য জরুরি নয়, জরুরি তা সব নাগরিকের জন্যই। অবাধে তথ্য পাওয়ার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে, সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা অত্যন্ত গর্হিত ও স্বৈরাচারমূলক কাজ বৈকি। বস্তুত স্বৈরাচারের চেহারা তথ্য-নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে যেমন স্পষ্টভাবে ধরা দেয় তেমনিভাবে কম ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে থাকে। সাংবাদিকরা যে পেশা ছাড়েন না তার কারণ কী? একটা কারণ নিশ্চয়ই এটা যে, সাংবাদিকতা হচ্ছে তাঁদের পেশা, এর সঙ্গে জীবিকার প্রশ্নটি প্রত্যক্ষ এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ওইটিই যে একমাত্র ব্যাখ্যা তাদের লেগে থাকার তা বোধহয় নয়। এতে কিছুটা নেশারও ব্যাপার আছে, নামান্তরে যা হচ্ছে অঙ্গীকার। এ হলো অনেকটা সেই ধরনের অঙ্গীকার যেটি একজন শিল্পীর থাকে, তাঁর শিল্প সাধনার প্রতি। কিন্তু শিল্পকলার সঙ্গে সাংবাদিকতার ব্যবধানটাও একেবারে মৌলিক। শিল্পীকে তাঁর বাজারের ওপর সেভাবে নির্ভর করতে হয় না, সাংবাদিককে যেভাবে ভরসা করতে হয় তাঁর চাকরির ওপর। শিল্পী নিজে নিজেই সৃষ্টি করেন, সাংবাদিক যেটা কখনোই করতে পারেন না, তাঁকে নির্ভর করতে হয় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগকর্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। সেজন্য এমনকি যখন তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠা, গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদির কারণে আপেক্ষিক স্বাধীনতাও ভোগ করেন তখনো তাঁর গলায় যে দড়ি থাকে না, তা নয়। থাকে। সে-দড়ি ফাঁসির না হলেও নিয়ন্ত্রণের বটেই। ‘বিপথে’ গেলে দড়িতে টান পড়তে পারে বৈকি এবং তখন দেখা যাবে স্বাধীনতা নেই সংবাদ-পরিবেশনের। তাছাড়া স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ তো একটা থাকেই। মালিক কোনটা পছন্দ করবেন কোনটা করবেন না সেটা যেকোনোভাবেই হোক বিবেচনার মধ্যে না রেখে উপায় থাকে না। এই যে মালিকের কথা বলছি সেটা কে? না, মালিক কোনো একজন ব্যক্তি না-ও হতে পারেন, হতে পারে মালিকানা রয়েছে কোম্পানির হাতে, সেটাই স্বাভাবিক। কেননা গণমাধ্যম চালু রাখতে হলে পুঁজির দরকার হয়, আর সে-পুঁজি যৎসামান্য নয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই, সংবাদপত্রের ব্যাপারেও বিস্তর টাকা খাটাতে হয় এবং সেটা কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে সংগ্রহ করা কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আপাতদৃষ্টিতে মালিক ব্যক্তি হোক আর প্রতিষ্ঠানই হোক, আসল মালিক একজনই, সেটি হচ্ছে পুঁজি। পুঁজি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে, তাকে চালু রাখে, প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয় এবং সর্বদাই তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর আজকের দিনে অবস্থা এমন যে ক্ষুদ্র পুঁজি দিয়ে সংবাদপত্র তো দূরের কথা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করাও কষ্টকর। ওদিকে পুঁজি যত বড় হয় ততই দুরন্ত হয়, সে তার নিজের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করতে চায় অন্য সবার স্বাধীনতাকে খর্ব করে দিয়ে। এই যে বাংলাদেশে এখন আমরা দেখার মতো চলচ্চিত্র খুব কম পাচ্ছি, তার পেছনে রয়েছে পুঁজির ষড়যন্ত্র। বিনিয়োগকারীরা অর্থ লগ্নি করে, প্রচুর অর্থ; এবং সেই অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য তেমন ছবি তৈরি করে যা চলে, আর চলা না চলা নির্ভর করে স্থূলতার ওপর, যত বেশি স্থূল তত বেশি কাটতি, নিয়ম এটাই। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা ঘটছে, গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটার আশঙ্কা। টেলিভিশনে তো বটেই খবরের কাগজেও এখন ছবিতে যেমন কথাতেও তেমনই স্থূলতার বিস্তর দাপাদাপি। কারণ ওসব জিনিস কাটে ভালো। কিন্তু তবুও গণমাধ্যম কখনো গণমাধ্যম থাকবে না যদি তাতে সংবাদ না-থাকে। মানুষ খবর চায়। খবর না-থাকলে টেলিভিশনের পর্দা পরিণত হবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রেক্ষাগৃহে এবং তার দর্শক থাকবে এমন লোকজন যারা ছায়াছবি দেখবে ঠিকই, কিন্তু পণ্য কেনার রুচি বা সামর্থ্য কোনোটিতেই বলীয়ান হবে না। আর পণ্যের বিজ্ঞাপনই যদি বিক্রি করা না-গেল তাহলে টেলিভিশনের আয়টা আসবে কোথা থেকে? আসবে না। চূড়ান্ত বিচারে খবরের কাগজ তো খবর ছাপে বলেই খবরের কাগজ হয়, নইলে সংবাদপত্রের পাঠক তাকে ছোঁবে কেন! মানুষের ভেতর খবরের জন্য আগ্রহটা রয়েছে। এটাকে আদিম ক্ষুধাও বলা যায়। মানুষ যে গল্প শুনতে ভালবাসে, সেটা তার ভেতরকার একেবারে প্রাথমিক কৌতূহলের কারণেই। ওই কৌতূহল তাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য সবকিছুর দিকে অহর্নিশ ধাবিত রাখে এবং কৌতূহলের তাড়নাতেই সে খবর চায় এবং গণমাধ্যমের কাছে ছুটে যায়। গণমাধ্যমে নিয়োজিত পুঁজির বাজার নিহিত রয়েছে ব্যক্তি মানুষের সংবাদ ক্ষুধার অভ্যন্তরেই। গণমাধ্যমে লগ্নি-করা পুঁজি চায় তার নিজের স্বার্থ দেখবে, সেই স্বার্থে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করবে। বিক্রি থেকে পাওয়া মুনাফার বিবেচনাটা তো আছেই, থাকবেই, তার চেয়েও বড় ইচ্ছাটা হচ্ছে পুঁজির স্বার্থকে পাহারা দেওয়া। যেমন ধরা যাক বাংলাদেশের অবস্থা। এখানে অহরহ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। এখন অনেকগুলো লঞ্চের যিনি মালিক, তাঁর কোম্পানি যদি সংবাদপত্রেরই মালিক হয় (হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় বরং খুবই স্বাভাবিক) এবং তাঁর কোনো একটি লঞ্চ ডুবে গিয়ে যদি কয়েক’শ লোকের মৃত্যু ঘটে (এরকমটা ঘটে থাকে বৈকি) তাহলে তাঁর সংবাদপত্রে এই সত্যকে কি গোপন করা হবে, নাকি পারবে সে প্রকৃত সত্যকে উন্মোচিত করতে? গার্মেন্টস শিল্পে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার বিরুদ্ধে সেই সংবাদপত্র কিভাবে লিখবে যে-সংবাদপত্রের পুঁজি আসছে ওই শিল্প থেকেই? বাংলাদেশে যা সত্য সারা পুঁজিবাদী ব্যবসাতেও তা অভ্রান্ত সত্য, বাইরের ভাব-সাব যা-ই হোক না কেন। পুঁজিবাদী বিশ্বে নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমগুলোর কোনটি কোন দলকে সমর্থন করবে সেটা মতাদর্শিক বিবেচনার দ্বারা নির্ধারিত হয় না, হয় পুঁজির স্বার্থের মাপকাঠিতে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের খবর আমরা সেভাবেই পেয়েছি যেভাবে মার্কিন পুঁজিপতিরা খবর আমাদের পাওয়া উচিত বলে মনে করেছে। তথাকথিত যুদ্ধটা মার্কিন জনগণের নয়, সেটি পুঁজিপতিদেরই, তারা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে গণমাধ্যকে ব্যবহার করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে গণহত্যা ঘটানোর সত্যকে তেমনভাবে উপস্থিত করেছে যেভাবে করলে পুঁজির স্বার্থ নির্বিঘ্ন থাকে। গণমাধ্যম কাজ করেছে ক্রীতদাসের। ইরাকের মানুষ যে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিল সে-খবর আমরা পাইনি, পেয়েছি উল্লাসের খবর। বিবিসি কিছুটা ‘নিরপেক্ষ’ হওয়ার চেষ্টা করেছিল, মার খেয়ে সোজা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতা’র ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবাষির্কীতে পত্রিকার পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং পত্রিকা সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়