বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে মার্কসের বিদ্রোহ

Posted: 26 জুলাই, 2026

মার্কস বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গড়ে তুলেছেন ‘বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব’। মার্কসের এই বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট আছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উদ্ভবের পর পুঁজি সমগ্র সমাজের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়। তখন সবকিছুই পরিণত হয় পুঁজির দাসে। মানুষের শ্রমশক্তি পুঁজি নির্ভর হয়ে পড়ায় গোটা শ্রম প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় সৃষ্টি বিমুখ। ফলে সৃষ্টিশীল শ্রম প্রক্রিয়া থেকে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়। শ্রম প্রক্রিয়া থেকে ব্যক্তির এই বিচ্ছিন্নতা এক খণ্ডিত ও বিকৃত জীবনবোধের জন্ম দেয়। অষ্টাদশ শতকের চিন্তাবিদেরা পুঁজিবাদ সৃষ্ট এই খণ্ডিত ও বিকৃত জীবনবোধ দেখে হয়েছেন বিচলিত। এসব চিন্তাবিদেরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিকরণের মাধ্যমে খণ্ডিত ব্যক্তি সত্তাকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপে বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ইতিহাসে এটা রোমান্টিক আন্দোলন নামে পরিচিত। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিচ্ছিন্নতা বোধকে অতিক্রম করে ব্যক্তি মানুষের সামগ্রিকতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। দুটি ভিন্ন ধারায় এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে। একটি ছিল নৈরাশ্যবাদী, অন্যটি ছিল বিদ্রোহী রোমান্টিকতায় ভরা। প্রথমটির নেতৃত্বে ছিলেন রুশো। আর দ্বিতীয়টির পুরোভাগে ছিলেন শেলি, বায়রন, বেটোফেন প্রমুখেরা। দুটি ভাবধারার মধ্যে পার্থক্য সত্ত্বেও উভয় ধারায়ই ছিল বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। নৈরাশ্যবাদী রোমান্টিক আন্দোলন বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক বিকাশের দ্বন্দ্বকে নিরসন করতে চেয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতাকে অস্বীকার ও উপেক্ষা করে। মানবাত্মাকে পূর্ণমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে তারা চেয়েছেন শিল্প সাহিত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে এক কল্পরাজ্য গড়ে তুলতে। অন্যদিকে বিদ্রোহী রোমান্টিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন চেয়েছে বিচ্ছিন্নতার শেকড়কে উপড়ে ফেলে মুক্তির সাধ পেতে। শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের মাধ্যমে তারা পুঁজিবাদের অমানবিক সৃষ্টিবিমুখ জীবনবোধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাস্তব জীবনে বিচ্ছিন্নতার শর্তগুলো ধ্বংস করে মানুষকে তার পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। বিদ্রোহী রোমান্টিক আন্দোলন যে গভীর মানবতাবোধের দ্বারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, মার্কস তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মার্কস তার বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব গড়ে তোলার সময় হেগেল ও ফয়েরবাখ দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু হেগেল ও ফয়েরবাখের চিন্তার অসম্পূর্ণতা ও অসঙ্গতি সম্পর্কে মার্কস পুরোমাত্রায় সচেতন ছিলেন। হেগেলের মতে, আত্মা (ঝঢ়রৎরঃ) আত্মোপলব্ধির প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। প্রথমত ঝঢ়রৎরঃ তার অনন্ত ও পরম সত্তা সম্পর্কে সচেতন হয়ার জন্য সৃষ্টি করে সসীম জগতকে। এর অর্থ ঝঢ়রৎরঃ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্ববিচ্ছিন্নতা ঘটায়। কিন্তু ঝঢ়রৎরঃ অনন্ত ও অসীম, তার সৃষ্ট কোনো সীমিতসত্তা বা ভাবের মধ্যেই সে তার প্রকৃত স্বরূপকে চূড়ান্তভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। তাই হেগেলীয় দর্শন অনুযায়ী ঝঢ়রৎরঃ সৃষ্টি করে তার স্ববিচ্ছিন্নতাকে, তেমনি পরমুহূর্তেই তাকে অতিক্রম করে ঝঢ়রৎরঃ সৃষ্টি করে নতুন সত্তাকে, এই প্রক্রিয়ার অবিরাম গতিশীলতার মাধ্যমেই ঝঢ়রৎরঃ নিজের বিপুল সত্তাকে খুঁজে পায়। মার্কস তার ১৮৪৪ সালে রচিত ঞযব ঈৎরঃরয়ঁব ড়ভ ঐবমবষরধহ উরধষবপঃরপ ধহফ চযরষড়ংড়ঢ়যু ধং ধ যিড়ষব রচনায় দেখান, হেগেলের বিচ্ছিন্নতার ধারণা ভাববাদী। হেগেলের ব্যাখ্যা সমাজজীবনে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। বিচ্ছিন্নতা কোনো বিমূর্ত, অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়। বিচ্ছিন্নতার উৎস এই চলমান বস্তুজগতের মধ্যেই নিহিত। ফয়েরবাখও বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নের একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হেগেলের চিন্তা প্রত্যাখান করে ফয়েরবাখ দেখান, বাস্তব বিচারে ধর্মের ওপর আস্থা ব্যক্তির আত্মোপলব্ধির পরিপন্থি। ঈশ্বরে বিশ্বাস করার অর্থ হচ্ছে, মানুষের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে বিচ্ছিন্নতাকে সৃষ্টি করে যে পরিবেশ, তার কাছে আত্মসমর্পণ করা। ফয়েরবাখ তার খবপঃঁৎবং ড়হ ঃযব ঊংংবহপব ড়ভ জবষরমরড়হ-এ দেখান মানুষই মানুষের একমাত্র উপাস্য দেবতা, অন্যায়-অবিচার ও নিরাপত্তার অভাব মানুষের মধ্যে যে নৈরাশ্যমূলক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়, তার নিরসন হবে সর্বশক্তিমান কোন বিমূর্ত সত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করে নয় বা কোনো স্বর্গলোককে কল্পনা করেও নয়, মর্তলোককে স্বর্গলোকে রূপান্তরিত করেই বিচ্ছিন্নতার অবসান হতে পারে। মার্কস তার ঞযবংবং ড়হ ঋবঁবৎনধপয (১৮৪৫) রচনায় দেখান, ফয়েরবাখ বস্তুবাদী হয়েও বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নের বিশ্লেষণে কোনো সামাজিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের নির্দেশ দিতে পারেননি। এ ছাড়াও ফয়েরবাখ হেগেলীয় ভাববাদকে খণ্ডন করতে গিয়ে তার দ্বান্দ্বিকতারও বিরোধিতা করেছেন। ফলে দ্বান্দ্বিকতার মূল কথা হল যে গতিশীলতা, ফয়েরবাখের চিন্তায় সেটি ছিল অনুপস্থিত। ফয়েরবাখ তাই ব্যক্তি ও পরিবেশের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধন করে বিচ্ছিন্নতার সমস্যার যে সমাধান সূত্র দিয়েছিলেন, তাতে বাস্তবকে পরিবর্তন করার দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল উপেক্ষিত। মার্কস ঙহ ঃযব ঔবরিংয ছঁবংঃরড়হ (১৮৪৪) ও ঈৎরঃরয়ঁব ড়ভ ঐবমবষ’ং চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ জরমযঃ (১৮৪৪)- এ ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, জীবনবিমুখ ভাববাদী দর্শন থেকে জন্ম নেয় ব্যক্তির জীবনবিরোধী এক রাজনৈতিক সত্তা। যে বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে ভাববাদী দর্শন জন্ম নেয়, সেই বিচ্ছিন্নতাবোধরই আর একটি প্রকাশ হচ্ছে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনবিরোধী রাজনীতি। এ বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার যে ব্যক্তি, তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাই জীবনবিরোধী ও খণ্ডিত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সিভিল সোসাইটির সদস্য হিসেবে ব্যক্তি আপতদৃষ্টিতে এখানে স্বাধীন। তার দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধ ইত্যাদি বিকাশের ক্ষেত্রে তার এক ধরনের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এই একই ব্যক্তি রাষ্ট্রের নাগরিকরূপে রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্র যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখে তার বিরুদ্ধে ব্যক্তি অসহায়। রাষ্ট্রের নির্দেশ ব্যক্তি পালন করতে বাধ্য। তার মানে ব্যক্তির সামাজিক সত্তা ও ব্যক্তির রাজনৈতিক সত্তা পরস্পর বিরোধী। এভাবেই দেখা দেয় রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা, অন্য কথায় রাজনৈতিক সত্তা থেকে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা। রাষ্ট্র সমাজ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের চরিত্র শোষণমূলক, স্বাধীনতাবিরোধী ও জনবিরোধী। মার্কসের মতে, রাষ্ট্র যেহেতু ব্যক্তির নাগরিক সত্তা বা সামাজিক সত্তার বিরোধী এজন্য রাষ্ট্রকে ধবংস করেই এ বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানো যায়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তির উৎস কোথায়? প্রধানত মুষ্টিমেয় সংখ্যালঘু কিছু ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষ করতে প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রের। স্বাভাবিক কারণেই রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থের বিরোধী ও জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। রাজনৈতিক জীবনে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে উদ্ভূত ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের বিচ্ছিন্নতারই বহিঃপ্রকাশ। এজন্য মার্কসের মতে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নের প্রকৃত সমাধান হতে পারে রাজনৈতিক উপায়ে, রাষ্ট্রের উচ্ছেদ ও ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে। একই সূত্র ধরে ১৮৪৪ সালে মার্কস তার ঊপড়হড়সরপ ধহফ চযরষড়ংড়ঢ়যরপধষ গধহঁংপৎরঢ়ঃং- এ প্রথম বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেন। মার্কসের জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত এই পাণ্ডুলিপিতে যেটি ‘প্যারিস পাণ্ডুলিপি’ (চধৎরং গধহঁংপৎরঢ়ঃং) নামে পরিচিত, তিনি এই প্রশ্নটির একটি সামগ্রিক আলোচনার সূত্রপাত করেন। মার্কস তার প্যারিস পাণ্ডুলিপিতে সমাজজীবনে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার অর্থনৈতিক কারণগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সমাজ জীবনে শ্রম বিভাজনের পূর্ববর্তী পর্যায়ে ব্যক্তি ও প্রকৃতি ছিল সমন্বিত। ঐতিহাসিক কারণে শ্রমবিভাজনের জন্মের সূত্র ধরেই সৃষ্টি হয়েছিল সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিমালিকানা উদ্ভবের ফলে সমাজে অর্থনৈতিক অসাম্যের বনিয়াদ পাকাপাকিভাবে রচিত হল।...ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমজীবী ব্যক্তির প্রধান ভূমিকা থাকলেও তার উৎপাদিত দ্রব্যকে আত্মসাৎ করে মালিকপক্ষ। এর পরিণতিতেই শ্রমিকের সঙ্গে তার সৃষ্ট বস্তুর ও নিজস্ব শ্রমপ্রক্রিয়ার এক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। পুঁজির ব্যক্তিগত মালিকানা শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতাবোধকে তীব্র করে তোলে। মার্কস তার প্যারিস পাণ্ডুলিপিতে পুঁজিবাদে শ্রমজীবী মানুষের বিচ্ছিন্নতার চারটি রূপের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমত : ব্যক্তির সঙ্গে তার শ্রমপ্রক্রিয়ার বিচ্ছিন্নতা প্রকৃতির সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। ব্যক্তি তার শ্রমক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে শ্রমপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিদত্ত বস্তুর রূপান্তর ঘটিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা সৃষ্টি করে তার নিজের ইতিহাস রচনা করে। শ্রমপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যক্তি ও প্রকৃতির মধ্যে সর্বাধিক একাত্মতা সৃষ্টি হয়। শ্রমপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে ব্যক্তি তার শ্রমের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলেই শ্রমের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার কারণটি হল, এই সমাজে সমগ্র শ্রমপ্রক্রিয়া পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে শ্রমিক তার শ্রমশক্তির অপার সম্ভাবনা ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হবার কোনো সুযোগ পায় না। এর পরিণতিতে ব্যক্তি তার নিজস্ব শ্রমপ্রক্রিয়া থেকে আত্মিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যা শেষ বিচারে প্রকৃতির সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। দ্বিতীয়ত: পুঁজিবাদী সমাজে স্রষ্টার সঙ্গে তার সৃষ্ট বস্তুর বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব হয়। পুঁজিবাদী সমাজে যেহেতু শ্রমিক পুঁজিপতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেহেতেু সৃষ্ট বস্তুর ওপরে শ্রমিকের কর্তৃত্ব বজায় থাকে না, শ্রমিক বাধ্য হয় মালিকের স্বার্থে, বাজারের ও মুনাফার প্রয়োজনে উৎপাদন করতে। এর পরিণতিতে স্রষ্টার সঙ্গে তার সৃষ্ট বস্তুর বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব হয়। তৃতীয়ত: পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। যেহেতু শ্রমপ্রক্রিয়া ও শ্রম সৃষ্ট বস্তু উভয় থেকেই ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন ও যেহেতু এই বিচ্ছিন্নতার মূলে থাকে একটি নিয়ন্ত্রণ শক্তি, অর্থাৎ পুঁজিপতিরূপী অপর এক ব্যক্তি, সেহেতু পুঁজিপতির সঙ্গে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার অর্থ দাঁড়ায় কার্যত শ্রমিকরূপী এক ব্যক্তির সঙ্গে পুঁজিপতিরূপী অপর এক ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা। এ থেকেই জন্ম নেয় সমাজজীবনে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার সম্পর্ক। চতুর্থত: পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে তার প্রজাতি সত্ত্বার বিচ্ছিন্নতা ঘটে। মানুষ হিসেবে ব্যক্তির পরিচয় এখানেই যে, সে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রকৃতিরাজ্যের রূপান্তর ঘটিয়ে তার শ্রমশক্তিকে তার নিজের ও সমাজের সার্বিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। এক কথায়, ব্যক্তি তার সৃষ্টিশীলতার তাগিদে শ্রমক্ষমতার সর্বোৎকৃষ্ট প্রয়োগ করতে সক্ষম। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক যেহেতু পুঁজিপতির আজ্ঞাবহ দাস মাত্র, সে তার সৃষ্টিশীল শ্রমের স্বাধীন প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত। এর ফলে, শ্রমিক তার নিজের আত্মিক, মানবিক প্রজাতি সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এভাবেই জীবনের ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই মার্কস বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার কারণ বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। পরিণত বয়সের রচনা ‘পুঁজি’-তে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের ঐতিহাসিক ও শ্রেণিগত পরিমণ্ডলটি ব্যাখ্যা করে মার্কস তার তত্ত্বকে আরও বিকশিত করেন। মার্কসের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদী সমাজে বিচ্ছিন্নতার মূল কারণটি অনুসন্ধান করা। মার্কস বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন এবং যে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় তাকে ধ্বংস করে ‘সমাজতন্ত্র নামক বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে’ বিচ্ছিন্নতাকে চির বিদায় জানাতে চেয়েছেন। শুধু সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদই সমাজের সব মানুষের পূর্ণাঙ্গ আর সমন্বিত বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদই সব ধরনের বিচ্ছিন্নতার ভিত্তিমূল ভেঙ্গে নির্মাণ করতে পারে নতুন সৌধ। লেখক : সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি