ঢাকার জল-যন্ত্রণা: মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাট ও গণমুখী সরকারের অপরিহার্যতা

Posted: 19 জুলাই, 2026

টানা মাঝারি ও ভারী বর্ষণে আরো একবার নরক যন্ত্রণা ভোগ করলো রাজধানী ঢাকার মানুষ। বনানী, খিলক্ষেত, মিরপুর, পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে খোদ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের সড়ক–কোথাও এক হাঁটু, কোথাও কোমর সমান পানি জমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নগরজীবন। বর্ষণ থামার পর হয়তো রাস্তা থেকে পানি নেমে গেছে, আপাতদৃষ্টিতে কোনো জলাবদ্ধতা নেই; কিন্তু ঢাকার কোটি মানুষের মন থেকে এই আতঙ্কের জলছাপ মুছে যায়নি। কারণ, জলাবদ্ধতা এখন আর সাময়িক কোনো দুর্যোগ নয়, এটি এই মহানগরের একটি স্থায়ী ও ক্রনিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আকাশে মেঘ জমলেই নগরবাসীর বুকে কাঁপন ধরে। মাত্র ঘণ্টাখানেকের মাঝারি কিংবা ভারী বৃষ্টি হলেই এই আধুনিক ঢাকা ওলটপালট হয়ে যায়, অলিগলি পেরিয়ে বিষাক্ত, নোংরা পানি ঢুকে পড়ে মানুষের বসার ঘরে, রান্নাঘরে। সামান্য বৃষ্টিতে একটি দেশের রাজধানীর এই পঙ্গুত্ববরণ কোনো প্রাকৃতিক নিয়তি নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে মানবসৃষ্ট, পুঁজিপতি ও লুটেরা আমলাতন্ত্রের যৌথ পাপের ফসল। অথচ গত দুই দশক ধরে এই ঢাকা শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে যা হয়েছে, তাকে স্রেফ ‘লুটপাটের মহোৎসব’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বিগত ২০ বছরে ঢাকা ওয়াসা, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট বা প্রকল্প পাস করা হয়েছে। ড্রেন নির্মাণ, খাল উদ্ধার, বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং পাম্প স্টেশন বসানোর নামে প্রতি বছরই জনগণের ট্যাক্সের টাকা উধাও হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বর্ষা আসার আগে তড়িঘড়ি করে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর লোকদেখানো ড্রেন পরিষ্কারের নাটক করা হয়েছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাসকদলের ঠিকাদার এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের পকেট ভারী করা। বাজেট বাড়ে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে, আমলা-ঠিকাদারদের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে, কিন্তু ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতেই ঢাকার ডুবে যাওয়ার স্থায়ী দুর্ভোগের কোনো অবসান হয় না। ঢাকার এই নারকীয় নিয়তির জন্য বিগত সব সরকার সমানভাবে দায়ী। স্বৈরাচারী হোক কিংবা তথাকথিত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক–কোনো সরকারই ঢাকার সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রতিটি সরকারই রাজধানীকে নিয়ে বাণিজ্যিক জুয়া খেলেছে। কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় না নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূমিদস্যুদের স্বার্থে ঢাকার চারপাশের নদী, খাল, বিল এবং প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ভরাট করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যে সুয়ারেজ লাইন ও প্রাকৃতিক খাল দিয়ে পানি বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় যাওয়ার কথা, তা আজ বহুতল ভবন ও শপিংমলের নিচে চাপা পড়ে গেছে। বিগত সরকারগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহির পরোয়া করেনি, কারণ তারা জনগণের প্রকৃত ভোটে নির্বাচিত ছিল না। ফলে নগরায়নের নামে তারা কেবল মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির সম্পদ বাড়িয়েছে, আর কোটি কোটি সাধারণ নগরবাসীকে ঠেলে দিয়েছে এই স্থায়ী জল-যন্ত্রণার দিকে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনের পর স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের বাস্তবতায় এ কথা প্রমাণিত যে, এই পচা-গলা বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থা এবং লুটেরা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে ঢাকার এই স্থায়ী জলাবদ্ধতার কোনো সমাধান সম্ভব নয়। জোড়াতালির সাময়িক প্রকল্প কিংবা কয়েকশ কোটি টাকার নতুন কোনো আইওয়াশ বাজেট দিয়ে এই সংকটের মোচন হবে না। কারণ বর্তমান ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। ঢাকার মানুষকে এই স্থায়ী অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত করতে হলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। একটি গণমুখী, দুর্নীতিমুক্ত এবং মেহনতি মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই পুঞ্জীভূত সংকটের কোনো বিকল্প সমাধান নেই। একমাত্র জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ একটি বিপ্লবী চিন্তাধারার সরকারই পারবে ভূমিদস্যুদের কবল থেকে ঢাকার প্রাকৃতিক খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী একটি বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং লুটপাটের প্রতিটি পয়সার হিসাব আদায় করতে। ঢাকাকে বাঁচাতে, নিজেদের বাঁচানোর স্বার্থেই আজ বুর্জোয়া লুটেরাদের বিরুদ্ধে মেহনতি জনতার ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে।