বিভ্রান্ত বিচারকের কাঠগড়ায় ‘প্রগতিশীল রাজনীতি’

Posted: 26 জুলাই, 2026

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ে এ বছর প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর ক্রোড়পত্রে কয়েকটি লেখা নিয়ে বেশ আপত্তি উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, ২৪-এর অভ্যুত্থানে এদেশে বামপন্থিদের ভূমিকাকে নাই করে দেয়ার সুকৌশলী প্রয়াস স্পষ্ট। বিশেষ করে যারা বিগত আওয়ামী শাসন আমলে বিরোধী ভূমিকায় নীতিনিষ্ঠ ছিল এবং একই সাথে বিএনপি ও জামাতবর্গ থেকে একটি স্বতন্ত্র ও আদর্শিক দূরত্ব বজায় রেখেছে, তেমন বামপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তির অসামান্য অবদান অস্বীকার করার একটা অপরাধমূলক চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রধান আপত্তি তৈরি হয়েছে বর্তমান শাসক সরকারের অংশীদার গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ফিরোজ আহমেদের লেখা নিয়ে। তার লেখার শিরোনাম ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ এক সময় ভদ্রলোককে অন্তত সংবেদনাশীল মানুষ বলে জানতাম। ফিরোজ আহমেদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল বক্তব্য আশা করেছিলাম। ওনার ‘প্রগতিশীল রাজনীতি’ শ্রেণিকরণ মারাত্মক সমস্যাজনক। ফিরোজ আহমেদের রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর এই বিবৃতির মধ্য দিয়েই বোঝা যায়। তিনি নিজেকে ‘প্রগতিশীল মহলের’ একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ঠাওরাচ্ছেন, নাকি সাম্প্রতিককালের হাওয়ায় ভেসে দায়িত্বজ্ঞানের মাথা খেয়ে আপাত জনপ্রিয় ‘লেফট ব্যাশিং’ বুলি আওড়াচ্ছেন, সেটা নিশ্চয়ই তিনি অচিরেই জানান দেবেন। জনাব ফিরোজ আহমেদ বলছেন, ‘প্রগতিশীল শক্তিগুলো অভ্যুত্থানে যথাযথ ভূমিকা রাখলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে মাজারে হামলা, নারীদের ওপর আক্রমণ, বাউলদের হেনস্তা, গণমাধ্যমে আগুন দেওয়া ইত্যাদি ঘটনা প্রতিহত করা শুধু অনেক সহজ হতো না, বাংলাদেশের সমাজে যে এর সমর্থন গৌণ সেটা প্রমাণিত হতো।’ এই বিশ্লেষণের চেয়ে সরল আর বাল্যসূলভ রাজনৈতিক বক্তব্য আমি অনেক দিন শুনি নাই। বাংলাদেশে প্রগতিশীলতার ‘সোল এজেন্ট’ শেখ হাসিনার পতনের পর যে রাজনৈতিক শক্তি ভারসাম্য দাঁড়িয়েছিল, সেই বাস্তবতা থেকে বহু দূরে গিয়ে খালার মুখে দাড়ি থাকলে সে খালু হতো কি না, এমন লজিক্যাল প্রেমিস আপনি কখন উত্থাপন করবেন? যখন আপনার ওপর দায়িত্ব পড়ে ‘বামপন্থিরা ছিলোই না’, এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা কলাকৌশলের কেন্দ্রে অথবা সঙ্গে থাকা একজন ব্যক্তি দাবি করছেন যে, প্রগতিশীল শক্তিগুলো অভ্যুত্থানে যথাযথ ভূমিকা রাখলে, সেই সরকারের পক্ষে এই সকল অপকর্ম প্রতিহত করা অনেক সহজ হতো। ভদ্রলোক কার দায় কার কাঁধে চাপাচ্ছেন! এমন যুক্তি সাজাতে হলে, যত দোষ সব নন্দ ঘোষের ঘাড়ে দিতে হবে, আগে থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে হয়। নিরেট বুদ্ধিজীবীতা বোধগম্য এবং তা মানাই যায়। কিন্তু আপনি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবলমাত্র উগ্র ডানপন্থি আরেকটি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর উত্থান মাত্র’ এমন আওয়ামী বয়ান প্রতিধ্বনিত করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বামপন্থি, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তির ভূমিকাকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেবেন, এটা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ফিরোজ আহমেদের মত রাজনৈতিক ব্যক্তি কি শুধু গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন? উনি কি মাঠে ছিলেন না? ফিরোজ আহমেদ লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের সমর্থনে যে একটিমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি এসেছিল উদারপন্থি ও প্রগতিশীলদের দিক থেকে, ১৯ জুলাই গণতন্ত্র মঞ্চের সেই সমাবেশ’। এমন নির্জলা মিথ্যা কথাতো চোখমুখ ঢেকেও বলা সম্ভব না। ১৬ জুলাই- যে দিন রংপুরে আবু সাঈদ, ঢাকায় হকার মো. শাহজাহানসহ অন্তত দুইজন, চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ অন্তত দুইজন শহীদ হন, সেই দিন বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমাবেশ থেকে সচিবালয়কে কেন্দ্র করে যে সঙ্ঘাত হয়েছিল, তার মধ্য দিয়েই অভ্যুত্থান পর্যন্ত সচিবালয় কার্যত অচল ছিল। সেদিন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বামপন্থি, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তি শুধু ঢাকায় কতগুলো রাজনৈতিক লড়াই করেছে সেগুলো সংখ্যা হিসেবে-গুণে দেখতে পারেন। হাসিনাশাহীর ১৬-১৭ বছরে ‘প্রগতিশীলদের’ লড়াই সংগ্রামের আলাপ আরেকদিন করা যাবে। ২০২৪ এর ১৭ জুলাই, যেদিন আশুরা ছিল, সেদিন আপনারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে বায়তুল মোকাররমে এসে যোহরের নামাজের পর গায়েবানা জানাজা পড়েছিলেন। একটু তাড়াহুড়া করে ছবিটবি তুলে নিরাপদে ফিরেছেন। একই দিন সকালে ঐ এলাকাতেই সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটি বাধা অতিক্রম করে মিছিল করেছিল আর বিকেলে সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কাছাকাছি সেগুনবাগিচায় সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হয়েও রাজপথের প্রতিবাদ থেকে পিছু হটে নাই। আমরা ১৬ জুলাই থেকেই যত স্পষ্ট করে সরকার পতনের কথা বলেছি, আপনাদের এখনকার ভরসাস্থল বিএনপি এবং তাদের এক সময়ের মিত্র জামাতের সরকার পতনের কথা মুখে বলতে আরো অন্তত দুই সপ্তাহ তিন দিন সময় লেগেছে। আর ১৯ তারিখে আক্রান্ত হওয়ার পর আপনারা কোথায় ছিলেন সেটাও জানি, কারফিউর মধ্যেই আপনাদের নেতা, বর্তমান মন্ত্রীমহোদয়ের বাসায়ও গিয়েছি, খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টার ত্রুটি করি নাই। ১৯ জুলাই প্রেসক্লাবের দিকে গণতন্ত্র মঞ্চ ও বিএনপির নেতাদের ওপর যে সশস্ত্র আক্রমণ হয়, সেটা যেমন সত্য। ঠিক ঐ মুহূর্তে গোটা বাংলাদেশে চলমান লড়াই ও সংঘাতও সত্য। চরম মিথ্যা হলো, শুধু পল্টন মোড় থেকে প্রেসক্লাব জায়গাকেই বাংলাদেশ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা আর ১৯ তারিখ দিনটাকেই জুলাইয়ের আন্দোলনের একমাত্র দিন হিসেবে চালিয়ে দেয়া। সে দিন দুপুরে জুম্মার নামাজের পর আপনাদের আরেক ডানপন্থি মিত্র শক্তি চরমোনাই হুজুরের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ডজন ডজন মাইক লাগিয়ে মহাধুমধামে তাদের যুব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছিল। পুলিশের ট্যাক্টিক্যাল অবস্থান ছিলো পল্টন মোড় থেকে নূর হোসেন স্কোয়ার ও বিজয় নগরের রাস্তায়। সেদিন শুধু আমাদের কাছেই নয়, পল্টনের অলিগলিতে সমবেত হাজার হাজার মানুষ স্পষ্ট বুঝেছিল আমরা আসলে অবরুদ্ধ হয়ে আছি দুই দিক থেকে, একদিকে পুলিশ আরেকদিকে চরমোনাই। আকাশে ছিল হেলিকপ্টার। এই অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক-গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ব্যানারটা (এই ব্যানারটা আমরা টানা ব্যবহার করে এসেছি ২৪-এর নির্বাচনের তফসিল যে দিন ঘোষণা হয় সেই রাত থেকেই) নিয়ে যে মিছিল শুরু করেছিলাম সেই মিছিল অলিগলি প্রদক্ষিণ করে মূল রাস্তায় আসার পরেই গুলি শুরু হয়েছিল। পুরানা পল্টনে গুলি করে মানুষ হত্যা হয়েছে তখনই। সবাই যখন আশা করেছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ শেষ করে চরমোনাই এর জমায়েত সঙ্ঘাতের দিকে অগ্রসর হবে, কিন্তু তখন তারা মিছিল করে দৈনিক বাংলা দিয়ে নিরাপদে বের হয়ে গেছে। অথচ এই চরমোনাই ৫ আগস্টের পরে আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে চোখ জুড়ানো ভাস্কর্য শিশু একাডেমির ‘দুরন্ত’, ময়মনসিংহের শশীলজের ভাস্কর্যসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য ভেঙেছে। এই গণঅভ্যুত্থানে আমার ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় কার্ফু ভেঙে গানের মিছিল। কারণ, কারফিউয়ের কারণে সারাদেশ স্তব্ধ, এমনকি এখনকার বড় বড় নায়ক মহানায়করাও যখন কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারছিল না, তখন আর্মিকে চ্যালেঞ্জ করে ৩০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন অর্থাৎ এখানকার গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে বিশেষ করে জামসেদ আনোয়ার তপন ও মফিজুর রহমান লাল্টুসহ সংস্কৃতিজনদের নেতৃত্বে আমরা প্রথম গানের মিছিল করি। সেই মিছিলে ফিরোজ আহমেদ এসেছিলেন কি না আমার মনে পড়ে না। আমি বলছি না, তাঁকে থাকতেই হবে এমন দাবি করা আমার যৌক্তিক হচ্ছে। কিন্তু তিনি যেহেতু নিজেকে বিচারকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, বিচারক চাক্ষুষ হলে বিচার সহজ হতো। এরপর লাগাতার আমরা এক সপ্তাহ কাফু, আক্রমণ, হামলা, মারধর উপেক্ষা করে ‘মা ও মেয়েদের মিছিল’, শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ, বিভিন্ন ব্যানারে, হাইকোর্টে আয়নুন নাহার সিদ্দিকার মামলায়, নূর হোসেন স্কয়ারে আরো একটি গানের মিছিলে যে শ্বেতপাথর গলানো সম্ভব হয়েছে খোদ ডানপন্থি শত্রুদেরও এখন পর্যন্ত সেসবের গুরুত্ব অস্বীকার করতে দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, মিরপুর ডিওএইচএসের সেফ হাউজে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ কি জানেন কর্মসূচিগুলো কিভাবে প্রতিদিন পালিত হয়েছে। সেই সময়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের কি অসামান্য ভূমিকা ছিলো, ফিরোজ আহমেদরা কি আজ সেই কথা স্বীকার করতে চাইবেন। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের তৎকালীন সমন্বক রাগীব নাঈম, দ্রোহযাত্রা শেষে শহীদ মিনারের বিশাল গণজমায়েত থেকে যে সরকার পতনের ডাক দিলো, তাঁর নাম কি আপনাদের মুখে উঠবে? বরং আমরা দেখেছি ‘দ্রোহযাত্রা’ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পরবর্তীতে এনএসআই-এর একটি রিপোর্ট ও জেমকনের পত্রিকার সূত্রে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, প্রেস সচিব প্রেজেন্টস ‘নয়া দাদা ভাই’ ফেসবুকে বিবৃতি দিয়ে বামপন্থিদের আক্রমণ করেছিলেন। আন্দোলন ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে বলে কেঁদেছিলেন। এখন আব্দুল কাদের সূত্রে জানা যাচ্ছে, তাদের নিউক্লিয়াস তখন ‘সরকার পতন’ শুনতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমরা যেভাবে দেখি সেটা হলো, তৎকালীন স্বৈরাচারি শাসকের দলীয় লোকবল, তার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও নৈতিকতা হারানো সমর্থক গোষ্ঠী বাদে গোটা দেশের আপামর মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রামই গণঅভ্যুত্থানে উত্তীর্ণ হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে। গুটি কয়েক সমর্থক ও সুবিধাভোগী বাদে, সমগ্র দেশের মানুষ চেয়েছে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান। বহু দল, বহু মত, ভিন্ন আদর্শ নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষের এই একক লক্ষ্যে উপনীত হওয়া ও জীবন বাজি রেখে লড়াই করার মধ্য দিয়েই গণঅভ্যুত্থান হয়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হোক কিংবা ব্যর্থই হোক; গণঅভ্যুত্থান-এর পক্ষ দুটোই থাকে। একটি জনতার পক্ষ অপরটি প্রতিপক্ষ। আমরা আজ পর্যন্ত আমাদের সহযোদ্ধাদের প্রাণদান, আহত ও রক্তাক্ত হওয়া ইত্যাদি ক্ষয়ক্ষতির তালিকা কোথাও জমা দেইনি। এই রাজনীতি আমরা করি নাই। তালিকা দেইনি বলে চব্বিশের ১৮ জুলাই উত্তরাতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়া ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মাহমুদুল হাসান রিজভী, ২০ জুলাই শনিরআখড়ায় জিজ্ঞাসাবাদ করা অবস্থায় পুলিশ কর্তৃক ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করা হকার্স ইউনিয়ন সূত্রাপুর থানা কমিটির নেতা শহীদ ইউসুফ সানোয়ার, সিরাজগঞ্জের প্রেসক্লাবে কর্মরত অবস্থায় নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার শহীদ প্রদীপ ভৌমিক, ৫ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়িতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দীর্ঘদিনের কর্মী আমাদের মিছিলের সাথী শহীদ আতিকুর রহমান, ঐদিন আশুলিয়ার বাইপাইলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়া গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’র সংগঠক শহীদ আশরাফুল ইসলামসহ বহু সংগ্রামী সহযোদ্ধার আত্মত্যাগ হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না। সেই সময়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ট্রেনের নিচে পড়ে প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন, সবাই জানেন। এর মধ্যেই স্যার দ্রোহযাত্রায় সভাপতিত্ব করতে রাজি হয়েছিলেন। সেটা আমাদের প্রচন্ড আশান্বিত করেছিল। আমাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের আরেক নেতা শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আনু স্যার যেহেতু আছেন, তিনি অন্তত ভালো বলতে পারবেন ফিরোজ আহমেদ বর্ণিত ‘রামপালে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিহত করার আন্দোলনের ব্যর্থতা’, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপের বাস্তবতা স্বীকার করে নিলে’ কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়, আর কোন ‘বাস্তবতা উপলব্ধি করতেন’, কিন্তু কোন ‘রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে ছিল বহুধাবিভক্ত’? আমরা বিএনপির সাথে রাজনৈতিক ঐক্য করবো না, জোনায়েদ সাকি ও সাইফুল হক মনে করেছেন সেটা করলেই দায়িত্ব পালন করা হবে। একদা এমন রব উঠেছিল ‘এই যেন বাংলাদেশ আফগানিস্তান হয়ে গেলো’; আমরা আওয়ামী লীগের সাথে তখনও রাজনৈতিক ঐক্য করতে রাজি হইনি। রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুরা মনে করেছিলেন সেটাই সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। সেই সময় এবং এই সময়ের সব চেয়ে বড় সাদৃশ্য পাওয়া যায় ফিরোজ আহমেদ লাইনের বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণের ভাষা ও সুরে। একই যুক্তি কাঠামো। একই সিদ্ধান্ত, সেই একই ন্যারেটিভ। ‘নাই নাই, কোথাও নাই! কিছুই হয় না!’ শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে এই পর্যন্ত শুনতে আমি রাজি আছি। মেজাজটা খারাপ হয়, যখন কেউ বলে ‘অন্যের কোলে উঠে কিছুদূর আগালেই একদিন হাতে শেখা যেত’। ফিরোজ আহমেদ বলেছেন, ‘প্রগতিশীলেরা কোন কোন বিন্দুতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং কী কী কারণ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা রাখায় বাধা দিয়েছে, তার অনুসন্ধান জরুরি।’ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি যা কিছুর সন্ধান পেয়েছি সেটা লম্বা আলাপ। ভবিষ্যতে সেসব বলা যাবে। খুব দৃষ্টিকটু লাগে যখন সংগ্রামে থাকা মানুষজন ‘মৌলবাদ’ ও ‘উগ্রবাদের’ উত্থান নিয়ে আতঙ্কিত হলে ফিরোজ আহমেদরা তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করান। বাণিজ্যিক পত্রিকা নতুন হাওয়ায় নতুন বেশ ধারণ করতে চাচ্ছে, এটা বোধগম্য। ভাষ্যকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন যিনি, তাদের অভিযোজন পথপরিক্রমা আমাদের বেশ ভালো জানা। হাসি পায় এই ভেবে যে- পথ ভাবে আমি দেব, ফিরোজ আহমেদ ভাবলেন তিনি। তাদের সাথে একটা পার্থক্য তো আমাদের আছেই। ওনারা মনে করেন, ‘বামপন্থি’ পরিচয় নিয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে না, জায়গা হচ্ছে না কোথাও; ‘প্রগতিশীল’ পরিচয়টাও বিদ্রুপাত্মক, গালিস্বরূপ। সহযোদ্ধা, বন্ধু ও সহমর্মী সুহৃদদের এই একটা বিষয়েই শুধু একটা কথা বলতে চাই। সমসাময়িক থাকার অস্থিরতায়, চাপে যারা নিজেকে একেবারে বদলে ফেলে, বদলে গিয়ে কখনো কখনো ‘সময়’ কোন দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেন। ‘দেশ ও কাল’ এখন চব্বিশকে অতিক্রম করে যেদিকে যাচ্ছে, দ্রুতই ‘প্রগতিশীল রাজনীতিকেই’ উদ্ধারকারী ভূমিকায় দেখা যাবে। আর কোনো ভিন্ন রাস্তা নাই। আশাকরি তখন যথাসময়ে নিউ ফিরোজ আহমেদকে তাঁর নতুন বিচার-বিশ্লেষণসমেত হাজির পাবো। লেখক: রাজনীতিবিদ