মুক্তির ভাষ্য নাকি শোষণের নতুন মুখ?
Posted: 02 আগস্ট, 2026
ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Origin of the Family, Private Property and the State –এ লিখেছিলেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই নারীর ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের সূচনা ঘটে। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এর ভাষায়, মানবসভ্যতার প্রথম শ্রেণিভিত্তিক নিপীড়নের রূপগুলোর একটি ছিল নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য। পরিবারের ভেতরে নারীর শ্রমকে অবৈতনিক করে তোলা, সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত করা এবং নারীকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখার মধ্য দিয়েই পিতৃতন্ত্র নিজেকে স্থায়ী করেছে।
প্রশ্ন হলো–বাংলাদেশে কি সেই শোষণ শেষ হয়েছে? নাকি কেবল তার রূপ বদলেছে? আজকের বাংলাদেশে নারীরা পোশাকশিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গৃহশ্রম, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাজ করছেন। নারীর শ্রম আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশ নারী; কৃষিক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান; স্বাস্থ্যসেবার বিশাল অংশ নার্স, মিডওয়াইফ ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় যে অর্থনীতি নারীর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই অর্থনীতির ক্ষমতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত কি নারীর হাতে?
উত্তরটি সহজ নয়। কারণ নারীর শ্রম দৃশ্যমান হলেও তার ক্ষমতা এখনো সীমিত। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু সেই প্রবেশ সবসময় স্বাধীনতার সমার্থক নয়। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন দারিদ্র্যের চাপে, জীবিকার তাগিদে বা পরিবারের বেঁচে থাকার প্রয়োজন থেকে। অর্থাৎ শ্রমের সুযোগ সৃষ্টি হলেও শোষণের কাঠামো ভেঙে যায়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরও জটিল হয়েছে। এই বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল ব্যক্তি বা সংস্কৃতিকে নয়, অর্থনীতি, রাষ্ট্র এবং সমাজকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
শ্রমের মর্যাদা আছে, কিন্তু শ্রমিকের?
দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত “RMG sector: ¸riad abuses of women workers” প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত বহু নারী এখনো যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, মজুরি বৈষম্য এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার। অনেক নারী শ্রমিক জানিয়েছেন, অপমান কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হলেও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে তারা চাকরি ছাড়তে পারেন না।
এর আগে “Investigate sexual violence against RMG workers” সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৪৫ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বা যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। পাশাপাশি মৌখিক অপমান, মানসিক নির্যাতন এবং অর্থনৈতিক শোষণের ঘটনাও উঠে এসেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই শ্রম কার জন্য? বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, বহুজাতিক ব্র্যান্ড কম দামে উৎপাদিত পোশাক পায়, উদ্যোক্তা লাভ করেন; অথচ যে নারী প্রতিদিন দশ থেকে বারো ঘণ্টা শ্রম দিচ্ছেন, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান কিংবা ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত? এঙ্গেলস বলেন, শ্রমের মাধ্যমে নারী উৎপাদনের অংশ হয়েছেন, কিন্তু উৎপাদনের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সমান শ্রম, অসম মজুরি
শোষণের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপগুলোর একটি হলো মজুরি বৈষম্য। বাংলাদেশে এখনো বহু ক্ষেত্রে সমমানের কাজ করেও নারী পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। বিশেষ করে কৃষি, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট সহায়ক কাজ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই বৈষম্য স্পষ্ট। একই উৎপাদনশীলতা থাকা সত্ত্বেও নারীর শ্রমকে কম মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বৈষম্যের পেছনে শুধু বাজারের যুক্তি কাজ করে না; কাজ করে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা “পুরুষ পরিবারের উপার্জনকারী”, আর “নারীর আয় অতিরিক্ত”। ফলে নারীর শ্রমকে গৌণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ এখানে বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারে অসংখ্য নারীই পরিবারের প্রধান বা সমান উপার্জনকারী। তবু তাঁদের শ্রমের মূল্য কম নির্ধারিত হয়।
এঙ্গেলসের তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনৈতিক নির্ভরতা নারীর অধীনতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা দেখায়, অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েও নারীরা সবসময় ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন না। কারণ মজুরি কম, সম্পদের মালিকানা সীমিত এবং পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা এখনো প্রায়শই দ্বিতীয় সারিতে।
নারী কি নিজের পেশা নিজে নির্বাচন করতে পারেন?
আমরা প্রায়ই বলি নারীরা এখন সব পেশায় যাচ্ছেন। বাস্তবে কি তা-ই? বাংলাদেশে এখনো অসংখ্য পেশা অলিখিতভাবে “পুরুষের পেশা” হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারী শিল্প, উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তি, নির্মাণ, নিরাপত্তা, পরিবহন, জাহাজশিল্প কিংবা অনেক নেতৃত্বের পদে নারীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। এর একটি কারণ দক্ষতার অভাব নয়; বরং সামাজিক মানসিকতা।
ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় কোন কাজ “মেয়েদের জন্য মানানসই” এবং কোনটি নয়। পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক রীতি সব মিলিয়ে নারীর পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্র সংকুচিত করে দেয়।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এমন পেশাকেই “উপযুক্ত” মনে করে, যেখানে নারী একই সঙ্গে গৃহশ্রমও করতে পারবেন। শিক্ষকতা, নার্সিং, গার্মেন্টস, সেলাই, বিউটি সার্ভিস এসব পেশাকে অনেক সময় উৎসাহিত করা হয়; কিন্তু দীর্ঘ সময়ের মাঠপর্যায়ের কাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভারী শিল্প বা প্রযুক্তিনির্ভর অনেক ক্ষেত্রকে এখনও নারীর জন্য নিরুৎসাহিত করা হয়।
অর্থাৎ পেশা নির্বাচনেও নারীর স্বাধীনতা আপাতদৃষ্টিতে থাকলেও বাস্তবে সেটি সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন- “নারী হয়ে জন্ম নেয় না; নারী হয়ে ওঠে।” বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই “হয়ে ওঠা” প্রক্রিয়াটিই পিতৃতন্ত্র।
মুক্তবাজার, নাকি সস্তা নারীশ্রমের অর্থনীতি?
১৯৯০-এর দশকের পর থেকে বাংলাদেশ ক্রমশ নব্যউদারবাদী অর্থনৈতিক নীতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। বেসরকারিকরণ, রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শ্রমবাজারকে নমনীয় করা এবং রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ব্যয় সীমিত করা এসব নীতির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীরভাবে পড়েছে।
এই অর্থনৈতিক কাঠামোতে নারী শ্রমিকদের বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। কেন? কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কম খরচে উৎপাদন করতে হলে দরকার সস্তা, অনুগত এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য শ্রমশক্তি। নারী শ্রমিকদের প্রায়ই এই ধারণার মধ্যেই দেখা হয়। তাঁদের “ধৈর্যশীল”, “কম প্রতিবাদী”, “কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি” এই ধরনের লিঙ্গগত ধারণা ব্যবহার করে শ্রমবাজারে তাঁদের অবস্থান তৈরি করা হয়। অর্থাৎ নারীর কর্মসংস্থান বাড়লেও সেই কর্মসংস্থান অনেক ক্ষেত্রে শোষণমুক্ত নয়; বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের নতুন চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি।
মার্ক্সবাদী নারীবাদী গবেষক ন্যান্সি ফ্রেজার দেখিয়েছেন, সমসাময়িক পুঁজিবাদ নারীর শ্রমকে কেবল কর্মক্ষেত্রে নয়, পরিবারেও ব্যবহার করে। কর্মক্ষেত্রে কম মজুরির শ্রমিক হিসেবে এবং ঘরে অবৈতনিক পরিচর্যাকারী হিসেবে দুই ভূমিকাতেই নারী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখেন।
বাংলাদেশেও আমরা একই চিত্র দেখি। একজন নারী সকাল থেকে কারখানায় শ্রম দেন, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রান্না, সন্তান লালন-পালন, বয়স্কদের পরিচর্যা এবং গৃহস্থালির কাজ করেন। এই দ্বিতীয় শ্রমের কোনো মজুরি নেই, কোনো ছুটি নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই। এখানেই নব্যউদারবাদ এবং পিতৃতন্ত্র একে অপরকে শক্তিশালী করে।
এঙ্গেলস যে অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলেছিলেন, সেখানে শিক্ষা থেকেও শ্রেণি ও লিঙ্গকে আলাদা করে দেখা যায় না। কারণ, দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলে হয়তো কষ্ট করেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে; কিন্তু একই পরিবারের একটি মেয়ের বিয়ে, গৃহশ্রম কিংবা কম মজুরির চাকরিই বেশি “বাস্তবসম্মত” বিকল্প হিসেবে হাজির হয়।
নারী কেন কথা বলেন না? নীরবতার পেছনে ব্যক্তিগত ভয় নয়, কাঠামোগত ভয়
অনেকেই প্রশ্ন করেন যদি এত নির্যাতন হয়, তাহলে নারীরা অভিযোগ করেন না কেন? এই প্রশ্নের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা লুকিয়ে থাকে। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী কথা বলেন না, তা এই কারণে নয় যে তিনি নির্যাতনকে মেনে নিয়েছেন; বরং তিনি জানেন অভিযোগ করার পর কী ঘটতে পারে। বাংলাদেশে যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা কর্মক্ষেত্রের নিপীড়নের অসংখ্য ঘটনা কখনো থানায় পৌঁছায় না। অনেক ঘটনাই পরিবার, সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই চাপা পড়ে যায়।
কারণগুলো বহুমাত্রিক
প্রথমত, সমাজ এখনো ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। “কেন সেখানে গিয়েছিলে?”, “কী পোশাক পরেছিলে?”, “এতদিন পরে অভিযোগ করলে কেন?” এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নির্যাতিত নারীকে, অপরাধীকে নয়।
দ্বিতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলা পরিচালনার ব্যয় এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের জটিলতা অনেক নারীকে শুরুতেই নিরুৎসাহিত করে।
তৃতীয়ত, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ, চাকরি হারানোর আশঙ্কা কিংবা আরও হয়রানির ভয় কাজ করে। ফলে নীরবতা অনেক সময় সম্মতি নয়; বরং টিকে থাকার কৌশল।
নারীবাদী লেখিকা ক্যাথরিন ম্যাককিনন দেখিয়েছেন, পিতৃতন্ত্র শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়; আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেও নিজেকে পুনরুৎপাদন করে। অর্থাৎ বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ হওয়ার দাবি করলেও বাস্তবে সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
বাংলাদেশেও এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো নারী অভিযোগ করেন, তখন তিনি কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ান না; অনেক সময় একটি সামাজিক মানসিকতা, একটি ক্ষমতার নেটওয়ার্ক এবং একটি দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও দাঁড়ান।
আইন কি সবার জন্য সমান?
বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলে। কিন্তু বাস্তব জীবনে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
একজন দরিদ্র গৃহকর্মী, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা একজন প্রান্তিক নারীর জন্য বিচার পাওয়ার পথ এবং একজন অর্থবান, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য বিচার প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা এক নয় এমন অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী ও গবেষকেরা বহুবার তুলেছেন। এখানে বিষয়টি আইন নয়; বরং আইনের প্রয়োগ।
মাতৃত্ব: অধিকার নয়, অনেক নারীর জন্য কর্মজীবনের শাস্তি
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মাতৃত্বকালীন ছুটির আইনি ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হলেও বাস্তবতা ভিন্ন, বিশেষ করে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে।
গার্মেন্টস, ক্ষুদ্র শিল্প, দোকান, গৃহশ্রম, কৃষি, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার, অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অসংগঠিত শ্রমবাজারে কর্মরত বিপুল সংখ্যক নারী বাস্তবে বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না অথবা আইন অনুযায়ী সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। অনেক নারী সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন চাকরি হারানোর ভয়ে। আবার অনেককে মাতৃত্বের পর চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। ফলে নিয়োগকর্তারাও অনেক সময় অঘোষিতভাবে এমন নারীকে নিয়োগে অনাগ্রহী হন, যিনি ভবিষ্যতে মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার চাইতে পারেন।
এভাবে মাতৃত্ব, যা একটি সামাজিক দায়িত্ব, তা ব্যক্তিগত “ঝুঁকি” হিসেবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ একটি শিশু জন্ম ও লালন-পালন কেবল একজন মায়ের কাজ নয়; এটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশ।
গৃহশ্রম : অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অদৃশ্য শ্রম
বাংলাদেশের কোটি কোটি নারী প্রতিদিন রান্না করেন, সন্তান লালন-পালন করেন, বৃদ্ধদের দেখাশোনা করেন, ঘর পরিষ্কার করেন, পানি সংগ্রহ করেন, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেন।
এই কাজগুলোর কোনোটির জন্য তাঁরা মজুরি পান না। কিন্তু এই শ্রম ছাড়া বাজার অর্থনীতিই চলতে পারত না। যদি একজন শ্রমিকের খাবার না রান্না হতো, যদি শিশুর যত্ন না নেওয়া হতো, যদি পরিবারের পুনরুৎপাদনের কাজ না হতো তাহলে উৎপাদন ব্যবস্থাও টিকত না।
মার্ক্সবাদী নারীবাদী চিন্তাবিদ সিলভিয়া ফেদেরিচি দেখিয়েছেন, গৃহশ্রম আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, কিন্তু এটিকে “ভালোবাসার কাজ” হিসেবে উপস্থাপন করে বিনা মজুরিতে করিয়ে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। একজন নারী যদি বাইরে আট ঘণ্টা কাজ করেন, তারপর বাড়ি ফিরে আরও পাঁচ-ছয় ঘণ্টা গৃহশ্রম করেন, তাহলে তাঁর কর্মদিবস একজন পুরুষের তুলনায় অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়। কিন্তু জাতীয় আয় হিসেবেও এই শ্রমের মূল্য প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।
এই কাঠামোতে নারী শ্রমিক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এমন শ্রমশক্তি চায়, যারা কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করবে, সহজে সংগঠিত হবে না, এবং সহজে প্রতিস্থাপন করা যাবে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও নারী শ্রমিকদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে তারা “ধৈর্যশীল”, “শান্ত”, “কম প্রতিবাদী” এবং “কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি”। ফলে নারীর শ্রমকে মুক্তির মাধ্যম হিসেবে নয়, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেই নব্যউদারবাদ ও পিতৃতন্ত্রের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। পিতৃতন্ত্র নারীর শ্রমকে কম মূল্যবান বলে প্রতিষ্ঠা করে। পুঁজিবাদ সেই কম মূল্যবান শ্রমকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবহার করে।
গৃহশ্রম, পরিচর্যা এবং ‘ডাবল বার্ডেন’
বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মজীবী নারী অফিস, কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে আবার রান্না, সন্তান লালন-পালন, বয়স্কদের সেবা, ঘর পরিষ্কার এবং পরিবারের অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেন।
এই বাস্তবতাকে সমাজবিজ্ঞানীরা Double Burden Second Shift বলে অভিহিত করেন। একজন পুরুষের কর্মদিবস শেষ হয় অফিস শেষে। একজন নারীর কর্মদিবস অনেক সময় তখনই শুরু হয়। গৃহশ্রমের এই বিশাল অংশের কোনো মজুরি নেই, কোনো পেনশন নেই, কোনো ছুটি নেই এবং জাতীয় আয় হিসাবেও এর যথাযথ স্বীকৃতি নেই। সিলভিয়া ফেদেরিচি যুক্তি দিয়েছেন, গৃহশ্রমকে “ভালোবাসার দায়িত্ব” হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যাতে এটিকে অর্থনৈতিক শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি না দিতে হয়।
বাংলাদেশেও আমরা দেখি, একজন নারী বাইরে চাকরি করলেও ঘরের কাজকে এখনও “নারীর দায়িত্ব” হিসেবেই দেখা হয়। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও গৃহস্থালির শ্রমের বোঝা তাঁর কাঁধ থেকেই নামেনি।
মাহরাং বালোচ : নারী যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলেন
নারীমুক্তির প্রশ্ন শুধু কর্মক্ষেত্র বা পরিবারের ভেতরের নয়; এটি রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নও। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বালোচ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায় যখন একজন নারী রাষ্ট্র, সামরিক কাঠামো বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, একজন নারী হিসেবেও অতিরিক্ত সামাজিক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই নারী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শ্রমিকনেত্রী কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরা অনলাইন হয়রানি, চরিত্রহনন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সামাজিক অপমানের শিকার হন।
বাংলাদেশেও আমরা বিভিন্ন সময়ে নারী সাংবাদিক, শ্রমিক নেতা, মানবাধিকারকর্মী কিংবা সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ, সাইবার হয়রানি ও সামাজিক অপপ্রচারের ঘটনা দেখেছি। এটি দেখায়, পিতৃতন্ত্র কেবল পরিবারের ভেতরে নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেও কাজ করে।
নারীমুক্তি কি কেবল নারীর দায়িত্ব?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ফিরে আসে। যে মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, যে কিশোরী অল্প বয়সে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করে, যে নারী প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন, যিনি সমান কাজ করেও কম মজুরি পান, যিনি মাতৃত্বের কারণে চাকরি হারান, যিনি কর্মস্থলে হয়রানির শিকার হয়েও অভিযোগ করতে পারেন না, যিনি অফিস শেষে আবার বিনা মজুরিতে গৃহশ্রম করেন- তাঁর কাছ থেকেই কি আমরা আশা করব যে তিনিই একা নারীমুক্তির নেতৃত্ব দেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তি নয়; কাঠামোর দিকে নিয়ে যায়।
নারীমুক্তির দায় কেবল নারীর নয়। এটি রাষ্ট্রের। এটি অর্থনৈতিক নীতির। এটি শিক্ষাব্যবস্থার। এটি শ্রমবাজারের। এটি বিচারব্যবস্থার। এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের।
এঙ্গেলসের আলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতা
এঙ্গেলস মনে করেছিলেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রেণি বিভাজন এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের বিকাশ নারীর অধীনতার ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা দেখায়, সেই কাঠামো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি; বরং নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
আজ নারীরা কর্মক্ষেত্রে আছেন, কিন্তু সম্পদের মালিকানা এখনও সীমিত। তাঁরা উৎপাদনে অংশ নেন, কিন্তু উৎপাদনের সিদ্ধান্তে তাঁদের ভূমিকা সীমিত। তাঁরা উপার্জন করেন, কিন্তু অবৈতনিক গৃহশ্রমের প্রধান দায়িত্বও তাঁদেরই বহন করতে হয়। তাঁরা শিক্ষায় প্রবেশ করেন, কিন্তু উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর আগেই অনেকে ঝরে পড়েন।
নারীমুক্তি মানে কেবল কর্মসংস্থান নয়, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন, নারীমুক্তি কেবল নারীকে চাকরি দেওয়ার প্রশ্ন নয়। কেবল সংসদে কয়েকজন নারী সদস্য বাড়ানোর প্রশ্নও নয়। কেবল নারী দিবসে ফুল দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়ও নয়।
নারীমুক্তি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সমান শ্রমের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত হবে। প্রতিটি নারী নিজের পেশা স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারবেন। গৃহশ্রমকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। মাতৃত্বকে ব্যক্তিগত বোঝা নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হবে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি কন্যাশিশুকে রাষ্ট্র ফিরিয়ে আনবে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত হবে। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার বাস্তবে রক্ষা করা হবে। বিচারব্যবস্থা আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে। সম্পদ, ভূমি, ঋণ, উত্তরাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সমান অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, নারীকে “সহযোগী” নয়, সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এঙ্গেলস লিখেছিলেন, শোষণের ভিত্তি যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে, তবে মুক্তিও কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন।
বাংলাদেশের নারীমুক্তির সংগ্রামও তাই কোনো একক স্লোগানের সংগ্রাম নয়। এটি শিক্ষা, শ্রম, অর্থনীতি, আইন, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সম্মিলিত সংগ্রাম।
কারণ একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে মুক্ত হয়, যখন সেই সমাজে নারীর শ্রম শুধু ব্যবহৃত হয় না স্বীকৃত হয়; নারীর কণ্ঠ শুধু শোনা হয় না গুরুত্বও পায়; এবং নারীর অধিকার শুধু আইনের বইয়ে নয়, বাস্তব জীবনেও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।