মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে গেলে

Posted: 12 জুলাই, 2026

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন এতকিছু ঘটছে যে কোনটা ছেড়ে কোনটা নিয়ে কথা বলা দরকার, তার অগ্রাধিকার তালিকা করতে গেলেও হিমশিম খেতে হবে। আয়াতুল্লাহ খামেনির বিশাল শেষকৃত্য, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পুনরুত্থান, দক্ষিণ আমেরিকায় ডানপন্থার বাড়বাড়ন্ত, ইউক্রেন আর ইউরোপকে যেভাবে ঘিরে ফেলছে রাশিয়া, আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধ, ইসলামাবাদ-নয়াদিল্লি­র সমরসাজ, চীনের নানামুখী তৎপরতা; কোনটা ছেড়ে কোনটা বাদ দিবো? তার চেয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো যাক। এইতো নভেম্বরে তাদের মধ্যবর্তী নির্বাচন। মার্কিন অর্থনীতির ত্রাহি দশা, ইরানের সঙ্গে ‘অনন্ত যুদ্ধ’, প্রেসিডেন্টকে দৃষ্টিকটূ তোষণের যে নজির এই আমলে দেখা যাচ্ছে, তাতে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের দুই কক্ষে এখন যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে, নভেম্বরের পর তা আর থাকবে না বলে অনেক বিশ্লেষকেরই অনুমান। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি শেষ পর্যন্ত টেনেটুনে রাখা যায়ও, প্রতিনিধি পরিষদে তা হবে কি না তা নিয়ে খোদ রিপাবলিকানদের অনেকেই শঙ্কিত। না, ট্রাম্প জিতুন বা হারুন, তাতে রাশিয়া, চীন ও গ্লোবাল সাউথের যে অপ্রতিরোধ্য উত্থান তা ঠেকানো সম্ভব হবে না। ট্রাম্প চাইছেন আগেভাগে যতখানি সম্ভব, জোর দেখিয়ে হোক, শুল্ক বা অস্ত্রের হুমকি দেখিয়ে হোক, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যতটুকু হিস্যা আদায় করে নেওয়া যাক, এরপর বাকিটুকুর ব্যাপারে চীন ও অন্যান্য প্রতিপক্ষদের সঙ্গে দরকষাকষি করা যাবে। তার দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশল একটু ভিন্ন। তারা দরকষাকষি জারি রেখে বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রতিপত্তি যতখানি ধরে রাখা যায় তাতেই স্বচ্ছন্দ। দুটি কৌশলই পতনোন্মুখ। অর্থাৎ, যে পথেই ট্রাম্প বা তার উত্তরসূরীরা হাঁটুন না কেন, তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ যে শেষ, তা নিশ্চিত। বহু মেরুর বিশ্ব এখন অবশ্যম্ভাবী। হয়তো তারই নানান প্রসব বেদনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ট্রাম্পের পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনকে পঙ্গু করে দেবে, সেই সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টিও চরম আদর্শিক গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হতে পারে, তাতে ট্রাম্পবাদীরা দলটির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। এর বিপরীতে ‘দৃশ্যত কোমল’ আদতে আগ্রাসী ডেমোক্র্যাটিক আধিপত্যবাদও বিশ্বমঞ্চে বেধড়ক মার খাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক পতনের প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে। অর্থনৈতিক অঙ্গনে ডেকে আনবে মহাবিপদ। ট্রাম্পের প্রণীত শুল্ক ও বাণিজ্যযুদ্ধের নীতিগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে অস্থিরতা তৈরি করেছিল, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে এসে তা হঠাৎ করে প্রত্যাহার বা শিথিল করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এই নীতিগত দোলাচল বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবিশ্বস্ত ও বিশৃঙ্খল অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। গ্লোবাল সাউথ এবং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো এরই মধ্যে ডলারের বিকল্প খোঁজা শুরু করেছে; এই অনিশ্চয়তা তাদের ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়াকে বেগবান করবে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির ভুল সিদ্ধান্ত ও ডেমোক্র্যাটদের অতি-উদার বাণিজ্যনীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেশটির অর্থনীতিকে মোটা দাগে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটতে পারে। ইসরায়েল আজ পর্যন্ত মার্কিন সুরক্ষার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জবাবদিহি এড়িয়ে এসেছে। ট্রাম্প যদি না জেতেন, তাহলে একটি ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস ইসরায়েলের কাছে কিছুটা হলেও হিসাব চাইতে বাধ্য হবে, বিশেষ করে যখন কংগ্রেসের প্রগতিশীল অংশ অস্ত্র সরবরাহে শর্তারোপের কথা বলছে। এটি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবাধ নৃশংসতার বৈশ্বিক দলিলায়ন এবং আইনি চাপ আরও বাড়াবে। ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কেও আসবে নতুন সমীকরণ। ট্রাম্পের অনুপস্থিতিতে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কিছুটা বেশি ‘খবরদারি’ ও নীতি-নির্ধারণী প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। ডেমোক্র্যাটরা ইউরোপীয় মিত্রদের নিরাপত্তার দায় কাঁধে তুলে নিয়ে ইউক্রেনে আরও অনেক বেশি অস্ত্রশস্ত্র ঢালবে। এতে মার্কিন যুদ্ধবল, গোয়েন্দা ও সামরিক মনোযোগ মস্কোর দিকে গভীরভাবে নিবদ্ধ হবে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে চীনের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সিযুদ্ধে পুরোপুরি নিবিষ্ট থাকলে বেইজিং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব নির্বিঘ্নে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম বা জাপানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা চুক্তি থাকলেও বাস্তবে চীনা নৌবহরের অবাধ বিচরণ ও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের সম্প্রসারণ চীনকে আরও ‘আপার হ্যান্ড’ এনে দেবে। দক্ষিণ আমেরিকায় অবশ্য ট্রাম্পের আগ্রাসী দক্ষিণপন্থা এরইমধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের পতনের পর আর্জেন্টিনার ইসরায়েলঘেঁষা, বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেসহ অন্যান্য কট্টর ডানরা ‘অনাথ’ হয়ে পড়তে পারে। কিউবারও হাঁপ ছেড়ে বাঁচার খানিকটা সম্ভাবনা আছে। ভারতও আরও বেশি কৌশলী ভারসাম্যের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা রেখে চীনকে মোকাবিলাই ছিল নয়া দিল্লির অগ্রাধিকার। কিন্তু ট্রাম্প-পরবর্তী আমেরিকা যখন দোদুল্যমান এবং ইউরোপকেন্দ্রিক সংঘাতে মগ্ন হবে, তখন ভারতও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে। তবে এত কিছুর মধ্যেও এটা মনে রাখা দরকার যে ট্রাম্প ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তিনি এরই মধ্যে আস্তো নির্বাচন কমিশনই বদলে ফেলেছেন। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি যদি তার চাপ ধরে রেখে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে জয় নিয়েই বেরিয়ে আসেন, তাহলে তার অনুসারীরা সংবিধানের ব্যাখ্যা বদলে তাকে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট রেখে দেওয়ারও নানান ফাঁকফোকর খোঁজা শুরু করতে পারেন। তেমনটা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গণতন্ত্র’ এমন এক নতুন চরিত্র নিয়ে হাজির হবে, তা সম্ভবত আর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বেচা যাবে না।