স্লোগানে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কাজে ‘সবার আগে আমেরিকা’

Posted: 19 জুলাই, 2026

একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেছেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে অধ্যাপক ইউনূস। কিন্তু তাতে সম্মতি প্রদান করেছে কে? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংসদের বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “তারা স্লোগান দেয় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, কিন্তু কাজে তারা সবার আগে আমেরিকা। যারা ঢাকা না দিল্লি বলে স্লোগান দিয়েছিল, আজকে তারা স্লোগান দেয় ঢাকা না ওয়াশিংটন, ওয়াশিংটন, ওয়াশিংটন।” গত ১৭ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিলের দাবিতে সংগঠিত গণজমায়েতে তিনি এসব কথা বলেন। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, “আমাদের দেশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পদানত করা হয়েছে। যেই চুক্তি করা হয়েছে, সেই চুক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের করদ রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে বাংলাদেশ। কমরেড রতন বলেন, “এই চুক্তির পরেই আমরা দেখলাম—এর আগে কোনোদিনও আমরা দেখি নাই—যে আমাদের সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বাধীনতা দিবসে তাদের পতাকা উড্ডীন করা হয়েছে। এটা তো মাত্র শুরু। যদি চুক্তি বাতিল করা না যায়, লড়াই করে যদি এই চুক্তি বাতিল করতে সরকারকে বাধ্য করা না যায়, তাহলে আমাদেরকে আরও অনেক কিছু দেখতে হবে।” আব্দুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, “তারেক রহমান কি বলবেন, তিনি এই চুক্তি মানেন না? যদি চুক্তি নাই মানেন, চুক্তির শর্ত অনুসারে কেন ৩০শে জুলাই ৪৫,৪০৮ কোটি টাকা দিয়ে চারটা বোয়িং বিমান কেনার জন্য চুক্তি করা হলো? বোয়িং তো আমেরিকান সরকারি কোম্পানি না।” তিনি বলেন, “২৪শে জুলাই-আগস্টে যারা জীবন দিয়েছে, যারা লড়াই করেছে, আমরা যারা রাজপথে ছিলাম, আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিজেদের মাথা বিকিয়ে দেয়ার জন্য লড়াই করি নাই। আজকের এই সমাবেশে যারা উপস্থিত আছেন এবং সমাবেশের বাইরে সারা দেশে যারা এই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং যুদ্ধ বিরোধী লড়াইয়ের মধ্যে আছেন, তাদেরকে আহ্বান জানাতে চাই যে আসেন, রাজপথে লড়াই করি। রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে এই সরকারকে বাধ্য করি চুক্তি বাতিল করতে। সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধ বিরোধী জোটের কেন্দ্রীয় নেতা রতন বলেন, “অনেকেই আজকে যুক্তি দেয়, ভারতকে ঠেকাতে হলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই চুক্তির সাথে আমাদের থাকতে হবে। ভারত লুণ্ঠন করলে খারাপ, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের লুণ্ঠন করে ভালো—এইটা কখনোই হতে পারে না। “আজকে আমাদের দেশকে যারা লুটতে আসবে, সেটা ভারতই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হোক, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো গর্জে উঠতে হবে। আমাদের দেশকে যারা লুটতে আসে, তাদেরকে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। সবাইকে একসাথে থাকতে হবে। তিনি বলেন, “ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার মধ্য দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করতে হবে; সেই সাথে যারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হয়ে বাংলাদেশে খেলতে এসেছে, তাদেরকেও পরাজিত করতে হবে। আজকে যারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর হয়ে দেশ পরিচালনা করছে, দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাদেরকেও আজকে পরাজিত করতে হবে।” এই গণজমায়েতে বক্তব্য রাখেন ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ) এর কেন্দ্রীয় সদস্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এর প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা, নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মুশতাক হোসেন, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন, জাতীয় কৃষক ক্ষেতমজুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ। গণজমায়েতে সমবেত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবি, নারী, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন এক্টিভিস্ট ও ব্যক্তিবর্গ। বক্তাগণ তাঁদের বক্তব্যে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে দেশের শ্রম, কৃষি, স্বাস্থ্য, পোল্ট্রি, ডেইরি, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য যে বিপর্যয় নামবে তার উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি দেশের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, সেই ঘাটতি পূরণে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া বাড়তি করের চাপ নিয়ে নিন্দা করেন। সর্বোপরি এই চুক্তি এবং এই জাতীয় সকল চুক্তি (জাপান, ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি) দেশের সুরক্ষা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ তা ব্যক্ত করেন। বক্তাগণ অবিলম্বে এ চুক্তি বাতিলের জন্য দাবী জানান এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করা হতে বিরত থাকার জন্য বর্তমান সরকারকে উপদেশ দেন। চুক্তি বাতিল না করলে গণ জমায়েত থেকে আরও কঠোর কর্মসূচির আয়োজন হবে বলে হুশিয়ারি জানানো হয়। গণজমায়েত সঞ্চালনা করেন অধিকারকর্মী মারজিয়া প্রভা, শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভান তাহসীব।