সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
Posted: 02 আগস্ট, 2026
একতা ডেস্ক :
এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের সংখ্যা-৩২ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে
তার ২০তম কিস্তি।
(২০)
বাংলা ভাষার অধিকার
ও সকল ভাষার সমান মর্য্যাদা কায়েম করুন
পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববঙ্গ সংগঠনী কমিটি নিম্নলিখিত বিবৃতি প্রকাশ করিতেছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব নাজিমুদ্দীন গত ২৭শে জানুয়ারী ঢাকায় বক্তৃতা দান কালে “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে” বলিয়া যে ঘোষণা করিয়াছেন আমরা তাহার তীব্র নিন্দা করিতেছি।
১৯৪৮ সালে পূর্ব্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জনাব নাজিমুদ্দীন প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে বাংলা ভাষা সম্পর্কে যে ওয়াদা করিয়াছিলেন, এই ঘোষণা জাতির জন্মগত অধিকার ও মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার কাড়িয়া নিতে উদ্যত হইয়াছেন। নিজের শোষণের সুবিধার জন্য জনগণকে পশ্চাৎপদ রাখার উদ্দেশ্যে ইংরেজ আমাদের দেশে ইংরেজী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চালু করিয়া জনগণের শিক্ষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির পথ রুদ্ধ করিয়াছিল। পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠিও জনগণকে নিরক্ষর ও পশ্চাৎপদ রাখিয়া সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখার জন্য বাংলার উপর আরবী হরফ চাপানো ও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করিয়া জনগণের শিক্ষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির পথ রুদ্ধ করিয়া দিতে চাহিতেছে।
ভাষার ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়াশীল নীতিকে যুক্তিসঙ্গত করার জন্য লীগ নেতারা বলিয়া থাকেন যে, “ইসলামী তমদ্দুন” ও “জাতীয় সংহতির” জন্য একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করা দরকার।
কিন্তু এই যুক্তি অসার। যেখানে পাকিস্তানে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির বাস, যেখানে পাকিস্তানের অর্দ্ধেকের বেশী লোক বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যেখানে সমস্ত দেশ অন্ধকারে ডুবিয়া আছে, সেখানে “ইসলামী তমদ্দুনের” নামে কেবল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপাইয়া দিলে সমস্ত জনগণের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হইয়া যাইবে।
যদি প্রত্যেকের ভাষাকে সম-মর্য্যাদা দেওয়া না হয়, যদি বিভিন্ন ভাষাভাষি জনগণকে নিজের মাতৃভাষার শিক্ষালাভ ও রাষ্ট্রের কাজ চালাইবার অধিকার দেওয়া না হয়, তাহা হইলে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির ভিতর সংহতির পরিবর্তে আসিবে জাতিগত, প্রদেশগত রেশারেশি ও বিভেদ।
পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির ভাষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির উপরই পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতি ও সংহতি নির্ভর করে। পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতি যেমন-বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি বেলুচি-প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুযায়ী উন্নতি লাভ করুক, সমস্ত ভাষা যেমন-উর্দু, বাংলা, পুস্ত, পাঞ্জাবী, সিন্ধি সমস্ত ভাষাকেই রাষ্ট্রে সমান অধিকার দেওয়া হোক– ইহাই পাকিস্তানকামী সকল জাতির কাম্য। কিন্তু লীগ সরকার উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে চালু করার চেষ্টা করিয়া শধু বাঙ্গালীর অধিকার ও কৃষ্টির উপর আক্রমণ করিতেছেন। ইহাতে পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতি ব্যাহত হইবে। তাই ‘বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা ও সকল ভাষার সম-মর্য্যাদা দান’-পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষি ব্যক্তির দাবী। এই দাবীর পিছনে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী সকল জনসাধারণকে সমবেত হওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাইতেছি।
প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি অতীতের ন্যায় এবারও বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী বিরোধ উস্কাইয়া ভাষা আন্দোলনকে দ্বিধা বিভক্ত করিয়া বিপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করিবে। এই বিভেদ নীতির বিরুদ্ধে সজাগ থাকিয়া বাঙ্গালী অবাঙ্গালী সকলকে আজ বুঝিতে হইবে যে, ভাষার অধিকারের জন্য এই আন্দোলন, উর্দু বিরোধী বা অবাঙ্গালী বিরোধী আন্দোলন নহে। ইহা সরকারের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন। ভাষার ক্ষেত্রে লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারী নীতিকে ব্যর্থ করার জন্য বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই আজ প্রয়োজন।
ঢাকার ছাত্রছাত্রী ও নাগরিকগণ ৩০শে জানুয়ারী ধর্মঘট ও শোভাযাত্রা করিয়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধত ঘোষণার সমুচিত জবাব দিয়াছেন ও বাংলা ভাষার ন্যায় অধিকার কায়েম করার সংকল্প গ্রহণ করিয়াছেন। ৩১শে জানুয়ারী বিভিন্ন দলের মিলিত সভায় বাংলা ভাষার অধিকারের দাবী ঘোষণা করা হইয়াছে এবং ব্যাপক আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য সর্ব্বদলীয় কমিটি গঠন করা হইয়াছে। আগামী ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরে ধর্মঘট পালন করিয়া ভাষা আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য সকল দল ও প্রতিষ্ঠান আহ্বান জানাইয়াছেন। আমরা জনসাধারণের এই সংগ্রামকে মোবারকবাদ জানাইতেছি।
আমরা পূর্ব্ববঙ্গের বিভিন্ন শ্রেণী, দল, প্রতিষ্ঠান বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী সমস্ত জন-সাধারণের নিকট আবেদন জানাইতেছি যে বিরাট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দ্বারা বাংলার উপর আরবী হরফ চাপানোর চক্রান্তকে ব্যর্থ করুন এবং বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা ও উর্দু ভাষার সমান মর্য্যাদা দানের ন্যায় সঙ্গত দাবীকে প্রতিষ্ঠা করুন।
এই আন্দোলনকে সফলভাবে পরিচালিত করার জন্য প্রদেশের সর্বত্র শহরে ও গ্রামে সর্বদলীয় শহর কমিটি ও মহল্লা কমিটি গঠন করুন।
২শরা ফেব্রুয়ারী
পূর্ববঙ্গ সংগঠনী কমিটি
পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি
(বানানরীতি অপরিবর্তিত)