রূপান্তরের রাজনীতি বনাম ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি

Posted: 19 জুলাই, 2026

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভ্যন্তরে বিগত কয়েক দশকে যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা দেশের মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা, আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষোভের যে গুণগত রূপান্তর ঘটেছে, তা প্রথাগত রাজনীতির চশমা দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে জনকল্যাণ ও জনঅধিকারের রাজনীতিকে সুকৌশলে নির্বাসনে পাঠিয়ে একটি সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা এবং অঞ্চলভিত্তিক ‘রাজনৈতিক সামন্তবাদ’ বা ‘লর্ড কালচার’ গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সংস্কৃতির অধীনে সমগ্র দেশকে দলীয় নেতাকর্মী এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মাঝে এক ধরণের অর্থনৈতিক, আইনি ও প্রশাসনিক ভাগাভাগির চারণভূমিতে পরিণত করা হয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অঙ্গকে যখন দলীয়করণের মাধ্যমে গ্রাস করা হয়, তখন রাজনৈতিক কর্মীরা জনগণের বন্ধু, পথপ্রদর্শক বা সেবক না হয়ে, ক্রমান্বয়ে জনমানুষের প্রতিপক্ষ বা শোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই রূপান্তর রাতারাতি হয়নি, বরং তা ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কৃত্রিম জনারণ্য ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব এখানে একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন জাগতে পারে–যদি রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের কর্মীবাহিনী এতখানিই জনবিচ্ছিন্ন এবং গণবিদ্বেষী হয়ে উঠবে, তবে তাদের আয়োজিত জনসভায় বা মিছিলে হাজার হাজার, কখনো বা লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটতো কীভাবে? এই ধাঁধার উত্তর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক বলয়ের ভেতর। সত্যটি হলো, সেই বিপুল সমাগম কোনো আদর্শিক টানে, রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আনুগত্যে কিংবা নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় হতো না; তা হতো নিছক ক্ষমতার ভয়ে কিংবা ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী হওয়ার বৈষয়িক তাড়নায়। যখন একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় জীবনের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কিংবা ন্যূনতম নাগরিক অধিকার পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায় দলীয় আনুগত্য, তখন সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই ক্ষমতার এই প্রদর্শনীতে নিজেদের শামিল করে। কিন্তু ক্ষমতার এই কৃত্রিম জনারণ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর ক্ষণস্থায়ী চরিত্র। ক্ষমতার বলয় যখনই কোনো গণঅভ্যুত্থান, অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা আন্তর্জাতিক সমীকরণে স্থানান্তরিত হয়, সেই জমায়েতের চরিত্র ও আনুগত্যও চোখের পলকে বদলে যায়। পটপরিবর্তন এবং একই নাটকের পুনরাবৃত্তি দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অতীতে বারবার ঘটে যাওয়া পটপরিবর্তনের পর আজ সমসাময়িক বাংলাদেশে আমরা একই নাটকের কুৎসিত পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। ছাত্র-জনতার বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে যে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছিল, তা যেন আবার পুরোনো অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে বসেছে। কেবল মঞ্চের পাত্র-পাত্রী বদলেছে, কিন্তু শোষণের পদ্ধতি, চাঁদাবাজির রুট এবং আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। এখনও নতুন শাসকদলের বা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসা শক্তির সামান্য ইশারাতেই রাজপথে হাজারো মানুষের কৃত্রিম ঢল নামছে, মোটর শোভাযাত্রার নামে শক্তির মহড়া দেওয়া হচ্ছে। আরও লজ্জাজনক বিষয় হলো, স্থানীয় স্তরের তথাকথিত সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী সংগঠন বা পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগী শক্তির একাংশ চাতক পাখির মতো নতুন শাসকের অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ লাভের আশায় অধীর আগ্রহে ফুল ও মালা নিয়ে বসে থাকে। কোনো ঘরোয়া আড্ডায়, কার্যালয়ে বা জনসমক্ষে নতুন ক্ষমতাসীনেরা বসলে, চারপাশ থেকে স্তাবকতা ও চাটুকারিতার যে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনী শুরু হয়, তা মূলত ক্ষমতার ভয়েরই এক ভিন্ন ও নগ্নরূপ। এই চাটুকারেরা কখনোই কোনো নেতার প্রকৃত বন্ধু নয়, এরা ক্ষমতার স্থায়ী পরজীবী। সমাজের অভ্যন্তরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ডানপন্থার উত্থান, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দৃশ্যমান স্তাবকতা, রাজপথের মিছিল, এবং ক্ষমতার পেশিশক্তির মহড়া সমাজের কেবলই একটি উপরি-কাঠামো। এর গভীরে, সমাজের মূলে এবং সাধারণ মানুষের নীরব হৃদয়ে এক ভয়াবহ ক্ষোভ, তীব্র অসন্তোষ ও চরম হতাশা প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও নিজের দৈনন্দিন জীবনে কোনো দৃশ্যমান কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে পায় না–যখন তারা দেখে বাজারে নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙেনি, থানায় গেলে এখনো টাকা ছাড়া মামলা হয় না, স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে কেবল শোষকের মুখবদল হয়েছে, কিন্তু শোষণ ও চাঁদাবাজির মাত্রা কমেনি–তখন তারা এক চরম নিস্পৃহতা ও বাস্তবতায় চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়ে। এই গভীর জাগতিক হতাশা থেকে মানুষ তখন লৌকিক রাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং এক ধরনের অলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক বা কঠোর ঈশ্বরতান্ত্রিক পরিবর্তনের আশা করতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে, মানুষের তৈরি এই ঘুণে ধরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা কখনোই তাদের মুক্তি দিতে পারবে না। আর ঠিক এই আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতার সুযোগটি অত্যন্ত সুকৌশলে নেয় ডানপন্থি, উগ্র-ডানপন্থি কিংবা ধর্মীয় চরমপন্থি শক্তিগুলো। তারা দীর্ঘদিনের সুপ্ত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং মানুষের এই ‘অলৌকিকতার আকাঙ্ক্ষা’ বা ধর্মীয় ও আবেগীয় সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের লৌকিক ও রাজনৈতিক দল গোছাতে শুরু করে। তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের একমাত্র সৎ ও বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে। দিনশেষে, মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর চরম ব্যর্থতা, সীমাহীন ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি এবং আদর্শিক আপোসহীনতার চরম মূল্য দিতে হয় সাধারণ নিরীহ জনগণকে। এটিই সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতির এক নির্মম ও ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা, যাকে আমরা বর্তমান যুগের ‘বিপথগামী শ্রেণি-সংগ্রাম’ হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারি। যেখানে শোষিত শ্রেণি প্রগতিশীল বা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ না পেয়ে চরমপন্থি রক্ষণশীলতার দিকে ধাবিত হয়। অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক সামন্তবাদের যোগসূত্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান উৎস হলো রাজনীতি ও অর্থনীতির এই অনৈতিক সমীকরণ। রাজনীতি এখন আর কোনো জনসেবা বা সমাজ পরিবর্তনের ব্রত নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে দ্রুততম সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যে ‘লর্ড কালচার’ বা সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্ব আমরা দেখি, তার মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। ফুটপাতের হকার, গণপরিবহন, বালুমহাল, জমি দখল থেকে শুরু করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প–সবখানেই ক্ষমতার অংশীদারদের জন্য নির্দিষ্ট বখরা বা চাঁদা নির্ধারিত থাকে। এই লুণ্ঠিত অর্থের একটি বড় অংশ আবার ব্যয় করা হয় লাঠিয়াল বাহিনী পুষতে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের স্তাবকতা করতে। ফলে, একটি চক্রাকার দুষ্টচক্র তৈরি হয়। এই অর্থনৈতিক সামন্তবাদ যতদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত কেবল মুখের কথায় বা নেতার পরিবর্তনে রাজনীতির গুণগত রূপান্তর অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যা ক্ষমতার অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেবে। ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে এখনই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিকে এই দীর্ঘস্থায়ী দুষ্টচক্র বা গতানুগতিকতার বৃত্ত থেকে জোরপূর্বক বের করে আনার। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতৃত্বকে অবিলম্বে বুঝতে হবে যে, ভয় দেখিয়ে, পুলিশি দমন-পীড়ন চালিয়ে কিংবা সাময়িক সুবিধা ও অর্থের উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে সাময়িক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু জনগণের প্রকৃত গণআস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করা কখনোই যায় না। রাজনীতির এই সনাতন, ক্ষয়িষ্ণু এবং আত্মঘাতী ধারা অবিলম্বে পরিহার করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনে রাজনীতিকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ‘শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার’ না ভেবে জনগণের ‘সেবা করার এবং অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম’ হিসেবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করতে হবে। ক্ষমতা কোনো প্রিভিলেজ বা বিশেষ অধিকার নয়, এটি জনগণের দেওয়া দায়িত্ব–এই বোধ প্রতিটি কর্মীর মগজে ঢুকিয়ে দিতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক জবরদখল, মাস্তানি, লাঠিয়াল বা হেলমেট বাহিনী প্রথা এবং হাটবাজার ও পরিবহনে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। কোনো কর্মী বা নেতা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে দলের পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া যাবে না, বরং তাকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে হবে। চাটুকার ও অর্থ জোগানদাতার দল দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকার আত্মঘাতী মোহ শীর্ষ নেতাদের ত্যাগ করতে হবে। দলের ভেতরে এবং মূলধারার সমাজে যারা সৎ, উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও চিন্তাশীল মানুষ–তাদের নেতৃত্বের অগ্রভাগে জায়গা দিতে হবে। স্তাবকতাকে অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর শুধু নিয়মরক্ষার জন্য নয়, নিয়মিত ও স্বচ্ছ কাউন্সিলের মাধ্যমে নিচুতলার কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। হাই কমান্ডের একক সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে দলের ভেতরে মুক্তবুদ্ধি ও ভিন্নমতের চর্চাকে স্বাগত জানাতে হবে। এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যদি এখনও নিজেদের সংশোধন না করেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেন এবং রক্তস্নাত ছাত্র-জনতার প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হন, তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে। সমাজ ও রাজনীতির ভেতরের এই শূন্যতা কখনোই দীর্ঘকাল শূন্য থাকে না; মূলধারার দলগুলো ব্যর্থ হলে সেই স্থান অচিরেই উগ্র, চরমপন্থি ও অগণতান্ত্রিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জন্য এক বিরাট হুমকি। আশা করি, বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই আসন্ন ও অনিবার্য বিপদটি অনুধাবন করবেন। তারা গতানুগতিক ক্ষমতার লোভ, ভাগাভাগি ও প্রতিহিংসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি কল্যাণমুখী, মানবিক, সাম্যবাদী ও জবাবদিহিমূলক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে নিজেদের আত্মনিয়োগ করবেন। অন্যথায়, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না এবং আরও একটি নির্মম গণবিস্ফোরণ হবে, আর তা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। লেখক : সভাপতি, সিপিবি, ঝিনাইদহ জেলা